শুক্রবার-২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি-১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কওমী মাদরাসা : ইলম, তাকওয়া ও ত্যাগের শিক্ষালয়

আল্লামা মুফতী আবু তাহের কাসেমী নদভী


গত ১০ মে ২০২৫ ইং তারিখে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার সুযোগ্য মুহতামিম, পীরে কামেল আল্লামা মুফতী আবু তাহের কাসেমী নদবী দা. বা. রাজধানীর মিরপুরস্থ আরজাবাদ জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় এক দাওয়াতী সফরে তাশরীফ নেন। সেখানে তিনি আসাতিযায়ে কেরাম, তালিবানে ইলম ও দীনদার মুসলমানদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইসলাহী তাকরীর পেশ করেন। কওমী মাদরাসার ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য, শিক্ষাব্যবস্থা, খেদমত ও দাওয়াতি কার্যক্রমের বিস্তারিত আলোচনা উঠে আসে হযরতের বক্তব্যে। এছাড়া পাঠ্যক্রম, ছাত্রদের চারিত্রিক গঠন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাদরাসার ভূমিকা ও অবদান তুলে ধরেন দরদী ভাষায়। মাসিক আত-তাওহীদ পাঠকদের উপকারের কথা বিবেচনা করে পুরো আলোচনাটি ২ পর্বে পত্রস্থ হলো। শ্রুতিলিখন ও গ্রন্থনা করেছেন মাওলানা আকরাম সাদী। 

মুহতারাম ওলামায়ে কেরাম, প্রিয় শিক্ষকগণ এবং আমার স্নেহের ছাত্র ভাইয়েরা!
আলহামদুলিল্লাহ! আজকের এই নূরানী মাহফিলে উপস্থিত হতে পেরে আমি পরম আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। আমি আজ দাঁড়িয়ে আছি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত মজলিসে—যার নাম বহুবার শ্রবণে এসেছে। কিন্তু এই প্রথমবার এখানে এসে আপনাদের সম্মুখে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য লাভ করেছি। আমি কথা বলছি, আল জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ—এই বরকতময় দীনি মারকায সম্পর্কে।
প্রিয় ভাইয়েরা!
এই আরজাবাদ মাদরাসা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি একটি দীনি মারকায। রূহানিয়াতের আস্তানা। ইলম ও হিদায়াতের আলোকস্তম্ভ। বহুবার শুনেছি এর প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুফতী শামসুদ্দীন কাসেমী রহ.-এর নাম ও অবদান সম্পর্কে। তিনি ছিলেন এমন একজন আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ—যাঁর নাম উচ্চারণেই অন্তরে এক নূরানিয়াতের অনুভব জাগে। তিনি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি; বরং একটি দীনি আদর্শের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। যার ছায়া আজও স্পষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে ছাত্রদের চেহারায়, ওস্তাদদের আখলাকে এবং পরিচালকদের ইখলাসে।
জানতে পেরেছি—দারুল উলুম দেওবন্দের বুযুর্গানে দীন যখন বাংলাদেশ সফরে আসতেন, তখন তাঁরা এই মাদরাসায় এসে অবস্থান করতেন। এটা কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। প্রশ্ন জাগে—এত মাদরাসার ভেতর তাঁরা কেন এই মাদরাসাকেই বেছে নিতেন? এর পেছনে আছে আল্লাহর বিশেষ কবুলিয়ত। এই প্রতিষ্ঠানের বুযুর্গদের ইখলাস, তাকওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন খেদমতের বারাকাত।
আজ এই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মাধ্যমে আমার বহুদিনের প্রত্যাশা পূর্ণ হয়েছে। স্মরণসভায় অংশ নিতে আমি এসেছিলাম কামরাঙ্গীরচরে। মরহুম মাওলানা আতাউল্লাহ হাফিজ্জী রহ. এর স্মরণে অনুষ্ঠিত সেই মজলিসেই এই মাদরাসার মুহতামিম হুজুর দা.বা.-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। এর পূর্বে তিনি এখানে আসার আমন্ত্রণ জানান। আমি প্রতিশ্রুতি দিই। আলহামদুলিল্লাহ, আজ তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
আমার দুই পাশে বসা রয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের দুই শ্রদ্ধেয় বুযুর্গ—মুহতামিম সাহেব ও মুফতী সাহেব দা.বা.। তাঁদের সঙ্গে পূর্বেও বিভিন্ন স্থানে সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু আজ তাঁদের নিজ প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তাঁদের রূহানিয়াতের পরিবেশে বসার এবং কিছু গ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে—এটা আমার জন্য বিরল সৌভাগ্য।
প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা!
আপনারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান—এমন একটি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন, এমন ওস্তাদদের সাহচর্যে রয়েছেন, যাঁরা ইখলাস ও ত্যাগের মাধ্যমে ইলমের খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। মনে রাখবেন, মাদরাসা কেবল পাঠদানের জায়গা নয়—এটি রূহানিয়াত ও আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র। এখান থেকে বের হওয়া প্রতিটি তালিবে ইলম যেন হয় দীনের এক জীবন্ত প্রতিনিধিত্বকারী।
আজ আরজাবাদ মাদরাসা শুধু ঢাকায় নয়; বরং গোটা বাংলাদেশেই দীনের এক দৃঢ় স্তম্ভরূপে প্রতিষ্ঠিত। যেমনভাবে কওমী মাদরাসাগুলো পুরো দুনিয়াতে দীনের দুর্গ হিসেবে কাজ করছে, তেমনি এই প্রতিষ্ঠানও একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
কওমী মাদরাসা: বিকল্পহীন দীনি শিক্ষা ব্যবস্থা
বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটে—দেশীয় হোক কিংবা আন্তর্জাতিক—দীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে কওমী মাদরাসার কোনও প্রকৃত বিকল্প খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যুগ-যুগ ধরে এই প্রতিষ্ঠানসমূহই উম্মতের ঈমান-আকীদা, আমল-আখলাক এবং রূহানিয়াতের প্রহরী হিসেবে কাজ করে আসছে। কওমী মাদরাসাগুলোর পাঠ্যক্রম কোনো সাধারণ সিলেবাস নয়। এটি আল্লাহপাক মনোনীত একটি মকবুল পদ্ধতি, যার তিনটি স্তম্ভ কুরআন মাজীদের ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে—
يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ (আয়াত পাঠ করা),
وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ (কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা),
এবং وَيُزَكِّيهِمْ (আত্মার পরিশুদ্ধি)।
এই তিনটি স্তম্ভ কেবল শিক্ষার মৌলিক স্তর নয়; বরং এটি একজন মানুষের সামগ্রিক রূহানি উন্নয়নের রূপরেখা। এর মধ্যে يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ হল ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে জ্ঞানের দালান وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ, আর এ শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য-আত্মশুদ্ধি তথা وَيُزَكِّيهِمْ।
শিক্ষাদানের ক্রমানুসার
কওমী মাদরাসাগুলোতে তালিবে ইলমদের শিক্ষা যাত্রা শুরু হয় কুরআনের বিশুদ্ধ পাঠের মাধ্যমে। প্রথম ধাপে শেখানো হয় আলিফ, বা, তা, সা-এর বুনিয়াদি হরফজ্ঞান এবং নাজেরা পদ্ধতিতে ত্রিশ পারা কুরআন বিশুদ্ধভাবে পড়া।  এরপর আসে হিফজ—পবিত্র কুরআন হৃদয়ে ধারণের মহা সম্মানিত কাজ। হিফজ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করে কুরআনের ভাষা অনুধাবনের স্তরে। এজন্য শেখানো হয় ইলমে নাহু ও সরফ—যা আরবী ব্যাকরণের মূল ভিত্তি। এসব বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে তালিবুল ইলমরা কুরআন ও হাদীস বুঝার যোগ্যতা লাভ করে।
ওলামায়ে কেরামের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা
এই শিক্ষাক্রমের পেছনে কাজ করছেন হাজার হাজার ওলামায়ে কেরাম। তারা কেউ ব্যাকরণ শেখাচ্ছেন, কেউ হাদীসের ব্যাখ্যায় নিয়োজিত, কেউ তাফসীর-ফিকহের জটিল বিশ্লেষণে রত। তারা প্রত্যেকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন সংরক্ষণের একেকজন বাহক, একেকটি স্তম্ভ।
وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ-এই আয়াতের প্রতিটি অংশে তাদের অবদান জড়িয়ে আছে।
কুরআনের হেফাজতে আল্লাহর নিশ্চয়তা
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“আমরাই যিকির (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক।”
আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনের হেফাজতের দায়িত্ব মানুষের ওপর ন্যস্ত করেছেন। তবে এই সম্মানিত দায়িত্ব সব মানুষের নয়। এটি সেইসব মানুষের, যাদের অন্তরে ঈমানের আলো দীপ্তিমান। ঈমানদারদের মধ্যেও এক শ্রেণি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত—তাঁরা হলেন আলেম-ওলামা। আর আলেমদের মধ্যে এমন একটি গোষ্ঠী আছে, যাদের চিন্তা-চেতনা কুরআন-সুন্নাহর প্রকৃত মর্মবাণীর প্রতিফলন, যাদের পথচলা দেওবন্দী ধারার পরিচায়ক। এদের মাধ্যমেই দীনের পরিপূর্ণ হেফাজত আল্লাহ পাক করে থাকেন। অন্যান্য জায়গায় হয়তো আংশিক আলো দেখা যেতে পারে, কিন্তু পূর্ণতা এখানেই।
এ দেওবন্দী হালাকার-
কেউ নিযুক্ত হয়েছেন কুরআন তিলাওয়াত শেখাতে,
কেউ হিফজ করাতে,
কেউ নাহু-সরফ,
কেউ তাফসির,
কেউ হাদীস,
কেউ ফিকহ,
কেউ তাজবীদ শিক্ষায়।
এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের হেফাজতের জন্য দেওবন্দী কওমী মাধ্যম বানিয়ে চলেছেন।
মানুষ ও পশু : বাহ্যিক সাদৃশ্য, আত্মিক বৈচিত্র
মানুষ: কেবল অবয়বের নাম নয়। আমরা মানুষ। আমাদের দেহ আছে—তাতে হাত আছে, পা আছে, চোখ আছে, কান আছে, জিহ্বা আছে। আমাদের মধ্যে আছে হাড়, রক্ত, মাংস, আর প্রবৃত্তির তাড়না—খাওয়ার ইচ্ছা, ঘুমের প্রয়োজন, যৌন আকাঙ্ক্ষা।
মানুষ কাকে বলে?
বাহিরের অবয়ব নয়, ভিতরের বাস্তবতা
মানুষ-শব্দটি ছোট, অথচ অর্থে গভীর। বাহ্যদৃষ্টিতে মানুষ একটি শারীরিক কাঠামোর নাম—যার দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চোখ, একটি জিহ্বা ও একটি মাথা আছে। এই দেহের মাধ্যমে মানুষ দেখে, চলে, খায়, ঘুমায়, কথা বলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দেহটাই কি মানুষ?
না, বরং এ তো শুধু এক খোলস—এক কাঠামো। এক বাহ্যিক অবয়ব মাত্র। মানুষ সে নয়, যাকে চোখে দেখা যায়; বরং মানুষ হলো সেই সত্তা, যাকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু যার পরিচয়ে গোটা দেহ জীবন্ত, সচল ও সম্মানিত।
মানুষের ভিতরে এমন কিছু রহস্যময় উপাদান আছে, যেগুলো তাকে পশুর চেয়ে আলাদা করে, তাকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বানায়। সেই অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা চারটি মূল উপাদানে পরিপূর্ণ—যেগুলোর মধ্যে ৪টি এখন আলোচনা করব:
১. আকল : মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড
আকল—এ এক অদৃশ্য শক্তি, কিন্তু তার ছায়া বিস্তৃত মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারে। এই আকলই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে। কারণ পশুর দেহ আছে, প্রাণ আছে, এমনকি কিছুটা বুদ্ধিও আছে, কিন্তু তাতে নেই আকলে কামিল।
আকল দুই প্রকার—
আকলে কামিল: পূর্ণ বিবেক, যা সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ বুঝে নিতে সক্ষম।
আকলে নাকেস: অপূর্ণ বুদ্ধি, যা আচরণে আবেগ প্রবণ, সিদ্ধান্তে দুর্বল ও লক্ষ্যহীন।
যে ব্যক্তির মধ্যে আকলে কামিল আছে, সে হয় মুকাল্লাফ-অর্থাৎ দায়িত্বপ্রাপ্ত। শরীয়তের নির্দেশনার আওতাভুক্ত। আর যে ব্যক্তির মধ্যে আকলই নেই, বা আছে কিন্তু পরিপক্ব নয়, সে মুকাল্লাফ নয়। যেমন: শিশু, পাগল ও পশু।
পশুরাও কোনো না কোনো পর্যায়ে বুদ্ধি ব্যবহার করে; তবে তা শুধু জীবিকা ও প্রবৃত্তির জন্য। তাদের আকল আছে, কিন্তু তা নাকেস। তাই তারা শরীয়তের দায়িত্বের আওতাভুক্ত নয়।
২. রূহ : মানুষের আসল পরিচয়
রূহ—এ এক অলৌকিক সত্তা, যার দ্বারা মানুষ জীবন্ত, সচল ও সংবেদনশীল। এই রূহ যখন দেহে থাকে, তখন মানুষকে মানুষ বলা হয়। কিন্তু যখন রূহ শরীর থেকে বিদায় নেয়, তখন সেই দেহ আর মানুষ থাকে না; তাকে বলা হয় লাশ।
একজন জীবিত মানুষকে সবাই তার নামে ডাকে: “আব্দুল খালেক এসেছেন”, “আব্দুল মালেক বসেছেন”
কিন্তু মৃত্যু আসার পর?
তখন বলা হয়: “আব্দুল খালেকের মৃতদেহ”, “আব্দুল মালেকের লাশ”।
তার নিজস্ব নামটি হারিয়ে যায়। কারণ আসল মানুষ—রূহ—চলে গেছে। শরীর পড়ে আছে নিস্তব্ধ, নির্জীব, নীরব।
এ থেকে বুঝা যায়, দেহ একা মানুষ নয়। এমনকি দেহ ও রূহ মিলেও মানুষ হতে পারে না; যদি না সেই রূহের মধ্যে আকল ও ঈমানের আলো না থাকে। কারণ পশুর মধ্যেও তো প্রাণ আছে, শরীর আছে। তাহলে মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
মানুষ তখনই সত্যিকার মানুষ, যখন তার দেহে রূহ থাকে, রূহের সাথে থাকে আকলে কামিল এবং সেই আকল আল্লাহর হিদায়াতের।
3. নফস : আত্মার ভেতরের যুদ্ধ ও আত্মশুদ্ধির সোপান
মানবদেহের ভেতর লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় সত্তা—যার নাম নফস। এটি সেই অদৃশ্য চালিকা শক্তি, যা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলে। কুরআনের আলোকে জানা যায়, এই নফস সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর চারটি মৌল উপাদান—মাটি, পানি, বাতাস ও আগুন—দ্বারা। যেমন দেহের গোড়া এ উপাদানগুলো। তেমনি নফসও গঠিত হয়েছে এগুলোর পারস্পরিক বিকাশে। আর এই উপাদানগুলো যেমন ভারসাম্যহীন হলে সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা, তেমনি নফসেও বাস করে ফাসাদ ও প্রবৃত্তির টান।
এজন্য ফেরেশতারা যখন জানতে পারলেন যে, আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করতে চলেছেন, তখন তারা জিজ্ঞেস করলেন:
﴿أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ﴾
“আপনি কি পৃথিবীতে এমনকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত করবে?” (সূরা বাকারা: ৩০) এ বক্তব্য ছিল ভবিষ্যতের নফসের দুর্বলতা ও অপশক্তির প্রতিচ্ছবি।
নফসের তিন স্তর: আত্মার অন্তঃসংগ্রামের ধারা
আল্লাহর রহমতে, মানুষ এই নফসকে শুধরানোর শক্তিও লাভ করেছে। নফস একদম নিচু স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে উত্তরণ ঘটাতে পারে, যদি সে মুজাহাদার (অভ্যন্তরীণ জিহাদ) মাধ্যমে নিজেকে শোধরায়। কুরআনের ভাষ্যে এই তিনটি স্তরের উল্লেখ আছে:
১. নফসে আম্মারা (নফসের আদেশকৃত স্তর)
এ স্তরের নফস মানুষকে সর্বদা মন্দ কাজের দিকে আহ্বান করে। এ নফস প্রবৃত্তির গোলাম, গুনাহের দিকে ধাবিত হয়, পাপকে আকর্ষণীয় মনে করে। আল্লাহ বলেন:
﴿وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ﴾
“আমি আমার নফসকে দোষমুক্ত করছি না, নিশ্চয়ই নফস তো মন্দের প্রতি প্রবণ।” (সূরা ইউসুফ: ৫৩)
এ নফস যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে মানুষ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়, তার গন্তব্য হয় জাহান্নাম।
২. নফসে লাওয়ামা (তিরস্কারকারী নফস)
এ স্তরের নফস গুনাহের পর নিজেকেই তিরস্কার করে। যখন সে পাপ করে, অন্তর বলে ওঠে: “তুমি এ কাজ করলে কেন?”, “তোমার কি লজ্জা নেই?” এই আত্মগ্লানিই আত্মশুদ্ধির সূচনা। আল্লাহ এই স্তরের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলেন:
﴿وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ﴾
“না, আমি শপথ করি তিরস্কারকারী নফসের।” (সূরা কিয়ামাহ: ২)
এ স্তরেই শুরু হয় মুজাহাদা-নফসের চাহিদার বিপরীতে চলা। চোখের অপব্যবহার না করা, জিহ্বার সংযম, লজ্জাস্থানের হেফাজত—এসবের মাধ্যমেই নফস ধীরে ধীরে উন্নীত হয়।
৩. নফসে মুতমাইন্না (সন্তুষ্ট ও প্রশান্ত নফস)
এই স্তর সেই পরিণত অবস্থার নাম, যেখানে নফস গুনাহ থেকে মুক্ত, অন্তর আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ এবং জীবন দুনিয়ার মোহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে সম্মানিত আহ্বান:
﴿يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي﴾
“হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরো, সন্তুষ্ট হয়ে ও সন্তোষজনক হয়ে। তুমি আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।” (সূরা ফজর: ২৭-৩০)
নফসকে উত্তরণের পথ: মুজাহাদা ও আত্মসংযম
নফসকে উন্নীত করার পন্থা হলো মুজাহাদা। অর্থাৎ নিজ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। নফস যা চায়, তা না করে বরং তার বিপরীতে যাওয়াই মুজাহাদা।
উদাহরণস্বরূপ: চোখ গুনাহের দিকে চাইলেও তা ফিরিয়ে নেওয়া। মুখ চায় মন্দ কথা বলতে, কিন্তু তা সংযত রাখা। হাত চায় হারামে লিপ্ত হতে, কিন্তু তা আটকানো।  এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই নফসে আম্মারা রূপান্তরিত হয় লাওয়ামায়। আর ক্রমাগত মুজাহাদার মাধ্যমে পৌঁছে যায় মুতমাইন্নার উচ্চ মর্যাদায়।
নফসের শুদ্ধিই জান্নাতের সোপান । যে ব্যক্তি তার নফসকে শুধরে নিতে পারে, সংযত করতে পারে, মুজাহাদার মাধ্যমে তাকে প্রশান্ত করতে পারে, সে জান্নাতের উপযুক্ত হয়। আর যে ব্যক্তি নফসে আম্মারার দাসত্বে নিমজ্জিত থাকে, তার গন্তব্য জাহান্নাম। কুরআন বলে:
﴿فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ﴾
“একটি দল জান্নাতে আর অন্য দল জাহান্নামে।” (সূরা আশ-শূরা: ৭)
মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্যের আসল জায়গা: কলব
মানুষ এবং পশুর মধ্যে বাহ্যিকভাবে অনেক মিল আছে। দু’জনেই খায়, ঘুমায়, দেখে, শোনে, হাঁটে। তাহলে প্রশ্ন আসে—মানুষকে মানুষ বানায় কী?
এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বুঝতে হবে, মানুষের দেহে এক বিশেষ অঙ্গ আছে, যার নাম কলব।
এই কলবই মানুষের শরীরের রাজার মতো।
কলব হলো মানুষের অস্তিত্বের রাজধানী।
এই কলবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার প্রকৃত মানুষ হওয়া না হওয়ার রহস্য।
পশুর মধ্যে কলব নেই।
যত বৈশিষ্ট্য পশুর আছে, তার সবই মানুষের মধ্যেও রয়েছে। কিন্তু কলব—এটি শুধু মানুষের আছে, পশুর নেই। তাই কলবহীন মানুষ, বাহ্যিকরূপে মানুষ হলেও, আসলে সে পশুরই মতো। কলবই মানুষ ও পশুর মাঝে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান সৃষ্টি করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণী
আমাদের প্রিয় নবী ﷺ হাদীসে বলেছেন : “নিশ্চয়ই মানুষের শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে, যদি তা ঠিক থাকে, তাহলে পুরো শরীর ঠিক থাকে; আর যদি তা নষ্ট হয়, তাহলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেটিই হলো কলব।” (বুখারী ও মুসলিম)
এই হাদীস আমাদের জানিয়ে দেয়, মানুষের আসল পরিচয় তার বাহ্যিক গঠন নয়, তার কলবে।
মানুষ দুই প্রকার
কলব যেহেতু মানুষের পরিচয় বহন করে, তাই মানুষেরাও দু’ধরনের:
প্রকৃত মানুষ—যার কলব জীবন্ত, আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয়ভীতিতে পূর্ণ।
মানুষ নামের পশু—যার কলব মরে গেছে, অথবা কলব থাকলেও তা নষ্ট হয়ে গেছে।
মানুষের কলবের (অন্তর) মধ্যে দুটি সম্ভাবনা থাকে—একটি হলো ভালো হওয়ার যোগ্যতা, আরেকটি হলো নষ্ট হওয়ার যোগ্যতা। যদি আমি আমার কলবের ভেতর আল্লাহ তাআলার মহব্বত সৃষ্টি করতে পারি, তাঁর প্রতি ভয় (খশিয়ত) ও ভক্তি যদি অন্তরে জন্ম নেয়,
তবে সেই কলব হবে পরিশুদ্ধ কলব,
আমি হবো একজন প্রকৃত মানুষ।
আল্লাহর মহব্বতের প্রভাব
যদি কলবে আল্লাহর মহব্বত সৃষ্টি হয়,
তাহলে সেই মহব্বতের কারণে ইবাদতের প্রতি স্বাভাবিকভাবে আগ্রহ জন্ম নেয়।
নামায সহজ হয়ে যায়
যিকির সহজ হয়
কুরআন তেলাওয়াত করতে ভালো লাগে
তাসবীহ-তাহলীল সহজ হয়
যাকাত দিতে মন চায়
রোযা রাখা সহজ হয়
সকল নফল ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
ফরয, নফল, সুন্নত, মুসতাহাব—সব ধরনের ইবাদত তখন আর কঠিন লাগে না।
বরং তা হয়ে ওঠে আত্মার প্রশান্তির উপায়।
আল্লাহর ভয় থাকলে গুনাহ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়
ঠিক তেমনি, যদি কলবে আল্লাহর ভয় (খশিয়ত) এবং লজ্জা সৃষ্টি হয়, তাহলে মানুষ গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
দৃষ্টি সংযত হয়
জবানের ব্যবহার শালীন হয়
কানের ব্যবহার সঠিক হয়
হাত-পা সঠিক কাজে ব্যবহৃত হয়
ক্ষমতা ও সম্পদের ব্যবহারও সঠিকভাবে হয়
যার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়, সে ব্যক্তি নিজের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করে।
এই দুই গুণ যার অন্তরে থাকবে, সে-ই হবে আসল মানুষ।
সুতরাং, যদি কলবে আল্লাহর মহব্বত সৃষ্টি হয়, তাহলে ইবাদত জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়। আর যদি আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়, তাহলে গুনাহ থেকে বাঁচা সহজ হয়।
এই দুই গুণ-মহব্বত ও খশিয়ত-যার কলবে থাকবে,
সে-ই হবে প্রকৃত মানুষ।
তার অন্তর হবে কলুষমুক্ত,
সে হবে কামেল ও পরিপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী।
দুনিয়ার মহব্বতের ভয়াবহ পরিণতি
কিন্তু যার কলব দুনিয়ার মোহে ভরে যায়—যেখানে সম্পদের লোভ, পদের লালসা, মর্যাদার অহংকার বাসা বাঁধে, সেই অন্তর ধীরে ধীরে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা মানুষকে অবৈধ পথে ঠেলে দেয়।
এমন ব্যক্তি বৈধ-অবৈধ বিচার করে না। সম্পদ অর্জনের জন্য চুরি, ডাকাতি, জেনা, সুদ, ঘুষ-সব কিছু করতে পারে। সে দুনিয়ার মোহে এমনভাবে ডুবে যায় যে, কোনো অন্যায় কাজেও তার বাধে না।
ইসলামী শিক্ষা কী শেখায়?
এখন প্রশ্ন হলো—ইসলামী শিক্ষা, কুরআনের শিক্ষা মানুষের মধ্যে কী সৃষ্টি করে? এ শিক্ষা কি মানুষের অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত সৃষ্টি করে? নাকি সৃষ্টি করে আল্লাহর মহব্বত? এ শিক্ষা কি মানুষের ভয় সৃষ্টি করে? না কি সৃষ্টি করে আল্লাহর ভয়?
নিশ্চয়ই কুরআনের শিক্ষা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। আল্লাহর ভয় অন্তরে বসিয়ে দেয় এবং মানুষকে বানায় একজন সত্যিকারের মানুষ।
এতটুকু বুঝে আসলে আরও কিছু কথা শোন। কোন শিক্ষা মানুষ গড়ে, আর কোন শিক্ষায় মানুষ বিলীন হয় । এই যে ইসলামী শিক্ষা, এই যে আল্লাহর পাঠানো কুরআনের শিক্ষা—তা মানুষের অন্তরে দুনিয়ার মোহ ও লোভ সৃষ্টি করে, নাকি সৃষ্টি করে আল্লাহর মহব্বত?  এই শিক্ষা কি মানুষের অন্তরে মানুষের ভয়, সমাজের চোখ, লোকলজ্জার ভয় সৃষ্টি করে,  নাকি আল্লাহর ভয়, আখেরাতের চিন্তা এবং রবের দরবারে দাঁড়ানোর আতঙ্ক সৃষ্টি করে?
তাহলে বুঝে নিতে হবে—কুরআনের শিক্ষাই মানুষকে আসল মানুষ বানায়। এই শিক্ষাই মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি করে আল্লাহর ভালোবাসা, আল্লাহর ভয় ও খশিয়ত এবং একজন মানুষের আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। যার অন্তরে এই দুই গুণ থাকবে—আল্লাহর মহব্বত ও আল্লাহর ভয়—তাকেই বলা হয় আসল মানুষ। এই হলো প্রকৃত সফলতা, এই হলো মানবিক উৎকর্ষের আসল মাপকাঠি।
অপরদিকে… যে শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে দুনিয়ার প্রতি মোহ, পদমর্যাদা ও সম্পদের প্রতি লোভ, খ্যাতি আর পার্থিব সফলতার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে, সে শিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না; বরং মানুষকে করে তোলে লোভী পশু, নফসের দাস।
আজকের বাস্তবতা—আমাদের দেশে রয়েছে দুই রকম শিক্ষা। একটি হলো: ইসলামী শিক্ষা, আরেকটি সেক্যুলার বা পার্থিব শিক্ষা—যা শুরু হয় প্রাইমারি স্কুল থেকে, গড়ায় কলেজ-ভার্সিটি পর্যন্ত। এই পার্থিব শিক্ষা একজন মানুষকে ডাক্তার বানাতে পারে। ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পারে। জজ, উকিল, ব্যারিস্টার, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী এমনকি দার্শনিকও বানাতে পারে। এই শিক্ষা দিয়ে মানুষ অর্জন করে ডিগ্রি, ডিপ্লোমা, প্রশংসাপত্র, পদবী। কিন্তু প্রশ্ন হলো,  এই শিক্ষা কি তাকে আল্লাহভীরু বানাতে পারে? এই শিক্ষা কি তার অন্তরে আখিরাতের চিন্তা জাগাতে পারে? না; বরং এই শিক্ষা শেখায়—কীভাবে টাকা উপার্জন করা যায়, কীভাবে উচ্চপদে আরোহণ করা যায়।”
একজন ডাক্তার লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে পড়াশোনা করে। সে কি মৃত্যুর পরের জীবনকে সুন্দর করার জন্য ডাক্তার হয়েছে? না, সে হয়েছে সম্পদের জন্য, দুনিয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য। ঠিক তেমনি—ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিস্টার, স্কলার—সবাই এই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসে কেবল দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে। এই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য—অর্থ উপার্জন এবং এরই মাধ্যমে অন্তরে জন্ম নেয় লোভ। এই লোভই মানুষকে করে তোলে অপরাধে অভ্যস্ত। এই শিক্ষার সাথে মানুষের হৃদয় বা কলবের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে নেই আখলাক গঠনের পাঠ, নেই আল্লাহভীরু বানানোর কোনো রোডম্যাপ; বরং এখানে মানুষ শিখে—কীভাবে বিতর্কে জয়ী হতে হয়, কীভাবে পয়সা উপার্জন হয়, কীভাবে অন্যকে নিচে নামাতে হয়।
তাই ভাবতে হবে—কোন শিক্ষা মানুষ গড়ে?  আর কোন শিক্ষায় মানুষ বিলীন হয়? সত্যিকার শিক্ষা—যা মানুষকে আল্লাহর বান্দা বানায়। যা মানুষকে গড়ে তোলে আলোকিত কলবের অধিকারী বান্দায়। যে শিক্ষা মানুষকে পশু নয়; বরং ফেরেশতার পথে নিয়ে যায়।
ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ও অন্তরের সংস্কার
যদি একটি দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়, তাহলে সমাজে আমূল পরিবর্তন আসবে। মানুষ মসজিদমুখী হবে, নামায ও দীনের দিকে ঝুঁকবে। তখন মানুষ চুরি করবে না, ডাকাতি করবে না, নিরপরাধকে জুলুম করবে না। কারণ সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সব পরিবর্তন মানুষের জীবনে কখন আসবে? কখন মানুষ সত্যিকারভাবে দীনের পথে আসবে?
মানুষ তখনই এসব পাপকর্ম থেকে ফিরে আসবে, যখন তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মুহাব্বত সৃষ্টি হবে। আল্লাহর ভয়, রাসূলের ভালোবাসা, আখিরাতের চিন্তা—এই গুণগুলো অন্তরে যতক্ষণ না গড়ে উঠবে, ততক্ষণ মানুষ বাহ্যিকভাবে ইসলামী শাসন দেখালেও প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।
এ কথা সত্য যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা যায়, কিন্তু মানুষের অন্তরকে পরিবর্তন করা যায় না। অন্তরের ভেতর আল্লাহর ভয়, মৃত্যু ও কবরের ভয়, কিয়ামতের ভয়, পুলসিরাতের ভয়, জান্নাতের আশায় ও জাহান্নামের আশঙ্কায় যখন মানুষ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নেবে, তবেই প্রকৃত ইসলামী সমাজ গঠন হবে।
সুতরাং, ইসলামী শাসনের পাশাপাশি দরকার ইসলামী শিক্ষা। এমন শিক্ষা—যা অন্তরে আল্লাহর ভয় ঢুকিয়ে দিতে পারে। এমন শিক্ষা—যা মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। কেননা, আসল পরিবর্তন আসে অন্তর থেকে। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মুহাব্বত সৃষ্টি করা যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ সত্যিকারের দুর্নীতি থেকে বাঁচতে পারবে না।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ