সমকামিতায় ভয়াবহ রোগের সংক্রমণ, মুক্তির উপায়
আসাদুল্লাহ গালিব
সমকামিতা ও বিকৃত যৌনাচারের কারণে বিশ্বে গনোরিয়ার মতো ভয়াবহ যৌনরোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের শরীরে এন্টিবায়োটিক কোনও প্রকার কাজে আসছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ডব্লিউএইচওর বরাতে বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
এ রোগের জীবাণু সাধারণত যৌনাঙ্গ, মলদ্বার বা গলার ভেতরে সংক্রমণ ঘটায়। এর মধ্যে গলার সংক্রমণই চিকিৎসকদের সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডব্লিউএইচওর বিশেষজ্ঞ থিওডোরা উয়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সমকামী পুরুষদের মধ্যে গলবিলের (ফ্যারিংক্স) সংক্রমণের মাধ্যমে গনোরিয়া জীবাণুর এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠছে।
জাপানে সমকামিতার হার বেড়ে যাওয়ার পর সে দেশে জন্মহার কমে যাচ্ছে, পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপান, ফ্রান্স ও স্পেনে অন্তত তিনটি ঘটনা পাওয়া গেছে, যেখানে গনোরিয়া পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়।
উয়ি বলেন, সাধারণ গলাব্যথার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলেও তাতে নেইসেরিয়া প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
বিকৃত যৌনাচারের কারণে যেসব রোগের মহামারির আশংকা
বিকৃত যৌনাচারের কারণে গনোরিয়ার ব্যাকটেরিয়া নেইসেরিয়া গনোরিয়া) সুপার গনোরিয়া তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি গনোরিয়ার নিরাময় অনেক বেশি কঠিন হয়ে তুলেছে; কিছু ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছে ‘অসম্ভব’।
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় সাত কোটি ৮০ লাখ মানুষ এসব রোগের সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন, যা অনেকের ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানে অক্ষমতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গনোরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার প্রবণতা কতটা ভয়াবহ রূপ পেয়েছে, তা ৭৭টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে ডব্লিউএইচও।
থিওডোরা উয়ি বলেন, গনোরিয়ার জীবাণু এতটাই ভয়াবহ যে, আপনি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যতবার এর চিকিৎসা করতে চাইবেন, ততবারই তা প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করবে।
আরও কিছু তথ্য
সুরক্ষা ছাড়া যৌন সংসর্গের মাধ্যমে নেইসেরিয়া গনোরিয়া সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে প্রতি ১০ জনে একজন ও নারীদের তিন চতুর্থাংশ এবং সমকামী পুরুষদের ক্ষেত্রে এ রোগের লক্ষণ সহজে শনাক্ত করা যায় না।
লক্ষণ যখন প্রকাশিত হয়, তখন যৌনাঙ্গ থেকে হলুদ বা সবুজাভ পুঁজের মত বের হতে পারে, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে যোনিপথ ও মূত্রনালিতে জ্বালা-পোড়া, পুঁজের মত হলুদ স্রাব, তলপেটে ব্যথা ও ঋতুস্রাবে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ রোগ নিরাময় না হলে তা বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় সংক্রমণের ক্ষেত্রে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে শিশুর শরীরেও।
তথ্যসূত্র:
১. www.bbc.com/news/health-40520125
২. http://intersections.anu.edu.au/issue3/mclelland2.html
সমকামিতা নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে সমকামিতা হারাম এবং এর শাস্তি ও কঠোর। আল্লাহ পূর্বেও এই জন্য অনেক জাতিকে শাস্তি দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, ‘এবং লুতকেও পাঠিয়েছিলাম, সে তার সমপ্রদায়কে বলেছিল, তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্য নারী বাদ দিয়ে পুরুষের নিকট গমন কর, তোমরা তো সীমালঙ্গনকারী সমপ্রদায়।’ (আল-আ’রাফ: ৮০-৮১)
রাসূল (সা.) আরও বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টি দেবেন না, যে কোনো পুরুষের সঙ্গে সমাকামিতায় লিপ্ত হয় অথবা কোন মহিলার পেছনের রাস্তা দিয়ে সহবাস করে।’ (তিরমিযী, সহীহ আল-জামি)
সমকামিতা থেকে মুক্তির উপায়
অনেকের ধারণা, সমকামিতা এক ধরণের আকর্ষণ যা থেকে নিস্কৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। এ ধরণের ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক। আসুন জেনে নিই কীভাবে এ পাপাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
তওবা করা: হৃদয় থেকে সত্যিকার অর্থে তওবা করতে হবে। আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। বেশি বেশি দুআ করতে হবে এবং কায়মনোবাক্যে আকুতি করতে হবে আল্লাহ যেন তোমাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি যেন তোমাকে এই বিষয় থেকে নিষ্কৃতি পেতে সহায়তা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ আরাধ্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেহেরবান এবং দুয়া কবুলে অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহ তাআলা বলেন, বলুন, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ [সূরা আল-যুমার: ৫৩]
হৃদয়ে ঈমানের বীজকে যত্ন করা: নিজের হৃদয়ে ঈমানের বীজ যখন অঙ্কুরিত হয়ে বেড়ে ওঠে, তখন তা দুনিয়া-আখেরাত উভয় জাহানের কামিয়াবি নিয়ে আসে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই, আল্লাহর তাওফিকের পর, বান্দাকে হারাম কাজ থেকে বাঁচায়। নবী (সা.) কি বলেননি, ‘ব্যভিচারকারী যখন ব্যভিচার করে তখন সে মুমিন অবস্থায় থাকে না।’ [সহীহ বুখারী: ২৪৭৫ ও সহীহ মুসলিম: ৫৭]
তাই ঈমান যখন তোমার হৃদয়কে কর্ষিত করবে তোমার অন্তরাত্মা ও অনুভূতি ঈমান দিয়ে ভরে যাবে, তখন আর তুমি হারাম কাজ করতে সাহস পাবে না। আর মুমিন যদি একবার পড়ে যায় তাহলে সাথে সাথেই সে চৈতন্য ফিরে পায়। আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, যখন শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তাদেরকে স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।’ [সূরা আল-আরাফ: ২০১]
উপযুক্ত সময়ে বিবাহ করা: রাসূলুল্লাহ (সা.) যুবসমাজকে যে উপদেশ দিয়েছেন তা পালন করার চেষ্টা করা। যদি কেউ বালেগ হয় তাহলে বিয়ে করা কর্তব্য। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অজুহাত দাঁড় করানো ঠিক নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবসমপ্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করার ক্ষমতাসম্পন্ন সে যেন বিয়ে করে ফেলে। কেননা দৃষ্টিকে অধিক অবদমনকারী, যৌনাঙ্গকে অধিক হেফাজতকারী। আর যে তা পারবে না, সে যেন রোযা রাখে, এটা তার জন্য যৌন-উত্তেজনা দমনকারী। [সহীহ আল-বুখারী: ৫০৬৫ ও মুসলিম: ১৪০০]
বিয়ের ব্যাপারে কাউকে দারিদ্র্যকে ভয় পাওয়া উচিত নয়। কারণ, বিয়ের কারণে আল্লাহ তার বান্দাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যবান ও মহাজ্ঞানী।’ [সূরা আন-নূর: ৩২]
রাসূলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন যে, সৎ উদ্দেশে যে ব্যক্তি বিয়ে করল আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন। আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই সাহায্য করেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারী, মূল্য পরিশোধ করার সদিচ্ছা আছে এমন মুকাতেব দাস, ইজ্জতের পবিত্রতা রক্ষার ইচ্ছায় বিবাহকারী ব্যক্তি।’ [সুনানে তিরিমিযী: ১৬৫৫), সুনানে নাসায়ী: ৩১২০, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫১৮, আলবানী সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব গ্রন্থে (১৯১৭) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।]
রোযা রাখা: যদি বিবাহ সম্ভব না হয় তাহলে আরেকটি সমাধান হল রোযা রাখা। তাহলে তুমি মাসে তিনদিন রোযা রাখার চিন্তা করছ না কেন? অথবা প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার?
রোযায় তো অনেক সওয়াব রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদীসে কুদসীতে বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের; তবে রোযা ব্যতীত। নিশ্চয় রোযা আমার এবং আমিই এর প্রতিদান দেব।’ [সহীহ আল-বুখারী: ১৯০৪ ও সহীহ মুসলিম: ১১৫১]
তাকওয়া সৃষ্টির উদ্দেশে আল্লাহ তাআলা রোযার বিধান দিয়েছেন মর্মে পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। আশা করা যায় তোমরা তাকওয়া অবলম্বনকারী হবে।’ [সূরা আল বাকারা: ১৮৩]
রোযার মধ্যে প্রবৃত্তির টানে ছুটে যাওয়া থেকে যেমন রয়েছে সুরক্ষা, রয়েছে আল্লাহর কাছে বড় প্রতিদান মানুষের ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় করা, ধৈর্য, সহনশীলতা, নাফসের খায়েস ও আনন্দদায়ক বিষয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দীক্ষাও রয়েছে রোযায়। তাই রোযা রাখার ব্যাপার মনস্থির করো। আশা করা যায় আল্লাহ তোমার বোঝা হালকা করবেন।
অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা: হারাম জিনিসে দৃষ্টি দেয়া থেকে নিজেকে সংবরণ করার ক্ষেত্রে কখনো অলসতা করবে না। যেমন- অশ্লীল ম্যাগাজিন, বিবস্ত্র ছবি ইত্যাদি, যা পাপ ও অশ্লীল কর্মে জড়িয়ে যেতে মানুষকে উৎসাহিত করে, মনের মধ্যে খারাপ প্রভাব জিইয়ে রাখে। এসব থেকে আমরা সবাই আল্লাহর আশ্রয় চাই। আল্লাহ তাআলা বলে, ‘মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।’ [সূরা আন-নূর: ৩০]
একাকীত্বে না থাকা: কখনও একাকী নিভৃতে থাকা উচিত নয়। কেননা একাকীত্ব যৌনবিষয়ে চিন্তা করা কারণ হতে পারে। এজন্য যুবকদের কুরআন তেলাওয়াত, গবেষণা, বিভিন্ন সামাজিক ও জনহিতৈষী কাজে সময় ব্যয় করার অভ্যাস গড়ে তোলা কর্তব্য।
অসৎ সঙ্গ ত্যাগ: ফাসেক ও অসৎপ্রবণ ব্যক্তিদের সঙ্গ ত্যাগ করা একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য। যারা যৌনউত্তেজক কথাবার্তা বলতে অভ্যস্ত, গুনাহকে যারা তুচ্ছভাবে পেশ করে এবং সেটাকে কর্মে পরিণত করতে নির্ভয়। ওদেরকে ছেড়ে সৎলোকদের সঙ্গ নিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দীনের উপর থাকে, অতঃপর কার সাথে বন্ধুত্ব করছ তা বিবেচনা করে নাও।’ [সুনানে তিরমিযী: ২৩৭৮]