---

পরাশক্তির পতন ও যুদ্ধের ন্যারেটিভ বদলের নতুন ইতিহাস

পরাশক্তির পতন ও যুদ্ধের ন্যারেটিভ বদলের নতুন ইতিহাস

জামালউদ্দিন বারী

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অন্তহীন যুদ্ধের ন্যারেটিভ প্রচার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা তথা ন্যাটো বাহিনী ইরাক ও আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশ দুটি দখল করে নিয়েছিল। এরপর দুই দশক ধরে চলে ধারাবাহিক ম্যানিপুলেশন, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস তেলসম্পদ ও প্রত্নসম্পদ পাচার এবং সব প্রতিরোধ শক্তি ধ্বংসের নামে অন্তহীন যুদ্ধ জিইয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি ডলার ওয়ার বাজেটের নামে পশ্চিমা জনগণের ট্যাক্সের টাকা মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের কর্পোরেট ফান্ডে জমা করা হয়েছে। এসব কর্পোরেট ফান্ডের সিংহভাগের মালিক মূলত ইহুদি ব্যাংকার ও ধনকুবেররা। এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন এবং পশ্চিমা ধনী রাষ্ট্রগুলোর জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুটে নেয়ার ফাঁদ হিসেবে বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বের ওপর যুদ্ধবাদী ধনতান্ত্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা বা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার চাপিয়ে দেয়া হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে জাপানের দুটি বেসামরিক শহরকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবাদী বিশ্বব্যবস্থা বিশ্বকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অস্থির ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। প্রায় সত্তর বছর স্থায়ী সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বলয়কে ঘিরে ধনতান্ত্রিক পশ্চিমাদের মধ্যে এক ধরণের স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটানোর পেছনে ছিল বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি

এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে রাশিয়া ও চীনের মত দেশের আপস ও আয়েশি-উচ্চাভিলাষি জীবনের প্রলোভন। টিকে থাকতে হলে পশ্চিমা ব্যবস্থার সাথে আপস করতে হবে, নতুবা যুদ্ধ ও আগ্রাসন মোকাবেলা করতে হবে। ‘মাইট ইজ রাইট’ বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিকে ধারণ করেই পশ্চিমা যুদ্ধবাদী বিশ্বব্যবস্থা চালিয়ে নেয়া হচ্ছিল।

এমনিতে পশ্চিমারা মাল্টিকালচারালিজমের কথা বললেও তা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ও ইচ্ছাধীন বিষয়ের বাইরের কিছু নয়। যারাই ভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংস্কৃতি, ও স্বাধীন অস্তিত্বের প্রশ্নে ভিন্নমত নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, যারাই নিজেদের তেল ও খনিজসম্পদ নিজেদের জনগণের কল্যাণে নিজেদের মতো করে ব্যবহারের চেষ্টা করবে তারাই কনসিকোয়েন্স বা সামরিক-অর্থনৈতিক আগ্রাসনের সম্মুখীন হবে। এটাই হচ্ছে জায়নবাদ প্রভাবিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল মেসেজ। তবে ভেনিজুয়েলা এবং ইরানের মধ্যকার পার্থক্য গুলিয়ে ফেললে যা হতে পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা’ই ঘটেছে। ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, যুদ্ধ ও ক্ষমতার আধিপত্য দিয়েই যদি কোনো রাজশক্তির উত্থান ঘটে, বিপরীত পিঠে একইভাবে যুদ্ধ ও সামরিক শক্তির সংঘাতের মধ্য দিয়েই তার সমাপ্তি ঘটবে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়ার মতো জনপদগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও

ইউরোপীয় দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পুরনো সভ্যতা ও সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক হলেও শুধুমাত্র সামরিক প্রযুক্তির বলে বলিয়ান হয়ে এসব দেশকে ধ্বংস করে দিতে পশ্চিমারা মোটেই কুণ্ঠিত হয়নি। আর এসব ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নিয়েই সত্তর বছর ধরে ইরান নিজেকে প্রস্তুত করেছে।

বিংশ শতকে নতুন বিশ্বব্যবস্থার ওপর পশ্চিমাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইরানি জনগণ শুরু থেকেই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর আগে ইরানিরা পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলো। ঊনবিংশ শতকের শেষ প্রান্তে (১৮৮৯) রাশিয়ার জার সম্রাট যখন ইরানের ৪র্থ কাজার শাহকে এমন একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করল, যে চুক্তির আওতায় ইরান স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলো যে, রাশিয়ার অনুমোদন ছাড়া ইরান কোনো রেললাইন সম্প্রসারণ করতে পারবে না; তার প্রতিক্রিয়ায় বিংশ শতকের শুরুতে (১৯০৫ থেকে ১৯১১) ইরানে কনস্টিটিউশনাল রেভ্যুলেশন ঘটে যায়, এর ভিত্তিতে ইরানে প্রথম সাংবিধানিক সংসদ বা পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরানি ইতিহাসের এই তারিখ থেকে আমাদের ‘বঙ্গভঙ্গের’ ইতিহাসের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। বর্ণ হিন্দুদের প্ররোচনায় পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ওপর শত বছরের বৃটিশ নিপীড়নে পিছিয়ে পড়া কিছুটা পুষিয়ে দিতে ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে আসাম ও পূর্ববঙ্গ নিয়ে নতুন প্রদেশ তথা প্রশাসনিক পরিকাঠামোর স্বীকৃতি দেয় বৃটিশ রয়াল সরকার। পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা কলকাতার বদলে ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে প্রশাসন, আদালত ও বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করলে কলকাতার গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে। এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে কলকাতার বুদ্ধিজীবী ও বণিকশ্রেণীর নেতৃত্বে ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, আন্দোলন তীব্রতর হলে বৃটিশ রাজ বাধ্য হয়ে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করে হিন্দুদের সমর্থন অক্ষুন্ন রাখার পথ অবলম্বন করে। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। মূলত মুসলমানদের অগ্রণী ভূমিকায় বৃটিশ বিরোধী স্বরাজ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা নতুন স্বপ্ন ও উদ্দীপনায় জেগে ওঠে। কিন্তু ১৯০৫ সালে ইরানের সচেতন জনগণ রাশিয়া ও বৃটিশদের আধিপত্যবাদী নীতির সাথে কাজার রাজাদের আপসকামীতার কবর রচনা করতে নতুন সংবিধান ও পার্লামেন্ট ব্যবস্থা চালু করলে মোজাফফর আদ-দ্বীন শাহ কাজার তা মেনে নিয়ে ১৯০৬ সালে চুক্তিতে সই করলেও অল্পদিনের মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করলে তার উত্তরসূরী মোহাম্মদ আলি শাহ কাজার রাশিয়া ও বৃটিশদের যৌথ প্ররোচনায় ১৯০৮ সালে সাংবিধানিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন এবং পার্লামেন্ট ভবন বোমা মেরে উড়িয়ে দেন।

তবে বিপ্লবী জনগণের তেহরানমুখী জনস্রোতের আন্দোলনের চাপে মোহাম্মদ আলি শাহর পুত্র আহমদ শাহ কাজার ১৯০৯ সালে সংবিধান পুনর্বহাল করেন এবং ১৯১১ সালে ১২ হাজার রুশ সৈন্যের সহায়তা নিয়ে দ্বিতীয় মজলিশের ডেপুটিদের অপসারণ কান্ড সামাল দিয়ে ইরানি কনস্টিটিউশনাল রেভ্যুলেশনের আপাত: পরিসমাপ্তি ঘটে। পরবর্তী এক দশক ধরে নানা ঘটনা ও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯২১ সালে ইরানে কাজার রাজবংশের স্থলে পাহলভি বংশের উত্থান ঘটে, যা ছিল আইনগত ও রাষ্ট্র কাঠামোর ক্ষেত্রে কাজার শাহদের ধারাবাহিকতা মাত্র। ইরানের বিপ্লবী জনগণ

পঞ্চাশের দশকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণের মাধ্যমে নিজেদের তেলসম্পদের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনার কারণে মুসলিম বিশ্বে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকার মোহাম্মদ মোসাদ্দেক বৃটিশ-আমেরিকান গোয়েন্দা তৎপরতায় মোসাদ্দেকের পতন ঘটিয়ে পাহলবি শাহর ক্ষমতা পুন:প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রায় একশ বছরের ধারাবাহিক হেজিমনিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে নতুন ইরানের জন্ম হয়, তা পশ্চিমা যুদ্ধবাদী অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় অর্ধ শতাব্দীর পশ্চিমা অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক অবরোধ, অব্যাহত হুমকি ও আগ্রাসন মোকাবেলা করে ইরান এখন এক অভাবনীয় বিজয়ী শক্তি।

তেহরানের রাস্তায় ইঙ্গ-মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এমআইসিক্স’র ভাড়া করা লোকজন জড়ো করে এবং সেনাবাহিনীতে থাকা রেজা শাহর অনুগত লোকদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে অর্কেস্টেড অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ১৯৫২ সালে ইরানের গণতন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। এবারের আয়োজন ছিল আরো ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। চারদশকের অর্থনৈতিক অবরোধ-নিষেধাজ্ঞায় কাবু হয়ে পড়া সমাজের একটি অংশকে মোসাদ-সিআইএর গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার খরচ করে রাস্তায় নামিয়ে রেজিম বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস দেখা গেছে। ইরানের অভ্যন্তরে থাকা মোসাদের এজেন্টদের অপতৎপরতা, অন্তর্ঘাত ও তথ্যপাচারের বড় মাশুল গুনতে হয়েছে ইরানকে। বারোদিনের যুদ্ধ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ সামরিক-বেসামরিক নেতাদের হত্যা করে রেজিম বদলের ব্লু-প্রিন্ট ছিল ঝটিকা বড় আঘাতের মাধ্যমে ইরানকে পদানত করার ব্যর্থচেষ্টা। কিন্তু আমেরিকা-ইসরাইলের সর্বাত্মক যুদ্ধ প্রস্তুতি, আক্রমণ-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিশ্বকে বদলে দেয়ার একশ দিনের রোমাঞ্চকর ঘটনাক্রম গত দুইশ বছরের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক

ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বিশ্বের একনম্বর সামরিক-অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তি আমেরিকা ও তার প্রতিপালিত ভ্যাসাল গ্যারিসন স্টেট ইসরাইলের পারমানবিক শক্তির বিরুদ্ধে আলবুরজের মতো সর্বংসহা অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাঘাতে শত্রুর সব হার্ডপাওয়ার, সফ্টপাওয়ার সামরিক-কূটনৈতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার মধ্য দিয়ে ইরান যে বিজয় অর্জন করেছে, তা বিশ্বের সামরিক ইতিহাস ও শক্তিমত্তার পুরো ন্যারেটিভকেই নতুন বাস্তবতায় উন্নীত করেছে।

২০২৫ সালের জুনমাসে ১২ দিনের যুদ্ধেই ইরানের পাল্টা আক্রমনে কার্যত ইসরাইল-আমেরিকা পরাস্ত হয়েছিল। বিশেষত জায়নবাদী ইসরাইলের রক্তপিপাসু ডিক্টেটর নেতানিয়াহু এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। তিনি আরো প্রস্তুতি ও শক্তি সঞ্চয় করে সম্মিলিতভাবে ব্যাপক আগ্রাসনের মাধ্যমে ইরানকে গাযার মতো বিধ্বস্ত এবং লিবিয়ার মতো রেজিম বদল, বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করার পরিকল্পনা করেই ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিমান হামলা ও টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশন ও গণহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। ইরান আমেরিকার জন্য কখনোই সরাসরি হুমকি ছিল না, এমনকি ইসরাইলকেও কখনো আগ বাড়িয়ে হামলা করেনি। ইসরাইলের হাতে শতাধিক পারমানবিক বোমা থাকার বিশ্বাসযোগ্য হাইপোথেসিস আছে। আমরা যদি ধরে নিই, ইরান পরমানু অস্ত্র তৈরি করেছে বা করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে, দুটি প্রতিবেশি পারমানবিক শক্তি একটি আরেকটির ওপর পরমানু অস্ত্র ফেললেই কেবল প্রত্যাঘাতে পরমানু হামলার সম্মুখীন হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ একদিন একরাতের মধ্যে ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা ছিলো পরমানু হামলার ভয় দেখিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণের বার্তা। ইরানকে পরাস্ত করতে ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধের কোনো নিয়ম-নীতি, কলাকৌশল ও ভারসাম্য নীতির কোনো মানদন্ডেরই তোয়াক্কা করেনি।

হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরোধ শক্তিকে দুর্বল করে ইরানকে নিয়ন্ত্রণমূলক চুক্তিতে বাধ্য করার সব হিসাব-নিকাশ ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সত্তর বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব সামরিক ঘাঁটি, রাডার প্রতিরক্ষার ক্ষতিগ্রস্ত হাজার কোটি ডলারের অবকাঠামো ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হওয়ার মত বাস্তবতা ছিল পুরো বিশ্বের কাছে অকল্পনীয়।

আশির দশকে আট বছরব্যাপী ইরান-ইরাক যুদ্ধ ছিল মূলত বিপ্লবের পর নতুন ইরানি রিজিমের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের মদতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মদতে একটি প্রক্সি ওয়ার। পুরো পশ্চিমাবিশ্ব এবং ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তা ও সমর্থন নিয়ে সাদ্দাম হোসেনের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানে আগ্রাসন শুরু করা এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইন্ধন যুগিয়েও ইরানকে হারানো যায়নি। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করা, তার আগে ইরানের আশপাশের দেশগুলোতে রেজিম বদলের মধ্য দিয়ে বশংবদ শাসক বসিয়ে কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় করা, গাজা, ইয়েমেন ও লেবাননের প্রতিরোধ শক্তিকে দুর্বল করার পর ইরানের ওপর সর্বাত্মক হামলার ছক ছিল কয়েক দশকের দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। সবই এখন ইতিহাসের অংশ।

আট মাসের মধ্যে দুই দফায় সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমে হাজার হাজার কোটি ডলারের সামরিক অবকাঠামো, সত্তর বছরের কৌশলগত সামরিক-অর্থনৈতিক অবস্থান খুইয়ে অবশেষে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-আমেরিকা শান্তি চুক্তি হতে চলেছে। ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় এই চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এই শান্তিচুক্তিকে ‘ইসলামাবাদ এগ্রিমেন্ট’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। গত বছর জুনমাসে ইরান-আমেরিকা ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটি সীমিত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। অপারেশন সিন্দুর নামে ভারতের শুরু করা যুদ্ধে পাকিস্তানের হাতে চরম মার খেয়ে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেলেও পাকিস্তান হয়ে ওঠে নতুন আঞ্চলিক পরাশক্তি। পাকিস্তান যখন একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করার কৃতিত্ব অর্জন করছে, ভারত তখন ছোট প্রতিবেশি দেশগুলোর ওপর হেজিমনিক উগ্রবাদী হুমকি ও আগ্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত।

যে দেশটি দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন লঙ্ঘন করে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে ভাটির দেশকে বঞ্চিত করছে, সে দেশের এক তালেবর রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ দুই দেশের ‘একই আকাশ, একই বাতাস’ গান গেয়ে দুই দেশের ১৬০ কোটি মানুষকে একই ছায়াতলে একত্রিত হওয়ার খোয়াবি নসিহত বিতরণ করে হইচই ফেলে দিয়েছেন। পল্টিবাজ রাজনৈতিক নেতা দীনেশ ত্রিবেদিকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিল্লি যে বার্তা দিতে চেয়েছিল, পরিচয়পত্র পেশ করার আগেই তা ব্যাকফায়ার করেছে। এর দুইদিনের মাথায় ভারতের বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের নাজেহাল হয়ে দেশে ফিরে আসার বাস্তবতা প্রমাণ করে দীনেশ ত্রিবেদীর ‘আকাশ-বাতাস’ বক্তব্য একটি চাণক্যবাদী রেটরিক।

আহারে দিল্লির রাজনীতি, কূটনীতি, প্রতিবেশি নীতি! পন্ডিত চাণক্যের দেশের কূটনীতি, প্রতিবেশি নীতি ও সমরনীতির এমন লেজে-গোবরে অবস্থা যদি তাদেরকে কিছুটা থামতে এবং সাম্প্রদায়িকতা, দাম্ভিকতা, অহমিকা ও ইসরাইলের অনুকরণ-অনুসরণে অখন্ড ভারতের নামে সম্প্রসারণবাদী নীতি পরিহার করে বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে না পারে, অখন্ড রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পতন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস ও চলমান বিশ্ববাস্তবতা থেকে হিন্দুত্ববাদি ভারতীয়রা শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সংযত করতে সক্ষম হলে সকলেরই মঙ্গল।

সূত্র : [দৈনিক ইনকিলাব]

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ