---

বহিষ্কৃত নেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী

বহিষ্কৃত নেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী

মমতার ১৫ বছরের রাজত্ব ধ্বংস করলো ছোট ভাইয়ের মতো শুভেন্দু

জান্নাতুল্লাহ আল-মারুফ

একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ‘ছোট ভাইয়ের মতো’ পরিচিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত এই নেতা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে দল ছাড়ার কয়েক বছরের মধ্যেই মমতার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয় পেয়ে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটায় বিজেপি।

১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম শুভেন্দুর। কংগ্রেস দিয়ে রাজনীতি শুরু করলেও পরে মমতার নেতৃত্বে তৃণমূলে যোগ দেন। দীর্ঘদিন দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ থাকলেও ২০১৬ সালের পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানসহ নানা কারণে নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে।

২০২০ সালে নাটকীয়ভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর থেকেই মমতার অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। এবারের নির্বাচনে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও মমতাকে হারিয়ে আলোচনায় আসেন শুভেন্দু।

এখন নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—আক্রমণাত্মক রাজনীতির বাইরে এসে প্রশাসক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।

শুভেন্দু অধিকারী : পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্ব রাজনীতির ক্রমবর্ধমান মুখ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দু

অধিকারীর উত্থান নিঃসন্দেহে এক নাটকীয় অধ্যায়। নন্দীগ্রামের কৃষক আন্দোলনের অন্যতম মুখ থেকে শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক—রাজনীতির এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ তিনি বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখার সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নেতা। একসময় যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিই আজ তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

কিন্তু তাঁর এই রাজনৈতিক রূপান্তর যতটা আলোচিত, তার চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গের বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, শুভেন্দু অধিকারী এখন কেবল দলনেতা নন; বরং তিনি রাজ্যে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে মুসলিম সমাজ, সীমান্ত রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কুরবানি ইস্যুতে তাঁর অবস্থান রাজ্যের রাজনৈতিক আবহে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

১…‘তোষ্টিকরণ’ শব্দের আড়ালে রাজনৈতিক বার্তা

গত কয়েক বছরে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তৃতায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো—‘সংখ্যালঘু তুষ্টিকরণ’। তিনি প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক মঞ্চেই অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মন জয় করতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা নিছক সমালোচনা নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে যেখানে মুসলিমদের নাগরিক অধিকার ও সাংবিধানিক সুবিধাকেও “অতিরিক্ত সুবিধা” হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে

সাধারণ মানুষের মনে মুসলমানদের প্রতি এক ধরনের বিরূপতা তৈরির আশঙ্কা বাড়ে।

২…বিধান সভায় মুসলিম বিধায়কদের বের করে দেওয়ার হুমকি

রাজনৈতিক জনসভায় দলনেতা হিসেবে শুভেন্দুর বক্তব্যে বহুবার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মুসলিম বিধায়কদের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, বারবার প্রতিবাদ ও কঠোর মন্তব্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, এটি শুধুই রাজনৈতিক মতবিরোধ নয়; বরং মুসলিম প্রতিনিধিত্বকে আক্রমণের একটি সুপরিকল্পিত বার্তা। যদিও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে—এটি সংসদীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন।

৩…কুরবানির আগে গরু জবাই নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব: ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপের অভিযোগ

সম্প্রতি কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে অনুমতি ছাড়া গরু জবাই বন্ধে কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে শুভেন্দু অধিকারীর অবস্থান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তিনি যুক্তি দিয়েছেন, “অবৈধ পশু জবাই বন্ধে প্রশাসনের কড়াকড়ি দরকার।” কিন্তু মুসলিম সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই অবস্থান বাস্তবে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়।

সমালোচকদের মতে, কুরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় অনুশাসন। এটিকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রচেষ্টা মুসলিম সমাজে আতঙ্ক ও অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।

অনেকের আশঙ্কা, আইন প্রয়োগের নামে স্থানীয় প্রশাসন হয়রানিমূলক আচরণ করলে তা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

৪..বাংলাদেশ সীমান্তে বিদ্যুৎচালিত কাঁটাতারের দাবি:

বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য বরাবরই আক্রমণাত্মক। তিনি একাধিকবার সীমান্তে আরও শক্তিশালী কাঁটাতার বসানোর দাবি তুলেছেন। সম্প্রতি বিদ্যুৎচালিত কাঁটাতার বসানোর প্রস্তাব ঘিরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সমর্থকদের দাবি, এটি সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বিদ্যুৎচালিত সীমান্ত বেড়া মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পদক্ষেপ সীমান্তবাসীর জীবনকে আরও অনিশ্চিত করবে এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও অস্বস্তিকর বার্তা দেবে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তার নামে একটি জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।

৫…‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে রাজনৈতিক মেরুকরণ:

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক বক্তব্যে “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” শব্দবন্ধ প্রায় নিয়মিতভাবে উঠে আসে। তাঁর দাবি, এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে।

সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্যে প্রকৃত অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রাজনৈতিক মেরুকরণ। কারণ এতে সাধারণ বাঙালি মুসলমানদেরও সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়।

মাদরাসা ও মসজিদকে ঘিরে সন্দেহের রাজনীতি:

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য বহুবার মুসলিম সমাজে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তিনি কখনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন, কখনো নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রসঙ্গ এনেছেন।

মুসলিম সংগঠনগুলোর বক্তব্য, এ ধরনের মন্তব্য গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করে এবং মাদরাসার ছাত্রদের সামাজিকভাবে হেয় করে।

একইভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা ও

মসজিদকে ঘিরেও তাঁর বক্তব্য অনেক সময় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

৬…সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় রাজনৈতিক লাভের অভিযোগ:

রাজ্যের বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক অশান্তির ঘটনায় শুভেন্দুর বক্তব্য প্রায়শই পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংযত ভাষার বদলে উসকানিমূলক মন্তব্য বিভাজনের রাজনীতিকে শক্তিশালী করে।

৭..শুভেন্দু সরকার গঠন করার পর পরই শুরু হয়েছে মুসলমানদের ওপর হামলা :

পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা আবারও নির্মম বাস্তবতা সামনে এনেছে। • বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম পরিবারগুলো নির্যাতনের শিকার হয়েছে। • মসজিদে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। • নামাযরত মানুষদের মাঝেও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। • ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। • নারী-শিশুরাও এই সহিংসতার ভয়াবহতা থেকে রেহাই পায়নি। • ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষকে হেনস্তা করা হয়েছে। • এই হামলাগুলো মুসলিম সমাজের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। • পশ্চিমবঙ্গের বহু অঞ্চলে মুসলমানরা অনিরাপত্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। • নির্যাতনের এই কালো অধ্যায় ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে থাকবে।

এই কট্টর হিন্দুত্ববী শুভেন্দুকে ঘিরে বাংলাদেশ সরকারের করণীয়:

বাংলাদেশের প্রথম দায়িত্ব হলো বিষয়গুলোকে আবেগ নয়, রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা দিয়ে মোকাবিলা করা।

বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে, সীমান্ত নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক বক্তব্যের নামে যদি বাংলাদেশকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে

নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য অশনিসংকেত।

সরকারের উচিত—

প্রথমত, শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় সীমান্তে যেকোনো অমানবিক ব্যবস্থা—বিশেষত বিদ্যুৎচালিত কাঁটাতারের মতো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উদ্বেগ জানানো প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও মানবাধিকার চুক্তিকে সামনে আনা। সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থাপন করা দরকার।

তৃতীয়ত, সীমান্ত অঞ্চলে উন্নয়ন জোরদার করা। সীমান্তবাসীর অর্থনৈতিক দুর্বলতা অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্ম দেয়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

চতুর্থত, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি বাড়ানো। কোনো উসকানিমূলক পরিস্থিতি যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।

পঞ্চমত, তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলা করা।

আজকের বিশ্বে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; হয় তথ্যের ভেতরেও। বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারের জবাব যুক্তি ও তথ্য দিয়ে দিতে হবে।

বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতা হলো—দুর্বলকে কেউ সম্মান করে না।

বাংলাদেশ যদি মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে কেবল প্রতিবাদী আবেগে নয়; জ্ঞান, কূটনীতি, ঐক্য ও আত্মনির্ভরতার শক্তিতে বলীয়ান হতে হবে।

রাষ্ট্রকে হতে হবে দৃঢ়, উলামাকে হতে হবে প্রজ্ঞাবান, জনগণকে হতে হবে সচেতন।

কারণ ইতিহাসের কঠিন সময়ে যারা প্রস্তুত থাকে, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে।

লেখক : ত্বালিবুল ইলম, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ