বুধবার-১৫ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি-৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন-পদ্ধতি: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

নির্বাচন-পদ্ধতি: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

নির্বাচন-পদ্ধতি: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

মু. সগির আহমদ চৌধুরী

১. নেতৃত্ব নির্বাচনে ইসলামের মৌলিক নীতিমালা

এখানে ‘নেতৃত্ব’ বলতে রাজনীতিক বা শাসনক্ষমতা উদ্দেশ্য। সেটি যে-স্তরেরই হোক বা যে-ধরনেরই হোক। এ-নেতৃত্ব থেকে সরকারি চাকুরিও উদ্দেশ্য নয়। এখানে নেতৃত্ব থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনীতিক বা শাসনক্ষমতা সেটি দেশের হোক বা দলের হোক। এ-ধরনের নেতৃত্ব-বিষয়ে ইসলামের মৌলিক কিছু ধারণা-নীতি আছে। যথাÑ

১. নেতৃত্ব একটি দায়িত্ব, অধিকার নয়: ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব কারো প্রাপ্য অধিকার নয়, বরং এটি একটি আমানত এবং বিশাল যিম্মাদারী ও দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,

«الْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ».

নেতা একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদেহি করতে হবে।’

এ-ধারণার অত্যাবশ্যক ফলাফল হচ্ছে যে, নেতৃত্ব এমন এক দায়িত্ব ও কর্তব্য যা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। হ্যাঁ, যদি ওপর তা অর্পিত হয় তা হলে তাকে আমানত ও যিম্মাদারি মনে করে যথাযথভাবে আনজাম দেবে। এজন্য হাদীস শরীফে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ ذَرٍّ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! أَلَا تَسْتَعْمِلُنِيْ؟ قَالَ: فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَىٰ مَنْكِبِيْ، ثُمَّ قَالَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ! إِنَّكَ ضَعِيْفٌ، وَإِنَّهَا أَمَانَةُ، وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ، إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا، وَأَدَّى الَّذِيْ عَلَيْهِ فِيْهَا».

আবু যর আল-গিফারী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাকে কোনো নেতৃত্ব-পদে নিয়োগ দেবেন না! একথা শুনে নবীজি তাঁর হাত আমার কাধের ওপর রেখে বললেন, ‘হে আবু যার! তুমি বড়ই দুর্বল ব্যক্তি। আর এ-পদ হচ্ছে কঠিন আমানতের ব্যাপার। কিয়ামতের দিন তা লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ হবে। তবে যে-লোক এ-দায়িত্ব যথাযোগ্যতার সাথে গ্রহণ করবে এবং যথাযথভাবে তা পালন করবে (তা হলে ভিন্ন কথা)।’’

২. পদপ্রার্থিতা না-জাযেয়: নেতৃত্ব যেহেতু একটি দায়িত্ব, যিম্মাদারি ও আমানতের ব্যাপার। এজন্য ইসলামের দৃষ্টিতে এটি চেয়ে নেওয়া জায়েয নেই। যারা শাসনক্ষমতা চেয়ে নেয় এবং পদের লোভ করে ইসলাম তাদেরকে নেতৃত্বের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেছে। হাদীস শরীফে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ مُوْسَىٰ h، قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ أَنَا وَرَجُلَانِ مِنْ قَوْمِيْ، فَقَالَ أَحَدُ الرَّجُلَيْنِ: أَمِّرْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ، وَقَالَ الْآخَرُ مِثْلَهُ، فَقَالَ: «إِنَّا لاَ نُوَلِّيْ هَذَا مَنْ سَأَلَهُ، وَلَا مَنْ حَرَصَ عَلَيْهِ».

আবু মুসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার গোত্রের দু’লোককে নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হই। তাদের একজন বলল, হে আল্লাহ রাসুল! আমাকে নেতা নিযুক্ত করেন। দ্বিতীয় লোকটাও অনুরূপ আবেদন করল। তখন নবীজি বললেন, ‘আমরা এমন কোনো লোককে নেতৃত্বে মনোনীত করি না যারা নেতৃত্ব চেয়ে নেয় এবং পদের লোভ করে।’’

৩. নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে পরামর্শের ভিত্তিতে: ইসলামে নেতৃত্ব উত্তরাধিকার নয়, যেমনটা রাজতন্ত্রে হয়ে থাকে। জবরদস্তিমূলকভাবে কারো নেতৃত্ব দখলেরও অবকাশ নেই ইসলামে, যেমনটা হয়ে থাকে স্বৈরতন্ত্রে। কথিত প্রত্যাদেশ দ্বারাও কারও জন্য নেতৃত্ব সাব্যস্ত হবে না, যেমনটা শিয়া সম্প্রদায় তাদের তথাকথিত নিষ্পাপ ১২ ইমামের পক্ষে দাবি করে থাকে। অন্যদিকে নেতৃত্ব শিক্ষত-মূর্খ সর্বশ্রেণির মানুষের সার্বভৌম ক্ষমতার অভিব্যক্তিও নয়, যেমনটা মনে করা হয় পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মতাদর্শে। ইসলামে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে জনগণের সম্মতির অভিব্যক্তি হিসেবে ভারসাম্যপূর্ণ শুরা-ব্যবস্থার মাধ্যমে। এর পক্ষে দলীল, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَاَمْرُهُمْ شُوْرٰى بَيْنَهُمْ۪ ۰۰۳۸

তাদের যাবতীয় পদক্ষেপ স্থির হয় পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে।’

নবীজি (সা.) ওফাতের সময় খলীফা হিসেবে কারও নাম ঘোষণা করেননি। এটি একথার দলীল যে, তিনি খলীফার নির্বাচন সাধারণ মুসলমানের জিম্মায় ছেড়ে গেছেন। হাদীস শরীফে এসেছে, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাযি.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন,

«لَقَدْ هَمَمْتُ – أَوْ أَرَدْتُ – أَنْ أُرْسِلَ إِلَىٰ أَبِيْ بَكْرٍ وَابْنِهِ وَأَعْهَدَ: أَنْ يَقُوْلَ الْقَائِلُوْنَ – أَوْ يَتَمَنَّى الْـمُتَمَنُّوْنَ -»، ثُمَّ قُلْتُ: يَأْبَى اللهُ وَيَدْفَعُ الْـمُؤْمِنُوْنَ.

আমি তো ইচ্ছা করেছিলাম, আমি ঠিক করেছিলাম আবু বকর (রাযি.) ও তাঁর ছেলের নিকট সংবাদ পাঠাবো এবং অসীয়ত করে যাবো যেন লোকদের কিছু বলার অবকাশ না থাকে কিংবা আক্সক্ষাকারীদের কোনো আকাক্সক্ষা করার অবকাশ না থাকে। তারপর আমি বললাম, আল্লাহ (আবু বকর ব্যতীত অন্য কেউ খলীফা হোক) তা অপছন্দ করবেন, মুমিনগণ তা প্রতিরোধ করবেন।’

২. খিলাফতে রাশিদার অভিজ্ঞতা

শুরুতেই বলে এসেছি যে, কোনো অবকাঠামো বিষয়ে ইসলাম সিদ্ধান্ত দেয়নি। পার্থিব ব্যাপারে সর্বাধুনিক পরিকাঠামো গ্রহণে ইসলাম উদার, যদি তা ইসলামি নীতি-আদর্শের পরিপন্থী না হয়। এমনকি এসব অবকাঠামো অমুসলিমদের উদ্ভাবিত হলেও তাতে কোনো বাধা-নিষেধ নেই, যদি তাকে ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়। উপরে নেতৃত্ব নির্বাচনে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির আলোচিত হয়েছে। উপর্যুক্ত ধারণা-নীতির আলোকে একটি আধুনিক রূপরেখা তৈরি করবো। তার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন যে, ইসলামের খিলাফত-ইতিহাসের সুবর্ণ সময় রাশিদার আমলে মহান খলীফারা কিভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নিম্ন দুটো পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায় খিলাফতে রাশিদা আমলের মহান খলীফারা নির্বাচিত হয়েছিলেন। যথা-

১. মনোনয়ন: আরবিতে বলা হয়, اخْتِيَارُ الْخَلِيْفَةِ(ইখতিয়ারুল খলীফা)। অর্থাৎ খলীফা হিসেবে কাউকে বেঁচে নেওয়া, তাকে মনোনীত করা বা গ্রহণ করা ইত্যাদি। খিলাফতে রাশিদার আমলে এটি দুটো প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছিল। যথাÑ

১. আহলুল হল ওয়াল আকদের মনোনয়ন: আহলুল হল ওয়াল আকদ প্রথমে সম্ভাব্য খলীফা হিসেবে একটি প্যানেল ঘোষণা করেন। তারপর তাঁদের মধ্যে থেকে একজনকে যাচাই-বাচাই ও পরামর্শের মাধ্যমে একজন খলীফা হিসেবে মনোনীত করেন। প্রথম খলীফা আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.) এ-প্রক্রিয়া খলীফা মনোনীত হন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর খলীফা মনোনয়নে মদীনার আনসারী সাহাবায়ে কেরামের একটি গ্রুপ বনি সায়িদা প্রাঙ্গনে জরুরিভাবে মিলিত হন। মদীনা শরীফে আনসারী সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ট। তাঁরা খাযরাজ ও আউস নামে দু’গোত্রে বিভক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বনি খাযরাজ খিলাফতের প্রার্থী ছিলেন, তাঁরা তাঁদের পক্ষ থেকে গোত্রের সরদার সা’দ ইবনে উবাদা (রাযি.)-কে খলীফাপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।  এ-ব্যাপারে মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম অবগত হলে তাঁদের পক্ষে খুব দ্রুত আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.), ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) ও ওবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.) প্রমুখ বনি সায়িদা-প্রাঙ্গনে গিয়ে সমবেত হন।  অন্যদিকে আলী ইবনে আবু তালিব (রাযি.), যুবাইর ইবনুল আউওয়াম (রাযি.) ও তালহা ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি.) প্রমুখ ফাতিমা বিনতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাড়িতে মিলিত হন।

বস্তুত নবীজির ওফাতের পর খিলাফতের প্রার্থিতা নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে স্পষ্টত তিনটি দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ১. সা’দ ইবনে উবাদা (রাযি.)-কেন্দ্র করে আনসারী সাহাবায়ে কেরামের বনি খাযরাজ। ২. আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.), ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.), ওবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.) ও অন্যান্য আনসারী সাহাবায়ে কেরাম। ৩. আলী ইবনে আবু তালিব (রাযি.), যুবাইর ইবনুল আউওয়াম (রাযি.) ও তালহা ইবনে আবদুল্লাহ (রাযি.) প্রমুখ। প্রথম দু’দল বনি সায়িদা-প্রাঙ্গনে এক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে সম্ভাব্য খলীফা হিসেবে সা’দ (রাযি.), আবু বকর (রাযি.), ওমর (রাযি.) ও ওবাইদা (রাযি.)-এর একটি প্রাথিমক প্যানেল মনোনীত হন। তাঁদের মধ্যে ওমর ও আবু ওবাইদা (রাযি.) আবু বকর (রাযি.)-কে চ্যালেঞ্জ করতে অস্বীকৃতি জানান। অর্থাৎ বিষয়টি তখন সা’দ (রাযি.) ও আবু বকর (রাযি.)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার পর আবু বকর (রাযি)-কে খলীফা মনোনীত হন।

দ্বিতীয় খলীফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসেবে ৬ সদস্য বিশিষ্ট প্যানেল গঠন করে দিয়েছিলেন। এতে ১. ওসমান ইবনে আফ্ফান (রাযি.), ২. আলী ইবনে আবু তালিব (রাযি.), ৩. যুবাইর ইবনুল আউওয়াম, ৪. তালহা ইবনে আবদুল্লাহ, ৫. সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাযি.) ও ৬. আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অতঃপর ওমর (রাযি.)-এর ওফাতের পর প্যানেলের সদস্যবর্গ এক সভায় মিলিত হলে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.) বললেন, ছয়জনের মধ্যে তিনজন নিজেদের মধ্যে এ-পদের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি বেঁচে নিন? তখন যুবাইর (রাযি.) আলী (রাযি.)-কে, তালহা (রাযি.) ওসমান (রাযি.)-কে এবং সা’দ (রাযি.) আবদুর রহমান (রাযি.)-কে সমর্থন করেন। আবদুর রহমান (রাযি.) নিজেকে এ-পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেন। এতে প্রার্থিতা আলী (রাযি.) ও ওসমান (রাযি.) দু’জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অতঃপর আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাযি.) জনমত যাচাইপূর্বক ওসমান (রাযি.)-কে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করেন।

ইসলামে পদপ্রার্থিতা জায়েয নেই। তবে এ-নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ব্যাপারে। উম্মাহর কল্যাণ বিচার ও বিবেচনাবোধ থেকে নেতৃত্বের জন্য কোনো যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাবনার অবকাশ ইসলামে আছে। বনি সায়িদা-প্রাঙ্গনে বনি খাযরাজ কর্তৃক সা’দ ইবনে উবাদা (রাযি.)-কে খলীফার পদপ্রার্থী ঘোষণা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ বা গোত্র কিংবা দল নিজেদের পক্ষ থেকে যথাপোযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে নেতৃত্বের জন্য প্রার্থী ঘোষণা এবং তাঁর পক্ষে আহলুল হল ওয়াল আকদের কাছে আবেদনও করতে পারবে। আহলুল হল ওয়াল আকদের কাজ হবে, ১. নেতৃত্বের জন্য কোনো ব্যক্তির পক্ষে করা আবেদনপত্র সংগ্রহ, ২. যাচাই-বাচাইপূর্বক যথাপোযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে প্যানেল গঠন ও ৩. প্যানেলে মনোনীতদের তালিকা সংক্ষিপ্তকরণ।

বনি সায়িদা-প্রাঙ্গনে আনসারদের বনি খাযরাজের পক্ষে সা’দ ইবনে উবাদা (রহ.) এবং মুহাজির ও অবশিষ্ট আনসারদের পক্ষে আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.), ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.), ওবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.) খিলাফতের প্রার্থী ছিলেন একথা বিবেচনা করা যায়। ফলে সম্ভাব্য খলীফা হিসেবে সা’দ (রাযি.), আবু বকর (রাযি.), ওমর (রাযি.) ও ওবাইদা (রাযি.)-এর সমন্বয়ে একটি প্রাথিমক প্যানেল গঠিত হয়। তাঁদের মধ্যে ওমর ও আবু ওবাইদা (রাযি.) আবু বকর (রাযি.)-কে চ্যালেঞ্জ করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে প্রার্থিতা সা’দ (রাযি.) ও আবু বকর (রাযি.)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয় এবং প্যানেলে মনোনীতদের তালিকাটি আরও সংক্ষিপ্ত হয়।

দ্বিতীয় খলীফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসেবে ৬ সদস্য বিশিষ্ট প্যানেল গঠন করে দিয়েছিলেন। প্যানেল-গঠনের পূর্বে এখানেও কারো কারো পক্ষে ওমর (রাযি.)-এর কাছে প্রস্তাবনা এসেছিল। খোদ ওমর (রাযি.)ও দু’জন ব্যক্তিকে নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন; আবু ওবাইদা ইবনুল র্জারাহ (রাযি.) ও মাওলায়ে আবু খুযাইফা সালিম (রাযি.), কিন্তু তাঁরা তখন জীবিত ছিলেন না। ওমর (রাযি.)-এর কাছে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.)-কে খলীফা মনোনীত করে যাওয়ার প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।  ৬ সদস্যের প্যানেলের তিনজন অন্য তিনজনকে সমর্থন করে নিজেদেরকে প্রার্থিতা থেকে প্রত্যাহার করেন নেন, অবশিষ্ট তিনজনের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.)ও পদপ্রার্থিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ফলে প্রার্থিতা ওসমান (রাযি.) ও আলী (রাযি.)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয় এবং প্যানেলে মনোনীতদের তালিকাটি আরও সংক্ষেপিত হয়।

প্রচলিত নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের সাথে আহলুল হল ওয়াল আকদের সাদৃশ্য খুঁজে পেতে পারেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে এটি তারও বহু ঊর্ধ্বে, উচ্চপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান। প্রচলিত নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বটে, প্রক্ষান্তরে আহলুল হল ওয়াল আকদ হচ্ছে ইসলামি রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ। প্রচলিত নির্বাচন কমিশন একটি আমলা-প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে আহলুল হল ওয়াল আকদ হবে রাষ্ট্রের অভিভাবক। আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশনের অবকাশ আছে। ওয়ার্ড, ইউপি, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও পার্লামেন্ট (মজলিসে শুরা) নির্বাচনগুলো এ-কমিশন পরিচালনা করবে। এমনকি রাষ্ট্রপতিপদে সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে কোনো প্রার্থীর ব্যাপারে মজলিসে শুরা একমত হতে না পারলে সাধারণ নির্বাচন বা ঐক্যমতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত হলে তাঁর ব্যাপারে গণভোট পরিচালনা করাও নির্বাচন কশিনের কাজ। পক্ষান্তরে আহলুল হল ওয়াল আকদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবিধিবদ্ধ অনেক কাজের মধ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত তার কাজ রয়েছে খুবই সামান্য। তাও শুধু রাষ্ট্রপতি মনোনয়নে; ১. আবেদনপত্র গ্রহণ, ২. প্যানেল মনোনয়ন ও ৩. তালিকা সংক্ষিপ্তকরণ পর্যন্ত।

২. বর্তমান খলীফা কর্তৃক মনোনয়ন: এটিকে অসিয়তও বলা হয়। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) তাঁর পূর্ববর্তী খলীফা আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.)-এর অসিয়তের মাধ্যমে খলীফা মনোনীত হয়েছিলেন। আবু বকর (রাযি.) যখন বুঝতে পারলেন যে, তাঁর অসুস্থতা তাঁকে ক্রমশঃ মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে, ঠিক সে-সময়ে মুসলিম সেনাবাহিনী পারস্য ও রোমান পরাশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধ করছিল। তখন তিনি তাঁর মৃত্যুর পর খলীফা কে হবেন এ-ব্যাপারে মুসলিমদের সাথে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি প্রায় ৩ মাসব্যাপী মুসলিমদের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে যখন তিনি অধিকাংশ মুসলিমের মনোভাব যাছাই করেন তারপর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে তিনি ওমর (রাযি.)-এর নাম ঘোষণা করেন।

২. বৈধতা ও সংঘটন: মনোনয়নেই খিলাফত-নেতৃত্ব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে না। এর বৈধতা ও এটি সংঘটিত হওয়ার ব্যাপার রয়েছে। খিলাফতের নেতৃত্ব লাভে মনোনয়ন জরুরি নয়। কারণ তৃতীয় খলীফা ওসমান (রাযি.)-এর পর চতুর্থ খলীফা হিসেবে আলী (রাযি.) সেভাবে মনোনয়ন লাভ করেননি, আহলুল হল ওয়াল আকদের প্রাতিষ্ঠানিক মনোনয়ন কিংবা পূর্ববর্তী খলীফার অসিয়ত দুটোর একটাও তাঁর বেলায় হয়নি। অতএব খিলাফতের নেতৃত্বের জন্য মনোনয়নপ্রাপ্তির ব্যাপারটি জরুরি নয়। বরং এর বৈধতা এবং এটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করতে নিম্নে দুটো পর্যায় অবশ্যই অতিক্রম করতে হবে:

১. শুরা: এটি খলীফা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপ এবং খিলাফতের বৈধতার জন্য শুরা অপরিহার্য। খলীফা মনোয়ন আহলুল হল ওয়াল আকদের প্যানেল ঘোষণা কিংবা বর্তমান খলীফার অসিয়ত যেভাবে হোক সর্বাবস্থায় আহলুশ শুরা (শুরা কাউন্সিল বা মজলিসে শুরা)-এর সঙ্গে পরামর্শক্রমে হতে হবে। হাদীস শরীফে এসেছে, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) বলেন,

«لَا خِلَافَةَ إِلَّا عَنْ مَشُوْرَةٍ».

খিলাফতের যাবতীয় কর্মকা- পরামর্শভিত্তিক হতে হবে।’

এখানে কিছু অস্পষ্টতা তৈরি করতে পারে যে, ‘আহলুল হল ওয়াল আকদ’ ও মজলিসে শুরা আলাদা? হ্যাঁ, কিছুটা আলাদা। এটি ঠিক যে, নবীজির ইন্তিকালের খলীফা নির্বচানের উদ্দেশ্যে বনি সায়িদার প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনকে ওলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে আহলুল হল ওয়াল আকদের মর্যাদা দিয়েছেন। তবে এটি একই সঙ্গে মসলিসে শুরা হিসেবেও বিবেচ্য হবে। অন্যদিকে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) তাঁর পরবর্তী খলীফা মনোনয়নে ৬ সদস্য বিশিষ্ট যে-প্যানেল গঠন করে দিয়েছিলেন সেটি একই সঙ্গে আহলুল হল ওয়াল আকদের মর্যাদা রাখে এবং এ-ছয় সদস্যসহ আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.)-কে সদস্য করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট আরও একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। আর এ ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিটি ছিল মজলিসে শুরা। কমিটির সদস্য হিসেবে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.)-এর ব্যাপারে ওমর (রাযি.) বলেছিলেন,

«يَشْهَدُكُمْ عَبْدُ اللهِ بْنُ عُمَرَ، وَلَيْسَ لَهُ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ».

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তোমাদের সাথে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না।’

এটি ছিল মজলিসে শুরা। আহলুল হল ওয়াল আকদ ও মজলিসে শুরার কাজের মধ্যেও স্পষ্ট তফাৎ আছে। আহলুল হল ওয়াল আকদের কাজ হচ্ছে, আবেদনপত্র গ্রহণ, প্যানেল গঠন ও তালিকা সংক্ষিপ্তকরণ। এর পরের কাজটি মজলিসে শুরার। সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে যেকোনো একজনকে বেচে নেবে মজলিসে শুরা কর্তৃকপক্ষ। কারো পক্ষে মসজিসে শুরা একমত হতে না-পারলে বা নিয়ম-অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক সমর্থন না পেলে তা হলে খলীফা মনোনয়নের বিষয়টি সরাসরি জনগণের ওপর ন্যাস্ত হবে। বনি সায়িদার প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত শুরার অধিবেশনে সংক্ষিপ্ত তালিকায় খিলাফতের প্রার্থী আবু বকর (রাযি.) ও সা’দ (রাযি.)-এর মধ্যে মজলিসে শুরা শেষ পর্যন্ত আবু বকর (রাযি.)-এর ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন এবং সেটি সম্ভব হয়েছিল আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ও যৌক্তিক কারণবশত সা’দ (রাযি.) নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের মাধ্যমে। ফলে আবু বকর (রাযি.) খিলাফতের মনোনয়ন লাভ করেন।

পক্ষান্তরে ওমর (রাযি.)-কর্তৃক গঠিত প্যানেল থেকে ওসমান (রাযি.) ও আলী (রাযি.) এ-দু’জনকে নিয়ে খিলাফতের প্রার্থী হিসেবে যে-সংক্তিপ্ত তালিকা হয়েছিল তা থেকে কারো ব্যাপারে মজলিসে শুরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। কারণ দু’জনের উভয়ই খিলাফতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিষয়ে নিরবতা পালন করছিলেন। ফলে মজলিসে শুরা ব্যাপারটি জনগণের মতামতের ওপর ছেড়ে দেন। মজলিসে শুরার সভাপতি হিসেবে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.) এ-দু’জনের মধ্যে কাকে জনগণ খলীফা নির্বাচিত করতে চায় সে-বিষয়ে জনমত যাচাইয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি মদীনার নারী-পুরুষ সবাইকে জিজ্ঞাসা করেন এবং জনগণের মতামত সংগ্রহে তিনি দিন-রাত কাজ করেন। আল-মুসওয়ার ইবনে মাখরামার বরাত দিয়ে সহীহ আল-বুখারীর নিম্ন হাদীস থেকে ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয়,

«طَرَقَنِيْ عَبْدُ الرَّحْمٰنِ بَعْدَ هَجْعٍ مِنَ اللَّيْلِ، فَضَرَبَ الْبَابَ حَتَّى اسْتَيْقَظْتُ، فَقَالَ: «أَرَاكَ نَائِمًا فَوَاللهِ مَا اكْتَحَلْتُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ بِكَبِيْرِ نَوْمٍ» – وفي رواية البيهقي في «السنن الكبرىٰ»: «… فَوَاللهِ مَا اكْتَحَلْتُ هَذِهِ الثَّلَاثَ بِكَثِيْرِ نَوْمٍ».

রাতের কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আবদুর রহমান ইবনে আউফ আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছিল যে পর্যন্ত না আমি জেগে উঠলাম। তিনি বললেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি ঘুমাচ্ছো, কিন্তু আল্লাহর কসম! গত তিন রাত আমি খুব কমই ঘুমের আনন্দ উপভোগ করেছি।’

খলীফাতুল মুসলিমীন আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.) তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.)-কে অসিয়তের মাধ্যমে মনোনীত করেছেন। তবে এই মনোনয়নের পূর্বে তিনি আহলুল হল ওয়াল আকদ এবং মজলিসে শুরার জন্য পদমর্যাদাবান বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামের যাঁদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.) ও ওসমান ইবনে আফ্ফান (রাযি.) প্রমুখ ছিলেন তাঁদের মতামত নিয়েছিলেন এবং পরামর্শ গ্রহণ করে তারই ভিত্তিতে ওমর (রাযি.)-এর মনোনয়ন ঘোষণা করেছিলেন।  আহলুল হল ওয়াল আকদ ও মজলিসে শুরার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তখনও গড়ে না ওঠলেও তার নৈতিক প্রতিফলন ছিল। নতুবা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অসিয়তের মাধ্যমেই এ-মনোনয়ন চূড়ান্ত লাভ করতো না। এ-প্রসঙ্গে কাযী আবু ইয়া’লা ইবনুল র্ফারা বলেন,

إِنَّ إِمَامَةَ الْـمَعْهُوْدِ إِلَيْهِ تَنْعَقِدُ بَعْدَ مَوْتِهِ بِاخْتِيَارِ أَهْلِ الْوَقْتِ.

পূর্ববর্তী খলীফার মৃত্যুর পরই তাঁর মনোনীত ব্যক্তির খিলাফত আহলুহল হল ওয়াল আকদ ও মজলিসে শুরার অনুমোদনক্রমে সংঘটিত হবে।’

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়া আরও স্পষ্ট করে বলেন,

وَكَذَلِكَ عُمَرُ لَـمَّا عَهِدَ إِلَيْهِ أَبُوْ بَكْرٍ، إِنَّمَا صَارَ إِمَامًا لَـمَّا بَايَعُوْهُ وَأَطَاعُوْهُ، وَلَوْ قُدِّرَ أَنَّهُمْ لَـمْ يُنَفِّذُوْا عَهْدَ أَبِيْ بَكْرٍ وَلَـمْ يُبَايِعُوْهُ لَـمْ يَصِرْ إِمَامًا.

অনুরূপভাবে আবু বকর আস-সিদ্দীক (রাযি.) ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.)-কে পরবর্তী খলীফা হিসেবে অসিয়ত করে গেলেও তিনি খলীফা হিসেবে চূড়ান্তরূপে নির্বাচিত হন জনগণের বায়আত ও আনুগত্য স্বীকারের পর। যদি জনগণ আবু বকর (রাযি.)-এর অসিয়ত মেনে না নিতেন এবং তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ না করতেন তবে ওমর (রাযি.) খলীফা হিসেবে চূড়ান্তরূপে নির্বাচিত বলে পরিগণিত হতেন না।’

খিলাফতের নেতৃত্বের জন্য মনোনয়ন জরুরি নয়। তবে এর বৈধতার জন্য মজলিসে শুরার অনুমোদন এবং এটি সংঘটিত হওয়ার জন্য জনগণের আনুগত্যের বায়আত অপরিহার্য। মজসিলে শুরার অনুমোদনই প্রথমত না থাকলে তা হলে ব্যাপারটি জনগণের বায়আতের পর্যায়ে গড়াবে না। এ-প্রসঙ্গে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) এক ভাষণে বলেছেন,

«مَنْ بَايَعَ رَجُلًا عَنْ غَيْرِ مَشُوْرَةٍ مِنَ الْـمُسْلِمِيْنَ فَلَا يُبَايَعُ هُوَ وَلَا الَّذِيْ بَايَعَهُ، تَغِرَّةً أَنْ يُقْتَلَا».

যে-ব্যক্তি মুসলমানদের সাথে পরামর্শ ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তির হাতে বায়আত করবে তার অনুসরণ করা যাবে না এবং তার অনুসারীদেরও অনুসরণ করা যাবে না।’

তৃতীয় খলীফা ওসমান (রাযি.)-এর শাহাদতের পর লোকজন আলী (রাযি.)-এর প্রতি আনুগত্যের বায়আত পেশ করলে তিনি মজলিসে শুরার অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি এ-প্রসঙ্গে বলেন,

«لَيْسَ ذَلِكَ إِلَيْكُمْ، إِنَّمَا هُوَ لِأَهْلِ الشُّوْرَىٰ وَأَهْلِ بَدْرٍ، فَمَنْ رَضِيَ بِهِ أَهْلُ الشُّوْرَىٰ وَأَهْلُ بَدْرٍ فَهُوَ الْـخَلِيْفَةُ، فَنَجْتَمِعُ وَنَنْظُرُ فِيْ هَذَا الْأَمْرِ»، فَأَبَىٰ أَنْ يُبَايَعَهُمْ، فَانْصَرَفُوْا عَنْهُ.

খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারটি তোমাদের ইখতিয়ারে নেই। এটি আহলে শুরা ও আহলে বদরের কাজ। আহলে শুরা ও আহলে বদর যাঁদেরকে পছন্দ করেন তিনিই খলীফা হবেন। অতএব আমরা একত্রিত হয়ে এ-ব্যাপারে পরামর্শ করবো।’ এ-বলে তিনি তাদের বায়আত গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।’’

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রচলিত পার্লামেন্ট ব্যবস্থা ও ইসলামি রাষ্ট্রের মজলিসে শুরার মধ্যে অনেক বৈসাদৃশ্য রয়েছে। ভোটের সংখ্যাধিকের ভিত্তিতে প্রচলিত পার্লামেন্ট-ব্যবস্থায় স্বল্পশিক্ষিত, মূর্খ, দুর্নীতিপরায়ণ, চরিত্রহীন ও দাগি অপরাধীরাও নির্বাচিত হয় আসতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ মজলিসে শুরায় থাকবে না। আইন-প্রয়ণয়নকারী রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে এর সদস্যবর্গকে অবশ্যই ইসলামি জ্ঞানে শিক্ষিত, চরিত্রবান, তাকাওয়াবান ও আমানতদার হতে হবে। এ-ধরনের গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিবর্গ ভোটের সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত হলে সেই নির্বাচনে ইসলামের কোনো বাধা-নিষেধ নেই। ইসলামি রাষ্ট্রের মজলিসে শুরা দু’কক্ষবিশিষ্ট হবে, ১. উচ্চকক্ষ ও ২. নিম্নকক্ষ। নিম্নকক্ষ পার্লামেন্টের সদস্যবর্গ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন। আহলুল হল ওয়াল আকদ (রাষ্ট্রীয় অভিভাবক পরিষদ বা সুপ্রিম কমান্ড কাউন্সিল) ও রাষ্ট্রীয় শরীয়া কাউন্সিলের সকল সদস্য পদাধিকার বলে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য হবেন।

২. বায়আত: এটি খলীফা নির্বাচনের তৃতীয় ধাপ এবং খিলাফতের সংঘটিত হওয়ার জন্য বায়আত একটি অপরিহার্য বিষয়। সংঘটিত হওয়া, আরবিতে এটিকে انْعِقَادُ الْخِلَافَةِ বলা হয়। শব্দটি আরবি عَقْدٌ (আকদ) থেকে। এটি একটি চুক্তি, যার একটি পক্ষ হচ্ছে খলীফা, চুক্তির অপর পক্ষ হচ্ছে জনগণ। এটি কুরআন-সুন্নাহের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়ের শাসন, ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠার দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে আনুগত্যের বাধ্যবাধকতার চুক্তি। খলীফার পক্ষ থেকে এটি জবাদেহিতার এবং জনগণের পক্ষ থেকে এটি আনুগত্যের শপথ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

اِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِيْنَ اِذَا دُعُوْۤا اِلَى اللّٰهِ وَرَسُوْلِهٖ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ اَنْ يَّقُوْلُوْا سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا١ؕ وَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ۰۰۵۱

মুমিনদের বক্তব্য কেবল একথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে তাদেরকে আহ্বান করা হয় তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তারাই সফলকাম।’

কুরআন-সুন্নাহের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়ের শাসন, ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে আনুগত্যের যে-চুক্তি এটি প্রকৃতপক্ষে মহান রাব্বুল আলামীনের সঙ্গে হয়ে থাকে। কারণ এখনে শাসক আল্লাহ তাআলারই খলীফা বা তাঁর প্রতিনিধি।  আল্লাহ তাআলার রজ্জু , পৃথিবীতে তাঁরই ছায়া।  অতএব এর প্রধান পক্ষ হচ্ছে মহান রাব্বুল আলামীন ও অপর পক্ষ হচ্ছে মানুষ। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

اِنَّ الَّذِيْنَ يُبَايِعُوْنَكَ اِنَّمَا يُبَايِعُوْنَ اللّٰهَ١ؕ يَدُ اللّٰهِ فَوْقَ اَيْدِيْهِمْ١ۚ فَمَنْ نَّكَثَ فَاِنَّمَا يَنْكُثُ عَلٰى نَفْسِهٖ١ۚ وَمَنْ اَوْفٰى بِمَا عٰهَدَ عَلَيْهُ اللّٰهَ فَسَيُؤْتِيْهِ اَجْرًا عَظِيْمًاؒ۰۰۱۰

আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব যে শপথ ভঙ্গ করে অতিঅবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে আল্লাহ সত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।’

চুক্তির প্রধানপক্ষ যেহেতু প্রকৃতপক্ষে মহান রাব্বুল আলামীন সেহেতু রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হবেন আল্লাহ তাআলাই। রাষ্ট্রপ্রধানও নন, দেশের জনগণও নয়। তবে রাষ্ট্রপতি যেহেতু মহান আল্লাহর খলীফা এবং তাঁর প্রতিনিধ সেহেতু তিনিই হবেন রাষ্ট্রে প্রধান নির্বাহী। তবে তিনি এখানে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমতার আমানদার মাত্র , তিনি দায়িত্বশীল , তাঁকে জনগণের কাছে জবাবদেহি করতে হবে তাঁর কাজের জন্য। অতএব ইসলামি রাষ্ট্র হবে রাষ্ট্রপতি শাসিত একটি প্রজাতান্ত্রিক দেশ। এখানেই পার্থক্য ইসলামি রাষ্ট্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে; যেখানে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক রাজা এবং পারিবারিকভাবে তার বংশের উত্তরসূরিগণ। এখানেই পার্থক্য ইসলামি রাষ্ট্র ও তথাকথিত যাজকতন্ত্র ও কথিত নিষ্পাপ ইমামতন্ত্রের মাঝে; যেখানে খোদার ঐশী বাণীর দোহাই দিয়ে এবং ধর্মের নামে যথাক্রমে খ্রিস্টবাদে চার্চের পাদরিরা এবং শিয়াবাদে ইমামরা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার দাবি করে।

এখানেই মূল পার্থক্য একটি আদর্শ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের মধ্যে, যেখানে জনগণই সকল ক্ষমতা উৎস বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। ইসলামি রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় খলীফাকে নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব দেয়নি। জনগণকে সার্বভৌমত্ব দেয়নি, ক্ষমতায় তার অংশদারিত্বের সুযোগ দিয়েছে এবং সম্মানজনক মর্যাদা দিয়েছে। এজন্য এটি যেমন রাষ্ট্রপতি শাসিত হবে, তেমনি এটি একটি প্রজাতান্ত্রিক দেশ হিসেবেও গণ্য হবে। ক্ষমতা-বণ্টনের এ-ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। এটি একটি চুক্তির মাধ্যমে সুবিন্যস্ত হবে। আর সেই চুক্তিরই নাম হচ্ছে বায়আত।

বায়আতের আনুষ্ঠানিকতা দু’ভাবে হতে পারে। যথাÑ ১. অলিখিত; হাতে হাত মিলিয়ে, ২. লিখিতভাবে। লিখিত বায়আতের এও একটি পদ্ধতি প্রবর্তিত হতে পারে যে, একটি লিখিত বায়আতনামা মুদ্রণ করে রাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে জনগণ সেটিতে সই-সাক্ষর দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেবেন বা জমা দেবেন। আর এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে আহলুল হল ওয়াল আকদ বা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত ও মজলিসের শুরায় অনুমোদিত প্রার্থীকে বা প্রার্থীবৃন্দের মধ্যে কাকে জনগণ মেনে নিচ্ছেন? এটি আরও সহজ করা যায় ব্যালেট-পদ্ধতি অনুসরণ করলে। আরও সহজ করে বললে নির্বাচনের মাধ্যমেও বায়আতের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যেতে পারে। ইসলামি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দু’ধরনের নির্বাচন হতে পারে,

১.         আহলুল হল ওয়াল আকদের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে যদি কারও ব্যাপারে মজলিসে শুরা ঐক্যমতে পৌঁছান তাহলে যে-নির্বাচন হবে সেটি হবে গণভোট। হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি যাচাই করার জন্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২.         যদি মজলিসে শুরা ঐক্যমতে না পৌঁছাতে পারেন তাহলে প্রার্থী বা প্রার্থীদের মধ্য থেকে যে-কাউকে বেঁচে নেওয়ার জন্য যে-নির্বাচন হবে সেটি হবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এ-উভয় ধরনের নির্বাচনে যিনিই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন ওই ভোট তার পক্ষে একই সঙ্গে বায়আত হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। আর এভাবেই একটি ইসলামি রাষ্ট্রে তার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একজন রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করবেন এবং তাঁর নেতৃত্ব সংঘটিত হবে। প্রচলিত ভোটাভুটি, গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং বায়আতের নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে, এই ভোটাভুটি শুধু ব্যালেট পেপারে একটি সিল মারার নাম নয়। এটি দেশের রাষ্ট্রপতি ও এর একজন নাগরিকের মধ্যে আনুগত্যের শপথপত্রে সাক্ষর হিসেবে বিবেচিত হবে। চুক্তিপত্র পালনে দেশের রাষ্ট্রপতি দায়বদ্ধ থাকবেন আর জনগণ থাকবেন বাধ্য। কোনো পক্ষ থেকে যতদিন এ-চুক্তি লঙ্ঘন করা না হবে ততদিন অপর পক্ষ থেকে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপ্রধান যতদিন কুরআন-সুন্নাহ-অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করবেন এবং ইনসাফ-আদল ও মানবাধিকার বজায় রাখবেন ততদিন তাঁর আনুগত্য আবশ্যক। হাদীস শরীফে এসেছে,

عَنْ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: «السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْـمَرْءِ الْـمُسْلِمِ فِيْمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَـمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ، فَإِنْ أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ عَلَيْهِ وَلَا طَاعَةَ».

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, নেতৃত্বের নির্দেশ শোনা এবং তা মান্য করা, চাই সে-নির্দেশ তার পসন্দ হোক বা অপসন্দ হোক। যতক্ষণ না আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ দেয়া হয়। যদি আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দেওয়া হয় তবে তার কথা শুনতেও নেই এবং মানতেও নেই।’’

অতএব রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত পর্যায়ে জনগণ কর্তৃক নিযুক্ত হলেও তাঁর মৃত্যু, পদত্যাগ কিংবা আইন-অনুযায়ী অপসারণ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে বরখাস্ত করার কোনো সুযোগ জনগণের নেই এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালও সুনির্দিষ্ট নয়। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক নিয়মে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে যে-নির্বাচন এটা গণবিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়, এসব নির্বাচনে নেতৃত্বে যে-পালাবদল হয় তাও গণআকাক্সক্ষার প্রতিফল নয়, এসব ভোটাভুটির মাধ্যমে ক্ষমতাকেন্দ্রিক যে-পরিবর্তন আসে তাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় না। এখানে জনগণ পুরোপুরি বোকামির ভেড়াজালে আবদ্ধ থাকে, অন্যদিকে একদল দখলদার, কায়েমি স্বার্থবাজ ও সন্ত্রাসনির্ভর গোষ্ঠী যেনতেনভাবে নির্বাচিত হয়ে যায়। ইসলাম এ-ধরনের নির্বাচনী অপচয়ের সম্পূর্ণ বিরোধী।

বস্তুত দেশের প্রকৃত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ধারাবাহিক অগ্রগতির জন্য পাঁচ-দশ বছরের নির্ধারিত মেয়াদকাল কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। এ-ধরনের নির্দিষ্ট মেয়াদকালে সরকার গঠনের জন্য দলবাজি, লাঠিয়াল তৈরি ও ভোট কেনার জন্য যে-পরিমাণ অর্থের সংস্থান ও সময় ব্যয় করে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া হয় সরকার গঠনের দুয়েক বছর তো দলীয় সেই ঘাটতি পূরণেই সরকারকে ব্যস্ত থাকতে হয়, অন্যদিকে পরবর্তী নির্বাচের জন্য পরবর্তী বছরগুলোতে পুনরায় পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে হয়। তাহলে এ-ধরনের মেয়াদকেন্দ্রিক সরকার-ব্যবস্থায় দেশের উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব? এসব মূলত বিপুল অপচয়, বিশাল অপব্যয় এবং প্রচুর দুর্নীতির কারণে দেশের উন্নয়নই ব্যহত হয়ে থাকে।

শরীয়তে বিধিবদ্ধ অপসারণের কারণ যেমন ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া, অপ্রকৃতস্থ হয়ে যাওয়া, ফাসিক হয়ে যাওয়া, দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে যান কিংবা বায়আতের চুক্তি লঙ্ঘন করেন ইত্যাদি অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অভিযুক্ত হবেন এবং এসব অভিযোগে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে সুপ্রিম কোর্ট বা আহলুল হল ওয়াল আকদের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতিকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অবসর, অব্যহতি, অপসারণ কিংবা রবখাস্ত করা হবে। এক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্ট বা আহলুল হল ওয়াল আকদদের সদস্যবর্গকে আত্মীয়করণ বা নিজের অনুসারীদের আধিপত্য সৃষ্টি করে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে এ-অভিসংশন টেকিয়ে রাখার একটা আশঙ্কা থেকে যায়! আর এভাবে একজন রাষ্ট্রপ্রধান স্বৈরচারী, একনায়ক ও জোর-জুলমবাজরূপে আর্বিভূত হলে জনগণের উপায় কী হবে?

               এখানে জনগণ যেহেতু একটি পক্ষ, রাষ্ট্রপতির সাথে তাদেরই চুক্তি। কাজেই জনগণের পক্ষে তাদের একটি প্রতিনিধি দল থাকবে যেটি রাষ্ট্রপতি পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। সেটি হবে মজলিসে শুরা বা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ। সদস্যবর্গ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। জনগণ যেহেতু সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস নন, সেহেতু পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলে বিবেচিত না হলেও এর দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাধিক্য সদস্য শরীয়তে বিধিবদ্ধ অপসারনের সুনির্দিষ্ট কারণে রাষ্ট্রপতিকে অভিযুক্ত করে জনগণের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে জনগণের বায়আত বাতিলের ঘোষণা দিতে পারবেন আর এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি অপসারিত হবেন।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, মাসিক আত-তাওহীদ

 

  আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৫, হাদীস: ৮৯৩, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত

  মুসলিম, আস-সহীহ, দারু ইয়াহইয়ায়িত তুরাস আল-আরবী, বয়রুত, লেবনান, খ. ৩, পৃ. ১৪৫৭, হাদীস: ১৮২৫

  আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৯, পৃ. ৬৪, হাদীস: ৭১৪৯

  আল-কুরআন আল-করীম, সুরা আশ-শূরা, ৪২:৩৮

  আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৯, পৃ. ৬৪, হাদীস: ৭১৪৯, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত

  আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৪৩

  (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৩, পৃ. ১৩২, হাদীস: ২৪৬২ ও খ. ৮, পৃ. ১৬৮Ñ১৬৯, হাদীস: ৬৮৩০; (খ) আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৪৩৪৮

  (ক) ইবনে হাজর আল-আসকলানী, ফতহুল বারী শরহু সহীহ আল-বুখারী, দারুল মারিফা, বয়রুত, লেবনান (১৩৭৯ হি. = ১৯৫৯ খ্রি.), খ. ১২, পৃ. ১৫০; (খ) ইবনে কসীর, আস-সীরাতুন্নাওয়াবিয়া, দারুল মারিফা লিত-তাবাআ ওয়ান নাশার, বয়রুত, লেবনান (১৩৯৫ হি. = ১৯৭৬ খ্রি.), খ. ৪, পৃ. ৪৮৮; (গ) আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৪৩৪৮

  (ক) ইবনে কসীর, আস-সীরাতুন্নাওয়াবিয়া, দারুল মারিফা লিত-তাবাআ ওয়ান নাশার, বয়রুত, লেবনান (১৩৯৫ হি. = ১৯৭৬ খ্রি.), খ. ৪, পৃ. ৪৮৮Ñ৪৯১; (খ) আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৪৮Ñ৫০

  (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৫, পৃ. ১৫Ñ১৮, হাদীস: ৩৭০০; (খ) আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৬৩Ñ৬৫

  (ক) ইবনে জরীর আত-তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলূক = তারীখুত তাবারী, দারুত তুরাস, বয়রুত, লেবনান (১৩৮৭ হি. = ১৯৬৭ খ্রি.), খ. ৪, পৃ. ২২৭Ñ২২৮; (খ) আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৬১৬২

  আতা ইবনে খলীল আর-রাশতা, আজহিযাতু দাওলাতিল খিলাফা ফিল হুকমি ওয়াল ইদারা, দারুল উম্মাহ, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২৬ হি. = ২০০৫ খ্রি.), পৃ. ২৭

  ইবনে আবু শায়বা, আল-মুসান্নাফ ফিল আহাদীস ওয়াল আসার, মাকতাবাতুর রাশাদ, রিয়াদ, সউদী আরব (প্রথম সংস্করণ: ১৪০৯ হি. = ১৯৮৯ খ্রি.), খ. ৭, পৃ. ৪৩১, হাদীস: ২৭০৪২

  আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৫, পৃ. ১৭, হাদীস: ৩৭০০

  (ক) আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৯, পৃ. ৭৮, হাদীস: ৭২০৭; (খ) আল-বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বয়রুত, লেবনান, খ. ৮, পৃ. ২৫৩, হাদীস: ১৬৫৬৩; (ঘ) আতা ইবনে খলীল আর-রাশতা, আজহিযাতু দাওলাতিল খিলাফা ফিল হুকমি ওয়াল ইদারা, দারুল উম্মাহ, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২৬ হি. = ২০০৫ খ্রি.), পৃ. ২৮

  (ক) ইবনে জরীর আত-তাবারী, তারীখুর রুসুল ওয়াল মুলূক = তারীখুত তাবারী, দারুত তুরাস, বয়রুত, লেবনান (১৩৮৭ হি. = ১৯৬৭ খ্রি.), খ. ৪, পৃ. ২২৮Ñ২৩০; (খ) আবদুর রহমান কিলানী, খিলাফত ওয়া জুমহূরিয়ত, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পাকিস্তান (সপ্তম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০২ খ্রি.), খ. ৫৭৬০

  আবু ইয়ালা ইবনুল র্ফারা, আল-আহকামুস সুলতানিয়া, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২১ হি. = ২০০০ খ্রি.), পৃ. ৩৬

  ইবনে তায়মিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ ফি নুকযি কালামিশ শীআ আল-কদরিয়া, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সুউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, সউদী আরব (প্রথম সংস্করণ: ১৪০৬ হি. = ১৯৮৬ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৫৩০

  আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ৮, পৃ. ১৬৯, হাদীস: ৬৮৩০

  ইবনে কুতায়বা আদ-দীনাওয়ারী, আল-ইমামা ওয়াস সিয়াসা = তারিখুল খুলাফা, দারুল আওযা, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪১০ হি. = ২০১০ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৬৫

  আল-কুরআন আল-করীম, সুরা আন-নুর, ২৪:৫১

  আল-কুরআন আল-করীম, সুরা আল-বাকারা, ২:৩০:

اِنِّيْ جَاعِلٌ فِي الْاَرْضِ خَلِيْفَةًؕ ۰۰۳۰

আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি।

  আল-কুরআন আল-করীম, সুরা আলে ইমরান, ৩:১০৩:

وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللّٰهِ جَمِيْعًا وَّلَا تَفَرَّقُوْا۪ ۰۰۱۰۳

আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।

  আল-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, মাকতাবাতুর রাশাদ, রিয়াদ, সউদী আরব (প্রথম সংস্করণ: ১৪২৩ হি. = ২০০৩ খ্রি.), খ. ৯, পৃ. ৪৭৯, হাদীস: ৬৯৮৮:

عَنْ أَبِيْ بَكْرَةَ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُوْلُ: السُّلْطَانُ ظِلُّ اللهِ فِي الْأَرْضِ، فَمَنْ أَكْرَمَهُ أَكْرَمَهُ اللهُ، وَمَنْ أَهَانَهُ أَهَانَهُ اللهُ

আবু বাকরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেছেন যে, ‘শাসকবর্গ পৃথিবীতে আল্লাহর ছায়া। যে তাঁকে সম্মান করবে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেন আর যে তাঁকে অপমানিত করবে আল্লাহ তাকে অপদস্ত করবেন।’’

  আল-কুরআন আল-করীম, সুরা আল-ফাতাহ, ৪৮:১০

  মুসলিম, আস-সহীহ, দারু ইয়াহইয়ায়িত তুরাস আল-আরবী, বয়রুত, লেবনান, খ. ৩, পৃ. ১৪৫৭, হাদীস: ১৮২৫:

عَنْ أَبِيْ ذَرٍّ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُوْلَ اللهِ! أَلَا تَسْتَعْمِلُنِيْ؟ قَالَ: فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَىٰ مَنْكِبِيْ، ثُمَّ قَالَ: يَا أَبَا ذَرٍّ! إِنَّكَ ضَعِيْفٌ، وَإِنَّهَا أَمَانَةُ، وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ، إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا، وَأَدَّى الَّذِيْ عَلَيْهِ فِيْهَا

আবু যর আল-গিফারী (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাকে কোনো নেতৃত্ব-পদে নিয়োগ দেবেন না! একথা শুনে নবীজি তাঁর হাত আমার কাধের ওপর রেখে বললেন, ‘হে আবু যার! তুমি বড়ই দুর্বল ব্যক্তি। আর এ-পদ হচ্ছে কঠিন আমানতের ব্যাপার। কিয়ামতের দিন তা লজ্জা ও লাঞ্ছনার কারণ হবে। তবে যে-লোক এ-দায়িত্ব যথাযোগ্যতার সাথে গ্রহণ করবে এবং যথাযথভাবে তা পালন করবে (তা হলে ভিন্ন কথা)।’’

  আল-বুখারী, আস-সহীহ, দারু তওকিন নাজাত, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪২২ হি. = ২০০১ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৫, হাদীস: ৮৯৩, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত:

الْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

নেতা একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদেহি করতে হবে।

  আত-তিরমিযী, আল-জামিউল কবীর = আস-সুনান, মুস্তফা আলবাবী অ্যান্ড সন্স পাবলিশিং অ্যান্ড প্রিন্টিং গ্রুপ, হলব, সিরিয়া, খ. ৪, পৃ. ২০৯, হাদীস: ১৭০৭

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ