---

শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন ভালোবাসা ও শ্রেষ্ঠত্ব

শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন ভালোবাসা ও শ্রেষ্ঠত্ব

হাকীমুল উম্মত, মুজাদ্দিদুর্দ মিল্লাত

হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর

মালফুযাত, মাওয়ায়েয, খুতবা, রচনা এবং ফতোয়ার চয়লিত অংশের সংকলন আল-ইলম ওয়াল উলামা হতে ধারাবাহিক অনুবাদ [৩]


হাকীমুল উম্মত বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার ভালোবাসা বেশি, ভক্তিদের জন্য তেমন নয়। আমার মাঝে তালিবে ইলমদের স্বভাব বেশি। আমি তালিবে ইলমের কাছে আমার দোষ লুকিয়ে রাখি না। কিন্তু আমি চাই না আমার দোষগুলো মুরিদদের কাছে দৃশ্যমান হোক। কারণ অল্পতেই মুরিদের সাথে মহব্বতে ফাটল ধরে যায়। এটি ঘটে কারণ মানুষের মধ্যে এতির ভিত্তি প্রায়শই একটি ধারণা যে, তিনি পরিবর্তিত হয়ে গেছেন। ছাত্রের মহব্বতের সম্পর্কে ফাটল ধরে না। কারণ সে ইলম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। দোষ জানার পরও ইলম ওই ছাত্রের মাঝে বাকি থাকে। যতক্ষন ইলম থাকবে ততক্ষন তা বাকি থাকবে।

হযরত মাওলানা থানভী রহ.-এর ঘটনা হলো, একবার এক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি তাঁর কাছে মেহমান হিসেবে এলেন। খাওয়ার সময় হলে হযরত তাঁকে কাছে বসিয়ে দিলেন। কারণ তাঁকে বড় লোক মনে করা হতো। অন্যান্যের গরিব তালিবে ইলম তাঁকে হযরতের সঙ্গে বসে থাকতে দেখে পিছনে সরে গেল। হযরত মাওলানা সাহেব বললেন, ভদ্রমহোদয়গণ! কেন তোমরা চলে গেলে? আমার পাশে একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বসে আছেন বলেই কি? ভালোভাবে বুঝে নাও! তোমরা হলে আমার প্রিয়। তোমাদেরকে আমি যতটা সম্মানিত মনে করি, সেখানে তাঁর কোনো অংশই নেই। পরে তিনি সব গরিব ছাত্রের বসিয়ে খাদ্য খাওয়ালেন।

দীনি ইলম অন্বেষণের ফজিলাত

খাবার হলো দৈহিক খাদ্য, ইলম হলো আধ্যাত্মিক খাদ্য। জীবন জ্ঞানের ওপরই নির্ভরশীল। দীনের ইলম অর্জনের একটি উপকারিতা হলো, এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদের সওয়াব পায়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য অজুহাত খোঁজেন।

আলেম কোর্স : আরবি-ফারসির ফজিলাত

আপনি যদি বলেন আরবি ভাষার প্রয়োজনীয়তা কী? তাহলে আমি বলব, অনুবাদ কখনো নিখুঁত হতে পারে না। কারণ কিছু শব্দ আছে যেগুলোর একাধিক অর্থ আছে এবং বিভিন্ন মর্ম আছে। ব্যাখ্যা আছে। এখন মূল শব্দগুলো না জানলে সেই অবস্থা হবে, যা বর্তমানে তাওরাত এবং ইনজিলের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এর দ্বারা ছাত্র বিধানের মূলে পৌঁছতে পারে না। সুতরাং বুঝা গেল, মূল শব্দজ্ঞানের জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

এই ব্যবস্থা আবশ্যক যে, একটি বিশ্বস্ত জামায়াত এমন থাকা উচিত, যারা সকল দীনি ইলমে নিখুঁত গবেষণা করেন। জীবনের একটি বড় অংশ এই ইলম অন্বেষণে এবং সমস্ত জীবন এর খেদমত ও প্রচারে ব্যয় করেন। যা ছাড়া তার অন্য কোনো কাজ থাকবে না।

পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে বলা হয়েছে :

وَلْتَكُن مِّنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ

“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকবে যারা ভালোর দিকে আহ্বান করবে, সৎ কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে।”

আর হাদীসসমূহে আসহাবে সুফফার ক্ষেত্রে এই উদাহরণ রয়েছে।

এটি ফরজে কেফায়া। আর ফরজে কেফায়ার হুকুম হলো, প্রত্যেক জায়গায় যদি এমন একটি জামাআত থাকে, যারা তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, তাহলে সমস্ত মুসলমান গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। অন্যথায় সমস্ত মুসলমান গুনাহের কাজে শরীক হবে।

ইলম ও আলেমদের ফজিলাত

الْعُلَمَاءُ وَرَثَةُ الأَنْبِيَاءِ

“আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী।” ইমাম মুহাম্মদকে কেউ স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করল আপনার সাথে কী আচরণ হয়েছে? তিনি বলেন, আমি যখন আল্লাহর দরবারে হাজির হলাম, তখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো : তুমি কী চাও? আমি নিবেদন করলাম, হে প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন। বলা হলো, হে মুহাম্মদ! আমি যদি তোমাকে শাস্তি দিতে চাইতাম, তবে তোমাকে এই ইলম দিতাম না। আমি তোমাকে ইলম দিয়েছি কারণ আমি তোমাকে ক্ষমা করতে চেয়েছিলাম।

এ থেকে কেউ কেউ উদঘাটন করেছেন যে, কেউ জানে না, আল্লাহ আমার সাথে কীরূপ আচরণ করবেন। আলেমদের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ বলা হয়েছে,

مَن يُرِدِ اللَّهُ بِه خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

সুতরাং এবার বুঝে আসার কথা : ইলমে দীন অর্জন কত বড় ফজিলতের বিষয় যে, এটা ছাড়া আল্লাহ খুশি হন না। দীনের ইলম লাভের ওপর আল্লাহ তাআলার রেজামন্দি স্থগিত থাকে।

আলেমদের প্রয়োজন

আমি জিজ্ঞেস করি : জাতির জন্য আলেম থাকা দরকার কি না? যদি দরকার না হয়, তবে তাকে বলতে হবে যে ইসলামের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ আলেম ছাড়া ইসলাম টিকে থাকতে পারে না। কেননা, বিশেষজ্ঞ ছাড়া কোনো পেশা চলতে পারে না। এটা ভিন্ন বিষয় যে, অল্পস্বল্প দীনি জ্ঞান সবারই থাকা চাই। যার দ্বারা সীমিত সময়ের জন্য তারা কিছু প্রয়োজন মেটাবে। কিন্তু তা দ্বারা প্রয়োজনের পরিমাণটুকু বাকি থাকতে পারে না। কোনো জিনিসের টিকে থাকা সবসময় তার বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করে। তাই বিশেষজ্ঞ আলেমদের প্রয়োজন থেকে যায়।

এবার কথা হলো, এই বিশেষজ্ঞদের জন্য কিভাবে অভিজ্ঞতা বলে : এর একমাত্র উপায় হলো, চাঁদা থেকে কিছু পুঁজি সংগ্রহ এবং পরবর্তী প্রজন্মকে দীনি তা’লীম শেখানোর জন্য আলেমদের সেবা করা। এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া সমগ্র জাতির ওপর আবশ্যক। কারণ, তাঁরাই সকল কষ্ট সহ্য করে দীনি শিক্ষায় যুক্ত হন। তাই আপনার উচিত তাদের মূল্যায়ন করা। আরবি পড়লে কী খাবে বলে তার মনোবল ভেঙে দেওয়া কিছুতেই উচিত নয়? হ্যাঁ জনাব! এই দুনিয়ার কুকুর হওয়ার চেয়ে উত্তম।

আলেমের উদাহরণ

আলেমের উদাহরণ সূর্যের মতো। উদিত হওয়ার সাথে সাথে পুরো পৃথিবীর অর্ধেক আলোকিত হয়ে যায় এবং অন্ধকার সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। তবে শর্ত হলো, তাকে দীদার আলেমে হতে হবে। এমন নয় যে, তোমার অনুগত হয়ে যাবে। তাদের গুণ হবে :

لَا يَخَافُونَ فِي اللَّهِ لَوْمَةَ لَائِمٍ

“আল্লাহর ব্যাপারে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে পরোয়া করবে না।”

পার্থিব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আলেম সমাজ থাকা আবশ্যক

أُدْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعاً وَخُفْيَةً وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا

দোয়া উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যদি এই আয়াতে ইবাদতের অর্থ ধরা হয়, তাহলে সারাংশ হবে, প্রথমে ইবাদতের আদেশ এবং পরেও। এর মাঝখানে ফাসাদ করতে নিষেধ করা হয়েছে। যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইবাদত না করা ফাসাদ। পবিত্র কুরআন দাবি করে, ইবাদত ত্যাগ করাই পৃথিবীতে বিপর্যয়ের কারণ (অর্থাৎ পৃথিবীতে দুর্নীতির উৎস)। পক্ষান্তরে, ইবাদত পৃথিবীর সংস্কারের উপায়। সুতরাং আয়াতের সারাংশ হলো : দীন না থাকা ফাসাদের কারণ। এখন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করছি।

দীন আসলে কয়েকটি জিনিসের সমষ্টির নাম। সেগুলো হলো পাঁচটি জিনিস। যথা : আকাইদ, ইবাদত, লেনদেন, সামাজিক শিষ্টাচার ও অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা।

পৃথিবীর সংস্কারে পৃথক পৃথকভাবে প্রত্যেকেরই জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, লেনদেনের প্রভাব সাধারণ নিরাপত্তার বেলায় দেখা যায়। কারণ লেনদেনের বিধি-বিধানের বাস্তব ফলাফল হলো, কারো অধিকার যেন নষ্ট না হয়। তাই ঐক্যমতের ওপর লেনদেনের একটি দুর্দান্ত প্রভাব রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, নৈতিকতার মধ্যে রয়েছে মিথ্যা না বলা, সহানুভূতিশীল হওয়া, স্বার্থপর না হওয়া। এই নীতিগুলো সভ্যতার একটি মহান নিয়ামকশক্তি। যার ওপর সমগ্র বিশ্বের ভিত্তি। বিভিন্ন ঘটনাবলী বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এই নৈতিকতা যদি দু’জন মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়, যাদের একজন তাওহীদ ও নবুওয়তের প্রতি বিশ্বাসী এবং অন্যজন তাতে বিশ্বাসী না, তাহলে অবশ্যই উভয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য থাকবে। অর্থাৎ তাওহীদকে অস্বীকারকারী ব্যক্তির মধ্যে এই নৈতিকতা এমনভাবে সীমাবদ্ধ থাকবে যে, এই নৈতিকতাগুলো অনুসরণ না করলে পার্থিব লাভ না থাকলে সে তা অনুসরণ করবে না। কিংবা যতক্ষণ তার বিরুদ্ধে সম্মানহানির আশঙ্কা না থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই নৈতিকতাগুলো অনুসরণ করা হবে। যদি এমন হয় যে, এই নৈতিকতার অনুসরণে পার্থিব ক্ষতি হয় এবং এগুলোর বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো বদনামের ভয় থাকে না, তাহলে এই কাফের কখনো এসব নৈতিকতার পরোয়া করবে না।

পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি নৈতিকতার শিক্ষার সাথে সাথে আল্লাহ ও বিচার দিবসের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী, সে এ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। কারণ সে জানে, আমি এখানে মুক্তি পেলেও শেষ বিচারের দিন আমাকে অবশ্যই এর ফল ভোগ করতে হবে।

এবার আমলের ভূমিকা দেখুন! সবাই জানে নৈতিকতার মধ্যে বিনয়ও আছে। এর অনুপস্থিতির কারণে দুর্নীতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ দুর্নীতির মূল হলো অনেক্জ ও অনেক্জজনিত অহংকার। অহংকার না থাকলে অনেকের কোনো কারণ নেই। সুতরাং ঐক্য গড়ে তুলতে এবং অহংকার মুছে ফেলতে বিনয়ের প্রয়োজন। আর বিনয়ের অভ্যাস নামাজের দ্বারা গঠিত হয়।

এটি নফসের একটি বৈশিষ্ট্য যে, যদি তাকে নম্রতা শেখানো না হয় তবে এটি ফেরাউনদের বিকাশ ঘটায়। নামাজে প্রথমেই আল্লাহু আকবারের শিক্ষা দেওয়া হয়। যার হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা আছে, সে নিজেকে একটি পিঁপড়ার চেয়েও ক্ষুদ্র ও অসহায় মনে করবে। কারণ বড়দের সামনে ছোটদেরও শাসন চলে না। তো, আল্লাহু আকবারের শিক্ষা হচ্ছে, এর দ্বারা অহংকার সমূলে উপড়ে ফেলা হয়।

এ ছাড়া পশুতুল সুলভ শক্তির কারণে পৃথিবীতে শত শত দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। পক্ষান্তরে রোজা এই পশুতুলশক্তি ভেঙে দেয়।

একইভাবে যাকাতগ্রহীতা ছাড়া অন্যরা যাকাতদাতাকে ভালোবাসে। দেখুন, হাতেম তায়ের উদারতা ও বদান্যতার কারণে তাকে সবাই ভালোবাসে। ঐক্যের মূল হলো ভালোবাসা। তাহলে এই ভালোবাসা বৃদ্ধিতে যাকাতের কী পরিমাণ ভূমিকা আছে!

একইভাবে, হজের দিকে দৃষ্টি দিন। এ দিন সারা পৃথিবীর লোকেরা একই সময়ে একটি স্থানে একত্রিত হয়ে থাকে। তাদের সমস্ত জিনিসপত্র অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে এক মহান দরবারে উপস্থিত হয়। যা ঐক্য ও ঐকমত্যের ওপর অনেক প্রভাব ফেলে। তাই সেখানে খুব কম দুর্ঘটনা ঘটে।

[চলবে, ইনশাআল্লাহ]

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ