বুধবার-৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় আবারও এরদোয়ান

ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় আবারও এরদোয়ান

 মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী

লেখক: মহাপরিচালক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া, ঢাকা

২০২৩ সালের পর তুরস্ক হবে অন্যতম সুপার পাওয়ার। শতাব্দীর ষড়যন্ত্র জাল ছিন্ন করে খেলাফতের স্মৃতিবাহী পরাশক্তি মুক্তির নিশ্বাস ফেলবে। বদলে যাবে পৃথিবীর শক্তি ও শাসনের চেহারা। বিশ্বের ৩৩টি রাষ্ট্র নিয়ে ছিল তর্কি জাতির নেতৃত্বাধীন মুসলিম কেন্দ্রীয় খেলাফত ব্যবস্থা। দীর্ঘ ৬০০ বছরের ইতিহাস ওসমানী খেলাফতের সোনালি যুগের কথা লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। ২০২৩ সালের পর তুরস্ক রাহুমুক্ত হলে ১০০ বছর ধরে বয়ে চলা গোলামি চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে এসব দেশ আবার একটি রাষ্ট্রসংঘ গড়ে তুলতে পারে। স্বতন্ত্র সত্তা ধরে রেখেই প্রতিরক্ষা, আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, উন্নয়ন, শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতার আওতায় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমন্বায়ক হওয়াও বিচিত্র নয় এই তুরস্কের। তখন ৩৩টি শুধু নয়, মোট ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রই একটি ইসলামিক ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আগামীর তুরস্ক নিয়ে বিশ্বমুসলিমের পাশাপাশি দুনিয়ার নিপীড়িত মানুষের অনেক আশাবাদ। বর্তমানে বিশ্বের দশম অর্থনৈতিক শক্তি। অষ্টম সামরিক শক্তি। মানবতার কল্যাণ ও ত্রাণ কর্মকাণ্ডের দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ডিঙিয়ে এখন তুরস্ক নাম্বার ওয়ান। জাতীয় ঐক্য, মিশনারি স্পিরিট আর ওসমানী খিলাফতের সময়কার বিশ্বনেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার প্রেরণা এখন তর্কিদের জীবনী-শক্তি। দীর্ঘ ৭৩ বছর ইসলাম বিরোধীদের নিষ্পেষণ পার হয়ে ২৪ বছর ধরে এক পারে দু পারে করে সামনে এগুচ্ছে তুরস্ক।

৬০০ বছরের বেশি ইসলামের পতাকা হাতে সভা পৃথিবীর সবটুকু শাসন করে যারা দুনিয়ায় ন্যায়বিচার ও সুশাসনের নজির স্থাপন করেছিল, সে তুর্কি জাতি আবারও জেগেছে। নেতা রজব তাইয়েব এরদোগানের হাত ধরে তারা একটি নতুন পথের দিশা পেতে চলেছে। মানবজাতিকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে, একটি সুন্দর পৃথিবীর।

খেলাফত পতনের সময় ইসলাম বিরোধী অক্ষশক্তি চরম অমানবিক তামাশা ও গোলামি চুক্তির মাধ্যমে তর্কি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সেসব অন্ধকার দূর করে করে তর্কি নতুন প্রজন্মের ইসলামমুখী কাফেলা এগিয়েছে বহুদূর। এই জঘন্য চুক্তির মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে। ইনশাআল্লাহ বিজয় সমাগত। আগামী বছর মুক্তি মিলবে তুরস্কের। এ চুক্তির বিষয়ে মাহদী গালিব কৃত গবেষণা নিবন্ধে দেখা যায়।

উসমানী সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার ঘটে ১৫২১ সালে। পুরো সাম্রাজ্যের আয়তন দাঁড়ায় ৩৪ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার প্রায়। ২৩টা বাংলাদেশের সমান। বিভিন্ন সময় আয়তন বাড়ে-কমে। শুরু থেকে শেষ অবধি হিসেব করলে গড় আয়তন হয়- ১.৮ মিলিয়ন (১৮ লক্ষ) বর্গ কিলোমিটার।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ হয়। মিত্রশক্তি যুদ্ধে জিতে। মিত্রশক্তি হচ্ছে, সার্বিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য , ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হেরেছিল কেন্দ্রীয় শক্তি। এরা হচ্ছে উসমানী সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানি ও বুলগেরিয়া।

মিত্রশক্তি উসমানী সাম্রাজ্যকে জবাই করে। টুকরো টুকরো করে। বর্তমান তুরস্ক ৭ লক্ষ ৮৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার (৭৮৩,৫৬২)। মানে ১০ লক্ষ ১৬ হাজার (১,০১৬,৪৩৮) বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা আলাদা করা হয়। বানানো হয় নতুন নতুন রাষ্ট্র।

উসমানীদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে লুজানের চুক্তি। এটি ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল ক্রীড়নক ছিল ব্রিটেন। এ চুক্তিকে ‘শতাব্দী চুক্তি’ বলা যায়। চুক্তির মূল পয়েন্ট পাঁচটি।

  1. খেলাফত ধ্বংস: উসমানী খেলাফত সমূলে শেষ করা হয়। এর উত্তরাধিকারীদের গুপ্তহত্যা করা হয়। নিখোঁজ করা হয়। সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়, পাচার করা হয় পশ্চিমা নানা দেশে। মুসলিম উত্থানের টুঁটি চেপে ধরা হয়।
  2. উগ্র সেক্যুলার রাষ্ট্র: ইসলামের গৌরব ওসমানী খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র তুর্কিকে হয় একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র। ইসলাম চর্চা হয় প্রায় নিষিদ্ধ। আরবিতে আযান নিষিদ্ধ করা হয়। কামানের মুখে কুরআন রেখে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ভাষাও বদলে যায়। আগে আরবি ও ফার্সির রীতি অনুসারে লেখালেখি হত। অক্ষর বা বর্ণমালাকে বলা হত আবজাদ। আরবি বর্ণমালার মত ছিল সেটি। একে উসমানী ভাষাও বলা হয়। এসব বদলিয়ে ল্যাটিন অক্ষরে লেখালেখি আরম্ভ হয়। রাতারাতি একটি জাতি হয় অক্ষরজ্ঞানহীন। চিন্তা করুন, কাল সকাল থেকে যদি অফিসিয়াল ভাষা হয় চাইনিজ, আপনার অবস্থাটা কী হবে? সত্য রূপটা হচ্ছে, সেক্যুলারিজমের নামে জায়নিস্টদের সমস্ত ঝাল মেটানো হয় তুরস্কে। একটি সুমহান জাতিকে ফেলে দেওয়া হয় পরিচয়হীনতার অন্ধকূপে।
  3. জ্বালানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা: তুর্কি জীবাশ্ম জ্বালানি বা খনিজ তেল উৎপাদন করতে পারবে না। না নিজের দেশে, না অন্য দেশে। দেখুন, বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি প্রায় পুরোটাই পেট্রো-ডলারের দখলে। সৌদি, আমিরাত কুয়েতসহ গালফের দেশগুলো তেল বেঁচেই আঙুল ফুলে কলাগাছ। এখানে, তুর্কিকে পেট্রো-অর্থনীতি থেকে বোল্ড আউট করা হয়।
  4. বসফরাস প্রণালি: বসফরাস প্রণালিকে তুর্কির এখতিয়ার একেবারেই তুলে নেওয়া হয়। সহজ ভাষায় প্রণালি হচ্ছে, দুই সমুদ্রের মধ্যকার শর্টকাট সংযোগ নৌপথ। ধরুন দুই দিকে দুটি সাগর। মাঝখানে একটা জমি। আপনি ওপারের সমুদ্রে যেতে চান। তাহলে আপনাকে পুরো জমিটা ঘুরে এপারে আসতে হবে। পেরোতে হবে হাজার হাজার কিলোমিটার। কিন্তু জমিটার মাঝ দিয়ে যদি একটা নৌপথ থাকে, তবে বিষয়টা সহজ হয়ে যায়। হাজার কিলোমিটার ঘুরতে হয় না। সময় বাঁচে। অর্থ সাশ্রয় হয়।

বসফরাস হচ্ছে এমনি এক প্রণালি। যা এশিয়া থেকে ইউরোপে যাবার সহজ রাস্তা। এখন চিন্তা করুন, কী পরিমাণ ব্যবসা ইউরোপ-এশিয়ায় হয়? কী পরিমাণ মাল বোঝাই জাহাজ চলাচল করে? এই জাহাজগুলোতে উঠানো টোল কী পরিমাণ হবে? ভৌগোলিকভাবে তাহলে বসফরাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

লুজানের চুক্তিতে বসফরাস থেকে তুর্কির কর্তৃত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। মানে যে যতই এ পথে ব্যবসা করুক, তুর্কি শুল্ক তুলতে পারবে না। ভাবুন, কতটা আর কতভাবে তুর্কিকে পঙ্গু করা হয়েছে। ২০২৩ সালে এ গোলামি চুক্তির মেয়াদ ফুরালে শুধু বসফরাস প্রণালি থেকেই তুরস্কের জিডিপির বিশাল সমৃদ্ধি অর্জিত হবে।

  1. হেজাজ নিয়ন্ত্রণ: আজকের সৌদি আরব কিন্তু আসল নাম না। এটা গোত্রবাদী সৌদবংশ অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি রাজবংশের সূচনা হয়। এর আগে মক্কা-মদীনা উসমানীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল কয়েক শতাব্দী। উসমানী শাসকরা নিজেদের আরবের শাসক বলতো না। বলত খাদেম বা সেবক। লুজান চুক্তি অনুসারে ১৯২৩ সালের পরে ১০০ বছর উসমানীরা জাজিরাতুল আরবের দিকে প্রশাসনিকভাবে অগ্রসর হতে পারবে না।

তুর্কিরা এখনো হজে গেলে একটা আলাদা মানচিত্র সাথে রাখে। বর্তমান শাসকরা ঐতিহ্যবাহী যেসব নিদর্শন ধ্বংস করেছে, তার ফলে রসুল (সা.) এবং সাহাবীদের স্মৃতি বিজড়িত জায়গা ও অনেকের বাড়ি ঘরের অবস্থান কোনখানে তা বোঝা কষ্টকর। কিন্তু তুর্কিরা এসব জানে। কারণ তাদের মানচিত্রে সেসব চিহ্নিত আছে। কোন খলীফা, উম্মুল মুমিনীন, হযরত ফাতিমা, হযরত আব্বাস (রযি.)সহ বিশিষ্ট সাহাবীদের মাকবারা কোনখানে, তাছাড়া কোন ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপত্য কোথায় ছিল, এসব দলিল তারা সবই সংরক্ষণ করে।

তুর্কিরা এখনো কাবা শরীফের গিলাফ ধরে কান্না করে। বলে, ইয়া আল্লাহ! আবার মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ফিরিয়ে দাও। ইসলামের খেলাফত পদ্ধতি ও বৈশ্বিক ঐক্য পুনরায় কায়েমের তাওফীক দাও। আসুন, ধারণা করা যাক, এখন ২০২৩ সাল। মানে ১০০ বছরের চুক্তি শেষ হলো। এরপর কী হবে? তুর্কিরা কী করবে?

প্রথমেই তারা তেল উঠাবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ব্যবসার পাশে নতুন শক্তি হিসেবে তুরস্কের উত্থান ঘটবে। বসফরাস প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেবে। ইউরোপ-এশিয়ার বাণিজ্য চলাচলে ছড়ি ঘুরাবে। যা ইউরোপিয়দের জন্য অশনিসংকেত। তুর্কির অর্থনীতি এখনো ততটা বিশাল না। কিন্তু তেইশের পরে পরাশক্তির মতোই ফুলেফেঁপে উঠবে।

তুর্কিরা যেকোনো মূল্যে সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মার্কিন মুলুকের সাথে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় নামতে প্রস্তুত। চীন, রাশিয়াসহ মার্কিন বিরোধী প্রায় সমস্ত শক্তিগুলোর সাথে বর্তমান তুরস্কের কৌশলগত সখ্য। এমনকি পাকিস্তানের সাথেও তুর্কিদের জমজ ভাইয়ের সম্পর্ক।

শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তান ও তুরস্ক সহযোগিতার ধারণাও অগ্রসর হচ্ছে। পাকিস্তান একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র। ন্যাটো ও ইইউয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ধাপগুলি এগিয়ে গেলে তুরস্ক পারমাণবিক শক্তি অর্জন এবং অস্ত্র তৈরির অনুমোদন বাগিয়ে নেবে। অস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানিতে তুরস্ক এখন অনেক অগ্রসর।

আর আগামীতে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারে ইসলাম। মুসলিমদেশগুলোর প্রতি তুর্কির আচরণগুলো খেয়াল করুন। বিশ্বমুসলিমের প্রতিটি সংকট ও প্রয়োজনে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয় তুরস্ক। রোহিঙ্গাসহ নিপীড়িত মুসলিমদের সাহায্যে তারা এগিয়ে।

তুর্কি মুসলিমদের মাঝে শত বছর আগের সেই চেতনা ফেরাতে চাচ্ছে বর্তমান সরকার। ভবিষ্যৎ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বিশ্বপরিস্থিতি বিচারে অনুমান করাও কঠিন। হয়ত গোলামি চুক্তির মেয়াদ শেষে তুর্কির মাধ্যমে ফিরতেও পারে মুসলিমদের সোনালি সময়।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ