নিউজিল্যান্ডে হত্যাকাণ্ড: মুসলমানদের যেখানে রক্ত ঝরে কালিমার ঝাণ্ডা সেখানে বুলন্দ হয়
খ্রিস্টান সন্ত্রাসী ট্যারান্ট কর্তৃক ১৫ মার্চ’১৯ নিউজিল্যান্ডের দু’টি মসজিদে গুলি চালিয়ে ৫০জন মুসল্লির কাপুরুষোচিত হত্যাযজ্ঞ গোটা দুনিয়াকে হত-বিহ্বল করেছে। শোকের ছায়া নেমে আসে ওয়েলিংটন থেকে সান্দিয়াগো, কেপটাউন থেকে অসলো পর্যন্ত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাবাদী মানুষরা মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়েছে সহানুভূতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। সব খ্রিস্টান সন্ত্রাসী নয়, সব মুসলমানও জঙ্গি নয়। আমরা অপরাধীকে ব্যক্তি পরিচয়ে দেখতে চাই, ধর্মীয় পরিচয়ে নয়। তারপরও ট্যারান্টের নামের আগে খ্রিস্টান সন্ত্রাসী লেখার কারণ হচ্ছে, প্রতিবাদ। এক শ্রেণির মিডিয়া, ইসলাম বিদ্বেষী মানুষ কোন মুসলমান অপরাধ করলে মুসলিম সন্ত্রাসী বলে প্রপাগাণ্ডা চালায়। তাদের এ মিথ্যাচারের কারণে দেশে দেশে মুসলিম বিদ্বেষ, ঘৃণা ও ইসলাম আতঙ্ক (Islamophobia) তৈরি হয়েছে।
অভিবাসী বিরোধী প্রচারণা, শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা, নাস্তক্যবাদী চেতনা, পাশ্চাত্যের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও ইসলাম বিদ্বেষ সন্ত্রাসী তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠার জন্য দায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্পের বক্তব্য মুসলিম বিদ্বেষ উস্কে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
নিউজিল্যান্ডের সরকার ও জনগণ যেভাবে নিহত ও আহত মুসলমানদের প্রতি সমবেদনা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়েছেন, আমরা এটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চাই। অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালনের জন্য আমরা তাদের অভিনন্দিত করি। পার্লামেন্টে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, তেলাওয়াতের সময় সব এমপি দাঁড়িয়ে কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ২২ মার্চ রাষ্ট্রীয় বেতার ও টিভিতে আজান সম্প্রচার, হিজাব পড়ে মিছিল, মুসলমানরা জুমার নামায আদায়ের সময় ২০ হাজার নিউজিল্যান্ডবাসী মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতা জ্ঞাপন, প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা মাথায় ওড়না দিয়ে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র হাদীস উদ্ধৃত করে বক্তব্য প্রদান, আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিষিদ্ধসহ নানা পদক্ষেপ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এক সাথে, এক সমাজে ও একদেশে বসবাস করার শুভ ইঙ্গিত বহন করে। নিউজিল্যান্ডে ইসলামের অগ্রগতি ও ক্রমবিকাশধারা অব্যাহত রাখতে এসব ঘটনা সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
নিউজিল্যান্ডে ইসলামের অগ্রযাত্রায় আতঙ্কিত ও বিদ্বিষ্ট হয়ে সন্ত্রাসী ট্যারান্ট মুসলিম হত্যার মিশন নিয়ে মাঠে নামে। এটা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। সন্ত্রাসীদের জেনে রেখে দরকার হত্যা, নির্যাতন ও বোমা ফেলে মুসলমানদের নিপাত করা যায়নি আগামী দিনেও যাবে না। মুসলমানদের বুকের তাজা রক্তের ওপর কালেমার বিজয় নিশান ওড়ে। ইতিহাস তার সাক্ষী।
নিউজিল্যান্ডের হত্যকাণ্ডের অব্যবহিত পর ব্রিটেনে ৫টি মসজিদের দরজা জানালা ভাংচুর এবং করাচিতে বিশ্বনন্দিত আলিম ও স্কলার শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুফতি তাকি উসমানী (দা. বা.)-এর বন্দুক হামলা হয়েছে। সব ঘটনা একই সূত্রে গাথা।
ট্যারান্ট যখন মুসল্লীদের প্রতি গুলি ছুঁড়ে তখন কিন্তু তার টার্গেট ছিল মুসলিম। কে কোন দল করে, কোন মাযহাবের অনুসারী, কোন পীরের মুরিদ, কোন তরিকা মানে; এটা বিবেচনা করেনি। মসজিদে নামায আদায় করতে আসা সব মুসলমান ছিল তার গুলির লক্ষ্য। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ।
মুসলমানদের পারস্পরিক ইখতিলাফ, মতভেদ, চিন্তার ভিন্নতা অতীতেও ছিল আগামীতে থাকবে বা থাকতে পারে। এক পক্ষ অপর পক্ষকে সম্মানের চোখে দেখতে হবে। আমরা যেন কাউকে কর্ণারে ঠেলে না দেই। সমালোচনা ও বিরোধের মাত্রা যেন কোনক্রমে সীমা ছাড়িয়ে না যায়। মুসলমানদের ইখতিলাফের সুযোগ নিয়ে কুফরি ও তাগুতি শক্তি যাতে আঘাত হানতে না পারে, এ ব্যাপারে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে। মুসলমানদের ঐক্যই দুশমনের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক।
পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে উদার, হৃদয়বান ও মানবতাবাদী মানুষ আছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে মুসলমানগণ তাঁদের সাথে সংলাপে বসতে পারেন। বহুধর্মীয় সমাজে (Pluralistic Society) ঠিকে থাকার জন্য এটা অপরিহার্য। পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষরা কোন দিন সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেন না। নানা ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর চিন্তা ও কর্মের ঐক্য গড়ে তুলতে পারলে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হতে বাধ্য।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন