ইলম ও মানবতার বাতিঘর দুর্যোগ ও সংকটে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া
আকরাম সা’দী
ইসলাম কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদত-বন্দেগির সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার মূল সুরই হলো সৃষ্টির সেবা ও কল্যাণসাধন। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইসলামে আল্লাহর হকের (হাক্কুল্লাহ) পাশাপাশি বান্দার হককে (হাক্কুল ইবাদ) অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই প্রকৃত মুমিন হতে হলে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করা আবশ্যক।
মানবসেবার এই শাশ্বত দর্শন ফুটিয়ে তুলে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন: “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।” — (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১১০)
সৃষ্টির কল্যাণসাধনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: “মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের উপকার ও কল্যাণ সাধন করে।” —(আল-মু’জামুল আওসাত, তাবারানী)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন: “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি সংকট বা বিপদসমূহের কোনো একটি বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের বিপদগুলোর মধ্য থেকে তার একটি বড় বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সহজ করে দেবে (তার ঋণ বা সংকট লাঘব করবে), আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার জন্য সহজ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দাকে সাহায্য করতে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে…” — (সহীহ মুসলিম)
হাদীস শরীফে মানবজাতি ও সমগ্র সৃষ্টিকে মহান আল্লাহর এক পরিবারের সাথে তুলনা করে প্রিয় নবী (সা.) আরও ঘোষণা করেছেন:”সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবারস্বরূপ। সুতরাং আল্লাহর কাছে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে প্রিয়, যে তাঁর পরিবারের (সৃষ্টির) প্রতি বেশি দয়ালু ও সেবামূলক আচরণ করে।” — (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী)
ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র প্রদান, অসুস্থের সেবা, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং যেকোনো দুর্যোগে মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো—ইসলামী সমাজব্যবস্থার মূল ভিত্তি। ইসলাম মানবসেবাকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করেনি; বরং পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও ইহ-পারলৌকিক মুক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথ হলো এই নিঃস্বার্থ মানবসেবা।
মানবসেবার এই মহান শিক্ষা কওমী মাদরাসার শিক্ষাধারায় কেবল পুঁথিগত ইলম চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তারা হাতে-কলমে আর্তমানবতার সেবা ও উম্মতের সংকটকালে তা বাস্তবায়ন
করে
দেখিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপীঠ আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইলম ও দীনের খিদমতের পাশাপাশি যেকোনো জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি ও সংকটে পটিয়া মাদরাসার আকাবির ও আসলাফগণ (পূর্বসূরিগণ) বুক দিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষকে আগলে রেখেছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের যেকোনো প্রান্তের দুর্গত মানুষের কাছে জামিয়া পটিয়া সর্বদা এক বিশ্বস্ত আশ্রয় ও অমলিন ভরসাস্থল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
উম্মতের অভিভাবক জামিয়া পটিয়া
জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার মুরুব্বিগণ শুধু কিতাবের পাতায় দীন চর্চা করেননি, বরং তাঁরা সবসময় উম্মতের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬০, ১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৮৭ এবং ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিকম্পসহ প্রতিটি ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই মাদরাসার আকাবিররা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং দুর্গতদের মাঝে কোটি কোটি টাকার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন।
এক্ষেত্রে জামিয়ার দ্বিতীয় মুহতামিম, যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ হযরত মাওলানা হাজী ইউনুস আব্দুল জব্বার (রহ.)-এর দৃষ্টান্ত অতুলনীয়। ১৯৯১ সালের শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর তিনি নিজে মাঠে নেমে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণ ও সংস্কারের বিশাল মহাযজ্ঞ পরিচালনা করেন। হাজী সাহেব হুজুর (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর রেখে যাওয়া মানবসেবার এই মহান কাজ যাতে কখনো থমকে না যায়, সেজন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ইসলামী ত্রাণ কমিটি বাংলাদেশ’। তাঁর ইন্তেকালের পর জামিয়ার পরবর্তী মুহতামিমগণ, বিশেষ করে আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী (রহ.) সহ অন্যান্য মুরুব্বিগণও এই আমানতকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে রক্ষা করে চলেছেন।
প্রকৃতির রুদ্ররূপ ও ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার ভয়াবহতম বন্যা
২০২৪ সালের ২০ আগস্ট। কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই বঙ্গোপসাগরের গভীর নিম্নচাপজনিত রেকর্ডভাঙা অতিবর্ষণ এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল মুহূ্র্তের মধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে এক জীবন্ত সাগরে পরিণত করে। ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো ভেঙে পানির তীব্র স্রোত লোকালয়ে প্রবেশ করে। এটি কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না; পানির উচ্চতা এতটাই বেশি ছিল যে, বহুতল ভবনের দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, মোবাইল নেটওয়ার্ক ডাউন এবং সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ায় একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোটি মানুষ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হন।
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও দীর্ঘস্থায়ী পানিবন্দী জীবনের বিভীষিকা
এই বন্যা উপকূলীয় ও সমতল অঞ্চলের মানুষের জীবনে এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনে:
ফেনী ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ টানা ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করেন। বিশেষ করে নোয়াখালীর সুবর্ণচর, বেগমগঞ্জ এবং লক্ষ্মীপুরের নিচু এলাকাগুলোতে পানি নামতে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়।
ব্যাপক প্রাণহানি: সরকারি ও বেসরকারি তথ্যমতে, এই আকস্মিক বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলায় ৭১ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৮ জন মারা যান ফেনীতে।
আর্থিক ও অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর হিসাব অনুযায়ী, এই বন্যায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪,৪২১.৫ কোটি টাকা। লাখ লাখ কাঁচা ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশে যায়, হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি ভেসে যায় এবং গবাদিপশু ও মাছের ঘের সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
২০২৪-এর বন্যা ও মুফতী আবু তাহের কাসেমী নাদভী (রহ.)
২০২৪ সালের আগস্টে যখন ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে, তখন পটিয়া মাদরাসার মসনদে সবেমাত্র নতুন মুহতামিম হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন হযরত মাওলানা মুফতী আবু তাহের কাসেমী সাহেব। একটি শীর্ষ মাদরাসার নতুন মুহতামিম হিসেবে তাঁর সামনে তখন অনেক পারিপার্শ্বিকতা, প্রশাসনিক ব্যস্ততা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু সব কিছুর উর্ধ্বে উঠে তিনি আকাবির আসলাফদের রেখে যাওয়া সেই মহান ব্রত—আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
হাজী সাহেব হুজুর (রহ.)-এর রেখে যাওয়া সেই ‘ইসলামী ত্রাণ কমিটি’-কে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্গঠন করে তিনি যেন আমানতের নৌকার এক নতুন ও দক্ষ মাঝি হিসেবে হাল ধরলেন। মাদরাসার একাডেমিক ক্লাস সাময়িকভাবে স্থগিত করে তিনি ‘সেবা সপ্তাহ’ ঘোষণা করেন, যা কওমী মাদরাসার ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করে।
সশরীরে ত্রাণ বিতরণ: মাদরাসার অভ্যন্তরীণ কাজের চেয়ে ডুবন্ত মানুষের জীবন বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি দ্রুত তহবিল সংগ্রহের জন্য দেশ-বিদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রবাসীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই এক বিশাল ত্রাণ তহবিল গঠিত হয়। বয়সের ভার ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে তিনি নিজেই সশরীরে ত্রাণ নিয়ে ফেনী ও নোয়াখালীর সবচেয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে ছুটে যান। কোমর সমান পানি ও কাদা মাড়িয়ে দুর্গত মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে নিজের হাতে ত্রাণের প্যাকেট ও নগদ অর্থ পৌঁছে দেন।
অসাম্প্রদায়িক মানবিকতার এক অনন্য নজির
জামিয়া পটিয়ার ত্রাণ স্কোয়াডের সুশৃঙ্খল মিশন ফেসবুকে এক অভূতপূর্ব আবেগ ও প্রশংসার ঝড় তোলে। সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে মাদরাসার ছাত্রদের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব। ফেনী ও নোয়াখালীর বেশ কিছু প্লাবিত সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) পাড়ায় পটিয়া মাদরাসার ছাত্ররা পরম মমতায় হিন্দু পরিবারগুলোর হাতে ত্রাণ ও নগদ অর্থ তুলে দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলেম সমাজের এই উদারতা ও মানবিক রূপ দেখে সাধারণ মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং দেশের সুশীল সমাজ কওমী মাদরাসার প্রতি ভূয়সী প্রশংসা করেন। নেটিজেনরা মন্তব্য করেন, “দুর্যোগের কোনো ধর্ম নেই, আর পটিয়া মাদরাসা তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিল।”
উত্তর-বন্যা পুনর্বাসন: পানি নেমে যাওয়ার পরও জামিয়া পটিয়া তাদের দায়িত্ব শেষ করে দেয়নি। তারা বন্যাকবলিত অসহায় পরিবারগুলোকে ঘর তৈরির জন্য টিন এবং ক্ষতিগ্রস্ত আলেম-উলামা ও কৃষকদের নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করে একটি দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়: জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তবানুগ চিত্র
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী এবং কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় অবিরাম বৃষ্টি ও নদীর পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে। সরকারি হিসাবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধস, বানের পানি ও দেয়াল ধসে মৃত্যুর সংখ্যা ৫১ জন। জানমালের এই ক্ষতির পাশাপাশি চার উপজেলায় ৫০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পেকুয়া ও চকরিয়ার ৮০% থেকে ৯৫% এলাকা প্লাবিত হয়। এছাড়া আউশ ধান ও সবজি খেত তলিয়ে কৃষি খাতে ১০০ কোটি টাকার বেশি, ৮ হাজারের বেশি পুকুর ও ঘের ভেসে মৎস্য খাতে ৭০ কোটি টাকার বেশি এবং ১২ হাজারের বেশি পশুপাখি মারা যাওয়ায় প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতিসহ সড়ক ও বেড়িবাঁধ ধ্বংস হয়ে সর্বমোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৬ সালের বন্যা: ঐতিহ্যের ধারায় মুফতী একরাম হোসাইন অদুদী (হাফিজাহুল্লাহ)
২০২৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা পুনরায় ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়লে, জামিয়া পটিয়া তার ঐতিহ্যগত দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র বিলম্ব করেনি।
জামিয়া পটিয়ার এই ঐতিহাসিক সেবামূলক ঐতিহ্যকে ধারণ করে সম্প্রতি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জামিয়ার নবনিযুক্ত মুহতামিম মুফতী একরাম হোসাইন অদুদী (হাফিজাহুল্লাহ)। জামিয়ার নতুন এই অভিভাবক দায়িত্ব নিয়েই তাঁর আকাবির ও পূর্বসূরিদের দেখানো পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন।
বন্যায় চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে অসংখ্য বানভাসি মানুষ। এই কঠিন পরিস্থিতিতে জামিয়ার কেন্দ্রীয় মসজিদে তিনি বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। একই সাথে তিনি সংকটকালে জামিয়া পটিয়ার ঐতিহাসিক মানবসেবার অবদান স্মরণ করিয়ে দিয়ে ছাত্র, শিক্ষক ও সর্বস্তরের শুভানুধ্যায়ীদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান।
তাঁর এই আন্তরিক ও দিকনির্দেশনামূলক আহ্বানে মুহূর্তেই যেন এক অভূতপূর্ব সাড়া জেগে ওঠে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে একটি জরুরি ত্রাণ তহবিল গঠন করা হয়। সেই তহবিলের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চকরিয়া ও পেকুয়া অঞ্চলে দুই দফায় ১,৫০০ (দেড় হাজার) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির প্যাকেট প্রস্তুত করে বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়।
১৩ জুলাই ২০২৬, সোমবার আল্লামা মুফতী একরাম হোসাইন অদুদীর সার্বিক নির্দেশনা, নেতৃত্ব ও বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে জামিয়ার একটি ত্রাণ কাফেলা বন্যাকবলিত বিভিন্ন উপজেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যাত্রার পূর্বে তিনি মানবিক খিদমত কবুল হওয়া, দুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘব এবং এই কাজে সম্পৃক্ত সবার কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন।
তাঁর সাথে উক্ত ত্রাণ কাফেলায় উপস্থিত ছিলেন: আল্লামা জাকারিয়া আজহারী (নায়েবে মুহতামিম), আল্লামা মুফতী জসিম উদ্দীন (নাযেমে তা’লীমাত), মাওলানা হাফেজ মাসুম, মুফতী মানজুর সিদ্দিক, মাওলানা সলিমুদ্দিন মাহদী কাসেমী, মাওলানা আনিসুল হক, মাওলানা নাসির উদ্দিন, মাওলানা ত্বকী, মাওলানা সুহাইল কাসেমীসহ জামিয়ার একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক।
তাঁদের লক্ষ্য ছিল বন্যাদুর্গত মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া এই অভয়বাণী—”আপনারা একা নন, এই বিপদে আপনাদের পাশে রয়েছে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া।”
মাঠপর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম
১. বাঁশখালী: ঘরে ঘরে মানবতার স্পর্শ
ত্রাণ কাফেলা প্রথমে বাঁশখালী উপজেলার ছাপাছড়ি, ইলশা, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মাদরাসা এবং ইউনুসিয়া মাদীনাতুল উলূম মাদরাসাসহ একাধিক বন্যাকবলিত এলাকায় পৌঁছায়। কাফেলার সদস্যরা কোথাও ঘরে ঘরে গিয়ে, আবার কোথাও স্থানীয় মাদরাসাকে কেন্দ্র করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও উপহার তুলে দেন। এই কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিক সহযোগিতা করেন মাদরাসা আবু বক্কর সিদ্দিকের মুহতামিম মাওলানা ইউসুফ সাঈদ, ইউনুছিয়া মদিনাতুল উলুম মাদরাসার পরিচালক মাওলানা আব্দুর রহমান নোমানসহ সংশ্লিষ্ট মাদরাসাগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম।
২. সাতকানিয়া: দুর্গম জনপদে মানবিক অভিযাত্রা
এরপর ত্রাণ কাফেলা সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া টেক সংলগ্ন বুধপাড়া, কেওছিয়া ওবাইদিয়া মাদরাসা, নলুয়া, ডলুকুল, ভিল্লাপাড়া, জনার কেউসিয়াসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করে। এই কার্যক্রমে জামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন। সহযোগিতায় ছিলেন হাতিয়ারকুল কাসেমিয়া নুরুল উলুম মাদরাসার মুহতামিম মুফতী মনসুর সিদ্দিকী, জামিয়ার সাবেক প্রফেসর রাসেল সাহেব, মাওলানা লোকমান হাকিম এবং জনার কেউচিয়া ওবাইদিয়া মাদরাসার পরিচালক মাওলানা ইদ্রিস সাহেব।
ডিঙ্গি নৌকায় মৃত্যুঝুঁকি পেরিয়ে: ডলুকুল ও ভিল্লাপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় যোগাযোগের কোনো সড়কপথ অবশিষ্ট ছিল না। কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও বিস্তীর্ণ জনপদ নদী রূপ নিয়েছিল। ফলে বাধ্য হয়ে জামিয়ার ত্রাণ কাফেলাকে ডিঙ্গি নৌকায় করে স্রোত পেরিয়ে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়েছে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই দেখা যায় এক আবেগঘন দৃশ্য; শিশুদের উচ্ছ্বাস, বৃদ্ধদের ব্যাকুল অপেক্ষা আর অসহায় মায়েদের অশ্রুসজল চোখ যেন বলে দিচ্ছিল—মানবতা আজও বেঁচে আছে। বিশেষ করে মাওলানা ত্বকী ও মাওলানা সুহাইল কাসেমী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম প্রান্তিক এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
৩. চকরিয়া ও পেকুয়া: উপকূলে আশার আলো
অভিযাত্রার ধারাবাহিকতায় ২৪ জুলাই ২০২৬ জামিয়া পটিয়ার মুহতামিম মুফতী একরাম হোসাইন অদুদী হাফিজাহুল্লাহর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ২য় দফায় ক্ষতিগ্রস্ত চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার প্লাবিত উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে পৌঁছে যায় কাফেলাটি। পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির পানি নেমে গেলেও এই অঞ্চলের হাজারো মানুষ যখন তীব্র মৌলিক চাহিদার সংকটে দিশেহারা, ঠিক তখনই জামিয়ার কাফেলা তাঁদের জন্য নিয়ে আসে স্বস্তির পরম বার্তা।
চকরিয়া উপজেলার কার্যক্রম: চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের পাহাড়তলী তা’লীমুল কুরআন মাদরাসাকে কেন্দ্র করে হারবাং, বরইতলী, রাসুলাবাদ, ডেঙ্গাকাটা, পহরচাঁদা, পাহাড়তলী ও মচনিয়াকাটা এলাকার বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়। বিতরণের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিম সর্বস্তরের মানুষকে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে ত্রাণ প্রদান করা হয়। এতে পাহাড়তলী তা’লীমুল কুরআন মাদরাসার মুহতামিম, শিক্ষক ও ছাত্ররা সার্বিক সহযোগিতা করেন।
পেকুয়া উপজেলার কার্যক্রম: চকরিয়ার কার্যক্রম শেষে কাফেলাটি পেকুয়ার মগনামা, রাজাখালী, শিলখালী, বারবাকিয়া, উজানটিয়া ও টইটং ইউনিয়নের দুর্গম বন্যাদুর্গত এলাকায় পৌঁছে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে। এখানে কার্যক্রম পরিচালনায় চিরিঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আনোয়ার এবং আশরাফুল উলূম পেকুয়া মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আবুল বশরসহ স্থানীয় আলেম-উলামাগণ সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
শেষ কথা
চকরিয়া ও পেকুয়ার উপকূল থেকে শুরু করে সাতকানিয়ার দুর্গম জনপদ, বাঁশখালীর প্লাবিত গ্রাম কিংবা অতীতের ফেনী-নোয়াখালীর বন্যাভূমি—প্রতিটি সংকট যেন একই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, নেতৃত্বের পালাবদল হয়েছে; কিন্তু বদলায়নি আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার মানবসেবার আদর্শ। আকাবির ও আসলাফগণের হাতে রোপিত যে সেবার বৃক্ষ, তা আজও সমান সতেজ, সমান ফলবান। এক মুহতামিমের হাত থেকে আরেক মুহতামিমের হাতে, এক প্রজন্মের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে—এই আমানত আজও অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত।
বস্তুত, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া শুধু একটি প্রাচীন দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি এমন একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যেখানে ইলমের সঙ্গে আমল, দাওয়াতের সঙ্গে খিদমত এবং দীনের সঙ্গে মানবতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এখানকার ছাত্ররা কেবল কিতাবের পৃষ্ঠা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে না; তারা শেখে কীভাবে মানুষের দুঃসময়ে তার পাশে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অন্যের কষ্ট লাঘব করতে হয় এবং কীভাবে মানবসেবাকেও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হয়।
আজকের এই আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার এই মানবিক অভিযাত্রা শুধু একটি ত্রাণ কার্যক্রমের ইতিহাস নয়; এটি দীনি শিক্ষা ও মানবকল্যাণের এক অনন্য মেলবন্ধনের জীবন্ত দলিল, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সচিব, জামিয়াপ্রধানের কার্যালয়