---

জুলাইয়ের চেতনা : আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা হবে তো?

জুলাইয়ের চেতনা : আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা হবে তো?

জুলাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়। এটি একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সত্য, ন্যায়, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষায় জাতির সম্মিলিত জাগরণের প্রতীক। ছাত্র-জনতার অকল্পনীয় আত্মত্যাগ, নির্যাতন ও রক্তের বিনিময়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা মানুষের মনে একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন জাগিয়েছিল।
কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে আদর্শকে সামনে রেখে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, আজ তার অনেকগুলোই প্রশ্নের মুখে। রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, সুশাসন এবং জবাবদিহির যে প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তি-প্রভাব ও ক্ষমতার রাজনীতি আবারও প্রাধান্য পাচ্ছে—এমন অভিযোগ সমাজের নানা স্তর থেকে উঠে আসছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা একসময় এ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন কিংবা দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের এই পরিবর্তনের প্রধান দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, যাঁদের আত্মত্যাগে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তাঁদের অবদান অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এ প্রবণতা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও সত্যকে আড়াল করার শামিল।
জাতি প্রত্যাশা করেছিল—নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে সংসদ হবে নৈতিকতা, শালীনতা ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতির কেন্দ্র। কিন্তু রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি, পারস্পরিক চরিত্রহনন, সংস্কারবিরোধী অবস্থান এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন মানুষের সেই প্রত্যাশাকে ক্ষুন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মেধার পরিবর্তে আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও জনগণের আস্থাকে দুর্বল করছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মাদক বিস্তার, চাঁদাবাজি, সামাজিক অবক্ষয় এবং তরুণ সমাজের নৈতিক সংকট—এসব জাতীয় সমস্যা মোকাবিলায় দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগের অভাবও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। যে রাষ্ট্র মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হয়েছিল, সে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উচ্চারিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—পরাজিত অন্যায় ও দুর্নীতির শক্তিগুলো আবারও নতুন রূপে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন আদর্শ বিস্মৃত হয়, আত্মত্যাগের মূল্যায়ন হয় না এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ব্যক্তি ও দলের স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন জাতিকে নতুন সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।
একটি মুসলিম সমাজ হিসেবে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, প্রকৃত পরিবর্তন কেবল শাসক পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে না; আসে ন্যায়, আমানতদারিতা, তাকওয়া এবং আল্লাহভীতিনির্ভর নেতৃত্বের মাধ্যমে। কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়—কোনো জাতি নিজের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা না করলে আল্লাহও তাদের অবস্থা পরিবর্তন করেন না। অতএব, জাতীয় পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত হলো নৈতিক পুনর্জাগরণ, সত্যের প্রতি অবিচল অবস্থান এবং ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও উম্মাহর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ যেন কেবল স্মরণসভা বা বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, মেধা ও সততা মূল্যায়িত হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়া হবে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। অন্যথায় ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না, আর আত্মত্যাগের সেই মহান অধ্যায় কেবল অপূর্ণ স্বপ্নের প্রতীক হয়েই থেকে যাবে।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ