শুক্রবার-২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া দামাত বারাকাতুহুমের জীবনী : একজন আলোকিত মানুষের আলোকিত জীবন (৩)

মুহাম্মাদ আদম আলী


 

২। গোরকঘাটা মাদরাসায় অদ্ভুত নীরবতা। মুহতামিম সাহেবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দেখা হচ্ছে, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। হযরত একটু বিস্মিত হলেন। হ্যাঁ-না কিছু একটা বলবে তো! কেউ কিছুই বলছে না। হযরতও চুপচাপ আছেন। সময় হলেই বিদায় নিবেন। সিদ্ধান্তের কোনো নড়চড় হবে না।
শাবান মাস প্রায় শেষ। চার-পাঁচ দিন বাকি। এসময় হঠাৎ করে মাদরাসা কমিটি বৈঠক ডেকেছে। এ বৈঠকে হযরতের থাকার কথা থাকলেও তাকে জানানো হয়নি। আবার বৈঠকটি মাদরাসায় ডাকা হয়নি। মুহতামিম সাহেবের বাসায় ডাকা হয়েছে। আলোচনার মূখ্য বিষয়- হযরতকে কীভাবে ধরে রাখা যায়। তিনি কেন চলে যেতে চাচ্ছেন, এর অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণ নিয়ে তারা আলোচনা করলেন। তারা জানতে পেরেছেন- কেউ হয়তো তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, হিংসা করেছে, যুলুম করেছে, খানাপিনাও ভালো দেয়নি ইত্যাদি। এগুলো তারা সব ঠিক করে দেবেন। এছাড়া হযরতের বেতনও দ্বিগুণ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
পরে হযরতকে এসব বিষয় জানানো হলো। তিনি বললেন, ‘আমি তো বেতনের জন্য ইস্তফা দেইনি। আমার বাড়ি-ঘরে অসুবিধা। আব্বু মারা গেছে। বিয়ে-শাদী করব। ঘর নাই। ঘর করতে হবে।’
হযরতের কথা শুনে তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে এখানে ঘর করে দেব। বিয়েও দিয়ে দেব।’
বিয়ের ব্যাপারটা তিনি আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। মাদরাসারই এক উস্তাদ তার মেয়েকে হযরতের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য রীতিমতো উঠেপড়ে লেগেছেন। বিষয়টি আর গোপন থাকেনি। তার বাসা থেকে হযরতের জন্য খাবার আসত। মাঝে মাঝে বাসায় দাওয়াতও দিত। হযরত সবই বুঝতেন। আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেন না। খাবার এলে খেয়ে নিতেন। ওই উস্তাদ আবার সরকারি মাদরাসায় পড়েছিলেন। তাকে মাদরাসার যেসব কিতাব দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো ভালো বুঝতেন না। এজন্য তিনি হযরতের কাছে আসতেন। হযরত তাকে তা বুঝিয়ে দিতেন। তারপর তিনি ক্লাস নিতেন। এতে একটি শর্ত ছিল, হযরত বিষয়টি কাউকে জানাতে পারবেন না। হযরত এ শর্ত রেখেছিলেন। এতে ওই উস্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। কিন্তু হযরতের মনে এত দূরে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না।

৩। মুহতামিম সাহেব ও অন্যান্য উস্তাদদের আচার-আচরণে হযরত বুঝে গেলেন, সহজে তাকে তারা ছাড়বে না। কোথাও থেকে মন উঠে গেলে আর থাকা সম্ভব হয় না। এটা মানুষের বেলায় যেমন, জায়গার বেলায়ও তেমন। হযরত নিজের মালপত্র সব গুছিয়ে ফেললেন। সাম্পানে করে শহরে ফিরতে হবে। এজন্য মাদরাসা বন্ধের আগের রাতে সব সামানপত্র ঘাটের এক দোকানে রেখে এলেন। মুহতামিম সাহেব এটা টের পেয়ে গেলেন। তিনি হযরতকে কিছু জানালেন না। লোক পাঠিয়ে ঘাট থেকে হযরতের সামানপত্র মাদরাসায় নিজের কামরায় এনে রাখলেন। হযরত এবার কি করবেন!
পরদিন সকাল হলো। মুহতামিম সাহেব সহাস্যে এলেন। মাদরাসা ছুটি হয়ে গেছে। ছাত্র-শিক্ষক সবাই আজ বাড়ি যাবে। মুহতামিম সাহেব হযরতকে বাড়ি যেতে নিষেধ করলেন না। বরং তিনি নিজে হযরতকে ঘাটে পৌঁছে দিলেন। তবে সামানপত্র নিতে দিলেন না। হযরতও কথা বাড়াননি। তিনি জানেন, মালপত্র রেখে দিলেও তাকে আর ফেরানো যাবে না।
হযরত গোরকঘাটা থেকে পটিয়া এলেন। হাজী ই্উনুস সাহেব রহ.-এর কামরায় যেতেই ঘটনা টের পেলেন। তিনি তাঁকে তখনই পটিয়া মাদরাসার উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে দিলেন। সবাইকে তা জানিয়েও দিলেন। আর এর মাধ্যমে হযরতের নতুন জীবন শুরু হলো। এ জীবনে ফুল হবে, ফল হবে, গাছ আরও বড় হবে!

মুফতী আব্দুর রহমান রহ.-এর নেক দৃষ্টি
মুফতী আব্দুর রহমান (১৯২০-২০১৫)। পটিয়া মাদরাসার প্রসিদ্ধ উস্তাদ। বয়স পঞ্চাশ পেরুলেও এখনো খুব স্মার্ট। সবসময় শ্বেত-শুভ্র পোশাকে থাকেন। টান টান কাপড়ের ভাঁজ। মনে হয়, কেবলই আয়রন করা হয়েছে। মাথায় কিস্তি টুপি। শক্ত-পোক্ত চেহারা। সেই চেহারায় গাম্ভীর্য লেগেই থাকে। ভরাট কণ্ঠ। হাঁক দিলে দৌড়ে পালানো ছাড়া উপায় নেই। ছাত্ররা ভয়ে তটস্থ থাকে। তিনি মাদরাসায় থাকলে টের পাওয়া যায়- না থাকলেও। মুহতামিম সাহেব তাকে খুব কদর করেন। তার পরামর্শ ছাড়া বাহ্যত কিছু করেন না। তার দূরদর্শিতা মাদরাসার জন্য কল্যাণই এনেছে।
এরকম উস্তাদের প্রিয় হওয়া কঠিন। মনে হয়, এ শ্রেণির মানুষের আবেগ বলতে কিছু নেই। কিন্তু তাদেরও মন আছে। সেই মন-ও জয় করা যায়। আর একবার কাছে ভিড়তে পারলে আমৃত্যু বন্ধন টিকে থাকে। হযরত এ কঠিন কাজটাই করে ফেললেন। তোষামোদ করে নয়—মেধা দিয়ে। হযরত যে ক্যাটাগরির মেধাবী, তাতে সব উস্তাদের কাছেই তার প্রিয় হওয়ার কথা। তবে মুফতী সাহেব হযরতকে চিনেছিলেন সবার আগে।
১৯৭০ সাল। হযরত পটিয়ায় নতুন ভর্তি হয়েছেন। জামাতে পাঞ্জুমে। ওই জামাতে মুফতী সাহেবের কোনো ক্লাস নেই। ক্লাস ছিল মাওলানা হাবীবুল্লাহ সাহেবের। তিনি শরহুত তাহযীব পড়াতেন। খুব ভালো উস্তাদ ছিলেন। তার বাড়ি হাটহাজারী মাদরাসার পাশের গ্রামে। দেশে সত্তরের ইলেকশনের পরে গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। এজন্য তাকে তার বাবা আর মাদরাসায় আসতে দেননি। নিজের ব্যবসার কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। এদিকে তার ক্লাসের দরসও বাকি ছিল। এখন সেটা কাউকে নিতে হবে। অগত্যা সেই দায়িত্ব পড়ে মুফতী সাহেবের ওপর।
একদিন মুফতী সাহেব ক্লাসে ‘নিসাবে আরবাআ’ বিষয়ে পড়ালেন। তারপর ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা বুঝেছ? সবাই বলল, বুঝেছি। এখন তিনি এক এক করে সবাইকে জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন। কেউ কেউ আংশিক পারল। অনেকে পারল না। হযরতকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি কিতাবের হাশিয়ার উদাহরণসহ বলে দিলেন। মুফতী সাহেব টের পেলেন—এই নতুন ছাত্র তো অসাধারণ! তখন থেকেই হযরত তাঁর নেকদৃষ্টিতে পড়ে গেলেন।
নির্দিষ্ট সময়ে শরহুত তাহযিব কিতাবের পরীক্ষা হলো। মুফতী সাহেবই প্রশ্ন করেছেন। তার ব্যস্ততা অনেক। এজন্য পরীক্ষার খাতা দেখার দায়িত্ব দিলেন মাওলানা আমীনুল হক সাহেবকে। তিনি হযরতের খাতা দেখে অবাক! যা লেখেছে, তাতে তাকে সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু তিনি তাকে এত নম্বর দিতে চাচ্ছেন না। তার সন্দেহ হচ্ছে। তার ক্লাসে (মাওলানা) আব্দুল গফুর ফার্স্ট বয়। তুখোড় ছাত্র। শুরু থেকেই প্রথম হয়ে আসছে। তাকে ডিঙাতে পারে, ক্লাসে এমন কেউ আছে বলে তার জানা নাই। শেষ পর্যন্ত তিনি মুফতী সাহেবের কাছে গেলেন। নতুন ছাত্রের ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘এই ছেলে কেমন করে এত নম্বর পায়?’ মুফতী সাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘সে পাবে। প্রয়োজন হলে তাকে ডেকে পরীক্ষা করে দেখ।’
মাওলানা আমীনুল হক সাহেব উপায়ন্তর না দেখে হযরতকে ডাকলেন। আবার এক এক করে সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। আর হযরত সব প্রশ্নেরই সঠিক জবাব দিলেন। এবার আর উপায় নেই। তিনি সেই বছর সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হলেন। আব্দুল গফুর পেছনে পড়ে গেল।

অদ্ভুত কৌশল
হযরত গোরকঘাটা মাদরাসার খেদমত শেষে এখন পটিয়া মাদারায় শিক্ষক হয়েছেন। মুফতী আব্দুর রহমান সাহেবের সঙ্গে সখ্যতা আরও বেড়েছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো কাজে ডাক পড়ে। তার রুমে রাখা রং-চায়ের দাওয়াত থাকে। হযরত তো চা খান না, পান-ও না। তবু যান। কখনো কখনো কোনো কাজ থাকে না। কেবলই বসে থাকেন। শিষ্য কাছে বসে থাকলে গুরুর ভালো লাগে। শিষ্যের কেমন লাগে, এটা তাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে!
হযরত বিয়ে করেছেন। প্রতি বৃহষ্পতিবার ছুটির পরে বাড়িতে যান। শুক্রবার বিকেলে মাদরাসায় ফিরে আসেন। মুফতী সাহেব এক ব্যতিক্রম জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি বাড়িতে বেশি যান না। নতুন বিয়ের পরেও বাড়িতে বেশি যাননি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ মাদরাসায়ই কাটিয়ে দিয়েছেন। এজন্য চাইতেন তার এই শিষ্য একই অভ্যাস গড়ে তুলুক। ব্যাপারটা দিন দিন জটিল হতে লাগল। বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় হযরতের ডাক পড়ে। রাত দশটার আগে ছুটতে পারেন না। বাড়িতে আর যাওয়া হয় না। হযরত এ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে লাগলেন। একটা মোক্ষম অস্ত্রও পেয়ে গেলেন।
এরকম এক বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় মুফতী সাহেব হযরতকে ডেকেছেন। কোনো কাজ নেই। হযরত বসে আছেন। কথাবার্তাও হচ্ছে না। এভাবে বসে থাকতে কারও ভালো লাগার কথা নয়। উস্তাদকে কিছু বলাও যাচ্ছে না। বাড়িতে নতুন পরিবার। এ পরিবার ফেলে ছুটির দিনে অকর্মণ্য বসে থাকা কষ্টকর। হযরত কষ্ট করে বসে থাকলেন। রাত দশটা বাজল। এরপর ছুটি মিলল। কিন্তু তখন তো আর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। অগত্যা নিজের রুমে ফিরে গেলেন। রাত মাদরাসায় কাটালেন। কিন্তু ভোর হতেই গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন।
শুক্রবার গেল। শনিবার-রবিবারও গেল। হযরতের আসার নামগন্ধ নেই। তিনি এলেন মঙ্গলবার। পুরো তিন কর্মদিবস অনুপস্থিত। তারপর যখন মাদরাসায় ঢুকলেন, মুফতী সাহেব তাকে দেখেও কিছু বলেননি। জিজ্ঞেসও করেননি, কেন দেরি করে এসেছেন। কাজ যা হওয়ার, হয়ে গেল। এরপর থেকে আর কোনো বৃহষ্পতিবারেই মুফতী সাহেব হযরতকে ডাকাডাকি করেননি।

নামের শেষে ’জিয়া’ সংযোজন
মাওলানা সুলতান যওক সাহেব পটিয়ার স্বনামধন্য শিক্ষক। তার আরবী সাহিত্য-জ্ঞান ও বুযুর্গি কিংবদন্তীতে পরিণত হচ্ছে। আরব বিশ্বেও তাকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে। বাংলাদেশে আরবী সাহিত্যের এরকম একজন প্রতিভা থাকতে পারে, অনেকের বিশ্বাস হতে চায় না। তারই একজন অতি প্রিয় ছাত্র হযরত।
সাহিত্যের মূল হচ্ছে কবিতা। যে কবিতা বোঝে না, তার দ্বারা সাহিত্য হয় না। আরবীতেও একই। অথচ হযরতের মধ্যে কবিতার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। লেখার ইচ্ছাও কাজ করে না। এরকম একজন বড় মাপের শিক্ষকের প্রিয় হতে হলে কবিতা চর্চা না করে উপায়ও নেই। অন্যরা চর্চা করছে। একসময় তিনিও কিছু লেখা শুরু করলেন। বন্ধুদের চাপে পড়ে যা লিখলেন, তাতে চারিদিকে সাড়া পড়ে গেল। তিনি অনেককে ছাড়িয়ে গেলেন। বিপত্তি বাধল অন্য জায়গায়।
বন্ধুরা প্রিয় শিক্ষক সুলতান যওক সাহেবের কাছে নালিশ করল শামসুদ্দীন কবিতা লেখে ঠিকই, কিন্তু নামের সঙ্গে কোনো প্রতীকী নাম যোগ করে না। সোজাসাপ্টা শামসুদ্দীন লিখে রাখে। তখন হুযুর ছাত্রদের বললেন, তোমরা তার জন্য একটা প্রতীকী নাম দিয়ে দাও। অনেকে অনেক নাম প্রস্তাব করল। কারওটা পছন্দ হলো না। তখন মাওলানা সুলতান যওক সাহেব নিজেই বললেন, দেখ কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,
তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময়। (সূরা ইউনুস, ১০ : ৫)
সূর্যের বিশেষণ হিসেবে আল্লাহ জিয়া শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সুতরাং তার নামের শেষে জিয়া যোগ করে দাও।
ছাত্ররা মহানন্দে সেটি শামসুদ্দীন-এর পরে যুক্ত করে দিল। তখন থেকে হযরত কবিতা লিখলে নামের শেষে জিয়া ব্যবহার শুরু করলেন। কিন্তু ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলে কবিতার যুগও শেষ হয়ে যায়। মাওলানা সুলতান যওক সাহেবও পটিয়া থেকে বিদায় নেন। ছাত্ররা প্রায় ভুলে যায় এই লকব। তবে কারও কারও তখনো মনে ছিল। সেটি আবার জেগে ওঠে ১৯৯২ সালে।
হযরত হজ থেকে ফিরেছেন। তাকে রিসিভ করার জন্য দলে দলে ছাত্ররা তার আগমন পথে ভীড় করল। দুআ নেয়াই মূল উদ্দেশ্য। তবে কেউ কেউ আবেগে হযরতের জন্য মানপত্রও রচনা করল। হজ থেকে ফিরে এসে কেউ মানপত্র পেয়েছে কিনা, জানা নেই। সেই মানপত্রে ছাত্ররা তার নাম লিখল মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া। এই জিয়া আর সরানো যায়নি। নামের সঙ্গে লেগে গেছে। এখনো আছে। তবে অফিসিয়াল ডকুমেন্টে এটি নেই।

তাখাসসুস ফিল ফিকহ
১৯৭৬ সাল। দাওরা হাদীসের বছর চলছে। ক্লাস শেষ। পরীক্ষা বাকি। বাংলাদেশ ইত্তেহাদুল মাদারিসের তত্বাবধানে দাওরায়ে হাদীসে বোর্ড পরীক্ষা দিলেন। প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করলেন। ইত্তেহাদ কর্তৃক বৃত্তিও পেলেন। ছোটবেলায় ক্লাস ফাইভেও একবার বৃত্তি পেয়েছিলেন। যদি মায়ের বারণ না থাকত, তাহলে সেই বৃত্তি তাকে নিশ্চিত কোনো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাত। কিছু মা-বাবা আল্লাহ এমন দিয়েছেন, যাদের নিয়তের স্বচ্ছতা দুনিয়াবাসী দেখেছে। হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-কে মাদরাসায় পড়ানো সম্পর্কে তার পিতার সেই বিখ্যাত উক্তি—‘খোদার কসম, যাদের আপনি উপার্জনশীল (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি) মনে করছেন, সেরকম লোকেরাই তার পিছনে পিছনে ঘুরবে; কিন্তু সে তাদের প্রতি ফিরেও তাকাবে না।’—এরকম সত্যের দিকেই হযরত এগিয়ে চলছেন।
হযরতের নামের আগে ইতোমধ্যে ‘মাওলানা’ যুক্ত হয়ে গিয়েছে। তবে পড়ালেখা শেষ হয়নি। তাখাসসুস করতে হবে। প্রিয় বিষয় মানতেক-ফালসাফা। তখন মেধাবিরা এ বিষয়কেই বেছে নিত। হযরতও নিলেন। কিন্তু আকাশের ফায়সালা ছিল ভিন্ন। এই ভিন্নতা তৈরিতে একজন মানুষ বিশেষ ভূমিকা পালন করলেন। তিনি আরেক কিংবদন্তী হযরত মুফতী আব্দুর রহমান রহ. (১৯২০-২০১৫)। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের ইফতা বিভাগে প্রথম ডিগ্রি লাভকারী মুফতী। এ বছরই তিনি পটিয়া মাদরাসায় ইফতা বিভাগ (তাখাসসুস ফিল ফিকহ) চালু করবেন। সেখানে যোগ্য ছাত্র দরকার। আর এক্ষেত্রে তার প্রথম পছন্দ মাওলানা শামসুদ্দীন। সুতরাং তাকে ফালসাফা পড়তে দেওয়া যাবে না। বাধা দিলেন। কিন্তু বাধায় কাজ হবে বলে মনে হলো না। হযরত মানতেক-ফালসাফা বিভাগের ফরম কিনে ফেলেছেন।
ফরম পূরণ করা হয়ে গেল। এখন জমা দিতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। মুফতী আব্দুর রহমান রহ. সেই ফরম আটকে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, তাকে মানতেক পড়তে দেওয়া হবে না। তাকে ফিকহ পড়তে হবে। আর হযরতও নাছোড়বান্দা। তিনি ফিকহ পড়বেন না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তার এই দৃঢ়তা টেকেনি।
মুফতী আব্দুর রহমান রহ. বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। তিনি তার প্রিয় ছাত্রের মেধা ও যোগ্যতা সম্পর্কে খুব জানতেন। তাকে দিয়ে যা হবে, তা অন্যদের দিয়ে হবে না। সুতরাং তিনি ভিন্ন পথ ধরলেন। তিনি মাওলানা সুলতান যওক দামাত বারাকাতুহুম এবং মুফতী মুজাফফর সাহেব দামাত বারাকাতুহুমকে ডেকে বললেন, ‘তাকে রাজি করাও। সে দুঘণ্টা ফিকাহতে পড়বে এং চার ঘণ্টা মানতেক পড়বে। তবে সে ফিকহের কামরায় থাকবে। মানতেকের কামরায় থাকবে না।’
তারপর আর কি! হযরত শীঘ্রই ‘মুফতী’ খেতাবে ভূষিত হলেন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ