মুফতী সাঈদ আহমাদ পালনপুরী
সাবেক শাইখুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসীন, দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত।
وَسْـَٔلْهُمْ عَنِ الْقَرْیَةِ الَّتِیْ کَانَتْ حَاضِرَةَ الْبَحْرِ ۘ اِذْ یَعْدُوْنَ فِی السَّبْتِ اِذْ تَاْتِیْهِمْ حِیْتَانُهُمْ یَوْمَ سَبْتِهِمْ شُرَّعًا وَّیَوْمَ لَا یَسْبِتُوْنَ ۙ لَا تَاْتِیْهِمْ ۚۛ کَذٰلِكَ ۚۛ نَبْلُوْهُمْ بِمَا کَانُوْا یَفْسُقُوْنَ ﴿۱۶۳﴾ وَ اِذَ قَالَتْ اُمَّۃٌ مِّنْهُمْ لِمَ تَعِظُوْنَ قَوْمَۨا ۙ اللهُ مُهْلِكُهُمْ اَوْ مُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا شَدِیْدًا ؕ قَالُوْا مَعْذِرَۃً اِلٰی رَبِّكُمْ وَلَعَلَّهُمْ یَتَّقُوْنَ ﴿۱۶۴﴾ فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُکِّرُوْا بِهٖۤ اَنْجَیْنَا الَّذِیْنَ یَنْهَوْنَ عَنِ السُّوْٓءِ وَاَخَذْنَا الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا بِعَذَابٍۭ بَئِیْسٍۭ بِمَا کَانُوْا یَفْسُقُوْنَ ﴿۱۶۵﴾ فَلَمَّا عَتَوْا عَنْ مَّا نُهُوْا عَنْهُ قُلْنَا لَهُمْ كُوْنُوْا قِرَدَۃً خٰسِئِیْنَ ﴿۱۶۶﴾
তরজমা : “তাদেরকে (নিজ সমকালের ইহুদিদের) জিজ্ঞেস করুন ওই জনবসতি সম্পর্কে যা সমুদ্রের উপকূলে বিদ্যমান ছিল। তারা শনিবারের সীমালঙ্ঘন করেছিল। শনিবার পালনের দিন মাছগুলো প্রকাশ্যতঃ তাদের নিকটে আসত। আর যেদিন শনিবারের অনুষ্ঠান থাকত না সেদিন সেগুলো আসত না। এটা হত এজন্য যে, তারা অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকার কারণে তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছিলাম। (স্মরণ করুন) যখন তাদের একদল লোক অপর দলের (যারা বুঝিয়েছিল, তাদের) নিকট বলেছিল, ওই জাতিকে তোমরা কেন উপদেশ দিচ্ছ যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন অথবা কঠিন শাস্তি দিবেন? তারা উত্তরে বলল, তোমাদের রবের নিকট দোষমুক্তির জন্য এবং এই আশা করছি যে, হয়তো তারা তাঁকে ভয় করবে। যে উপদেশ তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা বিস্মৃত হল, তখন যারা মন্দ কাজে বাধা দান করত, তাদেরকে আমি উদ্ধার করলাম এবং যারা অত্যাচারী ছিল, তারা সত্যত্যাগ করত বলে আমি তাদেরকে কঠোর শাস্তির সাথে পাকড়াও করলাম। অতঃপর যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল তারা যখন সে বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করল, (পরের কথা বলার জন্য এই ভূমিকাটি পুনরায় উল্লেখ করেছেন) তখন আমি তাদেরকে বললাম, ‘তোমরা নিকৃষ্ট বানর হয়ে যাও’।”
বনী ইসরাইলের মন্দ পরিস্থিতি
১. বনী ইসরাইল কূটচাল করে যখন শনিবারে মাছ ধরল, তখন তাদের বানর বানিয়ে দেওয়া হলো।
কোনো এক সমুদ্রের তীরে বনী ইসরাইল বসবাস করত। মহান আল্লাহ ইহুদিদের জন্য শনিবারে সব ধরনের কাজ নিষিদ্ধ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাদের পরীক্ষা করলেন। শনিবারে মাছ তাদের নিকটবর্তী হতো। আর অন্য দিন অদৃশ্য হয়ে যেত। এরা সমুদ্রের কাছে একটি হাউজ নির্মাণ করল। আর তার পথ করে দিল সমুদ্রের দিকে। সাগরের জোয়ারের সময় হাউজ পর্যন্ত পানি চলে আসত। সাথে মাছও চলে আসত। ভাটার সময় যখন পানি কমে যেতো, মাছগুলো সেখানেই থেকে যেতো। তারা রবিবার এই মাছগুলো ধরে ফেলত। এভাবে তারা মাছ ধরার ফন্দি করল।
২. যারা বাহানা করেছিল এবং শনিবারের হারাম হওয়াকে লঙ্ঘন করেছিল।
৩. যাঁরা প্রথম ধরণের লোকদেরকে এটি না করার জন্য প্ররোচিত করে বলেছিল, এমনটি করো না। শনিবারে মাছ শিকার করা আর বাহানা করে রোববারে ধরা একই কথা। যেমন সুদ নেয়া আর দেয়া দুটোই অপরাধ। সরাসরি সুদ নেয়া আর ফরমের মাধ্যমে নেয়ার মধ্যে পার্থক্য নেই। বাহানা করা বস্তু আল্লাহর সামনে পেশ করা যায় না।
৪. যারা মাছ শিকারকারীদের কাজকে অন্তর দিয়ে খারাপ জানতো কিন্তু তারা তাদের শুদ্ধির ব্যাপারে নিরাশ ছিল। এতটাই নিরাশ ছিল যে, যারা সতর্ক করছিলেন তাদেরকে তারা বুঝালো, তোমরা কেন তাদের পেছনে নিজেদের মাথা ঘামাচ্ছ? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের ধ্বংস বা কঠোর শাস্তি দেবেন।
উত্তরে সতর্ককারীরা বললো, আমরা তাদের ওপর এজন্য মেহনত করছি যেন আল্লাহর সামনে ওযর পেশ করতে পারি যে, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু তারা এ কাজ থেকে ফিরে আসেনি। আমরা কি-ই বা আর করতে পারি। এ আশায় দাওয়াত দিচ্ছি যে, তারা যদিও কট্টর তারপরও হয়তো তারা ফিরে আসবে। আমরা তাদের সংশোধন নিয়ে হতাশ হই না। অতঃপর যখন এই প্রতারকরা মূসা আ.-এর শরীয়তের আদেশ ভুলে গিয়ে তাদের কাজ থেকে বিরত থাকল না, তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার একটি আদেশ তাদের নিকটে উপস্থিত হয়। তারা অপমানিত হয়ে বানর হয়ে গেল। বলা হয় যে, তারা তিন দিনে একদম মরে যায়। আর এসব শারীরিক গঠন বিকৃতদের পরবর্তী প্রজন্ম অবশিষ্ট থাকে না।
জাতির যেসব লোক তাদেরকে বাহানা করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা করলেন। আর তৃতীয় সম্প্রদায়ের কি হয়েছিল? এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআন নীরব। তবে ইবনে আব্বাস রা.-এর শিষ্য ইকরিমা রহ. উক্ত আয়াতে গবেষণা করে বলেন, তাদেরকেও আল্লাহ তাআলা রক্ষা করেন। ইবনে আব্বাস রা. তার এ গবেষণাকে সমর্থন করেন। খুশি হয়ে তাকে জামা হাদিয়া দেন। আর তৃতীয় দলের আলোচনা কুরআন এজন্যে করেনি যেন তাদের এ কাজকে কেউ আবার গ্রহণীয় মনে করে না বসে। আর হাদীস শরীফও ইকরিমার এ উক্তিকে সমর্থন করে।
খারাপকে অন্তর দিয়ে খারাপ মনে করা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। সুতরাং তারা তো ঈমানদার ছিলেন তাদেরকে কেন ধ্বংস করা হবে? তবে তাদের কাজ অনুসরণীয় নয়। সুতরাং শেষ পর্যন্ত শুদ্ধির কাজ চালু রাখাই সমীচীন।
ফায়েদা-১ :
শারীরিক গঠন বিকৃত করে তাদেরকে বাস্তবেই বানর বানানো হয়েছে। এখানে কোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও মূল ব্যাখ্যায় বিকৃত সাধনের প্রয়োজন নেই। আশ্চর্যের বিষয়টি হলো, ডারউইন যখন বানরগুলোর বিকশিত হয়ে মানব হয়ে ওঠার কোনও নির্দিষ্ট যুক্তি ছাড়াই বর্ণনা করে, তখন এ থিউরি বিশ্ব মেনে নেয়। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে অকাট্যভাবে মানুষ বানরে বিকৃতি হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করলে এ সমাজের অনেক কথিত বুদ্ধিজীবি তখন ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। -‘আসান তরজমা’ থেকে।
ফায়েদা-২ : বনী ইসরাইলের ভাল-মন্দ পরিস্থিতি
পবিত্র কুরআনে তাদেরকে মুসলমানদের জন্য একটি পাঠ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে এই উম্মাহ তাদের উত্তম পরিস্থিতি অনুসরণ করে এবং খারাপ পরিস্থিতি এড়ায়। বনী ইসরাইলরা আরবের লোকদের সাথে মেলামেশা করতো। তাদের সাথে ওঠা-বসা করতো। তাই আরবরা তাদের অবস্থা সম্পর্কে ভালো জানতো। আর এজন্যই বনী ইসরাইলদের বাস্তব ঘটনা দিয়ে আরবদের বুঝানো হয়েছে যেন এসব উপদেশ আরবদের হৃদয়ে বসে যায়। তারা সহজেই বুঝতে পারে।
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বনী ইসরাইলের মতো এসব মন্দ স্বভাব ছিল না। তারা ছিলেন প্রকৃতই দুধে ধোয়া প্রকৃতির। এজন্য কুরআন বাইরে থেকে উদাহরণ নিয়ে পরিস্থিতি বর্ণনা করেছে। এ কারণেই বনী ইসরাইলের কথা প্রায়শই কুরআনে উল্লেখ রয়েছে।
ফায়েদা-৩
বনি ইসরাইলের বাহানার ঘটনার মতো বর্তমানে উম্মতের অবস্থাও অনুরূপ হচ্ছে। অনেক মাদরাসায় যাকাতের পয়সাকে বাহানার মাধ্যমে মালিক বানানো হচ্ছে। মুসলিম ফাণ্ডে ফরমের মাধ্যমে বাহানা শুরু হচ্ছে। বেদআতিদের কাছে চলছে ‘হিলায়ে ইসকাত’ তথা নামায-রোযা না করার বাহানা। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ‘মুরাবাহার মাধ্যমে বৈধকরণের কৌশলটি ব্যবহৃত হয়। উল্লিখিত ইহুদিদের বাহানার মতোই এসব বাহানা।
ফায়েদা-৪ :
হিলা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। সূরা সোয়াদে আল্লাহ তাআলা ইয়াকুব আ.-কে হিলা শিখিয়েছেন। ঝাড়ুর শলা দিয়ে স্ত্রীকে মারলে একশ বেত্রাঘাত আদায় হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন : “আপনি আপনার হাতে এক মুষ্ঠি শলার খিলাল নিন এবং শপথ না ভেঙ্গে তা দিয়ে প্রহার করুন।”
যে ব্যক্তি শাস্তি ভোগ করতে পারবে না, তার জন্যে হাদীসে হিলার কথা এসেছে যে খেজুরের বড় একটি শীষ নিয়ে একবার প্রহার করবে। এই হিলা শরীয়তের কোনো আইন হতে পারে না। এটা আইন নয়। তাকে নিয়ম বানিয়ে চালিয়ে দেয়া জায়েয নেই।
হিলা আইনের একটি নমনীয় দিক। আইন যদি লোহার ডান্ডার মতো হয়, তাহলে অসহায় অপরাগ ব্যক্তি তা ভাঙতে বাধ্য হবে। তাতে আইনের স্পর্শকাতরতা আরো বাড়বে। অপারগ ব্যক্তি আইন ভেঙ্গে বেরিয়ে যাবে। মোটকথা, ইমার্জেন্সি অবস্থার জন্যই হিলার এ পথ । সব সময়ের জন্য নয়। এ বিষয়টি ভালো করে মনে রাখা চাই।