ইসরায়েল রাষ্ট্র কি ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে?
মাসুম খলিলী
লেখক: প্রখ্যাত সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষক
কয়েক মাস আগে এ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন সবেমাত্র ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিচারিক সংস্কার বিলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ধূমায়িত হতে শুরু করেছিল। এখন বিলটি পাসের জন্য উত্থাপনের সময় দেশটির পাঁচজন সাবেক গোয়েন্দা প্রধান, তিনজন সাবেক সেনাপ্রধান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিচারবিভাগকে সংসদের অধীনে আনার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ইসরায়েল ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে পারে। এ বক্তব্যের সাথে একই সুরে কথা বলছেন বেশ কজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
বিরোধী জোট ও নাগরিক সমাজের ডাকে তেলআবিবসহ সারা দেশে নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রিজার্ভ ফোর্স বলেছে এই বিল পাস হলে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের ডাকে তারা সাড়া দেবে না। পাইলটরা বিমান না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে নেতানিয়াহু হার্টের বিপত্তি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সৃষ্ট অচলায়তনে প্রেসিডেন্ট ১৫ মাসের জন্য বিল পাসের প্রক্রিয়া স্থগিত করার আপস প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু নেতানিয়াহু চাইছেন যেভাবে হোক এই বিল পাস করতে। এটি পাস না করলে আদালতকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। এর ফলে তিনি দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারাতে পারেন। এজন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশেষত সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে টার্গেট করেছেন।
এক টুইটে তিনি বলেছেন, ‘আমরা যা জেনেছি তার প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে—এহুদ বারাক ইসরায়েলি সমাজকে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যান, নাগরিক বিদ্রোহ এবং ইসরায়েলি সমাজগোষ্ঠীগুলিকে বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে ইসরায়েলি সমাজকে ভেঙে ফেলার লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা এবং এ ব্যাপারে প্রচার করার জন্য বছরের পর বছর ধরে কাজ করেছিলেন। তিনি সবই করছেন প্রধানমন্ত্রীর পদে ফিরে আসার জন্য যেখান থেকে তাকে ইসরায়েলের নাগরিকরা বহিষ্কার করেছিলেন।’
নেতানিয়াহু বলছেন, ‘এহুদ বারাক তিন বছর আগে ক্যামেরার সামনে তার মাস্টার প্ল্যানের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক স্থাপনায় আগুন লাগানো। গণতন্ত্রের জন্য বিপদের একটি মিথ্যা উপস্থাপনা তৈরি করা যাতে এটি কার্যকর হয়, এটি সবার সাথে কথা বলে, এটি আকর্ষণীয় হয় এবং এটিই একমাত্র জ্বালানি হয় যা একটি গৃহযুদ্ধকে প্রজ্বলিত করতে পারে। এজন্য পাইকারিভাবে পতাকা কেনাসহ এতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য অর্জনে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে হবে যেখানে নদীতে অন্য ইহুদিদের দ্বারা জবাই করা ইহুদিদের ভাসমান লাশ থাকবে। এভাবে নেতানিয়াহুকে বহিষ্কার করতে হবে এবং এহুদ বারাককে প্রধানমন্ত্রী করতে হবে কারণ শুধুমাত্র তিনিই এ পরিস্থিতিতে দেশকে রক্ষা করতে পারেন।’
নেতানিয়াহু টুইটে আরও বলছেন, ”যখন এহুদ বারাক এই পরিকল্পনাটি ভাগ করেছিলেন, তখন কোনো সংস্কার ছিল না, ইয়ারিভ লেভিন বিচারমন্ত্রী ছিলেন না, রটম্যান ছিলেন মোটামুটি বেনামি লোক, বেন গাবির সরকারে বসেননি এবং যুক্তিসংগততার কারণ নেসেটে ভোটের জন্য ছিল না। আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে এই হিংস্র, বিরক্তিকর এবং যন্ত্রণাদায়ক জেনারেলের আসল শিকার কে।’
নেতানিয়াহুর এই যন্ত্রণা ভরা আকুতিকে তার কট্টর ডান সমর্থক ছাড়া কেউ বিশ্বাস করছেন না।
একশজন সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক এক পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন গতকাল রবিবার, যাতে বলা হয় যে বিচার বিভাগীয় সংস্কার পরিকল্পনা ‘(ইসরায়েলের) আন্তর্জাতিক অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করছে।’
কূটনীতিকরা বলেছেন, ‘আমরা বিশেষত আমাদের সেরা বন্ধু ও মিত্র এবং বিশ্বে ইসরায়েলের একমাত্র কৌশলগত সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খোলাখুলি ফাটল নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইসরায়েল একটি গণতন্ত্রের জন্য জন্ম হয়েছিল এবং এটি মুক্ত গণতান্ত্রিক বিশ্বের অন্তর্গত শুধুমাত্র জনগণের চেতনা এবং তাদের ইচ্ছাকে প্রকাশ করে না বরং এটির নিরাপত্তা, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক সক্ষমতার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান।’
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বিশিষ্ট সাবেক কূটনীতিক যেমন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও শ্রম এম কে কোলেট অ্যাভিটাল, জার্মানিতে সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরেমি ইসাচারফ, বিডিএসপন্থী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক অ্যালন লিয়েল, ফ্রান্সের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেক, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক উপপ্রধান এবং ইরান ইউনিভার্সিটির সাবেক সদস্য ইরান শেক প্রমুখ রয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত আর্থার লেনক টুইট করেছেন যে চিঠিতে নেতানিয়াহুকে ‘ইসরায়েলের গণতন্ত্র এবং আমাদের ভাগ করা মূল্যবোধ এবং আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাথে অত্যাবশ্যক সম্পর্ক রক্ষার জন্য বিচারিক আইন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।’
ভারতে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল কারমন টুইট করেছেন যে, ‘আমি যে গর্বের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, আর্জেন্টিনায়, জাতিসংঘে এবং ভারতে ইসরায়েলের সমস্ত সরকারকে প্রতিনিধিত্ব করেছি, আমি গর্বিত এ সিনিয়র কূটনীতিকদের এ গোষ্ঠীর অংশ হতে পেরে যারা এ উন্মাদ চরমপন্থার অধীনে দেশের ভাগ্যের জন্য ভয় পান।’
নেতানিয়াহু এখন এক ভয়ংকর ডিলেমার মুখোমুখি। একদিকে পদ হারানোর আশঙ্কা অন্য দিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংকটে পড়ার ভয়। সত্যি কি ভেতর থেকে ক্ষয় হতে শুরু করেছে ইসরায়েলের? নজিরবিহীন জুলুমের অলৌকিক প্রতিকার আসতে শুরু করেছে?