শুক্রবার-২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পবিত্র ঈদুল আযহা : ত্যাগ, তাকওয়া ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা

পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম জাতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই দিনটি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এক পরম আনন্দের দিন, যা ইতিহাসজুড়ে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আত্মত্যাগ ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর আনুগত্যের অনুপম দৃষ্টান্ত বহন করে। এই ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং তা এক গভীর শিক্ষার বাহক। কুরবানী মানুষের অন্তর থেকে আত্মকেন্দ্রিকতা, সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতার পর্দা সরিয়ে দিয়ে তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।

ঈদুল আযহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবতার মহান শিক্ষা। এই দিনটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করা যায়, কেমন করে একনিষ্ঠভাবে তাঁর আদেশের সামনে আত্মসমর্পণ করতে হয়। মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কাছে কখনো যবেহকৃত পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছবে না, পৌঁছবে কেবল তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্জ: ৩৭)। এই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, কুরবানীর মূল চেতনা হলো আন্তরিকতা, খাঁটি নিয়ত এবং আল্লাহভীতির সাথে ত্যাগের বাস্তব অনুশীলন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “এটি তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর সুন্নাত।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।” (সুনান ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ৩১২৭)। এ হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কুরবানী শুধু একটি রীতিনীতিগত কর্ম নয়, বরং তাতে নিহিত রয়েছে অপার সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ।

ঈদুল আযহার শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। ঈদের নামায আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানরা একত্রিত হয়, ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। কোলাকুলি করে সকল ভেদাভেদ ভুলে যায়। এই মিলন ও সম্প্রীতির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা।

কুরবানী দেওয়া হলে তার গোশত তিন ভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের জন্য, একভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং একভাগ গরীব-মিসকীনদের মাঝে বিতরণের নির্দেশ রয়েছে। এটি কেবল একটি সামাজিক অনুশীলন নয়, বরং ইসলামী সমাজ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার বাস্তব রূপায়ন। আর চামড়ার সঠিক ব্যবহার দীন ও মানবতার খিদমতের একটি বিশেষ সুযোগ—যা এতিমখানা, মাদরাসা ও দরিদ্র ছাত্রদের কল্যাণে ব্যবহৃত হলে বহুগুণ সাওয়াবের দরজা খুলে দেয়।

তবে এ সবকিছুর পূর্বশর্ত হলো—খাঁটি নিয়ত ও ঈমানদীপ্ত অন্তর। যদি কুরবানী কেবল গোশতের উদ্দেশ্যে হয়, তাকওয়ার ছোঁয়া না থাকে, তাহলে তা শুধুই একটি লোকাচার হয়ে দাঁড়ায়। হযরত ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর সুন্নাত তখন প্রথায় রূপ নেয়, যার অন্তরে থাকে না আল্লাহভীতি, প্রেম বা আত্মত্যাগের সুর।

আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ভোগবাদী প্রবণতা, স্বার্থপরতা, হিংসা ও বৈষম্য। ঈদুল আযহার শিক্ষা হলো এইসব মানসিক পশুত্বকে কুরবানী দেওয়া—লালসা, ক্রোধ, হিংসা, মোহ ও অহংকারকে জবেহ করা। কুরবানী যেমন বাহ্যিক পশু দিয়ে হয়, তেমনি আত্মিক কুরবানী না হলে তার প্রকৃত চেতনা পরিপূর্ণ হয় না। ঈদুল আযহা আমাদের শেখায় পরিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে, সমাজে সাম্য ও সহানুভূতির পরিবেশ গড়ে তুলতে।

আসুন, আমরা এ মহান উৎসবের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করি। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে আল্লাহভীতি, ইনসাফ, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঈদুল আযহাকে পরিণত করি এক মহা বিপ্লবী চেতনায়। আল্লাহর সন্তুষ্টিই হোক আমাদের সকল কর্মের মূল উদ্দেশ্য।

 

আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ.-এর ইন্তেকালে শোক

প্রখ্যাত আলেমে দীন, ইসলামী চিন্তাবিদ, ভাষাবিদ, দার্শনিক ও দীপ্ত বক্তব্যশৈলীর অধিকারী আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ. ইন্তেকাল করেছেন—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর ইন্তেকালে ইলমী জগতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়।
তিনি একাধারে আকাবির ওলামার শিক্ষক, বহু গ্রন্থের প্রণেতা এবং অগণিত শিক্ষার্থী, পাঠক ও শ্রোতার হৃদয়ের শিক্ষক। ভাষাগত বিশুদ্ধতা, চিন্তার গভীরতা, আকীদা ও দাওয়াতের পাক-পবিত্রতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন বিস্ময়কর আলেম। দীনি বোধ ও সাহিত্যবোধের অপূর্ব সমন্বয় তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
মাসিক আত-তাওহীদ পরিবার তাঁর ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করছে এবং তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করেন এবং তাঁর রেখে যাওয়া ইলমী, ফিকরী ও দাওয়াতী উত্তরাধিকার যেন দীর্ঘদিন উম্মাহকে উপকৃত করে—আমীন।

 

কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ