পাকিস্তান সফরের কারগুযারি
আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার শায়খুল হাদীস ও প্রধান মুফতী
মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া দা. বা.-এর
পাকিস্তান সফরের কারগুযারি
হাফেজ মুহাম্মদ ইবরাহিম নকশবন্দী [পাকিস্তান]
মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া- একটি নাম। একটি আলোকমিনার। উম্মাহর কাণ্ডারী। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ইসলামী আইনবিদ, ফিকহ বিশারদ ও হাদীস গবেষক। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার শায়খুল হাদীস ও প্রধান মুফতী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পবিত্র হজব্রত পালনশেষে তিনি বিভিন্ন ইসলাহী প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ ও দাওয়াতী তৎপরতার উদ্দেশ্যে সফর করেন পাকিস্তান। তাঁর মেজবান ছিলেন বিশিষ্ট পাকিস্তানি ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও ইসলাহী ব্যক্তিত্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ ইবরাহিম নকশবন্দী। যিনি আল-কাহফ এডুকেশনাল ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ হিসেবে পরিচিত। ইসলামী শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, বিশেষত নাওয়ায়ে ওয়াক্ত পত্রিকায় কলাম লেখার মাধ্যমে ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক বিষয়াবলি নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখে আসছেন।
আধ্যাত্মিক অঙ্গনে তিনি মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া দা. বা.-এর মতো প্রখ্যাত বুযুর্গ ও মুরব্বি মাওলানা পীর জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অনুমোদিত খলীফা। ২০০৩ সালে তিনি হযরতের সান্নিধ্যে তাযকিয়া ও সুলুকের প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেন এবং দীর্ঘ সাধনা ও তরবিয়তের পর ২০০৮ সালের অক্টোবরে খেলাফতের ইজাযত লাভ করেন। এরপর থেকে তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার আলোকে আত্মশুদ্ধি, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দিয়ে আসছেন। কুরআন-হাদীস, আধ্যাত্মিকতা ও ইসলামী জীবনদর্শন বিষয়ক তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক রচনা পাঠকমহলে সমাদৃত। এছাড়া বিভিন্ন অনলাইন অডিও ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাঁর ইসলাহী বয়ান, দারস ও আধ্যাত্মিক আলোচনা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারের সমন্বিত ধারার একজন নিবেদিতপ্রাণ দাঈ, লেখক ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে সুপরিচিত এই হযরতের কলম ও জবানে আমরা শুনবো আমাদের রাহবার ও মুরশিদ মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া দা. বা.-এর পাকিস্তান সফরের কারগুযারি।
৭ জুন ২০২৬ খ্রি. রবিবার খানকাহ আম্বালা হাউস, লাহোর
পাকিস্তানে লাহোরস্থ ‘খানকাহ আম্বালা হাউস’-এ অত্যন্ত বরকতময় ও জ্ঞানগর্ভবয়ান করেন হযরত মাওলানা মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব দামাত বারাকাতুহুম। তিনি আকাবিরদের সোহবতপ্রাপ্ত একজন বুযুর্গ। তিনি হযরত শাহ আবরারুল হক হারদুয়ী (রহ.)-এর খলীফা যিনি মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর শেষ খুলাফাগণের অন্যতম ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি হযরতজী (জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী রহ.)-এরও খলীফা। এসব মহান সম্পর্কই তাঁর কথার মধ্যে বিশেষ ওজন, গভীরতা ও প্রভাব সৃষ্টি করেছে।
বয়ানের সূচনাই হয় আত্মসংশোধনের আলোচনার মাধ্যমে। আসর নামাযের পর কথা শুরু করেই তিনি এমন এক ভঙ্গিতে নসিহত করলেন, যা হযরত শাহ আবরারুল হক হারদুয়ী (রহ.)-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। কারণ তিনি কোনো ভুল বা ত্রুটি
দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে তা সংশোধন করতেন। এভাবেই তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রথম সংশোধন: সালামের গুরুত্ব- তিনি বলেন, আজ আমাদের অবস্থা এমন হয়ে গেছে যে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, কোলাকুলি করে, মুসাফাহা করে; কিন্তু মুখে “আসসালামু আলাইকুম” বলার বিষয়টি অনেক সময় অবহেলিত থাকে। অথচ ইসলামে মূল বিষয় হলো সালাম। কোলাকুলি তো বিশেষ বিশেষ সময়ে হয়, (যেমন কেউ দীর্ঘদিন পর এলে বা দূর দেশ থেকে এলে)। মুসাফাহাও সুন্নত। কিন্তু সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিকভাবে “আসসালামু আলাইকুম” বলা। যদি সালাম ছাড়াই শুধু মুসাফাহা করা হয়, তবে তা সুন্নতের সঠিক পদ্ধতি নয়। যেন আমরা মূল বিষয়কে উপেক্ষা করে গৌণ বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
দ্বিতীয় সংশোধন: নামাযে প্রশান্তি ও ভারসাম্য- তিনি বলেন, আমরা সাধারণত রুকু ও সিজদা যথেষ্ট ধীরস্থিরতার সঙ্গে
আদায় করি, কিন্তু রুকুর পর দাঁড়ানো (কাওমা) এবং দুই সিজদার মাঝখানে বসা (জালসা) খুব দ্রুত শেষ করে ফেলি। হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত হাদীসের আলোকে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাসুলুল্লাহ-এর নামাযে রুকু, সিজদা, কাওমা ও জালসার মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য ও প্রশান্তি ছিল। কিন্তু আজ আমরা এই মধ্যবর্তী রুকনগুলোকে খুব তাড়াহুড়ো করে আদায় করি, যা সুন্নতের পরিপন্থী।
তৃতীয় সংশোধন: মাদরাসা ও খানকাহ সংশ্লিষ্টদের জন্য- তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক স্থানে এমন রীতি চালু হয়েছে যে বড় বড় আলেম ও মাশায়েখ নিজেরা ইমামতি না করে ছাত্রদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। অথচ হাদীসের নির্দেশনা হলো- যিনি অধিক তাকওয়াবান এবং কুরআন ভালোভাবে তিলাওয়াত করতে পারেন, তিনিই ইমামতির বেশি হকদার। (তাই কোনো ওজর বা বিশেষ কারণ না থাকলে আকাবিরদের উচিত নিজেরাই ইমামতির দায়িত্ব পালন করা)।
এরপর বয়ানের বিষয়বস্তু হজ ও হাজীদেরপ্রসঙ্গে চলে যায়। তিনি বলেন, বর্তমানে এমন সময় চলছে যখন হাজীগণ পবিত্র হজ সম্পন্ন করে নিজ নিজ দেশে ফিরে আসছেন। এ সময় আমাদের করণীয় কী? তিনি রাসূলুল্লাহ-এর একটি হাদীস উল্লেখ করেন: “যখন কোনো হাজী ফিরে আসে, তখন তার সঙ্গে মুসাফাহা করো এবং তার কাছে নিজের মাগফিরাতের জন্য দুআ চাইতে বলো, তবে তার ঘরে প্রবেশ করার আগেই।”
তিনি সুন্দরভাবে বলেন: হাদীসে তো বলা হয়নি যে পীর সাহেব বা মুফতী সাহেবের সঙ্গে মুসাফাহা করো; বরং হাজীর সঙ্গে মুসাফাহা করতে বলা হয়েছে। এরপর তিনি এর গভীর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন…।
হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “ইয়ামীনুল্লাহ ফিল আরদ” (রূপক অর্থে পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত)। হাজী সেখানে গিয়ে চুম্বন করেছে অথবা স্পর্শ করেছে, আর স্পর্শ চুম্বনেরই বিকল্প। অর্থাৎ যেন সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে অঙ্গীকার ও সম্পর্ক নবায়ন করে ফিরে এসেছে। এখন যখন সে ফিরে আসে, তখন তার সঙ্গে মুসাফাহা করা, আসলে সেই মহান সম্পর্ক ও মর্যাদারই সম্মান প্রদর্শন।
তিনি আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ দুআ করেছেন: “হে আল্লাহ! হাজীকে ক্ষমা করে দিন, এবং যাদের জন্য হাজী ক্ষমার দুআ করবে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিন”। এ প্রসঙ্গে তিনি দুটি চমৎকার বিষয় তুলে ধরেন: প্রথমত, হাজীর মাগফিরাতের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ দুআ করে দিয়েছেন। ফলে হাজী যদি নিজের জন্য দুআয় কোনো ত্রুটি করেও ফেলে, নবীজীর দুআই তার জন্য যথেষ্ট। দ্বিতীয়ত, হাজীকে একটি বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে-সে যেন অন্যদের জন্যও ইস্তিগফার করে। আর যেহেতু তার পেছনে রাসূলুল্লাহ-এর দুআ রয়েছে, তাই তার দুআর মধ্যে বিশেষ প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়।
এরপর তিনি এমন একটি কথা বললেন, যা সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছায়। তিনি বললেন-“হাজী কতদিন হাজী থাকে? যতদিন না সে ‘পাজী’ হয়ে যায়!” অর্থাৎ যতদিন সে গুনাহ থেকে নিজেকে হেফাজত করে, ততদিন সে সেই পবিত্র হজের প্রভাব ও মর্যাদা বহন করে। কিন্তু যখন সে পুনরায়গুনাহে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেই বিশেষ অবস্থা ও আধ্যাত্মিক জ্যোতি ম্লান হতে শুরু করে। এখন এটি তার নিজের ওপর নির্ভর করে-সে এক সপ্তাহ হাজী থাকবে, এক বছর থাকবে, কয়েক বছর থাকবে, নাকি আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে সারাজীবনই সেই পবিত্র অবস্থাকে সংরক্ষণ করে রাখবে।
৮ জুন ২০২৬ খ্রি. সোমবার আল-কাহফ এডুকেশনাল ট্রাস্ট, লাহোর
গত রবিবারের বয়ানের পর মানুষ অত্যন্ত ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সঙ্গে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর হযরত মুফতী সাহেব রাতে খানকাহ আম্বালা হাউসে নৈশভোজ গ্রহণ করেন। আলহামদুলিল্লাহ। সোমবার সকালে আমরা নাশতা শেষে আল-কাহফ হেড অফিসে পৌঁছাই। সেখানে হযরতের অত্যন্ত প্রভাবক ও আত্মস্পর্শী বয়ান অনুষ্ঠিত হয়। সেই বয়ানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে তুলে ধরা হলো। আল-কাহফ হেড অফিসে মুফতী সাহেবের প্রভাবক ও আত্মস্পর্শী বয়ান আবারও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হযরত এ আয়াত তিলাওয়াত করেন: رَبَّنَا وَابْعَثُ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِيمُ অর্থ: “হে আমাদের রব! তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যিনি তাদের নিকট আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের আত্মশুদ্ধি করবেন।” এ আয়াতে মহানবী-এর চারটি মহান দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-তিলাওয়াত, কুরআন শিক্ষা, হিকমাহ শিক্ষা, এবং আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়া)। এরপর সেই আয়াত পেশ করা হয়, যা পুরো আলোচনার মূল দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দেয়: كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنتُمْ تَدْرْسُونَ অর্থ: “তোমরা রবওয়ালা (আল্লাহমুখী) মানুষ হয়ে যাও, কারণ তোমরা কুরআন শিক্ষা দাও এবং নিজেও অধ্যয়ন কর।” এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয় বুঝে আসে…। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জ্ঞানের শিক্ষক হওয়ার সম্মান দান করেছেন। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের ওপর এই দায়িত্বও অর্পণ করেছেন যে, আমরা যেন ‘রব্বানী’ হয়ে উঠি। অর্থাৎ শুধু মাদরাসার শিক্ষক হওয়াই যথেষ্ট নয়…; বরং রব্বানী শিক্ষক হওয়া অপরিহার্য। এরপর জ্ঞান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা হয়। সব জ্ঞান উপকারী নয়; প্রকৃত জ্ঞান হলো সেই জ্ঞান, যা মানুষের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী। এ কারণেই একদিকে আমাদের এই দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে- رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا “হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।” অন্যদিকে এটাও শিখানো হয়েছে যে, যেন আমরা শয়তান থেকে আশ্রয় চাই一 أعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ তেমনি এমন জ্ঞান থেকেও আশ্রয় চাইতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা কোনো উপকারে আসে না। اللهم إني أعوذ بك من علم لا ينفع ومن قلب لا يخشع ومن نفس لا تشبع ومن دعاء لا يسمع অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই এমন জ্ঞান থেকে যা উপকার করে না, এমন হৃদয় থেকে যা বিনয়ী হয় না, এমন নফস থেকে যা তৃপ্ত হয় না এবং এমন দুআ থেকে যা কবুল হয় না।” অতএব একদিকে জ্ঞান বৃদ্ধির প্রার্থনা করতে হবে, অন্যদিকে অনুপকারী জ্ঞান থেকে আশ্রয়ও চাইতে হবে। তাই আমাদের চিন্তা করা উচিত, আমরা আসলে কোন ধরনের জ্ঞান অর্জন করছি? তৃতীয় বিষয়: তাকওয়া- স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, তাকওয়া ছাড়া জ্ঞান তার প্রভাব হারিয়ে ফেলে। জ্ঞানের প্রকৃত প্রভাব ও বরকত আসে তাকওয়ার মাধ্যমে। চতুর্থ বিষয়: জ্ঞানের সঙ্গে ইশক (আল্লাহরপ্রেম)- এখানে একটি অত্যন্ত গভীর উদাহরণ উপস্থাপন করা হয়: ইবলিসের জ্ঞানও ছিল, ইবাদতও ছিল; কিন্তু তার মধ্যে প্রেম ছিল না। যখন আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হলো, ফেরেশতারা সিজদায় নত হয়ে গেলেন; কারণ তাদের মধ্যে প্রেম ও আনুগত্য ছিল। কিন্তু ইবলিস থেমে গেল। সে যুক্তি ও তর্কের জালে আটকে পড়ল। সে বলল: خَلَقْتَني مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ “আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে।” তার জ্ঞান ছিল, ইবাদতও ছিল; কিন্তু প্রেম ছিল না। আর এটাই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে হযরত মাওলানা রুমী (রহ.)-এর কিছু কবিতার মর্মার্থ তুলে ধরা হয়: “মাদরাসার জ্ঞান যদি তোমার অন্তরে আল্লাহর প্রেম সৃষ্টি না করে, তবে তা প্রকৃত জ্ঞান নয়; বরং তা এক প্রকার কুমন্ত্রণা।” সবশেষে মুক্তির পূর্ণ পথ নির্দেশ করা হয় এ আয়াতের মাধ্যমে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مع الصادقين অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গ গ্রহণ কর।” আল-কাহফে এই হৃদয়স্পর্শী বয়ানের পর আমরা সেখান থেকে রওনা হয়ে আস একাডেমিতে পৌঁছাই। সত্যিই মনে হলো, এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান, যা শুধু লাহোর নয়, বরং পাকিস্তানের অন্যতম বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গণ্য হয়। এ প্রতিষ্ঠানের আমীর হলেন হযরতজী (রহ.)-এর খলীফা, মাওলানা মুনাওয়ার সিদ্দীকি। এছাড়াও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মরহুম ড. শাহিদ আওয়াইস-এর বহু সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। হযরত সেখানে আগমন করেন, শিক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা ঘটে। যখন পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো যে, “মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব বাংলাদেশ থেকে আগত”, তখন হযরত সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করে বললেন-“না, আমি তো থানাভবন থেকে এসেছি; আমি চাকওয়াল থেকে এসেছি; আমি ঝং থেকে এসেছি; আমি মিসকীনপুর থেকে এসেছি; আমি জুলাই ২০২৬ সাহারানপুর থেকে এসেছি; আমি দেওবন্দ থেকে এসেছি…।” অর্থাৎ তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক ও ইলমি সম্পর্কগুলোর কথা উল্লেখ করে এ শিক্ষা দিলেন যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জন্মভূমি নয়; বরং তার সম্পর্ক, আদর্শ ও আত্মিক সূত্রের মধ্যেই নিহিত। আস একাডেমিতে অবস্থান ছিল অত্যন্ত আনন্দময়। শিক্ষকদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সম্মানজনক মধ্যাহ্নভোজ পরিবেশন করা হয়। যোহরের নামায আদায় করা হয়। আর নামাযের পর হযরতের আরও একটি ঈমান-উদ্দীপক ও হৃদয়গ্রাহী বয়ান অনুষ্ঠিত হয়।
আস একাডেমিতে হযরত মুফতী সাহেবের বয়ান
সবার আগে হযরত মুফতী সাহেব নামায সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আলোচনা করেন। তিনি বলেন: নামায় কেবল আদায়ের নাম নয়; বরং সুন্নাহ অনুযায়ী নামায আদায় করাই মূল উদ্দেশ্য। নামাযের বাহ্যিক কাঠামো, বিন্যাস, ধরন ও পদ্ধতি, সবকিছুই সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়া উচিত। তিনি বলেন: এ বিষয়টি কেবল বই পড়ে অর্জন করা যায় না; বরং যারা সহীহ ও সুন্নাহসম্মত নামায আদায় করেন, তাদেরকে দেখতে হয়, তাদের সান্নিধ্যে থাকতে হয় এবং তাদের কাছ থেকে শিখতে হয়। এটাই প্রকৃত পদ্ধতি। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ ৬-এর বাণী উল্লেখ করেন: আমাকে নামায পড়তে দেখো।” »صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أَصَلَّي “তোমরা এমনভাবে নামায পড়ো, যেভাবে اس اکیڈمی এখানে হযরত একটি সূক্ষ্ম বিষয় ব্যাখ্যা করেন: তিনি বলেন, নবী করীম এ কথা বলেননি যে, “যেভাবে আমি নামায পড়ি, তোমরাও সেভাবে পড়ো”; বরং বলেছেন, “যেভাবে তোমরা আমাকে নামায পড়তে দেখো।” অর্থাৎ এখানে “দেখা”-র কথা বলা হয়েছে। নামাযের বাহ্যিক রূপ, পদ্ধতি ও নিয়ম, এসব আমাদের দেখে শিখতে হবে। যদি শুধু বলা হতো, “আমি যেমন নামায পড়ি, তেমন পড়ো”, তাহলে এর মধ্যে নামাযের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় দিকই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত, যা আমাদের সাধ্যের বাইরে হয়ে পড়ত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ও আমাদের জন্য একটি সহজ পথ নির্ধারণ করেছেন প্রথমে নামাযের বাহ্যিক দিককে সুন্নাহর আলোকে শুদ্ধ করো। এরপর হযরত অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী একটি কথা বলেন: যখন আমরা নামাযের বাহ্যিক রূপকে সুন্নাহ অনুযায়ী সাজিয়ে নিতে পারব, তখন প্রতিটি নামাযের পর আল্লাহর দরবারে এভাবে নিবেদন করব: হে আমার প্রতিপালক! আমি তো তোমার প্রিয় নবীর সাদৃশ্য ধারণ করে এসেছি, এখন এর প্রকৃত বাস্তবতা ও প্রাণও তুমি দান করে দাও। আমি কেবল আকৃতি নিয়ে এসেছি, তুমি এর মধ্যে হাকীকত সৃষ্টি করে দাও।» তিনি বলেন, বাহ্যিক অবস্থা যখন সুন্নাহমাফিক হয়ে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা অন্তরকেও সুন্দর করে দেন। কিন্তু বাহ্যিক দিকই যদি বিশৃঙ্খল থাকে, তাহলে অন্তরের সংশোধনের আশা কীভাবে করা যায়? আমরা নামাযের বাহ্যিক দিক নিয়েও পরিশ্রম করিনি, অথচ চাই হৃদয়ে খুশু-খুযু এসে যাক। এটা সম্ভব নয়। এর জন্য চিন্তা, চেষ্টা ও শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য। বয়ানের সময় হযরত নিজে দাঁড়িয়ে নামাযের বাহ্যিক কাঠামো প্রাকটাক্যালি দেখিয়ে দেন-কীভাবে তাকবীরে তাহরীমার সময় হাত তুলতে হয়, কোথায় হাত বাঁধতে হয়, কীভাবে রুকু করতে হয় এবং কীভাবে সিজদা আদায় করতে হয়। এভাবে পুরো নামাযের পদ্ধতি প্রাকটিক্যালি পরিষ্কার করে দেন। শেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যারা সহীহভাবে নামায আদায় করতে জানেন, তাদের কাছ থেকে অবশ্যই শিখতে হবে। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ -এর আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেন-“মানুষ তার বন্ধুর দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে; সুতরাং প্রত্যেকের উচিত সে কার সঙ্গ গ্রহণ করছে, তা ভেবে দেখা।” প্রকৃত ছাত্র কে? ছাত্রদের উদ্দেশে হযরত একটি অসাধারণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন ছাত্র শুধু শ্রেণিকক্ষের ছাত্র নয়; বরং সে চব্বিশ ঘন্টার ছাত্র। এরপর তিনি প্রশ্ন করেন-“তোমাদের মধ্যে কে স্বপ্নে পাঠ পড়েছ? কে স্বপ্নে দাওর বা তাকারর করেছ? কে স্বপ্নেও সেই পরিবেশ দেখেছ, যা ক্লাসে থাকে?” কয়েকজন হাত তুললে তিনি বলেন-প্রকৃত ছাত্র সেই, যার ওপর জ্ঞানের প্রভাব এতটাই প্রবল হয়ে যায় যে, দিনের অধ্যয়ন ও ব্যস্ততা রাতের স্বপ্নেও প্রতিফলিত হয়।
আস একাডেমির একটি অনন্য ব্যবস্থা
হযরত মাওলানা মুনাওয়ার সিদ্দীকী দা.বা. জানান, প্রতি বছর ছুটির পর যখন নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়, তখন প্রথম দিন নিয়মিত পাঠদান শুরু করা হয় না। বরং পুরো দিন ছাত্র, শিক্ষক ও প্রশাসনের সবাই মিলে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকেন। যার যতটুকু ক্লাস-সময়, সে তত ঘণ্টা কুরআন তিলাওয়াত করে। এমনকি কিছু ছাত্র একদিনেই সম্পূর্ণ কুরআন খতম করে ফেলে। তিনি বলেন, এর অসংখ্য উপকার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি- -প্রতিষ্ঠানে বরকত নাযিল হয়। – ছাত্রদের কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। – ছুটির সময় যে নূরানী পরিবেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, তা আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। এটা বাস্তব সত্য যে, যে কাজের সূচনা কুরআনের মাধ্যমে করা হয়, আল্লাহ তাআলা সেখানে বরকতের দুয়ার খুলে দেন।
রায়ওয়ান্ড মারকায সফর
এরপর আমরা রায়ওয়ান্ড তাবলীগী মারকাযের উদ্দেশ্যে রওনা হই, যেখানে বহু আকাবির ও বুজুর্গের সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়। সর্বপ্রথম আমাদের অভ্যর্থনা জানান, হযরত মাওলানা উমর আহমদ সাহেব দা.বা. ও হযরত মাওলানা মুফতী হাবীবুর রহমান সাহেব দা.বা.। তাঁরা উভয়েই রায়ওয়ান্ড মারকাযের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস। এরপর আমরা সাক্ষাৎ করি হযরত মাওলানা নযরুর রহমান সাহেব দা.বা.-এর সঙ্গে। তিনি হাদীসের শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের তাবলীগী জামাতের আমীর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর হযরত মাওলানা খুরশীদ সাহেব দা.বা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি মরহুম মাওলানা জামশেদ সাহেব রহ.-এর পুত্র, মারকাযের হাদীসের শিক্ষক এবং শূরা সদস্যদের অন্যতম। পরবর্তীতে হযরত মাওলানা এহসানুল হক সাহেব দা.বা.-এর সাক্ষাৎ লাভ করি। তিনি শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহ.-এর খলীফা এবং মারকাযের অত্যন্ত প্রবীণ উস্তাদ। বর্তমানে তিনি শাইখুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করছেন। সবশেষে হযরত মাওলানা আহমদ বাটলা সাহেব দা.বা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনিও মারকাযের হাদীসের শিক্ষক এবং শূরা সদস্যদের একজন। রায়ওয়ান্ড মারকাযে এসব সাক্ষাৎ অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ও সৌহার্দ্যময় পরিবেশে সম্পন্ন হয়। আলহামদুলিল্লাহ, সেখানে উপস্থিত অনেকেই পূর্বে বাংলাদেশের টঙ্গী ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং চট্টগ্রামে হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেবের মাদরাসাও সফর করেছিলেন। ফলে পূর্বপরিচয়ের একটি সুন্দর ভিত্তি ছিল। এ কারণে সাক্ষাৎগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা জ্ঞানগর্ভ, উপকারী ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছিল। হৃদয় যেমন প্রশান্ত হয়েছে, তেমনি জ্ঞানও সমৃদ্ধ হয়েছে ।
৯ জুন ২০২৬ খ্রি., মঙ্গলবার ঝং, পাকিস্তান
মঙ্গলবার সকালে নাশতা শেষে আমরা ঝং এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমরা ছিলাম চারজন মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব, আমার পিতা, হাফেজ আব্দুস সুবহান এবং আমি। পুরো পথজুড়ে আমরা হযরতজী রহিমাহুল্লাহর কালাম ও কবিতা শুনতে থাকলাম-যেগুলো মুরাকাবার সময় পাঠ করা হতো। আগেই আমাদের আগমনের সংবাদ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। হযরত সাহেবজাদা সাইফুল্লাহ আহমদ নকশবন্দী মুজাদ্দিদী দা.বা.. হযরত শাইখুল হাদীস মাওলানা হাবীবুল্লাহ সাহেব দা.বা., মাওলানা জীশান সাহেব এবং সামীর লাখানী সাহেবসহ সবাই অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। আর যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন সত্যিই এক আন্তরিক ও উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম। ঝং পৌঁছে আমরা সরাসরি মিহরাবের দিকে গেলাম এবং মসজিদে প্রবেশ করলাম। নামাযের সময় ঘনিয়ে এসেছিল। আমরা অজু করে জামাতে শরিক হলাম। নামাযের পর মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেবের বয়ান অনুষ্ঠিত হলো। বয়ান শেষে যখন আমরা সাহেবজাদা সাইফুল্লাহ আহমদ নকশবন্দী মুজাদ্দিদীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তার বাড়িতে গেলাম, তখন হযরতজী রহিমাহুল্লাহর কক্ষের পাশের স্থানে এক সুন্দর মজলিস বসে। এর পূর্বে একটি পৃথক বৈঠকে মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি কথা বলেন। তিনি বলেন, “তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি) ছাড়া কোনো কাজই উপকারী নয়। তাযকিয়া ছাড়া মাদরাসা পরিচালনা করাও উপকারী নয়। তাযকিয়া ছাড়া দাওয়াতে তাবলিগও উপকারী নয়। তাযকিয়া ছাড়া জিহাদও উপকারী নয়। তাযকিয়া ছাড়া দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা কিংবা শিক্ষা দেওয়াও উপকারী নয়। এমনকি তাযকিয়া ছাড়া তাযকিয়ার কাজ করাও উপকারী নয়।” এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের নফসের পরিশুদ্ধি না হয়, ততক্ষণ সে দীনের কাজ করতে গিয়েও আত্মগর্ব, অহংকার ও আত্মপ্রশংসার শিকার হয়ে পড়ে। বাহ্যিকভাবে সে দীনের সেবা প্রসঙ্গে তিনি একটি শিক্ষণীয় ঘটনাও বর্ণনা করেন-একবার হযরত শাহ আবরারুল হক হারদোয়ী রহিমাহুল্লাহ একটি মাদরাসায় গিয়ে দেখলেন সেখানে নতুন করে পানির কল লাগানো হয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “এগুলো কী করেছ?” পরিচালকবৃন্দ বললেন, “হযরত! মানুষের সুবিধার জন্য লাগানো হয়েছে।” তিনি বললেন, “সুবিধা তো বটেই, কিন্তু যে পানি অপচয় হবে, তার দায়ভার কে বহন করবে?” পরে তিনি একটি বাস্তবসম্মত সমাধানও দেন-প্রতিটি কলের নিচে একটি পাত্র রাখা হোক, যাতে মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিয়ে ব্যবহার করতে পারে এবং অপচয় থেকে বাঁচতে পারে। যখন তাঁকে বলা হলো, “যদি মানুষ এ নিয়ম না মানে?” তখন তিনি জবাব দিলেন, “তাহলে অন্তত তুমি গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে।” আমাদের আকাবিরদের এই ধরনের সতর্কতা ও তাকওয়া সত্যিই মানুষকে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
১৪ জুন ২০২৬ খ্রি., রবিবার জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর, পাকিস্তান
পাকিস্তানের প্রখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর-এ গত ১৪ জুন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় ইলমি ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রাম-এর শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া আগমন করেন। সফরকালে তিনি জামিয়ার মুহতামিম হযরত মাওলানা কারী আরশাদ উবাইদ, শাইখুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ খান, নাযিমে আ’লা মাওলানা আওয়াইস হাসান, মাওলানা মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং জামিয়া আশরাফিয়ার বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন। এ সময় জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের সাবেক মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ কাসেমী (রহ.), মাওলানা আবদুর রহমান আশরাফী (রহ.), মাওলানা হাফেজ ফজলুর রহিম আশরাফী (রহ.), শাইখুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস কান্ধলভী (রহ.), মাওলানা রাসূল খান হাজারভী (রহ.) এবং অন্যান্য আকাবির, আলেম ও শিক্ষকদের যুহদ-তাকওয়া, ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাত, তাঁদের ইলমি, মিল্লি ও রচনামূলক অবদান, পাশাপাশি দারুল উলুম দেওবন্দ ও উপমহাদেশের দ্বীনি মাদরাসাগুলোর ইসলাম প্রচার এবং নতুন প্রজন্মের ঈমান, আকিদা ও আদর্শ সংরক্ষণে ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া বলেন, “পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে মুসলমান হিসেবে হৃদয়ের ভালোবাসা ও ঈমানের যে বন্ধন রয়েছে, তা চিরস্থায়ী। দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং বাণিজ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা উভয় দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও বলেন, “জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ হাসান (রহ.) এবং তাঁর পরিবারের দ্বীন ও ইসলামের জন্য অবদান অবিস্মরণীয় এবং ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁদের ইখলাসের বরকতেই আজ জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের ইলমি ও দ্বীনি ফয়েজ-বরকত হারামাইন শরীফাইনসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।” এদিকে জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের মুহতামিম হযরত মাওলানা কারী আরশাদ উবাইদ এবং শাইখুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ খান আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রামের শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া-কে “ইজাযাতে হাদীস” প্রদান করেন। পরিশেষে মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য, বিশেষ করে গাজা, অধিকৃত কাশ্মীর, মিয়ানমার এবং বিশ্বের অন্যান্য নির্যাতিত মুসলমানদের মুক্তি ও জুলুম থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশেষ দুআ করেন। পাশাপাশি জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরসহ সকল দ্বীনি মাদরাসা ও মসজিদের হেফাজত, উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্যও তিনি বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন।
বাহাদুরাবাদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বয়ান
বাহাদুরাবাদে সংক্ষিপ্ত এক বয়ানে হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব দামাত বারকাতুহুম অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর একটি বিষয় তুলে ধরেন। কুরআনের আয়াত- إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ এর সাধারণ ও শুদ্ধ অনুবাদ হলো-“হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি।” কিন্তু ‘না’বুদু” শব্দের মধ্যে শুধু ইবাদত নয়, বরং উবুদিয়্যাত বা পূর্ণ দাসত্বের অর্থও নিহিত রয়েছে। ইবাদত মূলত কিছু নির্দিষ্ট আমলের নাম-যেমন নামায, রোজা, তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি। কিন্তু উবুদিয়্যাত এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। উবুদিয়্যাত অর্থ হলো পূর্ণাঙ্গ বন্দেগি, আত্মসমর্পণ, নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে আল্লাহ তাআ’লার ইচ্ছার মধ্যে মিশে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মচারীকে দেখুন। কর্মস্থলে থাকাকালীন সে নিয়মের অধীন থাকে, কিন্তু বাড়িতে ফিরে নিজের ইচ্ছামতো চলতে পারে। পক্ষান্তরে একজন গোলাম এমন নয়; সে চব্বিশ ঘণ্টাই তার মালিকের অধীন। আর আমরা তো আল্লাহ তাআ’লার বান্দা-শুধু কর্মচারী নই, শুধু গোলামও নই; বরং এর চেয়েও গভীর এক সম্পর্কের অধিকারী। এটি হলো ভালোবাসা, আনুগত্য ও আত্মবিসর্জনের বন্ধন। তাই ‘না’বুদু’ শব্দের মধ্যে এই বার্তাও নিহিত রয়েছে যে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে অতিবাহিত হওয়া উচিত।
১৬ জুন ২০২৬ খ্রি., মঙ্গলবার দারুল উলুম করাচি, পাকিস্তান
আলহামদুলিল্লাহ, করাচি সফরে বিভিন্ন বড় বড় মাদরাসায় উপস্থিত হওয়ার সুযোগ হচ্ছে । এরই ধারাবাহিকতায় আজ যাওয়া হলো দারুল উলুম করাচিতে। সেখানে হযরত শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকি উসমানি সাহেব (দা.বা.)-এর সঙ্গে হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব (দা.বা.)-এর সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। দুই মহান ব্যক্তিত্বের এই সাক্ষাৎ ছিল অত্যন্ত বরকতময়। সত্যিই তখন অনুভব হচ্ছিল, ইলম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং আহলে ইলমের মজলিসে তা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
গতরাতে দরসুল কুরআন উটকম-এ হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া সাহেব দামাত বারকাতুহুম এর বয়ান হয়। সেখানে হযরত অত্যন্ত চমৎকার একটি বিষয় তুলে ধরেন—সুরা ইখলাস ও সুরা কাফিরুন-এর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সুরা কাফিরুনে মানুষ তার আমল ও ইবাদতকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়—“আমি তোমাদের উপাস্যদের ইবাদত করি না।”
আর সুরা ইখলাসে মানুষের আকীদা ও আল্লাহ্ সম্পর্কে ধারণাকে পরিশুদ্ধ করা হয়—“আল্লাহ এক, তিনি অমুখাপেক্ষী।” অর্থাৎ একটি সুরা কর্মগত শিরকের (শিরকে আমলী) অস্বীকৃতি ঘোষণা করে, আর অন্যটি বিশ্বাসগত শিরকের (শিরকে ইতিকাদী) মূলোৎপাটন করে।
এই কারণেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে এই দুটি সুরা বিশেষভাবে নির্ধারিত হয়েছে। দিনের সূচনা হয় ফজরের সুন্নাতে এগুলোর মাধ্যমে, রাতের শুরু হয় মাগরিবের সুন্নাতে এগুলোর মাধ্যমে, আবার রাতের সমাপ্তিও বিতরের নামাযে এগুলোর মাধ্যমেই হয়। এমনকি সফরসহ আরও বিভিন্ন অবস্থায়ও এ দুটি সুরা পড়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, একজন মুমিনের জীবনের শুরু, ধারাবাহিকতা এবং সমাপ্তি—সবই হওয়া উচিত তাওহীদের ঘোষণা এবং শিরকের প্রত্যাখানের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ার শাইখুল হাদিস ও প্রধান মুফতী হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া দামাত বারকাতুহুম গত ১৬ জুন মঙ্গলবার পাকিস্তানের করাচিষ্ঠ জামিয়াতুর রশীদে তাশরীফ নেন এবং মুহতামিম হযরত মুফতী আবদুর রহিম সাহেবের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন।
উল্লেখ্য, পবিত্র হজ্ব পালন ও পাকিস্তানে ইলমী-ইসলাহী সফর শেষে হযরত গত ১৯ জুন ২০২৬ জামিয়ায় পৌঁছেছেন-আলহামদুলিল্লাহ্।
