প্রসঙ্গ পবিত্র ঈদুল ফিতর: জান্নাতি পরিবেশে এক অনন্য যোজনা
ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান
১. প্রাককথন:
একমাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের আবহ নিয়ে এসছে ঈদুল ফিতর। রমযানের শেষদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে শাওয়াল মাসের বাঁকা চাঁদ উদিত হওয়ার মধ্যদিয়ে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে ঈদুল ফিতরের আহ্বান: ‘ও মন রমযানের ঐ রোযার শেষে এল খুশির ঈদ’। পবিত্র আনন্দধারায় উদ্ভাসিত হয় সকল সিয়াম সাধকের চিত্ত। ঈদুল ফিতর বিশ্বমুসলিমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আনন্দোৎসব। ইসলামী সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ঈদুল ফিতরের উৎসব একদিকে যেমনি আমাদের নির্মল-নিষ্কলুষ আনন্দে উজ্জীবিত করে অন্যদিকে তেমনি মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের চেতনায় করে অনুপ্রাণিত। ঈদ অর্থ খুশি। তবে এ খুশি একা ভোগ করার জন্য নয়, সকলকে নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার মধ্যেই নিহিত এর সার্থকতা। ধনী-নির্ধন সকলে যাতে এ উৎসব প্রাণভরে উপভোগ করতে পারে, সেজন্য বিত্তশালীদের উচিত গরিব-দুস্থদের দিকে সাহায্য ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। পবিত্র রমযানে ইবাদত বন্দেগির কারণে যেভাবে পাপ থেকে মুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে তার ফলে প্রত্যেক রোযাদার যে পরিশুদ্ধতা অর্জন করে সে কারণে ঈদ তাদের জন্য এক স্বর্গীয় আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাধ্যমে একজন মুসলমান যে কঠোর সংযমের প্রশিক্ষণ লাভ করে তারই মূল্যায়নের দিন ঈদুল ফিতর।
রোযাদার একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নফসকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে অন্তরকে খাঁটি কলুষমুক্ত করে। তার মন-মানসিকতায় ধ্বনিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তার নৈকট্য লাভের তীব্র আকাক্সক্ষা। এমন সুফলদায়ক প্রশিক্ষণ যাতে বাকি ১১ (এগার) মাস কার্যকর থাকে, চিন্তা-চেতনায় শানিত থাকে তার শপথ নেয়ার দিন ঈদুল ফিতর।
২. ঈদুল ফিতরের পরিচয়
ঈদুল ফিতর মূলত দুটো শব্দ ‘ঈদ’ ও ‘ফিতর’-এর সমন্বয়ে গঠিত।
৩. ঈদ এর আভিধানিক অর্থ
ঈদ (عيد) একটি আরবি পরিভাষা। এর আভিধানিক অর্থ খুশি, আনন্দ, উৎসব, ঋতু ইত্যাদি। ঈদ শব্দটি ‘আউদুন’ শব্দমূল থেকে উদ্ভূত হলে এর অর্থ হবে প্রত্যাবর্তন করা, প্রত্যাগমন করা, বারবার ফিরে আসা, ঘুরে ফিরে আসা ইত্যাদি। প্রতি বছর এ দিনটি যেহেতু ঘুরে ঘুরে আসে বলে একে ঈদ বলা হয়। ঈদকে এজন্য ঈদ বলা হয় যে, ‘ঈদ প্রতি বছর নিত্য নতুন আনন্দ খুশি নিয়ে ফিরে আসে’১। ইবনে মনযুর আল-ইফরীকী (রহ.) ও আল-ফিরুযাবাদী (রহ.) বলেন, ‘ঈদ বলা হয়, আরবদের কাছে এমন সময়কে যাতে আনন্দ ও দুঃখ বারবার ফিরে আসে’২। অনুরূপভাবে লোক সমাগমের দিন বা স্মৃতিবিজড়িত কোন দিন, যা বারবার ফিরে আসে এমন দিনকেও ঈদ বলা হয়। যেমনÑ আল-কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে, ‘ঈসা ইবনে মারইয়াম বললেন, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুনএবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের, আমাদের পূর্ববর্তী ও আমাদের পরবর্তী সকলের জন্য হবে আনন্দোৎসব স্বরূপ ও আপনার নিকট থেকে একটি নিদর্শন হবে’৩। ‘উপস্থিত লোকদের আনন্দ হবে তাদের আবেদন গৃহিত হওয়া এবং খাদ্য গ্রহণ করার কারণে আর পরবর্তী লোকদের আনন্দ হবে পূর্ববর্তীদের প্রতি নিয়ামত অবতীর্ণ হওয়ার কারণে’৪। এ থেকে বুঝা যায় যে, আসমানী খাদ্য নাযিল হওয়ার দিনটি পরবর্তীদের জন্য স্মৃতিচারণের দিন হওয়ায় সেটিকে ঈদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।ঈদ প্রতি বছর সাজগোজ, আনন্দ-খুশি ও নিত্য নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে ফিরে আসে। এসব কারণে ঈদের দিনকে আনন্দ, খুশি, সাজগোজ, এবং নতুন পোশাকে সুসজ্জিত হওয়ার দিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, মূসা বললো, ‘তোমাদের প্রতিশ্রুতির দিন সাজ-সজ্জার দিন এবং পূর্বাহ্নে লোকজন সমবেত হবে’৫।
৪. ফিতরের আভিধানিক অর্থ
ফিতর (فطر) শব্দটি একটি আরবি পরিভাষা। এটি ইফতার থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো রোযা ভঙ্গকরণ, ইফতার ইত্যাদি। যেহেতু সারাদিন রোযা পালন শেষে সন্ধ্যায় কিছু খেয়ে ইফতার করা হয় তাই একে ফিতর নামে নামকরণ করা হয়েছে। শারীয়তের পরিভাষায় ঈদুল ফিতর তথা শাওয়াল মাসের প্রথম দিন এবং কুরবানীর দিনকে নির্দিষ্ট করে ঈদের দিন বলা হয়৬। হযরত আবু হুরায়রা ও আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈদুল ফিতর হলো যে দিন লোকেরা রোযা ভঙ্গ করে’৭। অতএব ঈদুল ফিতর অর্থ হলো, রোযা ভঙ্গের দিন, রোযা ভঙ্গের কারণে খুশি, উৎসব বা রমযানের পরবর্তী উৎসব। তাই আমরা বলতে পারি ‘ঈদুল ফিতর’ সেই উৎসব বা আনন্দকে বলা হয় যা মাহে রমযানের পরে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বড়ত্ব ও মহত্ত্ব ঘোষানার্থে এবং বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ ক্ষমা ও অনুগ্রহের বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে।
৫. ঈদুল ফিতরের সূচনা
৬২৮ খ্রিস্টাব্দ মোতাবিক হিজরী দ্বিতীয় বর্ষে রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ঈদের সূচনা হয়৮। নবী করিম (সা.) মদিনায় গমন করে দেখতে পেলেন যে, পারসিক প্রভাবে মদিনায় বসবাসকারী লোকেরা শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান’ নামাক দুটি উৎসব অত্যন্ত আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্বীপনা নিয়ে পালন করছে। এ উৎসবে তারা নানা আয়োজন, আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ উদ্যাপন করত। প্রাক ইসলামী যুগে আরব দেশে অন্যদের অনুকরণে নববর্ষ ও অন্যান্য উৎসব পালনের রেওয়াজ ছিল।হযরত আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করলেন, তখন তাদের দুটি দিন ছিল যাতে তারা উৎসব পালন করতো।’ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ দু’দিন কিসের উৎসব পালন করো?’ তারা বললো ’আমরা জাহেলী যুগে এ দু’দিন উৎসব পালন করতাম। এ ভাবধারাই চলে আসছে।’ তাদের একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের ঈ দু’দিনের বদরে দুটি মহান উৎসবের দিন প্রদান করেছেন। একটি ঈদুর ফিতর, অপরটি ঈদুর আযহা’৯। এতে তোমরা পবিত্রতার সাথে উৎসব পালন করো।
৬. ঈদুল ফিতরের শিক্ষা
ঈদুল ফিতর রমযানের রোযার গুরুত্বপূর্ণ ফরয আদায় করে খুশিতে পালন করা হয়। ঈদে আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে শুক্র-এর সিজদা আদায় করা হয় এবং তাঁর নিকট গুণাহ ক্ষমার জন্য দু’আ করা হয়। রমযানের রোযা পালনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির সুসংবাদের আনন্দ লাভ করেন।সমাজ তথা বিশ্বের প্রতিটি ঈমানদার পরস্পর ভাই ভাই। ঈদ আমাদের মধ্যে এ শিক্ষা জাগ্রত করে। ঈদের ময়দানে আমরা সহাস্য বদনে কোলাকুলি করি। সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও সৌজন্য প্রদর্শনে এগিয়ে আসি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি মুমিনগণকে পারস্পরিক করুণা, ভালোবাসা ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে একটি দেহের মতই দেখতে পাবে। এর একটি অংগ ব্যথিত হলে সকল অংগই বিনিদ্র ও জ্বরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে’১০।ঈদুল ফিতর আমাদেরকে হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা এবং জিঘাংসা পরিহার করতে শিখায়। এ দিন আমরা খোলামনে একে অপরকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানাই। মনের সকল হিংসা উৎখাত করে পরস্পর ভাই ভাই হিসাবে মিলিত হই।সুদীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তিরা তাকওয়া গুণে উজ্জীবিত হয়। নিজেদের আখলাক ও চরিত্রকে করে পূত-পবিত্র। ঈদুল ফিতর আমাদেরকে স্বরণ করিয়ে দেয় পরবর্তী ১১ মাস এ শিক্ষা স্বরণ রাখতে হবে। ঈদুল ফিতরের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হলো, বিভিন্ন দল ও মতে বিশ্বাসী মুসলিম মিল্লাতকে আনন্দ ও উৎসবমুখর একটি দিনে একই প্লাটফর্মে সমবেত করে স্থায়ী ও ঐক্যবদ্ধ ‘একক উম্মাহ’ গড়ে তোলা। যাকে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের ভাষায় বলা হয়, উম্মাতু ওয়াহিদাহ অর্থাৎ ’একক উম্মাহ’। তাছাড়া ধনী-গরীবের ব্যবধান ছিন্ন করে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন, উঁচু-নীচুর পার্থক্য দূর করে ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠন, হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা ভুলে গিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন সুদৃঢ়করণ; সর্বোপরি সর্বস্তরের মানুষের ইহকালীন মঙ্গল ও পরকালীন মুক্তি অর্জন ঈদুল ফিতরের অন্যতম মহান শিক্ষা।
৭. ঈদুল ফিতরের নিয়মাবলি
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন ঈদুল ফিতরের দিন আসে আল্লাহ তাআলা তাঁর ফেরেশতাদের নিয়ে গর্ব করেন। অতঃপর বলেন, ‘হে আমার ফেরেশতারা! যে শ্রমিক তার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছে, তার বিনিময়ে সে কি পেতে পারে?’ তারা আরজ করেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা চাই যথাযোগ্য মজুরি যেন পায়।’ তখন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ফেরেশতারা! আমার দাস ও দাসী যারা আমার পক্ষ থেকে তাদের উপর আরোপিত অপরিহার্য দায়িত্ব রোযা ও তারাবীহ পালন করেছে, অতঃপর আমার নিকটে প্রার্থনা করতে ঈদগাহের দিকে বেরিয়েছে, আমার সম্মান, মর্যাদা, দয়া, বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের শপথ, আমি তাদের দুআ কবুল করবো।’ আল্লাহ বলবেন, ‘তোমরা গৃহে ফিরে যাও আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি, তোমাদের পাপরাশিকে নেকিতে রূপান্তর করে দিয়েছি। অতঃপর তারা ক্ষমা প্রাপ্ত হয়ে গৃহে প্রবেশ করে’১১।বস্তুত ঈদের আনন্দ তাদেরই, যারা সেদিন পুরস্কার ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। এজন্যই হযরত ওমর (রাযি.) এক ঈদের দিনে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন ও গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। আরজ করা হলো, ‘আজকে এত খুশির দিন আপনি কাঁদছেন কেন?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘যাদের রোযা কবুল হয়েছে বলে সঠিক ভাবে বলতে পারে তারাই আজ আনন্দিত হতে পারে। আমি জানি না আমার রোযা কবূল হয়েছে কিনা।’ এখানেই ঈদুল ফিতরের শিক্ষা ও তাৎপর্য নিহিত। ঈদের দিন প্রথমে অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠতে হবে, মিসওয়াক করে দাঁত-মুখ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্œ করতে হবে। এরপর গোসল করতে হবে। কেননা এ দিনে সকল মানুষঈদের নামায আদায় করার জন্য একসাথে ঈদগাহে মিলিত হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন গোসল করতেন। এ হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, ঈদের দিন ঈদের মাঠে যাওয়ার পূর্বে গোসল করা উচিত। গোসল সম্পন্ন করার পর সামর্থ্যানুযায়ী সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতে হবে। নতুন পোশাক পেলে ভাল, নচেৎ ধৌত করা পুরাতন পোশাকে সজ্জিত হতে হবে। এ সময় আংটি পরিধান করা, সুগন্ধি লাগানো মুস্তাহাব। তবে মনে রাখতে হবে পুরুষের জন্য স্বর্ণের আংটি ব্যবহার করা এবং রেশমি কাপড় পরিধান করা হারাম। উত্তম পোশাক পরিধান করার পর সুগন্ধি ব্যবহার করতে হবে। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, ‘আমি আলিমদের নিকট থেকে শনেছি যে, তারা প্রত্যেক ঈদে সুগন্ধি ব্যবহার ও সাজ-সজ্জাকে মুস্তাহাব বলেছেন’ (আল-মুগনী)। ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেন, ‘নবী করীম (সা.) দু’ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন’ (যাদুল মা’আদ)। ঈদের দিন নখ, চুল ও শরীরের অন্যান্য পশম ও ময়লা দুর করে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সজ্জিত করা সুন্নাত।
৮. ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা
ঈদের জমাআত আদায় করার জন্য বের হওয়ার পূর্বেই সাদাকাতুল-ফিতর আদায় করা উত্তম। ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘নবী করীম (সা.) ঈদের নামাযে গমন করার পূর্বেই সাদাকায়ে ফিতর আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন’১২। ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে আরো বর্ণিত আছে তিনি বলেন, ‘নবী করীম (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন সকালে তাঁর সাহাবীদের সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ না দিয়ে বের হতেন না’।ঈদের খুশির দিনে যাতে সমাজের কোন ব্যক্তিই অভুক্ত না থাকে, ক্ষুধার যাতনায় কষ্ট না পায় ইসলাম তা সুনিশ্চিত করেছে। সাদাকাতুল ফিতর গরীব-মিসকীনদের হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত আমাদের রোযা আসমান-জমিনের মাঝে ঝুলন্ত থাকবে। আজকের খুশির হিল্লোল প্রতিটি কুড়ের ঘরে আর ছিন্নমুলদের বুকে যাতে প্রবেশ করে ধনীগণকে তা স্মরণ রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ধন সম্পদে সাওয়ালী এবং বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে’১৩। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রোযা পালনকারীর বেহুদা কথাবার্তা ও অশ্লীলতার কাফফারা হিসাবে এবং মিসকীনদের আহারের ব্যবস্থার জন্য সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বে তা আদায় করে, আল্লাহর নিকট তা গ্রহণযোগ্য সাদাকা হিসাবে পরিগণিত হয়। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পর তা আদায় করে, তাও সাদাকাসমূহ থেকে একটি সাদাকা হিসাবে গণ্য হয়’১৪।
৯. ঈদগাহে যাওয়ার
পূর্বে কিছু খাওয়া:
ঈদুল ফিতর দিবসে ঈদগাহতে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে মিষ্টান্ন গ্রহণ করা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু খেজুর খেয়ে বের হতেন। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর দিবসে কয়েকটি খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। তিনি বেজোড়ভাবেই খেজুর খেতেন’১৫। অর্থাৎ তিনটি বা পাঁচটি বা সাতটি এ নিয়মে। খেজুর ছাড়া যে কোন মিষ্টি জাতীয় খাদ্য খেলেই সুন্নাত পালন হবে। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করিম (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর না খেয়ে বের হতেন না।’ বুরায়ছা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন আহার না করে বের হতেন না। আর কুরবানীর দিন ঈদগাহ থেকে প্রত্যাবর্তন না করে আহার করতেন না’১৬।
১০. ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া ও রাস্তা পরিবর্তন করা
ঈদের জমাআতে নামায আদায়ের জন্য পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া উত্তম১৭। রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়ে হেঁটেই ঈদগাহে গিয়েছেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যেতেন।’ হযরত আলী (রাযি.) বলেন, ‘ঈদের নামায পড়ার জন্য পায়ে হেঁটে চলবে।’ আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিনে একপথ দিয়ে যেতেন এবং অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসতেন’১৮। তবে কোন ওযর থাকলে সাইকেল, রিক্সা, বাস, ট্রেন বা ধুরপথের জন্য দ্রুতগামী যে কোন বাহনে যেতে পারে। পায়ে হেঁটে গেলে প্রত্যেক কদমে অসংখ্য সওয়াব হবে।ঈদের দিন রাস্তা বদল করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বের হতেন এক রাস্তায় আর ফিরে আসতেন অপর রাস্তায়। হযরত জাবির (রাযি.) বলেন, ‘আল্লাহর নবী (সা.) ঈদের নামাযের জন্য যে রাস্তা দিয়ে যেতেন ফেরার পথে তিনি অন্য রাস্তায় বাড়ী ফিরতেন’১৯। রাস্তা বদলের কারণ হলো, রাস্তাগুলো যেন কিয়ামতের দিন আমাদেরকে ঈদের নামাযী বলে সাক্ষ্য প্রদান করে।
১১. তাকবীর পাঠ করা
রমযান মাসে সুদীর্ঘ রোযা পালন শেষে সূর্যাস্তের পরপরই পশ্চিম গগণে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়। একমাস রোযা পূর্ণ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও হিদায়াত প্রাপ্তির শুকরিয়া স্বরূপ উক্ত চাঁদ উদয়ের পর থেকে ঈদায়নের তাকবীর পাঠ করা সুন্নাত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সহজ চান, কঠিন চান না, আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ করতে পারো এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর’২০।
১২. ঈদের নামায খোলা
ময়দানে আদায় করা
ঈদের দিনের অন্যতম দায়িত্ব-কর্তব্য হলো জামাআতে দু’রাকাআত ঈদের নামায আদায় করা। এ নামায খোলা ময়দানে পড়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খুলাফায়ে রাশেদিন সর্বদা ঈদের নামায খোলা ময়দানে আদায় করতেন। তাঁদের ঈদের ময়দানটি ছিল মদিনার মসজিদে নববীর পূর্ব দরজা বরাবর মাত্র ৫০০ গজ দূরে ‘বাতহান’ নামক সমতল ভূমিতে অবস্থিত। তবে বৃষ্টি, ভীতি কিংবা কোন বাধ্যগত কারণে উম্মুক্ত ময়দানে নামায পড়া সম্ভব না হলে মসজিদে ঈদের জামাআত আদায় করা যায় (ফিকহুস সুন্নাহ)। হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার ঈদের দিন বৃষ্টি হয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামায মসজিদের মধ্যে আদায় করেছিলেন।
১৩. ঈদের আনন্দ
উদ্যাপনে সীমাবদ্ধতা
ঈদের সকল আনুষ্ঠানিকতা হবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যতার মাধ্যমে। পানাহারসহ সকল ক্ষেত্রেই আল্লাহর স্মরণ হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য।ঈদের আনন্দ উৎসব উদ্যাপনে থাকবে ভারসাম্যতা, নৈতিকতা, খোদাভীতি, সুশৃংখলতা ও সীমাবদ্ধতা। বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ছোটদের প্রতি স্নেহবোধ আর ইয়াতিম ও অসহায়দের প্রতি সহমর্মিতা ঈদ উৎসবকে সফল ও সমৃদ্ধ করে তুলবে।
১৪. এক নজরে ঈদুল ফিতরের মুস্তাহাব ও সুন্নাত কার্যাবলি
১। খুব শিগরই ফজরের সালাত পরবর্তী সময়ে দ্রুত ঈদগাহে গমন।
২। পদব্রজে ঈদগাহে গমন।
৩। ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে বেজোড় কয়েকটি খেজুর মতান্তরে মিষ্টান্ন বস্তু ভক্ষণ করা।
৪। প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠা।
৫। নামাযের পূর্বে ভালভাবে গোসল করা
৬। সুন্দরভাবে মিসওয়াক করা
৭। সুগন্ধি ব্যবহার করা
৮। চোখে সুরমা লাগিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করা।
৯। পবিত্র পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা।
১০। একপথে গিয়ে অন্য পথে প্রত্যঅবর্তন করা।
১১। ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করা।
১২। ঈদের ময়দানে গমকালে নিরবে তাকবীর পাঠ করা।
১৩। মসজিদের পরিবর্তে পরিবর্তে উন্মুক্ত ময়দানে ঈদের সালাত আদায় করা।
১৪। সামর্থ্য অনুসারে উত্তম খাবারের ব্যবস্থা পূর্বক স্বপরিবার সহ দরিদ্র, অনাথ, নিঃস্ব, রিক্ত, বঞ্চিত জনগণকে পানাহার করানো২১।
১৫. পরিসমাপ্তি
পরিশেষে বলা যায়, শুধু ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমেই নয়; আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমেও যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এর বাস্তব উদাহরণ হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। ঈদ মুসলিম উম্মার প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ দান। এবারের ঈদুল ফিতর আমাদের মাঝে খুশি ও আনন্দ বয়ে আনুক। সুখ ও শান্তির ফলগুধারা বয়ে যাক সমাজের প্রতিটি স্তরে। ঈদুল ফিতরের নিয়মাবলীর মাধ্যমেই ঈদ উদ্যাপন করা ইসলামের বিধান। সাথে সাথে ঈদুল ফিতরের শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। ঈদুল ফিতরের এ খুশি আমাদের অন্তর থেকে দূর করুক সকল কুটিলতা। সমাজে ফিরিয়ে আনুক অনাবিল শান্তি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ফেতনা-ফাসাদ পরিহার করে সঠিক নিয়ম ও শিক্ষার মাধ্যমে ঈদুল ফিতর পালন করার তাওফীক দান করুন।
তথ্যসূত্র
১. আল-ইফরীকি, শায়খ আবুল ফাযাল জামালুদ্দীন ইবনু মানযূর (৬৩০Ñ৭১১ হি. / ১২৩২Ñ১৩১১ খ্রি.), লিসানুলআরব, (বৈরূত: আসাহহুল মাতাবি, তাবি) আঈনবর্ণ অধ্যায়
২. আল-ইরাকী আয-যুবাইদী, শায়খ আবুল ফায়জ মুর্তাজা মুহাম্মদ ইবন আবদুর রাজ্জাক হুসাঈনী, তাজুল আরুস মিন জাওয়াহিরিল কামূস, (বৈরূত: আসাহহুল মাতাবি, তাবি) আঈনবর্ণ অধ্যায়
৩. আল-কুরআন, সূরা: ৫ মায়িদা: ১১৪
৪. শফী, আল্লামা মুফতী মুহাম্মদ, মা’আরিফুল কুরআন (ঢাকা: ইফাবা, তাবি) খ. ৩, পৃ. ২৬৭
৫. আল-কুরআন, সূরা: ৩০ তোয়াহা: ৫৯
৬. রাগিব আল-ইসপাহানী, আবুল কাশেম আল হুসাঈন ইবন মুহাম্মদ (রহ.), মুফরাদাত গারিবিল কুরআন (মিসর: আল-মাকতাবা আত-তাওফীকিয়া, তাবি) পৃ. ৩৫৫
৭. আত-তিরমীযী, মুহাম্মদ ঈবনে ঈসা (রহ.) জামি’ (মুলতান: ফারুকী কিতাবখানা, ১৯৮৩ খ্রি.), খ. ১, পৃ. ৩২৭)
৮. মুবারকপুরি, আল্লামা সফিউর রহমান, আররাহীক আল মাখতূম, খাদিজা আখতার রেজাযী কর্তৃক অনূদিত (লন্ডন: আল কুরআন একাডেমী, ২১ তম সংস্করণ, ২০০৭) পৃ. ৫৮
৯. আস-সিজিস্তানী, আবু দাউদ সুলাইমান ইবন আশআস (রহ) [মৃ. ২৭৫ হি.], সুনাম, হাদীস: ১০৮৭
১০. অগ্রপথিক, একত্রিশবর্ষ, ৭ সংখ্যা জুলাই, ২০১৬, ইফাবা, ঢাকা, পৃ. ২১,
১১. অগ্রপথিক, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩
১২. (ক) আল বুখারী, আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল (রহ.) [মৃ. ২৫৬ হি.], আস-সাহীহ (করাচি: কাদিমী কুতুবখানা, ১৩৭৫ হি.), হাদীস: ১৫০৩; (খ) আলকুশাইরি, আবুল হুসাঈন মুসলিম ইবন হাজ্জাজ (রহ.) [মৃ. ২৬১ হি.], আস-সাহীহ (করাচি: কাদিমী কুতুবখানা, ১৩৭৫ হি.), হাদীস ৯৮৪
১৩. আল-কুরআন, সূরা: ৫১, যারিয়া: ২১
১৪. (ক) আস-সিজিস্তানী, আবু দাউদ সুলাইমান ইবনুল আশআস (রহ) [মৃ. ২৭৫ হি.] প্রাগুক্ত, হাদীস: ১৬০৯; (খ) আল-কাযবীনী, ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইয়াযীদ (রহ.) [মৃ. ৩০৩ হি.], সুনান (করাচি: কাদিমী কুতুবখানা, ১৩৭৫ হি.), হাদীস: ১৮২৭; (গ) আশ-শায়বানী আল-জাজারি, আবুস সা’আদাত ইবনুল আসির মুবারক ইবন মুহাম্মদ আবদুল করিম (৫৪৪-৬০৬ হি. / ১১৫০-১২১০ খ্রি.), জামিউল উসূল ফী আহাদিসির রাসূল (বৈরূত: আসাহহুল মাতাবি, তা.বি) হা: ২৭৩২
১৫. আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২০৫, হাদীস: ৯০৫
১৬. আত-তিরমীযী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২
১৭. আত-তিরমীযী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৯
১৮. (ক) আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২০৮, হাদীস ৯০৯; (খ) আত-তিরমীযী, প্রাগুক্ত, আবওয়াবুল ঈদাঈন, পৃ. ১১৯
১৯. (ক) আল-বুখারী, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২০৮, হাদীস ৯০৯; (খ) আত-তিরমীযী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০
২০. আল-কুরআন, সূরা: ২, বাকারা: ১৮৫
২১. ফাতুয়া-ই-আলমগীরি, পৃ. ২৭৮-২৭৯
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও উপাধ্যক্ষ, ফয়জুলবারী ফাযিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম