---

যেমন ছিলেন উস্তাদে মুহতারাম

যেমন ছিলেন উস্তাদে মুহতারাম
হযরত আল্লামা আবু তাহের কাসেমী নদভী (রহিমাহুল্লাহ)

লেখক : মাওলানা রিজওয়ান রফিক জমীরাবাদী
নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক আল-আবরার

দীর্ঘদিন থেকেই অসুস্থতা ছাড়ছে না। দেখা হলে সবাই বলে তোমার তো হুজুরের (তোমার আব্বার) চেহারা এসে গেছে। এবার রমজান মাসে মাদরাসায়ও যাওয়া হয়নি। শারীরিক অসুস্থের পাশাপাশি মানসিক অসুস্থতাই যেন বেশি পীড়া দেয়। অনেক বন্ধুদের বলেছি ক্ষমা করে দিস। সেই আরজি থাকল সবার প্রতি। অসুস্থতার কারণে রমজানে বাড়িতে ছিলাম বিধায় জামিয়া পটিয়ার মুহতামিম হযরতুল আল্লাম মাওলানা আবু তাহের নদভী (রহিমাহুল্লাহ)-এর রমজান পরিপালনের মেহনত সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ হয়েছে। ইবাদতে তাঁর অদম্য মাশগালা দেখে অনেক সময় নিজের অসুখের কথা ভুলে যাওয়া হতো। আউয়াবিন, তারাবী, তাহাজ্জুদসহ দুই-তিন দিনে এক খতম কোরআন নামাযে শোনার মতো কঠিন আমল করে যাচ্ছেন এই ব্যক্তি। তাঁর এই নিরলস মেহনত সত্যিই আমাকে ভাবিয়ে তুলত। আমি তো বয়সে অনেক ছোট। তিনি আমার উস্তাদ। এত বয়সে যদি তিনি এভাবে মেহনত করতে পারেন আমি কেন পারি না। এসব ভাবনামাত্র। বাস্তবে নিজে কিছুই পারিনি। শারীরিক দুর্বলতা যেন সব কিছুর মধ্যে বাধা হয়ে আছে। আমার পিতাজি হযরতুল আল্লাম মাওলানা রফীক আহমদ সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) যখন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন তখনও জামিয়ার প্রবীণ উস্তাদ হযরত মাওলানা কলিমুল্লাহ সাহেব কর্মতৎপর ব্যক্তি হিসেবে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারতেন। পিতাজি আক্ষেপ করে বলতেন, আমি শয্যাশায়ী হয়ে গেলাম অথচ মাওলানা কলিমুল্লাহ সাহেব স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারছেন। আসলে তাঁরা উভয়েই প্রতিদিন ফজর নামাযের পর একসাথে হাঁটতেন। এরই মধ্যে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন। সেই কারণেই মূলত তাঁর আক্ষেপটা। আমরা তাঁকে সান্ত্বনা দিতাম, আপনিও ভালো হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা’আলার শোকর হযরত আল্লামা নদভী (রহিমাহুল্লাহ)-কে সে অবস্থায় পড়তে হয়নি। রমজানেই শুনলাম তিনি স্ট্রোক করেছেন। তাঁকে প্রথমে চট্টগ্রাম, অতঃপর ঢাকায় নেওয়া হলো। কিছুদিনের মধ্যেই মোটামুটি স্বাস্থ্যের উন্নতি হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম নিয়ে আসা হয়। হাত-পা অবশ থাকলেও মোটামুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করছিলেন। এরই মধ্যে আমি ঢাকা চলে আসি। দুই দিন পর শুনতে পেলাম আল্লামা নদভী সাহেব আল্লাহর জিম্মায় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আজ তিন এপ্রিল দুই হাজার তেইশ ইংরেজি জুমাবার। সকালে মাসিক আত-তাওহীদ সম্পাদক সাহেবের ফোন। নির্দেশ হলো আল্লামা নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে কিছু স্মৃতিকথা লেখার। কিন্তু কী লিখব? তাঁর জামিয়া পটিয়ায় ছাত্র হিসেবে আসা থেকে আরম্ভ করে মুহতামিম হয়ে পরলোকগত হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ জীবনই আমাদের সামনে। উপরন্তু তিনি পিতাজির স্নেহের ছাত্র হিসেবে আমাদের ঘরের একজন সদস্যই আমরা মনে করতাম। আমরা তাঁর ছাত্র হিসেবে তিনিও আমাদের সেভাবে আগলে রাখতেন। আন্তরিক স্নেহ দিতেন। এই দীর্ঘ সময়ের স্মৃতিগুলো লিখতে গেলে অনেক ভলিউম হবে, কিন্তু স্মৃতিচারণা শেষ হওয়ার নয়।
আমরা তখনও ছোট বয়সের। নাজেরার ছাত্র সম্ভবত। আব্বাজন নানুপুর থেকে পটিয়া মাদরাসায় সিনিয়র উস্তাদ হিসেবে যোগ দিলেন। শুনছিলাম তাঁর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কয়েকজন ছাত্রও নানুপুর ওবাইদিয়া মাদরাসা থেকে জামিয়া পটিয়ায় ভর্তি হতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে তো তখন থেকেই জানি। তিনি হলেন বর্তমান মদুনাঘাট ইউনুসিয়া মাদরাসার মুহতামিম পীরে কামেল হযরত মাওলানা শেহাবুদ্দীন সাহেব (দামাত বারাকাতুহুম)। তিনি পিতাজির রুমেই থাকতেন। সেই হিসেবে তাঁর সাথে তখন থেকেই জানাশোনা। আব্বার মুখে আবু তাহেরের নাম শুনতাম, কিন্তু তাঁকে চিনতাম না। আমাদের এত ছোট বয়সে সেভাবে চেনার কথাও নয়।
আমরা যে বছর চাহারুমে পড়ব সে বছর রমজানে শোনা যাচ্ছিল মাওলানা আবু তাহের নদভী নামে একজন নতুন উস্তাদ রাখা হয়েছে। শাওয়ালে মাদরাসা খোলার পর দেখলাম মাওলানা আবু তাহের নদভী সাহেবের নামে আমাদের জামাতের কিতাব নাফহাতুল আরব তাকসিম হয়েছে। তিনি আমাদের উস্তাদ হবেন। যথারীতি ক্লাস আরম্ভ হলো। তাঁর কাছ থেকে আমরা নাফহাতুল আরব পড়ছিলাম। ইত্যবসরে আব্বাজন একদিন তাঁকে ডেকে বললেন, রিজওয়ান এ বছর তোমার কাছে পড়বে। তাকে একটু নেগরানীতে রেখো। তখন হযরত আল্লামা নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) আমাকে বললেন, প্রতিদিন কিছু কিছু আরবী লিখে আমাকে দেখাবে। তখন থেকে কিছু কিছু লিখতাম। তাঁর কাছে নিয়ে গেলে তিনি খুব যত্নসহকারে আমার খাতা দেখে দিতেন। তখন আমাদের বয়সও ছোট, মনও ছোট। উস্তাদের কদর আর মর্যাদা কী-ই বা বুঝব। আব্বা বলেছেন তাই করছিলাম। এভাবেই বছর শেষ করলাম। এরপর তাঁর কাছে আর কিছু পড়া হয়নি। এর পরও তাঁর কাছে যাতায়াত ছিল। আব্বাজানের তাসনিফাতের কাজের কোনো অভাব ছিল না। বিভিন্ন মুসাবেদা বিভিন্ন উস্তাদের কাছে নিয়ে যেতে হতো। সেই হিসেবে বহু মুসাবেদা তাঁর কাছেও নিয়ে যেতাম। তিনি দেখে দিতেন। কিতাবের প্রুফ দেখাও একটি বিশেষ ফন। মুসাবেদার কোন ভুল কার নজরে পড়ে তা বলা যায় না। তাই আব্বাজন মুসাবেদা বিভিন্নজনকে দেখতে দিতেন। উস্তাদে মুহতারাম হযরত মাওলানা আবু তাহের নদভী সাহেবকেও দিতেন। এই ব্যাপারে তিনি আব্বাজনকে সহযোগিতা করতেন আন্তরিকভাবে।
হযরত আল্লামা আবু তাহের নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) দেশের শীর্ষ মুরব্বি ফকীহুল মিল্লাত হযরত মুফতী আবদুর রহমান (রহিমাহুল্লাহ)-এর আন্তরিক স্নেহভাজন ছাত্র ছিলেন। তিনি হযরত নদভী সাহেবকে যেমন মুহব্বত করতেন, তেমনি তাঁর কার্যাদিতে নেগরানীও করতেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। হযরত নদভী সাহেবকে তিনি হযরত হারদুয়ী (রহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে আধ্যাত্মিক তা’আল্লুক করে দেন। পরে একসময় তিনি নিজেই তাঁকে খেলাফত দান করেন। হযরত ফকীহুল মিল্লাত (রহিমাহুল্লাহ)-এর তদারকি ছিল অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ এবং কঠোর। হযরত নদভী সাহেবের বেলায় আমরা তা-ই দেখতাম। তিনি কোনো প্রকার ভুল পথে চালিত হলে হযরত ফকীহুল মিল্লাত কঠোরভাবে তাঁকে নিষেধ করতেন। হযরত নদভী সাহেবও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর কাছে পরামর্শ করেই চলতেন। তাঁদের মধ্যকার আন্তরিক মুহব্বত, স্নেহ ও ভক্তি ছিল বিরল প্রকারের। হযরত ফকীহুল মিল্লাত (রহিমাহুল্লাহ)-কে মুহব্বত করতে গিয়ে নদভী সাহেবকে নিজ কর্মস্থলে বিভিন্ন সময় নিপীড়িতও হতে হয়েছে। তথাপি তিনি তাঁর আনুগত্যতা ছাড়েননি।
তাঁর জীবনের যে অংশগুলো কষ্টের ছিল তার মধ্যে একটি ছিল এহসান এসের বিষয়। হুজুরের সরল্যতার কারণে ওই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও মূল কর্মকর্তারা তাঁকে অত্যন্ত আপদের মুখে ঠেলে দেয়। হুজুরের সেই দুঃসময়ে একদিন বসুন্ধরা মারকাযে হুজুরের সাথে দেখা। বিভিন্ন কথার ফাঁকে এহসান এসের কথাও উঠে আসে। তখন তাঁর ওপর বহু মামলা। হাজিরা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে যেতে হচ্ছে। কথার ফাঁকে হঠাৎ কেঁদে উঠে বললেন, আমার হুজুর তথা ফকীহুল মিল্লাত (রহিমাহুল্লাহ)-এর একটি কথা অমান্য করার কারণে আজ আমি এহেন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। হুজুর আমাকে শুরু থেকেই এহসান এসে যুক্ত না হওয়ার জন্য বলেছিলেন। তা থেকে অনুমান করা যায় হযরত ফকীহুল মিল্লাত (রহিমাহুল্লাহ) নিজ ছাত্রকে কতই না স্নেহ করতেন। এহসান এসের ক্ষেত্রে হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) আসলে প্রতারিত হয়েছিলেন। ওই সংস্থার পরিচালকরা অর্থ লুট করে গা ঢাকা দিলে হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) তাতে ফেঁসে গিয়েছিলেন। এর জন্য তিনি যারপরনাই কষ্ট ভোগ করেছেন দীর্ঘদিন।
হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) আসলে অর্গানাইজার ছিলেন। মুসলমান, বিশেষ করে আলেম-উলামারা আর্থিকভাবে একটু সচ্ছল হোক, এটি তাঁর প্রত্যাশা ছিল। সেই কারণে তিনি নিজ হাতেই আলেম-উলামাদের বহু সমিতি ও সংস্থা করেছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন আর কিছু ক্ষেত্রে সফল হননি। তবে তাঁর যে চিন্তা-চেতনা তা ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও ক্রমবিকাশমান। উন্নত চিন্তাই মাথায় রাখতেন। যে কাজ করবেন, তা যেন সুন্দর হয় সেই ভাবনা সব সময় লালন করতেন। একসময় তিনি কিতাব লিখলেন। কিতাবটির সুন্দর ছাপার জন্য তিনি সরাসরি পাকিস্তান থেকে ছাপিয়ে এনেছিলেন। এসব তাঁর উন্নত চিন্তারই স্বাক্ষর।
মানুষের খুব দরদি ছিলেন হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ)। এখন কেমন, তা জানি না; তবে এক সময় জামিয়া পটিয়ায় উস্তাদরা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে মাদরাসা থেকে তাঁর বেতন কিভাবে তাড়াতাড়ি বন্ধ করা হবে, সেটা নিয়ে কিছু লোক তৎপর হয়ে উঠতেন। বিষয়টা আমার কাছে খুব অমানবিক মনে হতো। একজন মানুষ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে মাদরাসার খিদমত করলেন। উক্ত ব্যক্তি শয্যাশায়ী হওয়া মাত্রই তাঁর বেতন বন্ধ করে দেওয়া হবে, তা সত্যিই অমানবিক। কওমী মাদরাসায় রিটায়ার্ড হওয়ার বয়স নেই। যত বয়স বেশি হয়, তত সম্মান বাড়ে। রিটায়ার্ডের পদ্ধতি থাকলে রিটায়ার্ড হওয়ার সময় মোটা অংকের টাকা পেয়ে কর্মক্ষেত্র ছাড়তে পারে, সেটা একটা পদ্ধতি। এখানে যেহেতু রিটায়ার্ড হওয়ার পন্থা নেই, সেহেতু শয্যাশায়ী হওয়া পর্যন্ত তাঁর মেহনত চলতেই থাকে। শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়ার পর ওই উস্তাদের যদি সহায়-সম্বল থাকে তবে তো ভালো, যদি না থাকে তবে এই অসুস্থাবস্থায় জীবনযাপন কীভাবে হবে মাদরাসার পক্ষ থেকে তার একটি বিহিত ব্যবস্থা থাকা জরুরি মনে হয়। বিভিন্ন উস্তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়া মাত্র মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর বেতন বন্ধ করে দিয়েছে। পরে ওই ব্যক্তি এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, যা দেখে বিভিন্নজন স্বয়ং মাদরাসার প্রতি বিরূপ মন্তব্য করেছেন। কয়েক উস্তাদের এরূপ অবস্থায় হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ)-কে দেখেছি তিনি দেশ-বিদেশে নিজের ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ করে ওই অসুস্থ উস্তাদের জন্য ফান্ড জোগাড় করতেন এবং অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত যেন এই খিদমত জারি থাকে, সে ব্যবস্থা করতেন। জামিয়া পটিয়ার কয়েকজন উস্তাদের বেলায় তিনি এভাবে এগিয়ে এসেছিলেন। এর সাক্ষী আমি নিজেই। হয়তো সে আমলের বরকতে তিনি কারো মুহতাজ হওয়া ছাড়াই দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পেরেছেন।
হযরতুল আল্লাম মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী সাহেব জামিয়া পটিয়ার মুহতামিম থাকা অবস্থায় হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ)-কে এক সময় লন্ডনের ভিসা বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সময় শুনতাম নদভী সাহেব জামিয়ার জন্য মোটা অংকের চাঁদা আনতেন। এই ধারা হয়তো কয়েক বছর অব্যাহত ছিল। এ ক্ষেত্রেও জামিয়া পটিয়ার জন্য তাঁর বিশাল খিদমত রয়েছে। কয়েক বছর পর তাঁর ভিসা বাতিল হয়ে যায়। এর পরও তিনি লন্ডনের ভিসা নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন বলে শোনা যেত। তবে আর ভিসা হয়নি। এই কয় বছর তিনি মনভরে জামিয়া পটিয়ার জন্য চাঁদা কালেকশনের কাজ করতে পেরেছেন। এর জন্য তিনি খুশিও ছিলেন।
আমার দাদাজি জামিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম শায়খুল হাদীস হযরত ইমাম সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বিশ্ৰুত আছে, তাঁর উপস্থিতিতে কেউ ইমামতি করতে যেতেন না। বহু ক্বারি সাহেবও তাঁর ইমামতি করতে ভয় পেতেন। কারণ সামান্য ব্যতিক্রম হলেই তিনি নামায শেষে ইমাম সাহেবকে পাকড়াও করতেন। আমরা দেখেছি, হযরত ইমাম সাহেব (রহিমাহুল্লাহ)-এর উপস্থিতিতেও হযরত নদভী সাহেব দীর্ঘদিন জুমু’আ পড়াতেন। তাতে বোঝা যায়, হযরত ইমাম সাহেবও তাঁর ইমামতি পছন্দ করতেন। তিনি দীর্ঘদিন থেকেই জামিয়া পটিয়ার জামে মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঈদের জামাতের ইমামতিও করেছেন।
তিনি বড় বক্তা ছিলেন না, তবে তাঁর আন্তরিক নসিহা মুসলমানদের মন কাড়ে। পটিয়ার আতরাফ হাম আক্বীদার জন্য খুব ছোট। কিন্তু নদভী সাহেবের আন্তরিকতাপূর্ণ নসিহা অন্য আক্বীদার লোকেরাও পছন্দ করতেন। তিনিও তাঁদের মুহব্বত করে আন্তরিকভাবে কাছে টানতে চাইতেন। তাঁরাও তাঁকে মুহব্বত করতেন। বিভিন্ন আতরাফের অন্য আক্বীদার লোকজনও তাঁর ওয়াজ-নসিহা শোনার জন্য তাঁকে দাওয়াত করতেন।
জামিয়া পটিয়ায় ছাত্রাবাস তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন একটি জটিল অধ্যায়। বহু বড় আলেম এই দায়িত্ব পালন করেছেন। সফলভাবে এই দায়িত্ব যাঁরা পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে নদভী সাহেব অন্যতম। তিনি কঠোরতার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর আমলে এমনও সময় গেছে জামিয়া পটিয়ার মসজিদে কোনো মসবুক ছিল না। বড় আশ্চর্যের বিষয় ছিল তিনি এত কঠোরতা করতেন তার পরও তালিবে ইলমগণ তাঁকে মুহব্বত করতেন। এটি কিন্তু বড় অর্জন। এর মধ্যে দায়িত্ব পালনে তাঁর আন্তরিকতা ও খুলুসিয়্যাত ফুটে ওঠে।
তাঁর জীবনে খুশিও ছিল আবার দুঃখভরা অধ্যায়ের অভাব ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন নিশ্চিত, শান্ত, স্বাভাবিক। একসময় তাঁর বিরুদ্ধে ডজনের বেশি মামলা ছিল। একই দিন দেশের এপার থেকে ওই পার সফর করতে হয়েছিল হাজিরা দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে মাদরাসার সবক। সব কিছু একসাথে আঞ্জামও দিয়েছেন, আবার এক মিনিট ঘুমের ব্যাঘাতও ঘটেনি—তিনি হলেন নদভী সাহেব। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাল যশোর গেলেন, আজ দশটায় পটিয়ায় পৌঁছলেন, তৎক্ষণাৎ সবকে চলে গেলেন, ঘুমালেন কখন। তিনি বললেন, গাড়িতেই ঘুম হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ের বাস্তবতার নিরিখে তাঁর এসব খুবই আশ্চর্য মনে হতো। এতগুলো টেনশনের কারণ উপস্থিত, কিন্তু তাঁর মাথায় যেন কোনো টেনশন নেই। আসলে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং জুহদ ছাড়া এভাবে হয় না।
দীর্ঘদিন থেকে জামিয়া পটিয়ার জামে মসজিদে জিকির, দু’আ, ই’তিকাফ ইত্যাদি আমল তিনি গুরুত্ব সহকারে ধরে রেখেছিলেন। জামিয়ার মুরব্বিদের আমানত তাঁদের মতো করেই ধরে রাখার চেষ্টা করতেন হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ)। জিকিরের ব্যাপারে জামিয়া পটিয়ার একটি খ্যাতি আছে প্রাচীন যুগ থেকেই। মুরব্বিদের বিয়োগ হওয়ার মধ্য দিয়ে এসব আমলেও ভাটা পড়ার কাছাকাছি ছিল জামিয়া। কিন্তু হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) সব সময় চেষ্টা করতেন এসব আমলে যেন কমতি না আসে। মুরব্বিরা যেভাবে এই আমলগুলো করতেন, সেগুলো যেন সেভাবেই স্থায়ী হয়, সেই চেষ্টা করতেন। জিকির, তাহাজ্জুদ, দু’আয় তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। ছাত্রদের হালকা বানিয়ে দিয়ে সাহরির সময় জিকির, দু’আ ও রোনাজারির জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। ছাত্ররাও তাঁর তত্ত্বাবধানে এসব আমলে ব্যাপক সাড়া দিতেন।
আসলে আল্লাহ তা’আলার কারিশমা বোঝা কঠিন। জামিয়া পটিয়ার শায়খুল আদব হযরত আল্লামা সুলতান যওক সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) যে বছর জামিয়া পটিয়া ত্যাগ করেন তার পরের বছর বা তার পরের বছর হযরত মাওলানা আবু তাহের নদভী সাহেব জামিয়া পটিয়ার উস্তাদ হন। আমরা তো তখন ছোট। তৎকালীন দাওরা মেশকাতের আমাদের বড় ভাইয়েরা, এমনকি কিছু কিছু উস্তাদও হেয় প্রতিপন্ন করে বলতেন, দেখো! আল্লামা যওক সাহেবের স্থলে আবু তাহের নদভীকে রেখেছে! এটি আসলে তৎকালীন জামিয়া কর্তৃপক্ষকে হেয় করার জন্য বলত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিগত দিনে হযরত নদভী সাহেব যখন জামিয়া পটিয়ার মুহতামিম ঘোষিত হলেন তখন কিন্তু আমার অন্তরে দীর্ঘদিন আগের ওই চিত্র স্মরণে এসে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। কারণ তখন হযরতুল আল্লাম মাওলানা সুলতান যওক সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) জীবিত ছিলেন। সময়ের ব্যবধানে আল্লামা আবু তাহের নদভী জামিয়ার মুহতামিম হয়ে গেলেন! অনেক সাথীকে আমি বিষয়টি বলেছি। আল্লাহর কারিশমা এখানেই। তখন আমার মনে আসে চল্লিশ বছর পূর্বের জামিয়া কর্তৃপক্ষ মাওলানা আবু তাহের নদভীকে জামিয়ায় নিয়োগ দেওয়াটা আল্লাহর বিশেষ হিকমতের অধীন ছিল। যাঁরা এই নিয়োগকে হেয় দৃষ্টিতে দেখে ছিলেন তাঁদের অবস্থানটি হকের ওপর ছিল না। কার দ্বারা আল্লাহ তা’আলা কী কাজ নেবেন, তা আল্লাহই ভালো জানেন। এ ক্ষেত্রে বান্দার কোনো হাত নেই। যে পরিস্থিতিতে তাঁকে জামিয়ার মুহতামিম বানানো হলো, তা ছিল জামিয়ার জন্য একটি অভূতপূর্ব নাজুক পরিস্থিতি। তিনি ছাড়া ওই পরিস্থিতিতে হয়তো অন্যের দ্বারা সামাল দেওয়া মুশকিল হতো। আল্লাহ তা’আলা তাঁর দ্বারা ওই জরুরি মুহূর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। খুব কম সময় হলেও তিনি অনড়, অবিচল থেকে অত্যন্ত সাহসিকতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন।
জামিয়ার মুহতামিম হওয়ার পর তাঁর মাঝে জামিয়ার উস্তাদদের প্রতি যে আন্তরিকতা দেখেছি, তা সত্যিই স্মরণ রাখার মতো। তিনি এক সময় আমাকে বলেছিলেন, আমি জামিয়ার উস্তাদদের যেকোনো সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করেছি। যে যেটা বলেছেন, সেটা দ্রুত সমাধান করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। তাঁর কথাগুলো শুনে আমার মনে হয়েছিল তিনি আসলেই সবার প্রতি আন্তরিক। উস্তাদদের সমস্যাগুলো সমাধান করাই ছিল তাঁর এহতেমামির প্রধান ও প্রথম চয়েজ। এর জন্য হয়তো তিনি বড় ধরনের বাজেটও দিয়েছিলেন। অতঃপর তালিবে ইলমদের প্রয়োজনীয় বিষয়াদির প্রতি মনোনিবেশ করেন। ছাত্রদের সহজতার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিশেষ করে খানাপিনার মান উন্নয়ন, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতে বিদ্যুৎ-পানি ইত্যাদির পর্যাপ্ত জোগাড়, ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা ইত্যাদি কাজ আন্তরিকভাবে সম্পন্ন করেন। অতঃপর জামিয়ার সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন রুচিশীল দৃষ্টিনন্দন কাজেরও আঞ্জাম দেন।
জামিয়ার স্থগিত ও স্তিমিত থাকা বহু কাজ তিনি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করেন। দেশের দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো বিভিন্ন সেবামূলক কর্মসূচি একসময় জামিয়ার পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে আঞ্জাম দেওয়া হতো। সেরূপ বহু কাজ স্থগিত ছিল। আবার কিছু কাজে ধীরতা আসে। হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) এসব কাজকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সচেষ্ট হন। এরূপ কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি বিভিন্ন এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান। দেশের নেতৃত্ব পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করাও জামিয়া পটিয়ার একটি ঐতিহ্য ছিল। হযরত নদভী সাহেব এই কয় বছর দেশে আলেম-উলামার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে যত প্রোগ্রাম হয়েছে প্রায় সবটিতে অংশগ্রহণ করে জামিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এতদ সামান্য পরিসরে তিনি যেকোনো কাজে হাত দিয়েছেন সর্বাধিক মেহনত করে হলেও তা সম্পন্ন ও সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর হতে এমন বরকতও দিয়েছেন যে তিনি সব কাজ পরিপূর্ণ করেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।
জামিয়ার অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, হযরত নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) প্রতিটি কাজ দ্রুত সম্পাদন এবং মানসম্মত ও রুচিশীল হওয়াকেই পছন্দ করতেন। এর জন্য উদার মনে বাজেট পাস করে দিতেন। কর্মকর্তাদের কাজে সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতা দিতেন। কর্মঠ ব্যক্তিদের যথাসাধ্য মূল্যায়ন করতেন। কোনো ক্ষেত্রে হীনম্মন্যতাকে প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি চাইতেন মাদরাসায় নিত্যনতুন কাজ হোক এবং দ্রুত সময়ে তা সম্পন্ন হোক। এর জন্য যা প্রয়োজন, তা-ই করতে প্রস্তুত থাকতেন।
বিভিন্ন মহল থেকে তাঁর সমালোচনা করা হলেও নিজেকে অন্যের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি সূত্রে জানা যায়, তিনি মুহতামিম হওয়ার আগে ও পরে তাঁর ফোনে বিভিন্ন দিক থেকে গালাগাল ও মন্দ ব্যবহারের সম্মুখীন হতেন। হুজুর এসবের কোনো উত্তর দিতেন না। শুনে থাকতেন। অনেক ক্ষেত্রে অশ্রু টলমল করত। কিন্তু নিশ্চুপ শুনতে থাকতেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলতেন, সত্যটা জানার জন্য আপনি মাদরাসায় আসেন। এসে দেখে যান আপনার শ্রুতগুলো সত্য নাকি বাস্তবতা এর বিপরীত।
জামিয়ার ঐতিহ্য ও অভিভাবকত্ব রক্ষায় ছোট-বড় সব মাদরাসার দাওয়াতে তিনি যেতেন। উপস্থিত হয়ে নসিহা পেশ করতেন, দু’আ করতেন। প্রায় ক্ষেত্রে হাদিয়া গ্রহণ করতেন না। অনেক ছোট মাদরাসার দাওয়াতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে যথাসাধ্য দিয়ে এসেছেন-এমন নজিরও আছে বলে সূত্র জানায়। মূলত জামিয়া পটিয়ার দীর্ঘকালের ঐতিহ্য ছিল এটি, দাওয়াতে গিয়ে হাদিয়া না নেওয়া বরং কিছু দিয়ে আসা। পরবর্তী এই ঐতিহ্যে সামান্য ব্যতিক্রম ঘটলেও আল্লামা নদভী সাহেব (রহিমাহুল্লাহ) তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট ছিলেন। অনেক দাওয়াতে হাদিয়া গ্রহণ করার পর তা পুনরায় মাদরাসার জন্য রসিদ করে দিয়ে দিতেন।
পাহাড়সম ধৈর্যশক্তি ছিল তাঁর। তাঁর সাথী-সঙ্গী-সহকর্মীদের অনেকে তাঁর সাথে রাগত স্বরে কথা বলতেন। হাসাচ্ছলে এমন কথাও বলে ফেলতেন সাধারণ মানুষ তা সহ্য করতে পারে না। কেউ কেউ হুকুমের স্বরে কথা বলতেন। সর্বাবস্থায় তিনি হেসে বরণ করে নিতেন। এমন ঘটনাও আছে, তাঁর চেয়ে ছোট কেউ তাঁকে রাগত স্বরে এমন কথা বলে ফেলেছেন, পরবর্তী সে নিজেই এর জন্য লজ্জিত হয়ে বললেন, নদভী সাহেব! আপনাকে ওই দিন আমি খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। হযরত নদভী সাহেব তাঁকে বলতে শোনা গেছে, আপনি সেভাবে না বললে আমি এই পর্যন্ত আসতে পারতাম না। বলেছেন, সেটা আমার জন্য ভালো হয়েছে। অথচ তিনি জামিয়া পটিয়ার মুহতামিম। এমন ধৈর্য ও নম্রতা সত্যিই এ যুগে বিরল।
যাঁরা বেশির ভাগ সময় তাঁর কাছে ছিলেন, তাঁরা অবশ্যই তাঁর মাঝে এমন বহু গুণ লক্ষ করেছেন, যা মানুষের জন্য শিক্ষণীয়। আখলাকী গুণ হোক বা চাল-চলনের, স্বভাব-চরিত্রের হোক বা লেনদেন, ইবাদত হোক বা দায়িত্ব পালনে-সর্বদিক থেকে তাঁর মাঝে বহু শিক্ষণীয় গুণাগুণ বিদ্যমান ছিল। এরূপ গুণাগুণ ও যোগ্যতার কথা বর্তমান ফিতনার যুগে বেশি বেশি প্রচার হওয়া জরুরি। বিশেষ করে অসংখ্য ফিতনার মাঝে এরূপ গুণগুলো তারকার মতো জাজ্বল্যমান থাকে। আশা করব, তাঁর কাছের ব্যক্তিরা তাঁর গুণাবলি আমানতদারির সাথে প্রচার করবেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘটনাও উদ্ধৃত হতে পারে। বাস্তব ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ হলে আগন্তুক প্রজন্ম তা থেকে আরো ব্যাপকভাবে উপকৃত হতে পারবে।
আল্লাহ তা’আলা উস্তাদে মুহতারামকে জান্নাতে আলা মকাম দান করুন। তাঁর নেক আমলের উসিলায় আমাদেরও কবুল করুন। আমিন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ