---

প্রশ্নোত্তর-ফতওয়া বিভাগ-আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া

সমস্যা ও সমাধান ফতওয়া বিভাগ আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

বিদআত-কুসংস্কার

সমস্যা: আমাদের দেশে প্রচলন আছে যে, অসতর্কতা বসত শরীরের পা লাগলে তাকে সালাম করা হয়। না করলে মানুষ বেআদব বলে, এব্যাপারে শরীয়তের নির্দেশনা কী?

মুহাম্মদ ইমন

বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: প্রশ্নোল্লিখিত প্রথা শরীয়তের দৃষ্টিতে ভিত্তিহীন। তবে এসব ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নেবে। শামী: ৬/৩৮৩

সমস্যা: নিম্নের প্রশ্নগুলোর শরয়ী সমাধান বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

  1. আমাদের দেশে প্রচলন আছে যে, কোন ব্যক্তি মারা গেলে চতুর্থ, পঞ্চম বা চল্লিশতম দিনে বা বছরের মাথায় বা যে কোন সময় মৃত ব্যক্তির ইসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্য ধনী, গরীব ও আত্মীয়-স্বজন সবাইকে মেযবান খাওয়ানো হয়। তার শরয়ী হুকুম কী?
  2. যারা মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফন ও কবর খননের ব্যবস্থা করে তাদেরকে খানা খওয়ানোর যে প্রচলন আছে তার শরয়ী হুকুম কী?

মাও. মোয়াজ্জম হক

টেকনাফ, কক্সবাজার

শরয়ী সমাধান:

  1. কোন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার ঘরে আত্মীয়-স্বজনের পুনর্মিলনিতে সমাজের লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজন ধনী-গরীব নির্বিশেষে মৃত্যুর চতূর্থ দিন বা পঞ্চম দিন ইত্যাদিতে যে যিয়াফতের অনুষ্ঠান করা হয় তা ইসলামী শরীয়ত মতে একটি কুসংস্কার এবং ধর্মীয় আবরণে একটি বিদআত কাজ। কেননা এধরণের যিয়াফত খুশির সময়ে করা হয়; মসিবতের সময় নয়। বরং মসিবতের সময় মৃত ব্যক্তির পরিবারবর্গের জন্য তিনদিন পর্যন্ত আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে পানাহারের ব্যবস্থা করা সুন্নাত এবং তার পরে করলেও কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু তার বিপরীত আমাদের দেশে মৃত ব্যক্তির পরিবারবর্গ থেকে দাবি করে চার দিনা ইত্যাদি যিয়াফত উসূল করা হয় এবং মৃত ব্যক্তির পরিবারবর্গে এতিম নাবালেগ থাকলে বা তাদের ওপর পরের ঋণ ও কর্জ থাকলে বা মৃত ব্যক্তির নামায-রোজা ইত্যাদির ফিদয়া থাকলেও কোন লক্ষ্য করা হয় না। এটা কত বড় অন্যায় ও জুলুম, ইসলামী শরীয়তের মধ্যে তার কোন স্থান নেই এবং সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদিনের স্বর্ণযুগে ও তার কোন প্রমাণ নেই। সুতরাং এ প্রথা ও কু-সংস্কার বর্জন করা মুসলমান জনসাধারণের জন্য একান্ত কর্তব্য ও জরুরি। অবশ্য মৃত ব্যক্তির পরিবারবর্গের অধিক সুযোগ-সুবিধা থাকলে মৃত ব্যক্তির রূহের ইসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে অনির্দিষ্ট কোন দিনে কিছু ফকির-মিসকিনকে পানাহারের ব্যবস্থা করা, কিছু দান করা বা ছদকা করা যেতে পারে তবে তা বালেগদের পক্ষ থেকে হতে হবে।
  2. আমাদের দেশে যেহেতু প্রায় জায়গায় মহল্লাবাসীদের পক্ষ থেকে যারা মৃত ব্যক্তির কবর খনন করে এবং দাফনের ব্যবস্থা করে তারা সাধারণত তার কোন পারিশ্রমিক ও বিনিময় নেয় না। তাই তাদের যদি কোন সময় এহসান হিসাবে তাদের পানাহারের ব্যবস্থা করা হয় তাতে কোন অসুবিধা নেই। সূরা আর-রাহমান: , রদ্দুলমুহতার: ২/১৪০, বজ্জাজিয়া, আলমগীরীর হাশীয়াতে: ৬/৩৭৯

সমস্যা: আমি একজন হানাফী মাযহাবের অনুসারী যদি বিশেষ কোন মাসআলায় অন্য মাযহাব তথা শাফেয়ী মালেকী বা nv¤^jx থেকে একটি মাযহাব অনুসরণ করি, তাহলে ইসলামী শরীয়ত এটা কতটুকু সমর্থন করে। বিস্তারিত জানালে উপকৃত হবো।

মাও. ইকবাল হুসাইন

চাটখিল, নোয়াখালী

শরয়ী সমাধান: নির্দিষ্ট মাযহাবের তাকলীদ ও অনুসরণ করার পর কোন বিজ্ঞ আলেমের জন্যও উক্ত মাযহাবের দলীলের চেয়ে অন্য কোন মজবুত দলীল ব্যতীত মাযহাব ত্যাগ করা জায়েয নেই। সুতরাং কোন সাধারণ আলেম ও জনসাধারণের জন্য কোন অবস্থাতেই অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা জায়েয ও বৈধ নয়; নতুবা দীন-ধর্ম মানুষের সুযোগ-সুবিধা ও খেল তামাশায় পরিণত হয়ে যাবে। রদ্দুল মুহতার: ১/৮০, ফাতাওয় ইবনে তাইমিয়্যাহ: ২০/২২০

সমস্যা: রাসূল (সা.) সব জায়গায় হাজির-নাজির কি না? কুরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানালে উপকৃত হবো।

মাওলানা সরওয়ার

টেকনাফ, কক্সবাজার

শরয়ী সমাধান: হাজির ও নাজির দুটাই আরবি শব্দ। যার অর্থ সেই সত্তা যার অস্তিত্ব একই সময়ে গোটা দুনিয়ায় আবিষ্টিত এবং দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার দৃষ্টির সামনে উপস্থিত থাকে। সুতরাং কুরআন ও হাদিসের আলোকে হাজির-নাজির কথাটি একমাত্র আল্লাহ তাআলার ব্যাপারেই প্রযোজ্য। রাসূল (সা.) হাজির-নাজির বা সর্বত্র বিরাজমান থাকার আকীদা শরীয়ত ও যুক্তিগত উভয় দিক থেকেই ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। তাই এরূপ ধারণা পোষণ করা থেকে প্রত্যেক মুসলমানের বিরত থাকা একান্ত আবশ্যক। কারণ এটা একটি শিরকী আকীদা, যার কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। সূরা ইউসুফ: ১০২, সূরা আল-কাসাস: ৪৪, মাহমুদিয়া: ১৫/১০৮

সমস্যা: কবর যিয়ারত করে টাকার আদান-প্রদান কি জায়েয? ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কোরান খতম করে টাকা দেওয়া-নেওয়া কি জায়েয আছে? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

আবদুস সুবহান

ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: কবর যিয়ারত করে এবং ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কোরান শরীফ খতম করে টাকা দেওয়া-নেওয়া কোনটাই জায়েয নেই। তাতকীহুল ফাতওয়াল হামিদিয়া: ২/১৩৮, কিফায়াতুল মুফতি: ৯/৪৬

তাহারাত-পবিত্রতা

সমস্যা: আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, অযু করার পর সতর দেখা গেলে বা পরপুরুষ এর সামনে পড়লে অযু পুনরায় করতে হয়। এই কথাটা সত্য কি না?

মু. মুহিব্বুল্লাহ

মিরসরাই, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: আমাদের সমাজে যা প্রচলিত আছে অর্থাৎ অযু করার পর সতর দেখা গেলে বা পর পুরুষের সামনে পড়লে পুনরায় অযু করতে হয়, এই কথাটা সম্পূর্ণ অবাস্তব। তাই উল্লিখিত অবস্থায় পুনরায় অযু করতে হবে না। তবে, সতর দেখা বা দেখানো এবং পর পুরুষের সামনে যাওয়া হারাম ও না জায়েয। মাবসুতে সারাখসী: ১/১৯৬, আলমুহীতুল বুরহানী: ১/৪৭, আল-ফিকহুল, আহসানু ফাতাওয়া: ২/২৪

সমস্যা: ইঞ্জেকশন দিয়ে শরীরে রক্ত প্রবেশ করানো হলে অযু ভঙ্গ হবে কি? সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

আজীজুল হাসান

চকরিয়া, কক্সবাজার

শরয়ী সমাধান: ইঞ্জেকশন দিয়ে শরীরে রক্ত প্রবেশ করানো হলে অযু ভঙ্গ হয় না। কেননা হাদিস শরীফে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, শরীরে কোন কিছু প্রবেশ করানো হলে অযু ভঙ্গ হয় না। তবে, ইঞ্জেকশন বের করার পর ওই স্থান থেকে রক্ত বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে বা সেই পরিমাণ রক্ত বের হলে অযু ভঙ্গ হয়ে যাবে। সুনানে বায়হাকী: ১/১৮৭, কিতাবুল আসল: ১/৫৮, বাদায়েউস সানায়ে: ১/১১৯

সমস্যা: যদি কোন মহিলা (মাসিক স্রাব) হায়েযের অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করতে চায় তখন স্পর্শবিহীন দেখে দেখে তিলাওয়াত করতে পারবে কি? এবং সে যদি হেফজখানার শিক্ষক বা ছাত্রী হয়ে থাকে তখন কুরআন তিলাওয়াতের কোন সুযোগ আছে কি? উল্লেখ্য যে, আমাদের এখানে একজন আলেম ফতওয়া দিয়ে থাকেন যে, হায়েজা মহিলা স্পর্শ করা ব্যতীত কুরআন তিলাওয়াত করতে শরয়ী কোন সমস্যা নেই। এবং «لَا يَقْرَأُ الْـجُنُبُ وَلَا الْـحَائِضُ شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ» বর্ণিত হাদিসকে দুর্বল বলেন ইসমাইল ইবনে আইয়াল নামাক রাওয়ীর কারণে। তাই আপনার কাছে শরয়ী সমাধানের আবেদন করছি।

মাও. মুসা সাহেব

বাঁশখালী, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: আমাদের জমহুরে ফুকাহায়ে কেরামের মতে কোন মহিলা হায়েজা অবস্থায় আল্লাহর বাণী পবিত্র কুরআন মজীদ তিলাওয়াত ও স্পর্শ কোনটা করতে পারবে না। তার জন্য কুরআন শরীফ স্পর্শ করা ও তিলাওয়াত করা উভয়টিই মাকরুহে তাহরিমী। কেননা হাদিস শরীফে রাসুল (সা.) মহিলাদেরকে হায়েয অবস্থায় কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে নিষেধ করছেন এবং উক্ত হাদিসের সনদের মধ্যে একজন বর্ণনাকারীর দ্বারা কিছু দুর্বলতা আসলেও সেই হাদিস ব্যতীত অন্য হাদিসের মধ্যে নবী করীম (সা.) মহিলাদেরকে হায়েয অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষেধ করেছেন। এধরনের কিছু মাউকুফ হাদিসের মধ্যে রয়েছে যা মারফু হাদিসের মধ্যে গণ্য হবে সুতরাং জমহুরে ফুকাহায়ে কেরামের মাযহাবের বিপরীতে আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যার কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। সাথে সাথে জমহুরের মাযহাবে সতর্কতাও রয়েছে এবং কুরআনের ইজ্জত-সম্মানের দিকেও বেশী লক্ষ্য করা জরুরি বিষয়। আর মহিলাদের জন্য কুরআন শরীফ হেফজ করা জরুরি বিষয় নয়। হায়েযের চার-পাঁচ দিনের দ্বারা কুরআন শরীফ হেফজের মধ্যে কোন প্রভাব পড়বে না। সুতরাং তার জন্য হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমলের বিরোধিতা ও চার ইমামের বিরোধিতা করা জায়েয হবে না। যে বর্ণনাকারীকে দুর্বল বলা হয়েছে তার মধ্যেও মতবিরোধ রয়েছে। অনেক নির্ভরযোগ্য ইমাম যথা ইয়াহয়া ইবনে মুঈন, সুফিয়ান সাওরী, ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান ও ইয়াযিদ ইবনে হারুনসহ অনেক মুহাদ্দিসীনে কেরাম উক্ত বর্ণনাকারীকে সিকা বা বিশ্বস্ত বলে মত প্রকাশ করেছেন। সুতরাং এই বর্ণকারীর দুর্বলতা সম্পর্কে মতবিরোধ থাকায় এর দ্বারা উক্ত হাদিসকে যয়ীফ তথা দুর্বল বলা যাবে না। বরং উক্ত হাদিস হাসান এর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা দলীল হিসেবে গণ্য হয়। সুতরাং আমাদের হানাফী মাযহাব ও অন্যান্য মাযহাবে মহিলাদের জন্য হায়েয অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা হারাম ও নাজায়েয। কেননা সেই অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াত করা কুরআন শরীফের ইজ্জতের পরিপন্থী। সুনানে দারমী: ২৫২, সনানে দারে কুতনী: ১২৪, বাদায়েউস্‌সানায়ে: ১/১৬৭

সমস্যা: আমাদের দেশে অপারেশনের মাধ্যমে যেসব মহিলার বাচ্চা প্রসব হয় সেই মহিলাদের নিফাসের হুকুম কী?

মু. মুরশেদ করীম

আনোয়ারা, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: এ ব্যাপারে ফতওয়ায়ে শামীতে বলা হয়েছে যে, অপারেশনের পর যদি জরায়ু থেকে রক্ত বের হয় তাহলে সেটা নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি জরায়ু থেকে বের না হয় অপারেশনের জায়গা থেকে বের হয়, তাহলে সেটা নিফাস হিসেবে গণ্য হবে না এবং ওই মহিলার নামায ইত্যাদিও মাফ হবে না। তবে যদি সিজারের পর জরায়ুর মুখ খুলে গিয়ে তা থেকে রক্ত বের হয় তাহলে তা নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। কনযুদ দাকায়েক: ১৫, রদ্দুল মুহতার: ১/৪৯৬, খায়রুল ফাতওয়া: ২/১৪১

 

সালাত-নামায

সমস্যা: একজন খতিব মসজিদে জুমার নামায পড়ায়। কিন্তু সে খতিব মাযারে ওরশের সময় কাওয়ালি গায় এবং হারমোনির সুরে মানুষকে নাচায়। এখন প্রশ্ন হলো, ওই খতিবের নামায ঠিক হবে কি না? এবং তার পিছনে ইক্তেদা সহীহ হবে? বিস্তারিত জানিয়ে আমাকে উপকৃত করলে খুশি হবো।

নুরুল আলম চৌধুরী

চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় খতিব শরীয়ত গর্হিত কাজ করে অর্থাৎ মাজারে গিয়ে কাওয়ালি ইত্যাদি গান গায়, যা শরীয়ত মতে কবিরা গুনাহ, তার দ্বারা উক্ত খতিব ইসলামী শরীয়ত মতে ফাসেক হিসেবে গণ্য এবং ফাসেক ব্যক্তি ইমামতির অযোগ্য। তার ইমামতি মাকরুহে তাহরিমী ও না-জায়েয। আর যদি উক্ত খতিব রাসুল (সা.)-এর হার জায়গায় হাযের নাযের হওয়ার বা আলিমুল গাইব হওয়ার মত শিরকি আকীদা পোষণ করে, তখন তার ইমামতি এবং তার পিছনে নামায পড়া পরিষ্কার নাজায়েয এবং নামায সহীহ হবে না; পড়লেও পুনরায় পড়ে দিতে হবে। মুসনদে আহমদ: ৫/২৫৭, ফাতওয়ায়ে শামী: ২/৯৯, গুনয়াতুল মুসল্লি: ৫১৪, মাহমুদিয়া: ১০/১৫৪

সমস্যা: আমরা জানি আছরের নামাযের পর নফল নামায পড়া মাকরুহ। সেই সময় ওমরী কাজা পড়া যাবে কি?

মু. আবদুল্লাহ নোমান

সাহারবিল, চকরিয়া

শরয়ী সমাধান: আমাদের হানাফী মাযহাব মতে যদিও আছরের নামাযের পর সকল প্রকারের নফল নামায পড়া মাকরুহ। কিন্তু আছরের নামাযের পর সূর্যের আলো পরিবর্তণ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওমরী কাযাসহ যে কোন কাজা নামায আদায় করতে কোন অসুবিধা নেই। মাবসুতে সারাখসী: ১/৩০৪, ফতওয়া তাতার খানিয়া: ২/১৫, ত্বহত্বাভী: ১/৯১

সমস্যা: আযানের জওয়াবের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম মুস্তাহাব, সুন্নাত ইত্যাদি মতামত পেশ করেছেন। আমার জানার বিষয় হলো জুম’আর দ্বিতীয় আযানের জওয়াব দেওয়ার হুকুম কী? এ-ব্যাপারে খতিব সাহেব এবং মুসল্লি উভয়ের একই হুকুম? নাকি কোন ভিন্নতা রয়েছে?

আরিফুল ইসলাম

রাজঘাটা, লোহাগাড়া

শরয়ী সমাধান: আমাদের হানাফী মাযহাবের ফুকাহায়ে কেরামের মতে খুতবা শুরু করার আগে এবং খুতবা শেষ হওয়ার পর নামায শুরু করার আগে দুনিয়াবী কথা বলা মাকরুহ। এ-ব্যাপারে খতিব ও মুসল্লির একই হুকুম। কিন্তু দীনী কথা বলা সম্পর্কে কোন কোন ওলামায়ে কেরামের মতে খতিব সাহেবের জন্য তার অনুমুতি আছে। মুসল্লিদের জন্য অনুমতি নেই। কিন্তু শামী, বাহরুর-রায়েক, কিফায়া কিতাবাদী থেকে বুঝা যায় হয় যে, খতিব হোক বা মুসল্লি হোক সবার জন্য দীনী কথা বলা বৈধ। এ-ব্যাপারে হানাফী মাযহাবের ইমামগণ একমত। তাই উল্লিখিত প্রশ্ন-ক্ষেত্রে বলা যায় যে, খতিব এবং মুসল্লি সবার জন্য জুমার দ্বিতীয় আজান এর জবাব দেওয়া জায়েয হবে, মাকরুহ হবে না। তবে দুররে মুখতার কিতাবে মুখে উচ্চারণ করে জবাব দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই উচ্চৈঃস্বরে জওয়াব দেওয়া যাবে না। বরং নিম্নস্বরে জওয়াব দেওয়া যাবে। মাবসুতে সারাখসী: ১/৩৫২, বাদায়েউস সানায়ে: ১/৫৯৪, খুলাসাতুল ফাতায়া: ১/২০৬

শরয়ী সমাধান: ইমাম সাহেব যদি ভুলে উচ্চৈঃস্বরে কিরাতের মধ্যে সূরা ফাতিহার অধিকাংশ বা পুরো সূরা-ফাতিহা অথবা সূরা ফাতিহার পরে কিরাতের ও কিছু অংশ আস্তে পড়ে এরপর তার স্মরণ আসে তখন তার করণীয় কী? তিনি কি পুনরায় সূর ফাতিহা থেকে উচ্চৈঃস্বরে কিরাত শুরু করবে? না কি যে পরিমাণ আস্তে পড়েছেন তার পর থেকে উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত পড়া শুরু করবেন? এবং উভয় অবস্থায় সিজদায়ে সাহু আবশ্যক হবে কি?

শরয়ী সমাধান: উচ্চৈঃস্বরে কিরাত বিশিষ্টি নামাযের মধ্যে তিন আয়াত বা তার থেকে বেশী পরিমাণ কিরাত যদি নিম্নস্বরে পড়ে তখন তার ওপর সিজদা সাহু ওয়াজিব হবে। তাই উল্লিখিত ক্ষেত্রে সূরা-ফাতিহা পুনরায় পড়তে হবে না; বরং যে পর্যন্ত আস্তে-আস্তে পড়েছে তার পর থেকে উচ্চৈঃস্বরে পড়বে এবং নামায শেষে সিজদা সাহু করবে, তাহলে নামায সহীহ ও শুদ্ধ হয়ে যাবে। সুনানে আবু দাউদ: ১/১৩৯, মুনয়াতুল মুসল্লি: ১৫৪, রদ্দুল মুহতার: ১/৩৫৭

যাকাত-সাদাকাত

সমস্যা: মাদরাসার জন্য যাকাতের টাকা উসূল করে মাদরাসায় জমা না করে (তামলীক করা ব্যতীত) যদি উক্ত যাকাতের টাকা দ্বারা যাকাত উসূলকারী ব্যক্তি তার জন্য ভিসা বানিয়ে নেয়, তা জায়েয বা বৈধ হবে কি? এবং যাকাতদাতাদের যাকাত আদায় হবে কি না?

মুহাম্মদ তাওফিক

 আনুয়ারা, চট্টগ্রাম

সমাধাণ: প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়ে মুফতী শফী সাহেব (রহ.)-এর সর্বশেষ মত হলো মাদরাসার মুহাচ্ছিলের নিকট যাকাতের টাকা ওই মাদরাসার ফকির-মিছকিনদের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করার সাথে-সাথে তামলিকের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। কেননা যেই মাদরাসার মুহাচ্ছিল বা মুহতামিম ছদকা-যাকাতের টাকা উসূল করে সে ওই মাদরাসার ফকির-মিছকিনদের পক্ষ থেকে উকিল তথা প্রতিনিধি হয়ে থাকে এবং ফকির-মিছকিনদের উকিল বা প্রতিনিধির হাতে যাকাত-ছদকার টাকা দিলে ফকির মিছকিনদের হাতে দেওয়ার মতো لان يد الوكيل يد المؤكل (অর্থাৎ উকিলের কবজা মুআক্কিলের কবজার মত) তাই যাকাত-ছদকার টাকা মুহাচ্ছিলগণ গ্রহণ করার সাথে সাথে তামলিকের কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে এবং যাকাত দাতাগণের যাকাত আদায় হয়ে যাবে। অতঃপর তিনি যদি মাদরাসার ফকির-মিছকিনদের স্বার্থে সেই টাকা ব্যবহার করেন তা জায়েয ও সহিহ হবে। সুতরাং মুহাচ্ছিল যদি মাদরাসায় অবস্থানরত ফকির-মিছকিনদের কল্যাণের লক্ষ্যে যাকাতের টাকা দিয়ে ভিসা করে থাকে, তাতে কোন অসুবিধা হবে না; বরং তা জায়েয ও বৈধ হবে। কেননা তা উক্ত মাদরাসার ফকির-মিছকিনদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোন অবস্থায় তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী: ৫/৫০২, ফতওয়ায়ে শামী: ২/২৬৯, ফতওয়ায়ে শামী: ২/২৭০, জাওয়ারিুল ফিকহ

সমস্যা: জনৈক ব্যক্তির তিন সন্তান রয়েছে। সে তার আয়ের অংশ প্রতিমাসে তার ছেলেদের বণ্টন করে দেয়। যার ফলে সন্তানদের সম্পদের পরিমাণ যাকাতের নেসাব পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এমতাবস্থায় তাদের ওপর যাকাত ফরয হবে কি না? হলে কীভাবে আদায় করবে? এবং কারা আদায় করবে?

আবদুল্লাহ আল ফায়সাল

সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: প্রশ্নে উল্লিখিত ক্ষেত্রে প্রত্যেক বালেগ সন্তানের টাকা ও সম্পদ যদি নেসাব পরিমাণ বা তার অধিক হয়, অনুরূপ বাপের সম্পদও যদি নিসাব পরিমাণ বা তার অধিক হয় তখন প্রত্যেকের ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে। আর বর্তমান বাজার দর হিসেবে নিসাবের পরিমাণ হলো সাড়ে বায়ান্ন হাজার টাকা।সুতরাং তাদের প্রত্যেক কে নিজ নিজ মালের হিসাব করে পৃথক পৃথকভাবে যাকাত আদায় করতে হবে। সহীহুল বুখারী: ১/১৮৭, রদ্দুল মুহতার: ১/১৭৩, হিদায়া: ১/১৬৫

সমস্যা: ক. যাকাতের ক্ষেত্রে নেসাবের পরিমাণ বাদ দিয়ে যে অতিরিক্ত সম্পদ থাকে শুধু তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে? নাকি নেসাবসহ সব সম্পদের ওপর যাকাত আসবে?

খ. বর্তমানে যাকাত স্বর্ণের হিসেবে দেবে? নাকি রূপার হিসেবে?

মু. ছালিম আহমদ

ডেমুশিয়া, কক্সবাজার

শরয়ী সমাধান:

  1. স্মরণ রাখতে হবে যে, টাকা-পয়সা স্বর্ণ-রুপা এবং ব্যবসার বিক্রিযোগ্য মালামাল ও পণ্য বাজারি মূল্যের ওপর যাকাত ওয়াজিব হয়। যদি তা নেছাবের পরিমাণ বা তার অধিক হয়। আর যখন যাকাত ওয়াজিব হবে তখন নেছাবসহ অতিরিক্ত সম্পদের হিসাব করতে হবে।
  2. বর্তমানে যাকাতের নেসাব সাড়ে বায়ান্ন তোলা পরিমাণ রূপার মূল্য হিসেবে ধার্য করতে হবে। স্বর্ণের পরিমাণ হিসেবে নয়; নতুবা গরীব মিসকিকরা যাকাত থেকে বঞ্চিত থাকবে। হিদায়া: ১/১৭৫, রদ্দুল মুহতার: ৩/২২৯, ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১৭৯, তাবয়ীনুল হাকায়েক: ১/২৭৯

সমস্যা: এক মহিলার দুই তোলা স্বর্ণ আছে এবং কিছু টাকা আছে উভয়টা হিসাব করলে রূপার নিসাব পূর্ণ হয়। তবে স্বামী কিছু স্বর্ণ বিক্রয় করে ছিলো, যার কারণে মহিলা স্বর্ণে নেসাবের মালিক নয়। স্বামী বলছে, আমি পরে ঐ স্বর্ণ এনে দেব দেয়ার আগে মহিলা নিসাবের মালিক না হওয়া অবস্থায় যাকাত নিতে পারবে কি না? মহিলার আপন ভাই যদি যাাকাতের টাকা থেকে কাপড় ইত্যাদি কিনে ওই মহিলাকে দেয় তখন ভাইয়ের যাকাত আদায় হবে কি?

মু. আবদুল্লাহ

পটিয়া, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: প্রকাশ থাকে যে, ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নেছাবের মধ্যে নগদ সম্পদের সঙ্গে সেসব প্রতিশ্রুত পাওয়া ঋণ অন্তর্ভুক্ত হবে যা পাওয়ার আশা থাকে সুতরাং কোন ব্যক্তির নিকট নগদ সম্পদ ও প্রতিশ্রুত পাওনা ঋণ মিলে যদি নেসাবের পরিমাণ হয় তাহলে তার ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে। তবে নগদ মালের যাকাত তৎক্ষণাৎ এবং প্রতিশ্রুত পাওনা ঋণের যাকাত ঋণ উসূল করার পর বিগত বছরের যাকাতসহ আদায় করতে হবে। আর এমন সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির জন্য অন্যের যাকাতের মাল নেওয়া ও এমন ব্যক্তিকে যাকাত দেয়া জায়েয ও বৈধ হবে না। সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত ক্ষেত্রে উক্ত মহিলার স্বামী যদি ওই স্বর্ণ এনে দেবে বলে মনে হয়। তাহলে সে নেসাবের মালিক বলে গণ্য হওয়ার কারণে তার নিজের ওপরই যাকাত ওয়াজিব, বিধায় তার জন্য অন্যের যাকাত নেওয়া জায়েয নয়। আর তার ভাইয়ের যাকাতের টাকা থেকে কাপড় ইত্যাদি নেওয়াও জায়েয হবে না। যদি দেয় তাহলে যাকাত আদায় হবে না। তাই যে পরিমাণ যাকাত তার বোনকে দিয়েছে তার সমপরিমাণ যাকাত পুনরায় আদায় করতে হবে। উল্লেখ্য যে, অনেক সময় যার ওপর যাকাত ওয়াজিব হয় না সে অন্যের যাকাত-সদকা ইত্যাদি নিতে পারবে না। যদি সে নেসাবের পরিমাণ স্বর্ণরুপা ক্যাশ টাকা ব্যতীত নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তুর অতিরিক্ত এমন সম্পদের মালিক হয় যার মূল্য উপস্থিত নেসাবের কম স্বর্ণ ওই টাকার সাথে মিলালে রূপার নেসাবের পরিমাণ হয়। তখন সে অপরের সদকা-যাকাত নিতে পারবে না। দুর্‌রে মুখতার: ৩/২৩৬, রদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৬, হিন্দিয়া: ১/১৮৬

 

মুয়ামালা-লেনদেন

সমস্যা: আমার পিতা এক লোককে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেয়। ঋণের বিপরীতে তার কাছ থেকে ১৫ কাঠা জমি বন্ধক নেয় এবং ওই জমিতে চাষাবাদ করে নিজে ভোগ করে। পরে ওই লোক যখন ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেয় তখন আমার পিতা তাকে ১০০ টাকা জমির ভাড়া বাবদ দেয়। যাকে আমাদের দেশে ক্ষয় বন্ধক বলে। এখন আমার জানার বিষয় হলো, এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয আছে কি না?

আবদুল মালেক

আলিকদম, বান্দারবন

সমাধা: প্রয়োজনবশত নিজের জমি অপরকে বন্ধক দেওয়া এবং এর বিনিময়ে বন্ধক গ্রহীতার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া জায়েয। সাথে সাথে ঋণ পরিশোধ করার পর বন্ধকদাতার নিকট জমি ফেরত নেওয়ার অধিকার থাকবে। এ-ক্ষেত্রে বন্ধকগ্রহীতার জন্য বন্ধকী বস্তু থেকে কোনভাবেই উপকৃত হওয়া জায়েয হবে না; চাই তার মধ্যে বন্ধকদাতার অনুমতি থাকুক বা না থাকুক। সুতরাং প্রশ্নোক্ত বর্ণনানুযায়ী প্রথমত আপনার পিতা ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে যে ১৫ কাঠা জমি বন্ধক নিয়েছে তােেত চাষাবাদ করা জায়েয হয়নি। কেননা তা সুদের অন্তর্ভূক্ত। দ্বিতীয়ত সুদ থেকে বাঁচার জন্য জমির খাজনা বা তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে নামেমাত্র যে ১০০ টাকা দিয়েছে তাও রেহেন তথা জমি অ্যাগ্রিমেন্ট পদ্ধতির মধ্যে ইজারা (ভাড়া) পদ্ধতি মিলে যাওয়ার কারণে তা জায়েয হয়নি। কেননা বন্ধকী বস্তুকে ভাড়া দেয়া যায় না। তাছাড়া এ ধরণের লেনদেন টাকা কর্য দেওয়া হয়ে থাকে বলেই নামেমাত্র কিছু খাজনা আদায় বা ১০০ টাকা কর্তনের বিনিয়ে অনেক জমি ভোগ করার সুযোগ লাভ হয়। অথচ টাকা কর্য না দিলে এত অল্প টাকায় এ পরিমাণ ভাড়া দেয়া সম্ভব ছিল না। হাদিস শরীফে আছে কর্যের বিনিময়ে যে লাভ আসে তা সুদের অন্তর্ভূক্ত। সুনানে কুবরা: ৮/২৭৬, রদ্দুল মুহতার: ৬/৪৮২, মাযমাউল আনহুর: ৪/২৩০, ইমদাদুল মুফতিয়্যীন: ১/৭২৫

সমস্যা: কোন ব্যক্তি তার কোন একটি কাজ করে দেওয়ার জন্য আমাকে উকিল বানিয়েছে। কাজটি আমি নিজে সম্পাদন না করে অন্য আরেকজনকে উকিল বানাতে চাইলে তা জায়েয হবে কি? এ ক্ষেত্রে মুয়াক্কিল যদি ওই কাজের বিনিময়স্বরূপ কিছু দিয়ে থাকে সেখান থেকে একাংশ আমি গহণ করতে পারব কি? যেমন মুয়াক্কিল উকালতির বিনিময়স্বরূপ আমাকে একশত টাকা দেয়। কাজটি আমি নিজে না করে মুয়াক্কিলের অনুমতি ব্যতীত আরেকজন উকিলকে ৫০ টাকার বিনিময়ে দিয়ে দেই। এ অবস্থায় আমার জন্য বাকি ৫০টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে কি?

সিফাতুল্লাহ

রামু, কক্সবাজার

শরয়ী সমাধান: প্রশ্নোক্ত বর্ণনানুযায়ী আপনার মুয়াক্কিল তথা দায়িত্ব প্রদানকারী যদি আপনাকে কাজ সম্পাদন করার ক্ষমতা কোন শর্তবিহীন আপনার হাতে পরিপূর্ণভাবে দিয়ে থাকেন তখন আপনি মুয়াক্কিলের অনুমতি বিহীন দ্বিতীয় আরেকজনকে উকিল বানাতে পারবেন। আর যদি মুয়াক্কিলের পক্ষ থেকে আপনাকে নির্দিষ্ট করে উকিল বানানো হয় অর্থাৎ কাজটি আপনি নিজেই সম্পাদন করার শর্তারোপ করে থাকেন তখন আপনার জন্য দ্বিতীয় উকিল বানানো জায়েয ও বৈধ হবে না। আর উকালতির বিনিময় নেওয়ার হুকুম হলো, ইসলামী আইনের সাথে দেশীয় আইন সাংঘর্ষিক হলে সেসব অবস্থায় উকালতি করা ও বিনিময় নেওয়া জায়েয নেই। পক্ষান্তরে যে সব আইন কানুন ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সেগুলো অনুযায়ী ফয়সালা করা বিনিময় নেওয়া জায়েয আছে। সুতরাং মুয়াক্কিল যদি বৈধ কাজের বিনিময়স্বরূপ আপনাকে বিনিময় প্রদান করে, তা গ্রহণ করা জায়েয হবে। এ ক্ষেত্রে মুয়াক্কিল কর্তৃক নিযুক্ত উকিল যদি কাজ সম্পাদনের জন্য দ্বিতীয় আরেকজনকে উকিল বানায় তখন উপরোল্লিখিত ১ম পদ্ধতি অনুযায়ী বৈধ হওয়া অবস্থায় যদি মুয়াক্কিল তার উকিলকে টাকা প্রদান করে তখন তারা উভয় উকিলের মধ্যে পারস্পরিক চুক্তি ও প্রথা অনুযায়ী ওই টাকা বণ্টন করতে পারবে। বাদায়েউস সানায়ে: ৬/২৫, হিন্দিয়া: ৪/৫১৩, ফাতওয়ায়ে হক্কানিয়া: ৬/৩৬৩

সমস্যা: কারো কাছে কোন কিছু আমানত রাখার পর যদি তা পরিপূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, কিংবা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন তার জরিমানা দিতে হবে কি?

মুহা. সায়েম

কিশুরগঞ্জ

শরয়ী সমাধান: ইসলামী শরীয়ত মতে কারো কাছে কোন কিছু আমানত রাখার পর তা যদি পরিপূর্ণ নষ্ট হয়, কিংবা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা যদি ওই ব্যক্তির পরিপূর্ণ সংরক্ষণ পাওয়া সত্ত্বেও হয়ে থাকে তখন তার জরিমানা দিতে হবে না। কেননা আমানতের ক্ষেত্রে যদি পরিপূর্ণ সংরক্ষণ পাওয়া যায় তখন তাতে জরিমানা দিতে হয় না। আর যদি পরিপূর্ণ সংরক্ষণ পাওয়া না যায় তখন তাতে জরিমানা দিতে হয়। যদি কোন শর্ত আরোপের ভিত্তিতে আমানত রাখে তখনও তাতে নির্ভরযোগ্য মতানুসারে জরিমানা দিতে হবে না। কেননা আমানতদার ব্যক্তিরকাছে জরিমানার শর্ত করা বাতিল। খুলাসাতুল ফাতওয়া: ৪/২২৮৯, মাযমাউল আনহুর: ৩/৪৬৮, মাউসুআয়ে ফিকহিয়্যা: ৪৩/২৪

 

নিকাহ-তালাক

সমস্যা: আমি মু. হানিফ। জনৈকা মহিলার সাথে আমার বিয়ের কথা চলছে। তার সাথে আমার কিছুটা আত্মীয়তার সম্পর্কও রয়েছে। অর্থাৎ আমার দাদা তার দাদার ফুফিকে বিয়ে করেছে। সেই হিসেবে সে আমার ভাইজী হয়। আমার জানার বিষয় হল, উক্ত সম্পর্কিত ভাইজির সাথে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক শুদ্ধ হবে কিনা? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

মুহাম্মদ হানিফ

কৈখাইন, আনোয়ারা

শরয়ী সমাধান: প্রশ্নে উল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী উক্ত মহিলা আপনার দূরসম্পর্কীয় ভাতিজী হিসেবে গণ্য হয়েছে। আপনার নিকটবর্তী কোন ভাতিজী নয়। তাই উক্ত মহিলার সাথে আপনার বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তে কোন বাধা নেই। বদায়েউস সানায়ে: ৩/৪১১, দুর্‌রে মুখতার: ৩/৩০, বিনায়া: ৫/২২

সমস্যা: আমি নিম্নে স্বাক্ষরকারী রিয়াজুল জান্নাত। স্বামীকে দেওয়া আমার তালাকনামা আপনাদের কাছে শরয়ী সমাধান জানার জন্য ইতঃপূর্বে পাঠিয়েছি। স্বামীকে তালাকনামায় নামরদ তথা পুরুষত্বহীন লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। আসলে উনি নামরদ নয়। আসল সমস্যা হল আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কের পর কোন বাচ্চা হচ্ছে না। তাই শুধু প্রচলিত আইনানুযায়ী তালাকনামায় পুরুষত্বহীন লিখা হয়েছে। এখন আমি পুনরায় তার সাথে সংসার করতে ইচ্ছুক বিধায় উক্ত বিষয় বিবেচনা করে আমাকে শরয়ী সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।

রিয়াজুল জন্নাত

শাহমীরপুর, কর্ণফুলী

শরয়ী সমাধান: উল্লিখিত ঘটনায় স্ত্রীর স্বীকৃতি মতে বিয়ের কাবিননামার ১৭ ও ১৮ নাম্বার কলামে যেসব শর্তাদির ভিত্তির ওপর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে তা যেহেতু লঙ্ঘন হয়নি, বরং সরকারি আইনের ধারা মতে শর্ত লঙ্ঘন হওয়ার কথা লেখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শর্ত লঙ্ঘন হয়নি। সুতরাং স্ত্রীর প্রতি তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পিত হয়নি এবং তার তালাক দেওয়াও সহীহ হয়নি বিধায় তাদের সাবেক নিকাহ বহাল রয়েছে। এখন তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেলামেশা ও ঘর-সংসার করতে ইসলামি শরীয়তে কোন অসুবিধা নেই। বরং জায়েজ ও বৈধ হবে। ইবনে মাজাহ শরীফ: ১/১৪৭, রদ্দুল মুহতার: ৪/৫৭৩, জামেউল ফুসুলাই, ১/২৯৬, ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৩৯১

সমস্যা: আমার নাম মো. আবুল কালাম। গত ১৫ মে ১৪ ইংরেজিতে আমার স্ত্রী রাবেয়া বেগমের কাছে তিন তালাকের একটি ডিভোর্সনামা পাঠিয়েছিলাম। ডিভোর্সনামাটি আমার স্ত্রী না দেখে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ চার বছর পর আমরা পুনরায় সংসার করতে চাচ্ছি এখন আমাদের ভুল সংশোধন করার জন্য শরয়ীভাবে কী করতে পারি?

আবুল কালাম

চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: শরীয়তে মৌখিকভাবে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে যেমন স্ত্রীর ওপর তালাক পতিত হয় তদ্রূপ স্বেচ্ছায় লিখিতভাবে তালাক দিলে বা লিখিত তালাকনামায় স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করলেও স্ত্রীর ওপর তালাক পতিত হয়ে যায়। সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় স্বামী আবুল কালাম তার স্ত্রী রাবেয়া বেগমকে যখন পরিষ্কার ভাষায় লিখিতভাবে তিন তালাকের নোটিশ নামায় স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করেছে তার দ্বারা স্ত্রীর ওপর তিন তালাক পতিত হয়ে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে গেছে। তালাক দেওয়ার পর থেকে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেলামেশা ও ঘর-সংসার করা পরিষ্কার হারাম ও না-জায়েয এবং তালাকের ইদ্দত শেষে অন্য স্বামীর সংসার করা ব্যতীত তাদের পুনরায় বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য যে, স্বামী মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে স্ত্রীকে তালাক দিলে স্ত্রী তা গ্রহণ করার বা শ্রবণ করার প্রয়োজন হয় না। বরং স্বামী যেকোনভাবে তালাক দিলে উক্ত তালাক স্ত্রীর ওপর পতিত হয়ে যায়। বাদায়েউস সানায়ে: ৩/১০০, আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাহ, ৫/৩৮৩, রদ্দুলমুহতার, ৪/৪৫৬, মাবসুতে সারাখসী, ৮/১০৯

 

বিবিধ

সমস্যা: ইসলমী শরীয়ত মতে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার ভাইয়ের স্ত্রী চলে যেতে চাইলে তার বিয়ের সময় ধার্যকৃত মোহরানা বিষয়ে ফয়সালা কি হবে?

বি. দ্র. আমার ভাইয়ের স্ত্রী আমার ভাইয়ের ব্যাংকে গচ্ছিত প্রায় ১০,৫০,০০০ (দশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা নগদ পেয়েছেন। এ ছাড়াও আমার কাছ থেকে পাওনা বাবদ ৩,৫০,০০০ (তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা নগদ পেয়েছেন, স্থাবর সম্পত্তি বাবদ আরও কিছু নগদ টাকা পাবেন।

উল্লেখ্য, বিয়ের মোহরানা ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) টাকা ধার্য হয় এবং ৬০,০০০ (ষাট হাজার) টাকা উসূল ধরা হয়। বিয়ের সময় ১০ (দশ) ভরি স্বর্ণালঙ্কার দেয়া হয়। বিয়ে হয় ২০০১ সালে। এক্ষেত্রে শরয়ী সমাধান কী?

আসাদুজ্জামান চৌধুরী

পটিয়, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: স্মরণ রাখতে হবে যে, আপনার ভাই মৃত্যুকালে যা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রেখে গেছেন, অর্থাৎ জায়গা-জমি এবং ব্যাংকে রক্ষিত টাকা, আপনার নিকট পাওনা তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা সব সম্পদ তার তরকা সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। যদিও স্বামীর নমিনী হিসেবে স্ত্রী ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে থাকে। কিন্তু নমিনী ওই টাকাসমূহ অর্থাৎ স্ত্রী ওই টাকাসমূহের মালিক হবে না। তাই আপনার ভাই স্থাবর-অস্থাবর যা সম্পদ রেখে গেছেন, ওই সম্পদ থেকে স্ত্রীর বকেয়া মোহরের টাকা ব্যতীত অন্য সব টাকা ও সম্পদ তরকা সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে এবং স্ত্রীসহ সব ওয়ারিশ সে টাকা ও সম্পদের মধ্যে তাদের অংশ অনুপাতে মিরাস পাবে। আল-বাহরু ররায়েক: ৮/৪৮৯, রদ্দুল মুহতার: ১০/৪৯৪, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া: ৪/২০৩

সমস্যা: আমার পাঁচ মেয়ে ও চার ছেলে। আমার প্রায় ৩৫,০০০,০০ (পয়ত্রিশ লক্ষ) টাকার একটি দু’তলা বিশিষ্ট ভাড়াঘর আছে। আমি আমার ছেলেদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে ওই ঘর আমার ছেলেদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি যেন আমার মৃত্যুর পর মেয়েরা ওই ঘর দাবি করতে না পারে। এমতাবস্থায় আমার কাজটি শরীয়তসম্মত হয়েছে কি না? যদি না হয় তাহলে এখন আমার করণীয় কী? শরীয়ত অনুযায়ী সামাধান জানালে উপকৃত হবো।

আবদুস সালাম

ঈদগাহ, কক্সবাজার

শরয়ী সমাধান: প্রশ্নে উল্লিখিত ঘটনায় আপনার যদি উক্ত ঘর ব্যতীত আরও জায়গা-জমি এবং সম্পদ থাকে যা থেকে আপনার মৃত্যুর পর আপনার মেয়েরা মিরাস পেতে পারে, সে জন্য আপনার ছেলেদের ভবিষ্যত-কল্যাণের দিকে লক্ষ্য করে আপনি যদি ঐ ঘরটা ছেলেদের নামে দিয়ে তাদের ভোগ দখলে দিয়ে দেন, তখন তা জায়েয ও সহিহ হবে এবং আপনি আল্লাহর নিকট আশা করি গুনাহগার হবেন না। কিন্তু মেয়েদেরকে আপনার মিরাস থেকে একেবারে বঞ্চিত করা জায়েয হবে না। তখন আপনি আল্লাহর নিকট কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবেন। ফতওয়ায়ে আলমগিরী: ৪/৩৯১, আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী: ৯/১৫৮, বাহরুর রায়েক: ৭/২৮৮

সমস্যা: কোন ব্যক্তি যদি তার মায়ের মাথায় হাত দিয়ে শপথ করে যে, মা আমি আপনার মাথায় হাত দিয়ে বলছি, আমি এই কাজটি করব না। আর যদি ওই ব্যক্তি সেই শপথ ভেঙে ফেলে বা রাখতে না পারে তখন ইসলামী বিধান অনুযায়ী তার কী করা উচিৎ?

ইখতিয়ার উদ্দিন

পটিয়া, চট্টগ্রাম

শরয়ী সমাধান: ইসলামী শরীয়তে কারো মাথায় হাত দিয়ে কোন ওয়াদা করাকে শপথ হিসেবে গণ্য করা হবে না। বরং তা দেশীয় রেওয়াজ ও প্রথামাত্র। তাই তা ভঙ্গ করলে ইসলামী শপথ ভঙ্গ করার হুকুম জারি হবে না। যদিও ওয়াদা ভঙ্গ করা কবীরা গুনাহ। তার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি তাওবা করতে হবে।

উল্লেখ্য যে, ইসলামী শপথ হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার নাম বা তার গুণাবলি ইত্যাদির সাথে শপথ করতে হয়। অন্য কিছুর সাথে শপথ করলে সে শপথ সহিহ হবে না। বুখারী শরীফ: ২/৯৮৩, ফতাওয়ায়ে শামী: ৫/৪৮১, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল: ৪/১৮৭, ফতাওয়ায়ে মাহমুদিয়: ২০/২০৭

বিভাগীয় নোটিশ

দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো সমস্যার শরয়ী সমাধান জানতে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার ফতওয়া বিভাগে প্রশ্ন পাঠাতে পারেন। এজন্য সরাসরি যোগাযোগ বা বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট ফোনে যোগাযোগ করুন। প্রশ্ন পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইল বা ফেসবুক ফ্যান-পেইজেও।

ইমেইল- daruliftapatiya@gmail.com

ফ্যানপেজ- https://www.facebook.com/DarulIftaJamiaPatiyaOfficial/

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ