বুধবার-৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধার্মিক কী ‘মুক্তমনা’হতে পারে?

ধার্মিক কী ‘মুক্তমনা’হতে পারে?

ধার্মিক কী ‘মুক্তমনা’হতে পারে?

এম আহমদ

ধার্মিক কি মুক্তমনা হতে পারে? না। মুক্তমনার দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি আল্লাহতে বিশ্বাস করবে সে মুক্তমনা হতে পারবে না। কেন? এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে মুক্তমনা যে যুক্তির কসরত করে, (হাসি সম্বরণ করে) সেই কসরত দেখা যাক। এই ‘যুক্তি’ মুক্তমনা সাইটের পরিচিতি থেকে গৃহীত। বিষয়টি স্পষ্ট করতে স্কয়ার বন্ধনীর ভিতরে আমার নিজের কথা সংযোগ করেছি ও আন্ডারলাইনিং ব্যবহার করেছি।

‘কোন ধার্মিক যদি মুক্তমনে তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তবে তাঁর নিজেকে মুক্তমনা বলতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু [এখান থেকে যুক্তিবাদীর কুযুক্তি শুরু হবে, লক্ষ্য করুন] অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা তা না করে [অন্যদের ওপর নিজ ধারণার প্রক্ষেপণ লক্ষণীয়, এটা তার অপিনিয়ন] নিজের ধর্মটিকেই আরাধ্য মনে করেন, কোন কিছু চিন্তা না করেই [কোন চিন্তা-ভাবনা না করেই? কীরে পণ্ডিত! আর কোন কিছুকে আরাধ্য ভাবতে সমস্যা কোন্ যুক্তিতে?] নিজের ধর্মগ্রন্থকে ‘ঈশ্বর-প্রেরিত’ বলে ভেবে নেন [তার এই ভেবে নেয়াতে কোন চিন্তা-ভাবনা নেই? সে যে যৌক্তিক, ভাষিক ও দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা অতিক্রম করে আসেনি এই বাস্তবতা সে উড়িয়ে দেয় কীভাবে? আবার সবাই কি তথাকথিত মুক্তমনার পথ ধরেই হাঁটতে হবে, এটা কীসের যুক্তি, এটা কার মস্তিষ্কের উর্বরতার কারণে ‘ফরজ’ হয়?]। স্রেফ [স্রেফ?] ঘটনাচক্রে পৈত্রিক-সূত্রে পাওয়া [পৈত্রিক সূত্রে পেলেই কি তা বর্জনীয় হতে হবে?] যে ধর্মটিকে ‘নিজের’ বলে মনে করেন সেটাকেই ঈশ্বরের মনোনীত একমাত্র ধর্ম বলে বিশ্বাস করেন। আমাদের মতে [অর্থাৎ এই নাস্তিক-গ্রুপের মতে] কোন ব্যক্তি শুধুমাত্র শোনা [শুধুমাত্র শোনা কথা? আরোপিত ধারণা] কথার ভিত্তিতে বাইবেল, কোরান বা বেদকে অন্ধভাবে [অন্ধভাবে!] অনুসরণ করে, বা নবী-রসুল-পয়গম্বর-মেসীয়তে বিশ্বাস করে নিজেকে কখনোই ‘ফ্রি থিঙ্কার’ বা মুক্তমনা বলে দাবি করতে পারেন না। [কিন্তু অন্ধভাবে খোদা-নাই বললে সে মুক্তমনাই থেকে যাবে?] মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে।’ [১]

এই প্যারাগ্রাফটি মুক্তমনাদের যুক্তির একটা নমুনা হিসেবে নেয়া যেতে পারে। প্রথমে ‘কোন ধার্মিক যদি মুক্তমনে তাঁর ধর্মবিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তবে তাঁর নিজেকে মুক্তমনা বলতে আপত্তি থাকার কথা নয়’ কিন্তু ‘মুক্তমনাদের আস্থা তাই বিশ্বাসে নয়, বরং যুক্তিতে।’ একজন যুক্তিবাদী কিভাবে এই প্যারাগ্রাফ তৈরি করতে পারে এবং নিজের যৌক্তিক দুর্বলতা দেখতে পায়না, সেটাই হয় যৌক্তিক প্রশ্ন। এত ধানাই পানাই কেন? এক ব্যক্তি তার বিশ্বাসের যৌক্তিক justification কার কাছ থেকে গ্রহণ করবে? (প্রোপাগাণ্ডিস্ট ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকদের কাছ থেকে?) বড় বড় দার্শনিকদের অনেকে বিশ্বাসী ছিলেন এবং অনেকে ছিলেন না। এই justification– এর জন্য কি কোনো স্ট্যান্ডার্ড অথোরিটি রয়েছে যে এর মধ্যে arbitration করবেন, না উপরের বাক্যটি যে মুক্তমনা তৈরি করেছেন তার ‘যুক্তিই’ হবে শেষ কথা? এই প্যারাগ্রাফে উগ্র নাস্তিকরা যে অন্ধমনা, মৌলবাদী এবং ধাপ্পাবাজ তা নিজেরাই প্রমাণ করে।

এই তথাকথিত মুক্তমনাদের দৃষ্টিতে আজন্ম লালিত ধর্মীয় ও সামাজিক বিবর্তনমূলক সকল সংস্কৃতি ‘অপসংস্কৃতি’। তাদের জিহাদও তাদেরই যুক্তিপ্রসূত অপসংস্কৃতির’ বিরুদ্ধে!

এখানেও তারা অপরের সংস্কৃতিকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলছে, ইতিবাচক শব্দ তাদের, এবং নেতিবাচক শব্দ ওদের। এবারেই হয়ত স্পষ্ট যে কেন তারা নিজেদের জন্য এক শব্দ-শ্রেণি ব্যবহার করে এবং প্রতিপক্ষের জন্য আরেক ধরণের শব্দ-শ্রেণি (নিজেরা মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনষ্ক ইত্যাদি আর প্রতিপক্ষ ধর্মান্ধ, যুক্তিহীন, বিজ্ঞানবিমুখ) ব্যবহার করে। এটাই তাদের নতুন ধর্ম। এই ধর্ম এতই অন্তঃসারশূন্য যে অপরের বিপক্ষে প্রোপাগাণ্ডা ছাড়া নিজের ধর্মে এমন কিছু নেই যা দিয়ে তাদের প্রচারণা কার্য চালাতে পারে।

মুক্তমনারা কি ধর্ম বিরোধী?

মুক্তমনাদের ধাপ্পাবাজির নমুনা আরেকটি প্যারাগ্রাফ থেকে নেয়া যাক। এখানেও তাদের শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন ও প্যারাগ্রাফের প্রথমাংশ, মধ্যাংশ এবং শেষাংশের দিকে কী হচ্ছে তা খেয়ালে রাখবেন। আগের মতো, স্কয়ার বন্ধনীর ভিতরের কথা এবং বোল্ডিং ও আন্ডারলাইনিং আমার।

মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয়, বলা যায় অনেক মুক্তমনাই ধর্মের কঠোর সমালোচক। কারণ তাঁরা মনে করেন ধর্ম জিনিসটা পুরোটাই মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মুক্তমনারা সর্বদা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির [বরংselected সপ্ত/অষ্টাদশ শতাব্দীর দৃষ্টিভঙ্গি!] প্রতি আস্থাশীল, আজন্ম লালিত কুসংস্কারে নয়। কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার [আগের আন্ডারলানিংটা স্মরণ করুন এবং হাসি সামলিয়ে পরেরপ্রোপাগাণ্ডামূলক বাক্য রচনা দেখুন!] একটা বড় কারণ হল, ধর্মগুলোর মধ্যে বিরাজমান নিষ্ঠুরতা। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন আয়াত এবং শ্লোকে বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে ঢালাওভাবে, কখনো দেয়া হয়েছে হত্যার নির্দেশ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্ম আসলে জিহাদ, দাসত্ব, জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, হোমোফোবিয়া, অসহিষ্ণুতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতন এবং সমঅধিকার হরণের মূল চাবিকাঠি হিসেবে প্রতিটি যুগেই ব্যবহৃত হয়েছে।

‘মুক্ত-মনারা ধর্ম-বিরোধী নয় তবে মুক্তমনাদের ধর্ম-বিরোধী হওয়ার’ কারণ আছে। কেননা ধর্ম মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত, ধর্ম কুসংস্কার, আর মুক্তমনারা ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির’ অধিকারী! নিজেদের ব্যাপারে সুন্দর সুন্দর বাক্য রচনা, ইতিবাচক শব্দ চয়ন এবং প্রতিপক্ষের ব্যাপারে বিপরীত ধরণের বাক্য ও শব্দ নির্বাচন – এগুলো হচ্ছে এই ধাপ্পাবাজদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। যারা একটি প্যারাগ্রাফের সীমানায় যুক্তি টিকিয়ে রাখতে পারে না, তারাই অপরকে যুক্তি শিখাতে চায়, যে নিজেই বিদ্বেষ ছড়ায় সে’ই আবার অপরের বিদ্বেষ নিয়ে সংগীত রচনা করে, নিজের prejudice অন্যের ওপর ধারণ করে। এটাই হচ্ছে উগ্রপন্থি নাস্তিকদের আলোকিত পথ, এনলাইটনম্যান্ট।

মানবজাতির ইতিহাসে মানুষ অনেক পথ অতিক্রম করেছে এবং এখনো করছে। অতীতে যেমন মানুষে মানুষে হানাহানি করেছে, তেমনি আজও করছে। আগেও যুদ্ধ হয়েছে, এখনো হয়। সকল দ্বন্দ্ব সংঘাতে অনেক ধরণের উপাদান কাজ করতে দেখা যায়। এসবের মধ্যে স্থানভেদে ধর্মও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাতে মানুষের লোভ-লালসা, তাদের প্রকৃতিজাত হিংগ্রতা, আমিত্বের-প্রভাব, সমঝের ভিন্নতা, গোত্রীয় স্বার্থ, রাজকীয় স্বার্থ, রাজ্য বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদি অনেক কিছু কাজ করত এবং এখনো করে। কিন্তু ধাপ্পাবাজ অজ্ঞতাবশত অথবা তার নিজ নাস্তিকধর্ম প্রচারের জন্য দুনিয়ার (অতীত-বর্তমানের) সব দাঙ্গা-হাঙ্গামাকে ধর্মের সাথে সংযুক্ত করে, এবং জোড়াতালি দিয়ে ধর্মের বিপক্ষে প্রোপাগাণ্ডা করে। মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের স্থানে আক্রমণ করে।

কোনো নাস্তিক ব্যক্তি যদি ভাবে যে ‘কুসংস্কারের কাছে আত্মসমর্পণ আসলে নিজের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়’, তবে এটা তার নিজের বেলায় গ্রহণ করাতে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু তার নিজ ব্যাখ্যার আলোকে অপরের বিশ্বাস ও প্রথাকে অপসংস্কৃতি সাব্যস্ত করে, তাদের ওপর চড়াও হওয়া সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না, এই অধিকার তার নেই। আবার এক ব্যক্তি যদি তার নিজ অযৌক্তিকতাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে, তবে সে স্বাধীনতা তার আছে, কিন্তু অন্যের ওপর চড়াও হওয়ার স্বাধীনতা নেই। এটা সভ্য নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে। উগ্র-নাস্তিকতাকে এক ধরণের হিটলার-মানসিকতার সাথে তুলনা করলে হয়ত অত্যুক্তি হবে না। প্রয়াত মিলিট্যান্ট নাস্তিক হিটচিন ছিলেন ইরাক আক্রমণের প্রবক্তা, সাম হারিস শুধু সে যুদ্ধের পক্ষেরই নন বরং বোমা ফুটিয়ে গোটা আরব-ভূখণ্ডের সকল আরব মুসলমানদেরকে উড়িয়ে দেয়ার পক্ষেও। এই হচ্ছে তাদের মানসিকতা।

ওদের যুদ্ধ, ওদের প্রোপাগাণ্ডা, ওদের মিথ্যাচার হচ্ছে ধর্মের বিরুদ্ধে এটা তাদের নিজ কথাতেই প্রতিষ্ঠিত। তাদের থলের বিড়ালটি তারা বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারেন না। তাদের প্যারাগ্রাফের শুরুতে এককথা, মধ্যখানে এককথা এবং শেষাংশে আরেক কথা কিন্তু তবুও বিজ্ঞান-মনস্ক, যুক্তিবাদী!

শেষ কথা

আমাদের শেষ কথা হল এই যে আজকের বিশ্ব সভ্যতার মূলে রয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতির রূপায়ণ। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার সমাজের সন্তান। তার সভ্যতা তার ভাষাকে যেভাবে সাজিয়েছে, সে বাল্যকালে ভাষায় প্রবেশ করার সাথে সাথে সেই ভাষাই তার সজ্ঞাকে সচেতন করে, তাকে ‘আমিত্বের’ চেতনায় আনে। সে ভাষা ও সংস্কৃতিতে সৃষ্ট চৈতন্যময়ী সত্তা। তার যুক্তির ব্যবহার ভাষিক, কিন্তু ভাষা বস্তুর আয়না নয়, বস্তুর প্রতিনিধিও(representative) নয়, যুক্তির ভাষিক ব্যবহারে সে যে ‘সত্য/অর্থ’ উপস্থাপন করে, সেই সত্যের আয়না হয়ে ব্যবহৃত শব্দমালা কাজ করে না। সে যে বস্তুকে তার যুক্তিতে ‘সত্য’ ভাবে, সঠিক ভাবে, সত্যের definition-কে পুনরায় যুক্তির scaffolding– এ তুলে ধরলে (এবং পরতে পরতে এনালাইজ শুরু করলে) তার ধারণা তিলে তিলে তিরোহিত হবে। যুক্তি ও বিজ্ঞানবাদের ধর্মীয়রূপ অনেক।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ