মঙ্গলবার-১০ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি-৩১শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৭ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এতো তাড়াতাড়ি এই অসীম সমুদ্র আপনি পাড়ি দেন কীভাবে?

মাওলানা লিসানুল হক শাহরুমী

এক.
আপনি একটি আয়াত দেখুন :
وَإِذْ قُلْنَا لَكَ إِنَّ رَبَّكَ أَحَاطَ بِالنَّاسِ ۚ وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةً لِّلنَّاسِ وَالشَّجَرَةَ الْمَلْعُونَةَ فِي الْقُرْآنِ ۚ وَنُخَوِّفُهُمْ فَمَا يَزِيدُهُمْ إِلَّا طُغْيَانًا كَبِيرًا
“এবং স্মরণ করুন, আমি আপনাকে বলে দিয়েছিলাম যে, আপনার পালনকর্তা মানুষকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং যে দৃশ্য আমি আপনাকে দেখিয়েছি তা ও কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যে৷ আমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন করি৷ কিন্তু এতে তাদের অবাধ্যতাই আরও বৃদ্ধি পায়৷” সূরা বনী ইসরাঈলঃ আয়াতঃ ৬০৷
উপর্যুক্ত আয়াতের স্রেফ তরজমার দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানবজাতির হেদায়াতের জন্যে সেই কুরআনের আয়াত তাদের কানে গেলে তাদের গুমরাহী আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ তাহলে এর কারণ কী? হ্যাঁ এর কারণ বর্ণনা করা হয়েছে আরও আগে একই সূরার ৪৫-৪৬ নম্বর আয়াতে—
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُورًا (45) وَجَعَلْنَا عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَن يَفْقَهُوهُ وَفِي آذَانِهِمْ وَقْرًا ۚ وَإِذَا ذَكَرْتَ رَبَّكَ فِي الْقُرْآنِ وَحْدَهُ وَلَّوْا عَلَىٰ أَدْبَارِهِمْ نُفُورًا
যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন, তখন আমি আপনার মধ্যে ও পরকালে অবিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন পর্দা ফেলে দেই (৪৫)৷
আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ রেখে দেই, যাতে তারা একে উপলব্ধি করতে না পারে এবং তাদের কর্ণকুহরে বোঝা চাপিয়ে দেই৷ যখন আপনি কুরআনে পালনকর্তার একত্ব আবৃত্তি করেন, তখনও অনীহাবশতঃ ওরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায় (৪৬)৷
এখানে প্রথমোক্ত আয়াতে বর্ণিত ফিতনা শব্দের অল্প ব্যাখ্যা জেনে নিন৷ আরবী ভাষায় ফিতনা শব্দটি বহু অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ এর এক অর্থ গুমরাহী৷ এছাড়া পরীক্ষা, হাঙ্গামা, গোলযোগ ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হয়৷ এখানে সব অর্থের সম্ভাবনা বিদ্যমান৷ হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা., সুফিয়ান, হাসান, মুজাহিদ প্রমুখ তাফসীরবিদ এখানে শেষোক্ত অর্থ নিয়েছেন৷ তাঁরা বলেন, এটা ছিলো ধর্মত্যাগের ফিতনা৷ রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন শবে মে’রাজে বায়তুল মুকাদ্দাস, সেখান থেকে আকাশে আরোহণ এবং প্রত্যুষের পূর্বে ফিরে আসার কথা প্রকাশ করলেন, তখন কোনো কোনো অপরিপক্ক নওমুসলিম একথা মিথ্যা মনে করে মুরতাদ হয়ে গেলো৷—(কুরতুবী)
আরেকটা মজার বিষয় হলো, হযরত আবু বকর রা. ‘সিদ্দীক’ উপাধি লাভ করেন এই মে’রাজের ঘটনাকে বিশ্বাস করার ভিত্তিতে৷ কুরআনে কারীমের মাধ্যমে এভাবেই একদল হয়ে যায় মুরতাদ আরেকদল উপাধি পায় সিদ্দীক৷ হেদায়াত ও গুমরাহী সবই আল্লাহর ইচ্ছাধীন৷ এখানে কারও অহমিকার সুযোগ নেই৷ এজন্যে যারা ঈমানের সম্পদ লাভ করেছে তাদের উচিত নিয়মিত শোকর আদায় করা, আর যারা পায়নি তাদের উচিত দ্রুত আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করা৷ বিনয় প্রদর্শন করলে আল্লাহ অবশ্যই হেদায়াত দিতে পারেন৷
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
অর্থ, আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন৷ তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন—যাতে তোমরা স্মরণ রাখো৷ (সূরা নাহল, আয়াত : ৯০)
মাত্র কয়েকটি শব্দ সম্বলিত একটি আয়াত৷ অথচ এই আয়াত সম্পর্কে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, এটি হচ্ছে কুরআনে কারীমের ব্যাপকতর অর্থবোধক আয়াত৷
তাফসীরের কিতাবে এই একটিমাত্র আয়াত সম্পর্কে তিনটি বিস্ময়কর ঘটনা আমি পেয়েছি৷ তিনটি ঘটনাই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি৷
এক. হযরত আকসাম বিন সায়ফী রা. এই আয়াত শ্রবণ করেই মুসলমান হয়েছিলেন৷ তিনি ছিলেন স্বীয় গোত্রের নেতা৷ যখন রাসূল ﷺ-এর নবী হিসেবে আবির্ভূত হবার সংবাদ তাঁর কানে পৌঁছলো তিনি রাসূলুল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন৷ গোত্রের লোকেরা বললো, আপনি আমাদের প্রধান৷ আপনার নিজের যাওয়া সমীচীন নয়৷ আকসাম বললেন, তবে গোত্র থেকে দু’জন লোক মনোনীত করো৷ তারা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমাকে জানাবে৷ মনোনীত দু’ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হয়ে আরয করলো, আমরা আকসাম বিন সায়ফীর পক্ষ থেকে দুটো বিষয় জানতে এসেছি৷ আকসামের প্রশ্ন দুটি এই—من أنت وما أنت؟
“আপনি কে এবং কী?”
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, প্রথম প্রশ্নের উত্তর হলো, আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ৷ দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো, আমি আল্লাহর দাস ও তাঁর রাসূল৷ এরপর তিনি সূরা নাহলের এ আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন৷
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
উভয় দূত অনুরোধ করলো : এ বাক্যগুলো আমাদেরকে আবার শোনানো হোক৷ রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়াতটি একাধিকবার তেলাওয়াত করলেন৷ ফলে শেষপর্যন্ত আয়াতটি তাদের মুখস্থ হয়ে গেলো৷ দূতদ্বয় আকসাম বিন সায়ফীর কাছে ফিরে এসে উল্লিখিত আয়াত শুনিয়ে দিলো৷ আয়াতটি শুনেই আকসাম বললেন, এতে বোঝা যায় যে, তিনি উত্তম চরিত্রের আদেশ দেন এবং মন্দ ও অপকৃষ্ট চরিত্র অবলম্বন করতে নিষেধ করেন৷ তোমরা সবাই তাঁর ধর্মের দীক্ষা নাও, যাতে তোমরা অন্যদের অগ্রে থাকো এবং পেছনে অনুসারী হয়ে না থাকো৷—(ইবনে কাসীর)
এবার বিজ্ঞ পাঠক বিচার করুন যে, দু’জন বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মুখ থেকে শুনে সরাসরি না দেখে পূর্ণ আস্থার সাথে আকসাম বিন সায়ফীর এই মন্তব্য কি অযৌক্তিক? তদুপরি স্বীয় গোত্রসহ মুসলমান হয়ে যাওয়া! আর এযুগে? কুরআন আরবী পড়ছে বিভিন্ন ধর্মের পন্ডিতরা৷ বিভিন্ন অনুবাদ পড়ছে ইহুদী-খ্রিস্টান ও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা৷ একই কুরআন একই কথা পাঠ করে রাসূলকে আখ্যা দিচ্ছে সন্ত্রাসী, তাঁর আনীত ধর্মকে সন্ত্রাসবাদী ধর্ম৷ মুসলমান তো হচ্ছেই না; বরং নিজেদের অবাধ্যতার মধ্যে উদ্ভ্রান্ত৷ তদুপরি অনেক মুসলমান তাদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে৷ একেই বলে
ومن لم يجعل الله له نورا فما له من نور.

দুই.
হযরত উসমান ইবনে মাযউন রা. বলেন, শুরুতে আমি লোকমুখে শুনে ঝোঁকের মাথায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম৷ আমার অন্তরে ইসলাম বদ্ধমূল ছিলো না৷ একদিন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম, হঠাত্ তাঁর ওপর ওহী অবতরণের লক্ষণ প্রকাশ পেলো৷ কতিপয় বিচিত্র অবস্থার পর তিনি বললেন :
আল্লাহর দূত এসেছিলো এবং এই আয়াত আমার প্রতি নাযিল হয়েছে—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
হযরত উসমান ইবনে মাযউন রা. বলেন,
এই ঘটনা দেখে এবং এই আয়াত শুনে আমার অন্তরে ঈমান বদ্ধমূল ও অটল হয়ে গেলো এবং রাসূল ﷺ -এর মহব্বত আমার অন্তরে আসন পেতে বসলো৷ ইবনে কাসীর রহ. এ ঘটনা বর্ণনা করে এর সনদকে হাসান ও নির্ভুল বলেছেন৷

তিন.
উপর্যুক্ত আয়াত রাসূল ﷺ ওলীদ ইবনে মুগীরার সামনে তেলাওয়াত করলে সে-ও প্রভাবান্বিত হয় এবং কুরায়শদের সামনে ভাষণ দেয় যে,
والله إن له لحلاوة وإن عليه لطلاوة وإن أصله لمورق وأعلاه لمثمر وما هو بقول بشر.
আল্লাহর কসম, এতে একটি বিশেষ মাধুর্য রয়েছে৷ এর মধ্যে একটি বিশেষ রওনক ও দীপ্তি রয়েছে৷ এর মূল থেকে শাখা ও পাতা গজাবে এবং এর শাখা ফল উৎপাদন করবে৷ এটা কখনোই কোনো মানবরচিত বাক্য হতে পারে না৷

[চলবে]

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ