---

প্রসঙ্গ নব্য খারেজি চিন্তাধারার বিকাশ: ধন্যবাদ প্রফেসর ড. আহমদ আলী স্যারকে

প্রসঙ্গ নব্য খারেজি চিন্তাধারার বিকাশ:

ধন্যবাদ প্রফেসর ড. আহমদ আলী স্যারকে

 

মুহাম্মদ ইসমাইল বোখারী

        লেখক: বিশিষ্ট অনুবাদক, লেখক ও গবেষক

 

মাসিক আত-তাওহীদ নামটি শুনলেই স্মৃতির মিনারায় পত পত করে উড়তে থাকে নব্বই দশকের কিছু সুখস্মৃতি। তখন আমি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া মোজাহেরুল উলুমে অধ্যয়নরত। এ সময় পড়াশুনার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের অগোচরে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলাম। মূলত এই রাজনৈতিক চেতনা বা মদমত্ততা থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে খানিকটা মিতালি ও সখ্য গড়ে ওঠে তখন। কথাটা বললাম এই কারণে যে, তখনও কওমি মাদরাসায় আজকের মতো বাংলা ভাষা চর্চার রেওয়াজ গড়ে ওঠেনি।

সে যাই হোক, সাহিত্যের বাহন তথা পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাময়িকী-বুলেটিন এসব মানুষের আত্মার খোরাক জোগায়। মানবীয় সুকুমারবৃত্তির পরিপুষ্টি সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জ্ঞানরাজ্য ও চিন্তার পরিধিকে ঋদ্ধ করে। করে প্রশস্ত ও সমৃদ্ধ। একজন মানুষকে মানবিক গুণাবলিতে গড়ে উঠতে দারুণ সহায়তা করে সাহিত্য।

জীবনের এই ঊষালগ্নে যেসব পত্রপত্রিকা ও সাহিত্য-সাময়িকী আমাদের মনমগজকে আলোড়িত করে, আমাদের চিন্তার সাগরে প্রবল ঢেউ তুলে, আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ার মুখপত্র মাসিক আত-তাওহীদ তার অন্যতম। পাশাপাশি মাসিক মদীনা, মাসিক জাগো মুজাহিদ, মাসিক আদর্শ নারী, মাসিক নিউজ লেটারে, দৈনিক ইনকিলাব, সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান, সাপ্তাহিক বিক্রম, সাপ্তাহিক পালাবদল এসবের নাম তো অবশ্যই করতে হয়।

মাসিক আত-তাওহীদের প্রায় সংখ্যা তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। অপরকে পড়তে উৎসাহ দিতাম। শুধুমাত্র মাসিক আত-তাওহীদের সময়োপযোগী লেখাগুলোর সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দিতে কিংবা বাংলা সাহিত্যের প্রতি বন্ধুবান্ধবদের অনুরাগী করে তুলতে এ পত্রিকার এজেন্সিও নিয়েছিলাম কিছুদিন। তখন অবশ্য মাসিক আত-তাওহীদ ধর্মের নামে গজিয়ে ওঠা নানাবিধ ফিতনা ও বাতিল মতবাদসমূহের মুখোশ উন্মোচনেও সোচ্চার ভূমিকা পালন করতো। তখনকার নিয়মিত লেখক অধ্যাপক আ ফ ম খালিদ হোসেন, মাওলানা গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী, মাওলানা নুরুল কবির আনসারী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান আল আজহারী, হাফেজ গোলাম মাবুদ, মাওলানা নাসির বিন আছগর, কবি আবদুল হালীম খাঁ, আবদুল গনী খান সাহিত্যবিশারদ প্রমুখের লেখা এখনও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। এ সময় পাঠকের পাতায় আমার একখানা প্রতিক্রিয়াও ছাপা হয়েছিল।

কালের পরিক্রমায় সময় বদলেছে। রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। সবচেয়ে বড় কথা, জীবনযুদ্ধের ব্যস্ততা ও কঠিন তা দুটোই বেড়েছে। এখন আর পত্রপত্রিকা পড়া হয় না। বইপত্র কেনা হয় না। এমনকি শোনা হয় না আগের মতো এফএম রেডিওর সংবাদ ও সংবাদ বুলেটিনও। খুব বেশি হলে শিরোনামেই নজর বুলানো পর্যন্তই।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। মাসিক আত-তাওহীদের মে-জুন সংখ্যা চোখে পড়তেই পাতা উলটাতে শুরু করলাম। শুরুতেই চোখ আটকে গেলো বিদগ্ধ লেখক, আদর্শ শিক্ষাবিদ, চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদরাসার প্রাক্তন মুহাদ্দিস ও বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রফেসর ড. আহমদ আলী স্যারের লেখা ‘নব্য খারেজি চিন্তাধারার বিকাশ’ এ শিরোনামে। নিমিষেই লেখাটা পড়ে ফেললাম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্যার কলম ধরেছেন। বিষয়টি স্পর্শকাতরও বটে। এক্ষেত্রে তিনি দুর্দান্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন বলা যায়। কেননা, গোটা মুসলিম উম্মাহ আজ এ সমস্যায় জর্জরিত। বাংলাদেশের ইসলামী অঙ্গনও আজ এ ভাইরাসে আক্রান্ত। এদেশের খালেস ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহও আজ এই নব্য খারেজি ফিতনায় টালমাটাল। অস্থির। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যারা এ ফিতনার সরাসরি ভিকটিম তারা কিন্তু এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। প্রকাশ্যে কথা বলছেন না। এর পেছনে অবশ্য ভিন্ন কারণ রয়েছে।

এখানে প্রসঙ্গত প্রাচীন খারেজি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে হয়। হাদীসের ভাষ্য মতে খারেজি হচ্ছে, যারা গুনাহের কারণে মুসলমানকে কাফের মনে করে। মুসলিম শাসক ও সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এরা হবে নবীন, তরুণ ও কমবয়সী, তবে নির্বোধ। তাদের মাঝে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও হেকমতের কমতি থাকবে। কাফের, মুশরিক ও বিধর্মীদের বাদ দিয়ে এরা মুসলমানদের হত্যা করবে। তারা আলেমবিদ্বেষী হবে। তাদের আদব জ্ঞান থাকবে না। যার তার ভুল ধরবে। আহলে হক তথা হযরত আলী (রযি.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রযি.)-এর বিরোধিতা করবে। ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে কঠোরতা আরোপ করবে। ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করবে। কুরআনের যেসব আয়াত কাফেরদের সম্পর্কে অবতীর্ণ তারা সেগুলোকে মুসলমানদের ওপর প্রয়োগ করবে।

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা মুসলমানদের হত্যা করবে, পক্ষান্তরে কাফের-মুশরিকদের ছেড়ে কথা বলবে। (মজমূউল ফাতাওয়া)

ড. নাসিরুদ্দীন আল-বাকল বলেন, খারেজি নামটি পূর্বসূরি খারেজিদের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনিভাবে যাদের মধ্যে প্রাচীন খারেজিদের আকিদা-বিশ্বাস পাওয়া যাবে তাদের ক্ষেত্রেও উক্ত নামটি সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।

প্রফেসর ড. আহমদ আলী স্যারের মতে, উপনিবেশোত্তর মুসলিমবিশ্বে দুটি পরিবর্তন ঘটে। ১. দেশে দেশে ইসলামী জাগরণ। ২. উক্ত ইসলামী জাগরণ ঠেকাতে কাফের-মুশরিক ও নাস্তিক্যবাদীদের হরেকরকমের কূটকৌশল ও নানামুখী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র। এ দুটির সমন্বিত পরিণামেই বিভিন্ন মুসলিম দেশে দেশে নব্য খারেজিদের উদ্ভব ঘটে। স্যার তাঁর মূল্যবান নিবন্ধে নব্য খারেজিদের কিছু বৈশিষ্ট্যও উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য থেকে কিছু বৈশিষ্ট্য অতিসংক্ষেপে এখানে তুলে ধরছি,

  1. ইসলামী আইনে বিচার-আচার না করার কারণে এরা মুসলিম শাসকদের কাফের ও মুরতাদ মনে করে।
  2. যারা জালিম ও পাপিষ্ঠ সরকারের আনুগত্য করে তাদেরকেও কাফের ও মুরতাদ মনে করে। এভাবে তারা মূলত রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীকেই অনায়াসে কাফের আখ্যায়িত করে।
  3. সাহাবীগণ থেকে শুরু করে পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম প্রজন্মকে তারা ইসলাম থেকে বিচ্যুত মনে করে। কেননা, তারা নাকি সঠিক ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে তাগুতি রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে আপস করে চলেছেন।
  4. তারা আলেমগণের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। অধিকাংশ আলেমকে তারা আব্রাহামবাদের দালাল, জালেমের সঙ্গে আপসকামী, তাগুতের অনুসারী এসব বলে জর্জরিত করে।
  5. তারা দাবি করে, কেবল জামায়াত ও বায়আতের মাধ্যমেই একজন মুসলমানকে অমুসলিম থেকে আলাদা করা যাবে। অথচ এটা ঈমান ও ইসলামের মৌলিক কোনো চিহ্ন নয়।
  6. এরা জালিম ও ফাসিক শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে ফরজে আইন মনে করে। এটাকে প্রথম ফরজ বলে অভিহিত করে। তাদের ভাষায় তা করতে গিয়ে অন্য কোনো ফরজ ছুটে গেলেও সমস্যা নেই। এগুলো ছোট ফরজ।

স্যারের উল্লিখিত বিষয়গুলো নব্য খারেজিদের আলামত হলে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। কারণ বিপুলসংখ্যক নবীন ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এ নব্য খারেজিদের সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আজ এমন উঠতি বয়সি তরুণের অভাব নেই, যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়ায় যুক্ত না থেকেও যখন তখন জিহাদের বুলি আওড়ায়। সামান্য মতের অমিল হলেই এরা প্রতিপক্ষকে নাস্তিক, মুরতাদ, তাগুত, দালাল ইত্যাদি বলতে দ্বিধা করছে না। এরা পূর্বসূরি বুজুর্গদের অনুসরণকে ‘আকাবির-পূজা’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলার পথ খুলে দিচ্ছে। কোনো একজন আলেমের কোনো একটি দিক অপছন্দ হলেই তার বিরুদ্ধে সিরিজ অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। দ্বীন কায়েমের কোনো প্রক্রিয়ায় যুক্ত না হয়েও এরা হরদম গণতন্ত্র, নির্বাচন, ইসলামী রাজনীতি এসবের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। এসবকে দেদারসে কুফরি কুফরি বলে অহেতুক হৈচৈ করে। এমনিভাবে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, দলে দলে, প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে দ্বন্দ্ব তৈরি করে একটা অরাজক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে গোটা আলেম সমাজকে। এরা সবসময় চায় ওলামায়ে কেরামকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে। এমনিভাবে নব্য খারেজিরা প্রাচীন খারেজিদের ন্যায় এখনো মুসলমানদের রক্ত ঝরাচ্ছে দেশে দেশে। তাদের পবিত্র স্থাপনাসমূহ ধ্বংস করছে। তাদের সহায়-সম্পদ নষ্ট করছে। নিকট অতীতের আইএস ও জেএমবির নানা তৎপরতা বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার হয়ে যায়।

এ উগ্রতা ও চরমপন্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর দিক হচ্ছে, এতে করে বিধর্মীদের মনে ইসলামভীতি তৈরি হচ্ছে। ইসলামবিদ্বেষীরা সুযোগ নিচ্ছে। তাদেরই তৈরি নানান জঙ্গিগোষ্ঠীকে হাইলাইট করে পশ্চিমারা ইসলামের নবজাগরণকে ঠেকিয়ে দিতে চাচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মুসলমানদের মন-মানসে ইসলামের উদারতা ও মানবিক দিক নিয়ে চরম সন্দেহের উদ্রেক করছে। অতএব ইসলামী শিক্ষার সুষ্ঠু ধারা অব্যাহত রাখতে হলে এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে প্রফেসর ড. আহমদ আলী স্যারের লেখাটির বহুল প্রচার কামনা করছি। স্যারকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ