
তাফসীরে হিদায়াতুল কুরআন
হজরত মাওলানা মুফতী সাঈদ আহমাদ সাহেব পালনপুরী
সাবেক শাইখুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসিন, দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত।
وَ اِذْ تَاَذَّنَ رَبُّكَ لَیَبْعَثَنَّ عَلَیْهِمْ اِلٰی یَوْمِ الْقِیٰمَةِ مَنْ یَّسُوْمُهُمْ سُوْٓءَ الْعَذَابِ ؕ اِنَّ رَبَّكَ لَسَرِیْعُ الْعِقَابِ ۚۖ وَ اِنَّهٗ لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۶۷﴾ وَقَطَّعْنٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اُمَمًا ۚ مِنْهُمُ الصّٰلِحُوْنَ وَمِنْهُمْ دُوْنَ ذٰلِكَ وَبَلَوْنٰهُمْ بِالْحَسَنٰتِ وَالسَّیِّاٰتِ لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ ﴿۱۶۸
তরজমা : (১৬৭) আর যখন তোমার রব ঘোষণা দিলেন, অবশ্যই তিনি তাদের ওপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত এমন লোকদেরকে পাঠাবেন, যারা তাদেরকে আস্বাদন করাবে নিকৃষ্ট আযাব। নিশ্চয় তোমার রব আযাব প্রদানে খুব দ্রুত এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
(১৬৮) পৃথিবীতে আমি তাদেরকে নানা দলে বিভক্ত করে দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে কিছু দল ছিল সৎ, কতক দল অন্য রকম এবং সুখ আর দুখ দিয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যাতে তারা (আল্লাহর নির্দেশের পথে) ফিরে আসে।
২. কিয়ামত পর্যন্ত ইহুদিরা শাসিত থাকবে
যেমনইভাবে একজন ব্যক্তিকে হকের বিরোধিতা ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে নিয়ে যায়, তখন তার ঈমানের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তার অন্তরে মহর এঁটে দেন। কান ও চোখে পর্দা ঢেকে রাখেন। ঠিক একইভাবে, জাতীয় জীবনের এই পর্যায়ে, যখন কোনও জাতি নষ্টামিতে জড়িয়ে পড়ে এবং অন্যায়ের শেষ পয়েন্টটিকে স্পর্শ করে, তখন তাদের ওপর শাসিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার কলঙ্ক চাপানো হয়। অবশেষে সেই জাতি সর্বদা দাস থেকে যায়।
ইহুদিরা যখন অন্যায় ও দুর্ব্যবহার চালিয়ে যেতে থাকে, তখন মূসা আ.-এর পরে আগত বনী ইসরাইলের নবীরা এই হুঁশিয়ারিমূলক ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তারা কিয়ামত অবধি দাসত্বের জীবন যাপন করবে। তাদের ওপর এমন লোকদের চাপানো হবে, যারা তাদেরকে নিকৃষ্ট উপায়ে শাস্তি দেবে। ইহুদিদের ইতিহাস অধ্যয়নে জানা যায়, অল্প অল্প বিরতিতে তাদের ওপর কোনো না কোনো অত্যাচারীকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যারা তাদের বিভিন্ন উপায়ে কষ্ট দিয়েছিল। নিকৃষ্ট শাস্তি দ্বারা নিগৃহীত ও শাসিত জীবন উদ্দেশ্য। বর্তমানে ফিলিস্তিনে ইহুদি সরকার খ্রিস্টানদের কৃপার দান। এটি সম্মানের কোনো বিষয় নয়। বরং এটিও এক ধরণের অপমান এবং অপদস্থতা। ব্রিটেন এবং আমেরিকা যদি তাদের ওপর থেকে স্নেহ-হৃদ্যতার হাত উঠিয়ে নেয়, তবে মুসলমানরা তাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে!
وَ اِذْ تَاَذَّنَ رَبُّكَ لَیَبْعَثَنَّ عَلَیْهِمْ اِلٰی یَوْمِ الْقِیٰمَةِ مَنْ یَّسُوْمُهُمْ سُوْٓءَ الْعَذَابِ ؕ
“আর যখন তোমার রব ঘোষণা দিলেন, অবশ্যই তিনি তাদের ওপর কিয়ামতের দিন পর্যন্ত এমন লোকদেরকে পাঠাবেন, যারা তাদেরকে আস্বাদন করাবে নিকৃষ্ট আযাব।”
ইহুদিদেরও সম্মান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে
ব্যক্তি বা জাতি হকের বিরোধিতা কিংবা বিধি লঙ্ঘন করে যখন শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, তাদের অন্তরে মহর পড়ে যায় এবং এই জাতির ললাটে লাঞ্ছনা গেঁথে যায়, তখনও এই ব্যক্তির হেদায়াত এবং এই জাতির সম্মানের সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ, মহর এবং লাঞ্ছনা একটি অস্থায়ী অবস্থার কারণে হয়ে থাকে। আয়াতের একদম শেষে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা ইহুদিদেরকে তাদের ধৃষ্টতা ও দুরাচরণে আখিরাতে শাস্তি দেবেন। তবে তারা যদি সর্বশেষ নবীর প্রতি ঈমান আনে, বিশ্বাস স্থাপন করে এবং বিরোধিতা ছেড়ে দেয়, তাহলে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন। তিনি খুব দয়ালু। তিনি তাদেরকে সম্মানে ভূষিত করবেন।
اِنَّ رَبَّكَ لَسَرِیْعُ الْعِقَابِ ۚۖ وَ اِنَّهٗ لَغَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ ﴿۱۶۷
“নিশ্চয় তোমার রব আযাব প্রদানে খুব দ্রুত এবং নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
৩. ইহুদিদের মধ্যে অনৈক্য এবং বিভেদ
ইহুদিদের সম্পর্কে দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীটি হলো, তারা সর্বদা বিভক্ত থাকবে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে তাদের জনগোষ্ঠী। তারা এক জায়গায় একসাথে থাকতে পারবে না। তাদের ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং ঝগড়া দেখা দেবে। পারস্পরিক মতানৈক্য ও বিভেদ থাকবে তুঙ্গে। এটি হলো মন্দ অবস্থা। ভালো অবস্থা এর বিপরীত। তখন জাতির সম্মিলিত শক্তিতে তারা উপকৃত হবে।
এই বিভাজন ও অনৈক্যের সময়েও কিছু ইহুদি ভালো থাকবে। কিছু তাদের চেয়ে কম ভালো হবে। অর্থাৎ ফাসিক ও কাফির হবে। আল্লাহ তাদেরকেও মাঝে-মধ্যে ভালো থাকার সুযোগ প্রদান করবেন। কখনো দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত করবেন। যাতে তারা আল্লাহর ইহসানের কথা স্মরণ করে কিংবা দুঃখ-কষ্টের ভয়ে তাওবাহ করে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।
বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায়, ইহুদিদের ইতিহাসে এমন একটি সময় আসবে যখন ইহুদিরা ফিলিস্তিনে সমবেত হবে। আমাদের শক্তি ও ক্ষমতা থাকবে না। সেই সময় আবির্ভাব ঘটবে দাজ্জালের। সে পুরো বিশ্বে চষে বেড়াবে। শেষে ঈসা আ. আসমান থেকে নেমে এসে ইহুদিদের নাম ও প্রতীক মুছে ফেলবেন। সুতরাং হতে পারে, বর্তমান ইসরাইলি রাষ্ট্রব্যবস্থা ইহুদি ইতিহাসের সেই ক্ষণে উপস্থিত। আল্লাহই ভালো জানেন।
وَقَطَّعْنٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اُمَمًا ۚ مِنْهُمُ الصّٰلِحُوْنَ وَمِنْهُمْ دُوْنَ ذٰلِكَ وَبَلَوْنٰهُمْ بِالْحَسَنٰتِ وَالسَّیِّاٰتِ لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ ﴿۱۶۸
“পৃথিবীতে আমি তাদেরকে নানা দলে বিভক্ত করে দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে কিছু দল ছিল সৎ, কতক দল অন্য রকম এবং সুখ আর দুখ দিয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যাতে তারা (আল্লাহর নির্দেশের পথে) ফিরে আসে।”