শুক্রবার-২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুরবানী : ফাযাইল ও মাসাইল

মাওলানা যুবাইর হানীফ কাসেমী


কুরবানী এমন একটি ইবাদত যা আল্লাহ তাআলা সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব করেছেন৷ হযরত ইবরাহীম আলাইহি সালাম থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত এই সুন্নাহ চলমান৷ রাসূল ﷺ সারা জীবন প্রত্যেক বছর কুরবানী করেছেন৷ এক বছর করতে পারেন নি৷ পরের বছর দুইটা কুরবানী করেছেন৷
ইসলামে কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই পবিত্র মাসে লক্ষ লক্ষ মুসলিম এই বিধান পালন করে এবং ইবরাহীম আ. এর সুন্নাহ অনুসরণ করে লক্ষ লক্ষ পশু জবাই করা হয়। কুরবানী হলো আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এমনটা হওয়া উচিত ছিল যে বান্দা নিজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করবে। তবে, আল্লাহ তাআলার রহমতের কারণেই আল্লাহ তাআলা পশু জবাইকে তাঁর বিকল্প হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা যাকে আর্থিক সম্পদ দান করেছেন, সেই ব্যক্তি কুরবানীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কর্তব্য বলে মনে করে পালন করা চাই। আর যে ব্যক্তি আর্থিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এই মহান ইবাদত থেকে বঞ্চিত হয়, সে অত্যন্ত দুর্ভাগা।
পাশাপাশি কুরবানী শাআইরে ইসলাম তথা ইসলামের প্রতীকি বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে শাআইরে ইসলামের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এছাড়া গরীব-দুঃখী, অসহায়, এতীম ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শর্তহীন আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে কুরবানীতে। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার জন্য উৎসর্গ ও বিসর্জনের ছবকও রয়েছে এতে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী আদায় করুন। (সূরা কাওসার, আয়াত: ২)
অন্য আয়াতে এসেছে-
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
(তরজমা) (হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ (অর্থাৎ আমার সবকিছু) আল্লাহ রাববুল আলামীনের জন্য উৎসর্গিত। (সূরা আনআম : ১৬২)
পশু জবাই করে কুরবানী করার মধ্যে এই হিকমত ও ছবকও আছে যে, আল্লাহর মুহববতে নিজের সকল অবৈধ চাহিদা ও পশুত্বকে কুরবানী করা এবং ত্যাগ করা। সুতরাং কুরবানী থেকে কুপ্রবৃত্তির দমনের জযবা গ্রহণ করা উচিত। তাই কুরবানীর মধ্যে ইবাদতের মূল বিষয় তো আছেই, সেই সাথে তাকওয়ার অনুশীলনও রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ
(মনে রেখো, কুরবানীর জন্তুর) গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে কেবলমাত্র তোমাদের পরহেযগারিই পৌঁছে। (সূরা হজ্ব, আয়াত: ৩৭)
আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে কুরবানী দেওয়ার ঐতিহ্য সাইয়্যিদুনা আদম (আ.) থেকে চলে আসছে। তাই, আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়েদায় সাইয়্যিদুনা আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল ও কাবিলের কাহিনী উল্লেখ করেছেন যে, তারা উভয়েই মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করেছিলেন, হাবিল একটি উত্তম ভেড়া কুরবানী করেছিলেন এবং কাবিল কিছু কৃষিজাত দ্রব্য, অর্থাৎ শস্য উৎসর্গ করেছিলেন। সেই সময়, কুরবানী কবুল হওয়ার লক্ষণ ছিল যে, আকাশ থেকে আগুন এসে কুরবানী গ্রাস করবে; ফলে, হাবিলের কুরবানী আগুন গ্রাস করে এবং কাবিলের কুরবানী সেখানেই থেকে যায়, ফলে তা কবুল থেকে বঞ্চিত হয়।
প্রতিটি জাতির মধ্যে কুরবানীর বিধান ছিল; তবে, এর পদ্ধতি এবং রূপে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কুরবানীর একটি মহান রূপ হলো যা মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺএর উম্মতকে ঈদুল আযহার কুরবানীর আকারে দান করেছেন, যা হযরত সাইয়্যিদুনা ইবরাহীম (আ.)-এর কুরবানীর স্মারক।
কুরবানীর ফজিলত সম্পৃক্ত কিছু হাদীস:
পবিত্র হাদীসে, নবী (ﷺ) কুরবানীর মহান গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করেছেন;
১৷
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ ، قَالَ : قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ ؟ قَالَ : ” سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ “. قَالُوا : فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : ” بِكُلِّ شَعَرَةٍ حَسَنَةٌ “. قَالُوا : فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ : ” بِكُلِّ شَعَرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَةٌ “.
হযরত যায়েদ বিন আরকাম (রা.) বলেন: সাহাবীগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানীগুলো কী?” তিনি ﷺ বললেন, “এগুলো আপনার পিতা ইবরাহীম আ. এর সুন্নাত। সাহাবীগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এগুলোতে আমাদের জন্য কী সওয়াব?” তিনি বললেন, “প্রতি চুলের বিনিময়ে একটি নেকী আছে।” তিনি বললেন, “আর পশমের ক্ষেত্রেও”? তিনি বললেন, “প্রতি চুলের বিনিময়ে একটি নেকী আছে।” (ইবনে মাজাহ, কিতাবুল আযাহি, হাদীস নাম্বার: ৩১২৭)
এই হাদীসে, নবী (ﷺ) পশু কুরবানীর মহান সওয়াব বর্ণনা করে বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা একজন বান্দাকে পশুর লোমের সমান নেক আমল দান করেন, যা গণনা করা অসম্ভব।
২৷ অন্য হাদীসে, নবী (ﷺ) বলেছেন,
عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : ” مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ، إِنَّهُ لَيَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا، وَأَشْعَارِهَا، وَأَظْلَافِهَا، وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الْأَرْضِ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا ”
“কোরবানীর দিনগুলিতে (অর্থাৎ যিলহজ্জের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত) কোনো ব্যক্তির কোনো আমল আল্লাহর কাছে কুরবানীর পশুর রক্তপাতের চেয়ে বেশি প্রিয় নয় এবং কিয়ামতের দিন, এই কুরবানীর পশু তার শিং, লোম এবং খুর নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে এবং নিঃসন্দেহে, কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে কবুলের মর্যাদা অর্জন করে। অতএব, হে মুমিনগণ! আনন্দিত হৃদয়ে কুরবানী করো।” (তিরমিযী, হাদীস: ১৪৯৩)
৩৷ অন্য বর্ণনায়,
أن النبي صلى الله عليه وسلم قال لفاطمة: (قومي إلى أضحيتك فاشهديها، فإنه يغفر لك عند أول قطرة من دمها كل ذنب عملتيه)
নবী (ﷺ) তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) কে বললেন: “হে ফাতিমা! উঠে তোমার কুরবানীর পশুর কাছে যাও এবং তা নিয়ে এসো; কারণ যখন এর রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়বে, তখন তোমার পূর্ববর্তী পাপ ক্ষমা করা হবে।” তারা জিজ্ঞাসা করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! এই উপহার কি আমাদের, আহলে বাইতের জন্য নির্দিষ্ট, নাকি আমাদের এবং সকল মুসলমানের জন্য সাধারণ?” তিনি (ﷺ) বললেন: “বরং, এটি আমাদের এবং সকল মুসলমানের জন্য সাধারণ।” (আল-মুসতাদরাক, কিতাবুল আযাহী)
৪৷ আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বলেছেন: “যার সামর্থ্য আছে এবং সে কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ৮২৭৩)
৫৷
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: ” أَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ، يُضَحِّي كُلَّ سَنَةٍ ”
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ দশ বছর মদীনায় অবস্থান করেছিলেন এবং প্রতি বছর একটি করে কুরবানী করতেন। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ৪৯৫৫)
নবী ﷺ প্রতি বছর একটি করে কুরবানী করতেন, এটাই কুরবানীর গুরুত্ব, ফজিলত এবং গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।
৬৷
عَنْ أَنَسٍ قَالَ : ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ ، فَرَأَيْتُهُ وَاضِعًا قَدَمَهُ عَلَى صِفَاحِهِمَا، يُسَمِّي وَيُكَبِّرُ، فَذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ.
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ দুটি কালো ও সাদা রঙের এবং বড় শিং বিশিষ্ট ভেড়া কুরবানী করতেন এবং তাদের ঘাড়ে তাঁর পা রেখে তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে জবাই করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৫৫৮)
কুরবানীর গুরুত্ব এই সত্য থেকেও অনুমান করা যায় যে, নবী ﷺ বিদায় হজ্জের সময় একবারে একশটি উট কুরবানী করেছিলেন। অন্য একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, নবী ﷺ স্বয়ং তাঁর পবিত্র হাতে তেষট্টিটি উট জবাই করেছিলেন; আর হযরত আলী (রা.) কে বাকিগুলো জবাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সহীহ বুখারী)
আজকাল কিছু নাস্তিক এবং ধর্মহীন মানুষ কুরবানী করার বিরোধিতা করে এবং বলে যে, “কুরবানী করা” অর্থ ও সময়ের অপচয়৷ যদিও শরীয়ত ও যুক্তি অনুসারে এটি গ্রহণযোগ্য নয়৷ কারণ যদি “কুরবানী করা” অর্থ ও সময়ের অপচয় হত, তাহলে নবী ﷺ কুরবানীর ওপর এত জোর দিতেন না। স্বয়ং নবী ﷺ-এর কথা ও কর্ম থেকে প্রমাণিত হয় যে, কুরবানী করা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনন্দের কারণ, একই সাথে এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও অনুভূতির প্রকাশ এবং এটি মুমিন বান্দার জন্য ক্ষমার কারণও; তাই, এই ধরণের লোকদের কথায় কান দেওয়া উচিত নয়। এরা বস্তুত ইসলাম ও মুসলমানের শত্রু৷

কুরবানী কার ওপর ফরজ?
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্বের সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বর্তমানে বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
কুরবানীর নেসাব
নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব। যেমন কারো নিকট কিছু স্বর্ণ ও কিছু টাকা আছে, যা সর্বমোট সাড়ে বায়ান্ন তোলা চাঁদির মূল্য সমান হয় তাহলে তার উপরও কুরবানী ওয়াজিব। বর্তমান সময়ে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্য: ৯০০০০ টাকা৷
কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য, নিসাবের অতিরিক্ত সম্পদ, অর্থ বা পণ্যের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়, বরং কুরবানীর দিনগুলোতে ১২ তারিখের সূর্যাস্তের পূর্বে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাবের মালিক হলেই কুরবানী ওয়াজিব৷
যেসব জন্তু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয
● ভেড়া, ছাগল, দুম্বা, গরু, মহিষ, উট দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। তদ্রূপ হাঁস-মুরগি বা কোনো পাখি দ্বারাও কুরবানী জায়েয নয়।- ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৮, এসব জন্তুর নর-মাদা উভয়টির কুরবানী জায়েয৷
কুরবানীর জন্তুর বয়সসীমা
● ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা সর্বনিম্ন এক বছর, গরু ও মহিষ সর্বনিম্ন দুই বছর ও উট সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের হতে হবে৷ তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এক বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে এক বছরের মতো লাগে তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা বৈধ। তবে এক্ষেত্রে কমপক্ষে বয়স ৬ মাস হতে হবে। ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। অনেকে ভেড়া ও দুম্বার সাথে ছাগলকেও এক করে ফেলেন, যা সম্পূর্ণ ভুল৷ (কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬)
এক পশুতে কত শরীক হতে পারবে
একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে কুরবানী করলে কারোটাই কুরবানী শুদ্ধ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮)
জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন যে, আমরা একটি গরু এবং একটি উটে সাতজন করে শরীক হয়ে যাই।-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১২১৮
একা কুরবানী করার নিয়ত করে পশু কিনে অন্যকে শরীক করা
যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কুরবানী দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরীক করা জায়েয। তবে এতে কাউকে শরীক না করে একা কুরবানী করাই উত্তম। শরীক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়, যার ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে যেহেতু কুরবানীর নিয়তে পশুটি ক্রয় করার মাধ্যমে লোকটি তার পুরোটাই আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে তাই তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরীক করা জায়েয নয়। যদি শরিক করে তবে ওই টাকা সদকা করে দেওয়া জরুরি । কুরবানীর পশুতে কাউকে শরীক করতে চাইলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিতে হবে। -কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০
শরীকে কুরবানী
সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানী সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
কোনো শরিকের ভুল নিয়ত থাকলে
যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯
পশু হারিয়ে গেলে কিংবা হারানোটা পাওয়া গেলে
কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে কুরবানীদাতা ধনী হলে দুটির একটি কুরবানী করলেই চলবে। তবে দুটি কুরবানী করাই উত্তম। উল্লেখ্য যে, গরীব ব্যক্তির ক্রয়কৃত পশু হারিয়ে গেলে তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানী করা আবশ্যকীয় নয়, তারপরও যদি সে আরেকটি পশু কুরবানীর জন্য কিনে ফেলে তবে সেটি জবাই করা জরুরি হয়ে যায় এবং হারানোটি পাওয়া গেলে তাও জবাই করতে হবে। -সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪, ইলাউস সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯, কাযীখান ৩/৩৪৭
কুরবানীর জন্তুতে আকীকা
কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে। ছেলের জন্য দুই অংশ আর মেয়ের জন্য এক অংশ দিতে হবে।

কুরবানী সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা
● কিছু লোক পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে কেবল একটি ছাগল কুরবানী করে, যদিও কখনও কখনও পরিবারের একাধিক সদস্যের কুরবানী ওযাজিব হওয়া নেসাব পরিমাণ থাকে এবং এই কারণে, তাদের সকলের ওপর কুরবানী ওয়াজিব; এক্ষেত্রে কুরবানী তারা প্রত্যেকে নিজের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে কুরবানী করা আবশ্যক। তাদের সকলের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী করলে কারোই কুরবানী আদায় হবে না৷
● গরু, মহিষ এবং উটের মতো বড় প্রাণী সাতজন শরীক হয়ে কুরবানী করা যেতে পারে। (আলমগিরি)
● অন্যের পক্ষ থেকে ফরজ কুরবানী করার জন্য অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় অন্যের পক্ষ থেকে কুরবানী আদায় হবে না। যদি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আত্মীয়স্বজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অভ্যাস ও রীতি থাকে, তাহলে সেই ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই এবং অনুমতি ছাড়াই কুরবানী করা বৈধ হবে (আলমগিরী)
● কুরবানীর সময় কুরবানী করা আবশ্যক। অন্য কোনো জিনিস এর বিকল্প হতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, কুরবানীর পরিবর্তে একটি ছাগল বা তার মূল্য দান (খয়রাত) হিসেবে দেওয়া যেতে পারে, যা যথেষ্ট নয়। (আলমগিরী)
● মুসাফির ব্যক্তির ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়, যদিও সে সামর্থ্যবান হয়৷ অবশ্য যদি কোনো ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে প্রথম দিকে মুসাফির ছিল, শেষের দিকে মুকিম হয়ে গেল, নিজের বাড়ি আসল বা কোথাও পনের দিন থাকার নিয়ত করে ফেলল, তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব৷
● কুরবানীর পশু অবশ্যই ত্রুটিহীন হতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ পশুর কুরবানী জায়েয নয় (রদ্দুল মুহতার মুহতার)
● নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে নফল কুরবানী করতে পারবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১,
● নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এমন দরিদ্র ব্যক্তির ওপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২
● যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কুরবানীর সময়। তবে সবচেয়ে উত্তম হল প্রথম দিন কুরবানী করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮;
বারা ইবনে আযেব রা.থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ﷺ বলেছেন, ঈদের দিন আমরা প্রথমে নামায আদায় করি। অতপর ফিরে এসে কুরবানী করি। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে সে আমাদের নিয়ম মতো করল। আর যে নামাযের আগেই পশু জবাই করল সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে, এটা কুরবানী হবে না।-সহীহ মুসলিম ২/১৫৪
ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানী করা
● যেসব এলাকার লোকদের ওপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামায আদায় পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।- সহীহ বুখারী ২/৮৩২, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮; সহীহ মুসলিম ২/১৫৪
من ذبح قبل الصلاة فإنما يذبح لنفسه ومن ذبح بعد الصلاة فقد تم نسكه وأصاب سنة المسلمين.
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানীর পশু জবাই করবে সেটা তার নিজের জন্য সাধারণ জবাই হবে। আর যে নামায ও খুতবার পর জবাই করবে তার কুরবানী পূর্ণ হবে এবং সে-ই মুসলমানদের রীতি অনুসরণ করেছে। -সহীহ বুখারী ২/৮৩৪; সহীহ মুসলিম ২/১৫৪
রাতে কুরবানী করা
● কুরবানীর দিন সমূহে দিনে যেমন কুরবানী করা যায়, তেমনি রাতেও করা যায়৷ তবে দিনে করা উত্তম৷ -আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০
কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী করতে না পারলে
● কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার ওপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করেছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫
● কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ