আবু মোহাম্মদ আজিজি
একজন শ্রান্ত নাবিকের মতো হযরতুল উস্তাদ আবদুল মান্নান দানিশ সাহেব রহ. পাড়ি জমালেন অনন্ত জীবনের পথে। শুভ্র দাড়ি, অবনত শরীর, জীবনের হাজারো ঝড়ঝঞ্ঝার সাক্ষী এক অবিচল মানব। কত দুঃখ, কত বেদনা, কত প্রতিকূলতা তাঁকে আঘাত করেছে, কিন্তু তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। তিনি মাথা উঁচু করে এগিয়ে গেছেন নিজের রবের পথে—অবশেষে সফলতার মুকুট মাথায় নিয়েই চিরবিদায় নিলেন।
জামিয়ার আঙিনায় প্রথম পা রাখার দিনটিই যেন আজও স্পষ্ট চোখে ভাসে। তখন হযরতের সাথে প্রথম দেখা। পরিচয়ের বাঁধন তখনো শক্ত হয়নি, তবুও তাঁর কথা বলার ভঙ্গিতে মমতার এক অপার ছায়া ছড়িয়ে পড়েছিল আমার হৃদয়ে। অজান্তেই মনের কোণে এক স্বপ্ন জেগে উঠেছিল— হায়! যদি কোনো দিন তাঁর দারসে বসার সৌভাগ্য মিলত, যদি তাঁর দারসের মনিমুক্তা হৃদয়ে ধারণ করতে পারতাম!
সময় চলতে থাকলো নিজের আপন গতিতে। স্বপ্নগুলোও ভেসে চললো সময়ের নদীতে। মহান রবের কৃপায় একদিন সেই স্বপ্ন সত্যি হলো। দারসের প্রথম দিন। বহু আশার ফুলে মালা গেঁথে প্রথম ক্লাসে হাজির হলাম। প্রথম পিরিয়ড—নাফহাতুল আরব।
হযরত, তাঁর চিরচেনা ভঙ্গিতে লাঠির টুকটুক শব্দ তুলে দারসে প্রবেশ করলেন। পিনপতন নীরবতা ভেঙে মধুর কণ্ঠে দারস শুরু করলেন। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আবেগের ভারে চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। নিরবে শুকরিয়া আদায় করলাম, কারণ দীর্ঘদিনের লালিত সেই ছোট্ট স্বপ্ন সেদিন আলোর মুখ দেখেছিল।
জীবনের পথচলায় কত ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, কত স্মৃতির বৃষ্টিতে ভিজেছি। আর আজ, শুনলাম সেই স্বপ্নের দিশারী, সেই স্নেহময় শিক্ষক, সেই আলো ছড়ানো মনীষী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন— তাঁর প্রভুর সান্নিধ্যে। রেখে গেলেন এক মহিমান্বিত জীবন-কাহিনী, রেখে গেলেন খেদমতের সুবাস।
মন বিষণ্ণতায় ভরে আছে। হৃদয় যেন এক অব্যক্ত শোকে ভারাক্রান্ত। জামিয়ার বাতাসেও আজ যেন বিষাদের সুর বাজছে। হে আমাদের শ্রদ্ধেয় উস্তাদ! আপনার দীপ্তিময় জীবন আমাদের জন্য অনন্ত অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
আমরা প্রতিজ্ঞা করি—আপনার আদর্শকে ধারণ করে, আপনাদের রক্ত-মিশ্রিত আমানতের পতাকা সমুন্নত রাখবো।
লেখক : শিক্ষার্থ, জামাতে দুয়াম, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া।