মুহাম্মাদ ইমরান বিন তালিব
শহরের যান্ত্রিক ব্যস্ততা আর কোলাহলের ক্লান্তিকর দিনগুলো যখন হৃদয়ে ভার চাপিয়ে বসে, তখন মন চায় পালিয়ে যেতে—কোনো এক শান্ত, সরল জগতের কোলে। যেখানে নেই মোবাইলের শব্দ। নেই থেমে থেমে আসা বিজ্ঞাপনের ঝাঁপটা, নেই বিশৃঙ্খলার ক্লান্তি। আছে কেবল বিশুদ্ধ নীরবতা। প্রকৃতির মুগ্ধতা। আর আল্লাহর অফুরন্ত রহমতের অপার সৌন্দর্য। এমনই এক তৃষ্ণা মেটাতে আমরা কয়েকজন ছুটে গিয়েছিলাম সৃষ্টির বিশাল আঙিনায়—একটি অনন্য দিন কাটাতে।
এই দিনটি ছিল যেন প্রকৃতির কোলজুড়ে অনন্ত প্রশান্তির রঙে আঁকা এক স্বপ্নময় মুহূর্ত। শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা, প্রযুক্তির ক্লান্তিকর আবরণ পেরিয়ে আমরা ক’জন প্রকৃতিপ্রেমী ছুটেছিলাম প্রাকৃতিক নিস্তব্ধতার খোঁজে—এক নিরব জগত যেখানে কেবল আছে পাহাড়, নদী, পাখির ডাকে ভোরের আহ্বান আর আল্লাহর সৃষ্টি নিদর্শনের এক অপরূপ সৌন্দর্য। যেন মহান আল্লাহ তাঁর অফুরন্ত নিয়ামতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আমাদের স্নেহভরে আহ্বান জানিয়ে বলেন—
أَفَلَا يَنظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ . وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ . وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ . وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ
“তারা কি উটের প্রতি দৃষ্টি দেয় না, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উত্তোলন করা হয়েছে? এবং পর্বতমালার প্রতি, কীভাবে তাদের স্থাপন করা হয়েছে? এবং পৃথিবীর প্রতি, কীভাবে সমতল করা হয়েছে?” —(সূরা আল-গাশিয়াহ: ১৭-২০)
শীতের শিশিরভেজা সকাল, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে হাঁটার সময় মনে হচ্ছিল যেন দুনিয়ার প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি পাথর আমাদের আলিঙ্গন করতে চাইছে। ঘাসের ওপর শিশিরের নরম স্পর্শ, পাথরের গায়ে বয়ে চলা ঝর্ণার শব্দ আর ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া—এসব যেন আল্লাহর কুদরতের সরাসরি সাক্ষাৎ।
নেটওয়ার্কবিহীন, শূন্য প্রযুক্তির সেই দিনটি প্রকৃতিকে একান্তভাবে উপলব্ধির এক মহাসুযোগ এনে দেয়। আমাদের রান্নার প্রস্তুতি চলছিল পাহাড়ের গ্যাস নির্গমনস্থলে। প্রকৃতির মাঝে রান্নার এমন মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—এ শুধু খাবার নয়, বরং নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার এক দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতি সীমাহীন অনুগ্রহ বর্ষণ করে চিরন্তন ভালোবাসার এক অতুলনীয় নিদর্শন তুলে ধরেছেন। মহান আল্লাহ যেন নিজ নিয়ামতের রাজ্যে আমাদের ডেকে নিচ্ছেন স্নেহভরে—এই বলে যে,
فَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا ۖ وَاشْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ إِن كُنتُم إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
“সুতরাং আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল ও পবিত্র রিযিক দিয়েছেন তা খাও এবং আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় করো, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো।”
(সূরা নাহল: ১১৪)
সেইসব মুহূর্তে খাওয়ার সময় প্রতিটি লোকমা যেন স্বাদে নয়, বরং ভালোবাসা, সংহতি ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার আবরণে মাখানো। পাহাড়ি ঝর্ণার স্বচ্ছ ঠান্ডা পানি যখন মুখে পৌঁছায়, মনে হয়েছিল দেহে যেন এক নতুন প্রাণ সঞ্চার হলো। আল্লাহর এই নিদর্শনগুলো যে কত অপূর্ব—তা শুধু চোখে দেখে নয়, হৃদয়ে অনুভব করেই বোঝা যায়।
একটানা হাঁটার পরে আমরা একটি সবুজ ঘাসে ঢাকা উঁচু চূড়ায় পৌঁছালাম। সেখানে মিলেছিল এক গভীর আধ্যাত্মিকতা। যখন সকলে একত্রে নামাযে দাঁড়াল, প্রকৃতির কোলেই তখন গড়ে উঠেছিল যেন এক ক্ষণস্থায়ী মসজিদ। বাতাস বইছিল ধীর লয়ে, সূর্যরশ্মি সেজেছিল নূরের মতো। তখনই পরম করুণাময় আল্লাহ সুবাহানাল্লাহ তাআলার অনন্ত প্রেম ও ভালোবাসায় সিক্ত একটি আহ্বান আমাদের হৃদয়ঙ্গম করেছিল—
اقم الصلاه لذكري
“আমার স্মরণে সালাত আদায় করো”— যেন বান্দা ফিরে পায় হারানো প্রশান্তি, ফিরে পায় রবের নৈকট্য। (সূরা ত্বহা: ১৪)
নামাজ শেষে নিঃশব্দে চারদিকের সৌন্দর্য অবলোকন করতে করতে উপলব্ধি হলো, এই জগতের প্রতিটি জায়গা আল্লাহর বান্দার ইবাদতের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
وَٱلْأَرْضَ وَضَعَهَا لِلْأَنَامِ
“এবং তিনি পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন সমস্ত সৃষ্ট জীবের জন্য।” —(সূরা রহমান: ১০)
এই ভ্রমণটি আমাদের জন্য কেবল বিনোদন নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করার এবং তাঁর অগণিত নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার এক দারুণ উপলক্ষ। প্রকৃতির মাঝে একদিন কাটিয়ে আমরা যেন ফিরে পেয়েছিলাম নতুন করে জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
শেষ বিকেলের আলোয় আমরা ফিরে এসেছি শহরের দিকে, কিন্তু মনে রয়ে গেছে এক অপূর্ব শান্তির সুর। আল্লাহর সৃষ্টি, তাঁর রহমত, আর প্রিয়জনদের সাথে কাটানো মুহূর্ত—এসবই জীবনকে করে তোলে পরিপূর্ণ, অর্থবহ। মনের গভীরে যেন বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল একটি মহিমান্বিত আহ্বান—মহান রবের একটি বাণী, যা হৃদয় ছুঁয়ে দিয়ে বলছিল,
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَان
“তবে তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (সূরা রহমান)
আজকের এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য কেবল চোখের নয়, বরং ঈমানের খোরাক। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর সান্নিধ্যই আমাদের প্রকৃত শান্তির পথে পৌঁছে দেয়।