---

খারেজিদের আকীদা-বিশ্বাস ও বাড়াবাড়ি

খারেজিদেআকীদা-বিশ্বাস ও বাড়াবাড়ি

 

আবদুর রহমান আল-হাসান

 

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসের নিকৃষ্ট জাতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খারেজি সম্প্রদায়। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও মহামান্য ব্যক্তিদের অবজ্ঞা দ্বারাই তাদের সূচনা হয়। তাদের প্রতিটা বিষয় নিয়ে আমরা নিচে মূলকথা ও ব্যাখ্যাসহ আলোচনা করছি।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি

খারেজিদের ব্যাপারে একটা কথা চিরসত্য যে, তারা খুবই ইবাদাত বন্দেগি করে। সর্বক্ষণ খোদার স্মরণে মত্ত থাকে। কিন্তু তারা ইসলাম বা ধর্মকে বুঝেছে নিজেদের মন ও মত অনুযায়ী। তারা নিষিদ্ধ বিষয় থেকে খুবই দূরে থাকার চেষ্টা করে। স্বয়ং রসুল (সা.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন,

«يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِيْ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قِرَاءَتُكُمْ إِلَىٰ قِرَاءَتِهِمْ بِشَيْءٍ، وَلَا صَلَاتُكُمْ إِلَىٰ صَلَاتِهِمْ بِشَيْءٍ، وَلَا صِيَامُكُمْ إِلَىٰ صِيَامِهِمْ بِشَيْءٍ».

‘আমার উম্মতের মধ্য হতে এমন একটি দল বের হবে, তারা কুরআন পড়বে। তাদের কুরআন পাঠের তুলনায় তোমাদের কুরআন পাঠকে নগণ্য মনে হবে। তারা রোজা রাখবে। কিন্তু তাদের রোজার তুলনায় তোমাদের রোজা কিছুই না।’[1]

কিন্তু তারা এতটা ফরহেজগার হয়েও ইসলামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে লাগলো। তাদের মতের বাইরে কেউ গেলে তাদেরকে কাফের মনে করতো তারা।

দীন-ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা

খারেজিদের আরেকটি বড় অসুবিধা হচ্ছে, তারা কুরআন-সুন্নাহ বা হাদীস সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। তারা তাদের মনমতো ইসলামেকে বুঝতে চায়। শরীয়তকে তারা সঠিকরূপে মান্য করতে চায় না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রযি.) তাদেরকে সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীব হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তারা দীন ও ধর্মের বিধানগুলো না জেনেই আলী (রযি.)সহ বড় বড় সাহাবীদের কাজকে কুফরি আখ্যা দিয়ে তাদের কাফের বলেছিল।

মুসলিম খলীফাকে মানতে অস্বীকৃতি

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, খারেজিদের ভ্রষ্ট নীতিগুলোর অন্যতম হচ্ছে তারা হিদায়েত, ইসলামের ইমাম ও মুসলিম জামায়াতের ব্যাপারে বেইনসাফির আকীদা পোষণ করে থাকে। তারা রাফেজি ও অন্যান্য ভ্রষ্ট দলগুলো থেকে নিজের নীতিমালা গ্রহণ করে থাকে। তারা নিজের মতের বিরুদ্ধে গেলেই কুফরি বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। তারা আমিরুল মুমিনীন আলী (রযি.)-এর খেলাফত মানতে অস্বীকার করে এবং তাকে কাফের বলে।

পাপের কারণে কাফের ফাতওয়া দেয়া

ও মুসলমানদের রক্তকে বৈধ মনে করা

খারেজিরা কোনো পাপী ব্যক্তিকে সরাসরি কাফের বলে। সে তাকফীরের ভিত্তিতে মুসলমানদের জানমালকে বৈধ মনে করে। তাকফীর হচ্ছে, কোনো মুসলিমের ব্যাপারে কাফির ও মুরতাদ হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া।

তারা বিশ্বাস করে যে, মুসলিম খলীফার হাতে থাকা ভূখণ্ড কখনোই মুসলামনের নিজস্ব ভূখণ্ড নয়। অর্থাৎ তারা দারুল ইসলামকে দারুল হরব বলে থাকে। খারেজিরা সর্বদা মুসলিম জামায়াত হতে পৃথক থাকতে পছন্দ করে। তারা নিজেদের আকীদাকে একমাত্র আল্লাহর মনোনীত মনে করে। আল্লামা ইবনে কসীর (রহ.) বলেন, তারা নিজেদের ধর্মবিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে এতটা হীন যে, তাদের মতের বিরুদ্ধাচরণ করলে নারী-শিশুদের হত্যা করে। এমনকি তারা এটাকে বৈধ মনে করে। তাদের নিকট মুসলমানরা কাফের হওয়ার মূলনীতি হচ্ছে,

  1. যে ব্যক্তি ভুলে বা নিজের রায়ের মাধ্যমে কুরআনের বিরোধিতা করবে, সে কাফের।
  2. যে হযরত উসমান (রযি.) ও হযরত আলী (রযি.)-কে সমর্থন করবে, সেও কাফের। এমনকি যারা উপর্যুক্ত ব্যক্তিদেরকে কাফের বলে না, খারেজিদের দৃষ্টিতে তারাও কাফের।

রসুল (সা.)কে জালিম বলে আখ্যায়িত করা

খারেজিদের আকীদা বিশ্বাস এর আরেকটি হচ্ছে, রসুল (সা.) এর ব্যাপারে নিজেদের স্বাধীন ভেবে নিয়েছে। তারা বলে থাকে, নবীজি (সা.) জুলুম করেছেন (আল্লাহ আমাকে এমন বিশ্বাস থেকে হেফাজত করুন)। তারা রসুলের আনুগত্যকে ওয়াজিব মনে করে না। এমনকি তারা নবীজির হাদীসে বর্ণিত বিষয়কেও অস্বীকার করে। খারেজিরা মনে করে, রসুলের প্রয়োজন ছিল কুরআন নাজিলের জন্য। যেহেতু কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই এখন আর রসুলের প্রয়োজন নেই। তারা কুরআন না থাকা মাসআলার ক্ষেত্রে হাদীস থেকে গ্রহণ না করে নিজেদের মনমতো আমল করে।

দোষচর্চা করা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করা

খারেজিরা মুসলিম খলীফাদের ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে। তারা বলে, এসকল মুসলিম খলীফারা হিদায়েতের পথ থেকে দূরে সরে গেছেন।

কুধারণা পোষণ করা

রসুল (সা.)-এর ওপর খারেজিদের পূর্বপুরুষ যুলখুয়াইসারার মতো মূর্খ আপত্তি তুলেছে। সেই মোতাবেক তারাও বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি তুলে। হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ وَهُوَ يَقْسِمُ قَسْمًا أَتَاهُ ذُو الْـخُوَيْصِرَةِ، وَهُوَ رَجُلٌ مِنْ بَنِيْ تَمِيْمٍ، فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! اعْدِلْ، فَقَالَ: «وَيْلَكَ، وَمَنْ يَعْدِلُ إِذَا لَـمْ أَعْدِلْ، قَدْ خِبْتَ وَخَسِرْتَ، إِنْ لَـمْ أَكُنْ أَعْدِلُ»، فَقَالَ عُمَرُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! ائْذَنْ لِيْ فِيْهِ، فَأَضْرِبَ عُنُقَهُ، فَقَالَ: «دَعْهُ فَإِنَّ لَهُ أَصْحَابًا يَحْقِرُ أَحَدُكُمْ صَلَاتَهُ مَعَ صَلَاتِهِمْ، وَصِيَامَهُ مَعَ صِيَامِهِمْ، يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ، يَمْرُقُوْنَ مِنَ الدِّيْنِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ».

‘আমরা আল্লাহর রসুল (সা.)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি কিছু গনীমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন বনি তামীম গোত্রের যুলখুয়াইসারা নামে এক ব্যক্তি এসে হাজির হল এবং বলল, হে আল্লাহর রসুল! আপনি ইনসাফ করুন। নবীজি বললেন, ‘তোমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি ইনসাফ না করি, তবে ইনসাফ করবে কে? আমি তো নিষ্ফল ও ক্ষতিগ্রস্ত হব যদি আমি ইনসাফ না করি।’ হযরত ওমর (রযি.) বললেন, হে আল্লাহর রসুল! আমাকে অনুমতি দিন আমি এর গর্দান উড়িয়ে দিই। তিনি বললেন, ‘একে ছেড়ে দাও। তার এমন কিছু সঙ্গীসাথি রয়েছে তোমাদের কেউ তাদের সালাতের তুলনায় নিজের সালাত এবং সিয়াম নগণ্য বলে মনে করবে। এরা কুরআন পাঠ করে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালীর নীচে প্রবেশ করে না। তারা দীন হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর ধনুক হতে বেরিয়ে যায়।”[2]

মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরমপন্থা অবলম্বন

তারা মুসলমানদের জান-মালকে বৈধ মনে করে। তারা মুসলমানদের হত্যা করা সওয়াবের বিষয় ভেবে থাকে। এমনকি তারা মুসলমানদের শত্রুদের সাহায্য করতে একটুও ভাবে না।

হক্কানি আলেমদের প্রতি বিষোদ্‌গার

খারেজিরা কোনো আলেম বা ইসলাম সম্পর্কে ধারণা রাখে, এমন ব্যক্তিদের পছন্দ করে না। তারা তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করে থাকে। তাদের এসব কর্মকাণ্ডে অমুসলিমরা আরও উৎসাহ পায়। ফলে সাধারণ মুসলমানরাও কখনো কখনো এমন কাজের কারণে ধোঁকা খায়। ইমাম ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, শরীয়ত, ইতিহাস ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এ ব্যাপারে সম্যক অবগত যে, সকল মর্যাদাবান ব্যক্তি ইসলামের জন্য উত্তম কীর্তি রেখে গেছেন, সুনাম অর্জন করেছেন। এরপরও তাদের কিছু কিছু ভুল হয়েছে। সেগুলোকে আমরা অপারগ বলে ধরে নিয়ে তাদের জন্য আজর বা পরকালে প্রতিদানের আশা রাখতে হবে। কিন্তু খারেজিরা তাদেরকে পুরোপুরি পথভ্রষ্ট ও কাফের বলে থাকে।

তথ্যসূত্র

খারেজি: ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী, পৃ. ৫৭-১২৭

[1] মুসলিম, আস-সহীহ, দারু ইয়াহইয়ায়িত তুরাস আল-আরবী, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৩৭৪ হি. = ১৯৫৫ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৭৪৮, হাদীস: ১৫৬৬

[2] আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত লিত-তাবাআ ওয়ান নাশর ওয়াত তাওযী’, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৪, পৃ. ২০০, হাদীস: ৩৬১০

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ