শুক্রবার-২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফতওয়া বিভাগ আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

ইমেইল: patiyadarulifta@gmail.com, পেইজলিংক: Facebook.com/Darul-ifta-Jamia-Patiya

ফতওয়া বিভাগ আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

 

রসম-রেওয়াজ
মঈনুদ্দীন, নেত্রকোনা
সমস্যা : আমাদের দেশে প্রচলিত নাক-কান ফোঁড়ার অনুষ্ঠানাদি সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী? এবং কিছু সংখ্যক লোক ওই দিনে ‘খতমে কুরআন’ ও ‘খতমে সূরায়ে ইনআম’ ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। আর বলে থাকে, আমরা মূলত এই সমস্ত খতমের উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করছি। জানার বিষয় হলো, তাদের এই দাবি শরীয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু সঠিক? আর এ-সকল অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ব্যক্তির জন্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া বা না হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী? কুরআন-সুন্নাহর আলোকে উপরোক্ত সমস্যার সমাধান প্রদান করে বাধিত করবেন।
সমাধান : প্রশ্নোল্লিখিত অনুষ্ঠানাদি বিভিন্ন শরীয়ত পরিপন্থী কার্যাবলি দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়। যেমন, অপচয়, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মেয়েটির ছবি-ভিডিও ধারণ করা ইত্যাদি। এ সবকিছু সম্পূর্ণ শরীয়তপরিপন্থী কাজ। তাই এ ধরণের অনুষ্ঠানাদি না করা উচিৎ। কেননা, ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো, যে সব কাজ হারামের দিকে ধাবিত করে, ওইসব কাজও হারাম।
উপরোক্ত অনুষ্ঠানাদিতে যদি ওইসব শরীয়তপরিপন্থী কার্যাবলি নাও থাকে তবুও তা না করা উচিৎ। ‘খতমে কুরআন’ ও ‘খতমে সূরায়ে ইনআমে’র দোহাই দিয়ে এ সব অনুষ্ঠানের আয়োজনের যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার সাথে শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামী শরীয়তে সাদাসিধেভাবে নাক-কান ফোঁড়ার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু তার জন্য আড়ম্বর ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি করার অনুমতি নেই। -সূরায়ে ইসরা: আয়াত: ২৭; মুসনাদে আহমাদ: ১/২১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৫৭

তাহারাত-পবিত্রতা
মুন্সি আবদুল্লাহ
দিনাজপুর
সমস্যা: আমাদের বাসার ছাদের ওপর থেকে বৃষ্টির পানি পাইপ দিয়ে নিচে পড়ে। মাঝে মাঝে আমাদের পাশের এক ভাড়াটিয়া সে পানি পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখে। পরে ওযু-গোসলে ব্যবহার করে। জানার বিষয় হল, এভাবে পাইপ দিয়ে পড়া বৃষ্টির পানি পাত্রে সংরক্ষণ করার পর তা দিয়ে ওযু করা যাবে কি?
সমাধান: বৃষ্টির পানি পবিত্র। বৃষ্টির পানি ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে পড়ার সময় যদি দৃশ্যত কোনো নাপাকি না থাকে তাহলে তা পবিত্র। তা দিয়ে ওযু-গোসল করতে কোনো অসুবিধা নেই। – সূরা ফুরকান: ৪৮; আদ্দুররুল মুখতার: ১/১৮১
সুজন আলী
সিলেট
সমস্যা: আমাদের মার্কেট মসজিদের ওযুখানায় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পানি থাকে না। আমাদের দোকানে এসির ভেতর থেকে নির্গত পানিগুলো আমরা বালতির মধ্যে জমা করি। বালতি ভরে গেলে তখন ফেলে দেই। জানার বিষয়, এসি থেকে নির্গত এই পানি দিয়ে কি অযু করা যাবে?
সমাধান: এসি থেকে নির্গত পানি পবিত্র পানির হুকুমে। অতএব তা দ্বারা অযু ও পবিত্রতা অর্জনে কোনো অসুবিধা নেই। -আলফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু: ১/২৬৪-২৬৫
শিহাব সাকিব
সাভার, ঢাকা
সমস্যা: আমার আম্মু মাঝে মাঝে ভাতের মধ্যে ডিম সিদ্ধ করে থাকে। অনেক সময় মুরগি ডিম পাড়ার স্থান থেকে এনে তা না ধুয়ে সরাসরি দিয়ে দেয়। জানার বিষয় হল, ভাতের মধ্যে ডিম সিদ্ধ করার হুকুম কী? যদি না ধুয়ে সরাসরি দিয়ে দেয় তাহলে কী হুকুম? জানিয়ে বাধিত করবেন।
সমাধান: ডিমের ওপরে যে আদ্রতা থাকে তা নাপাক নয়। শুধু আদ্রতা আছে এমন ডিম যদি সরাসরি পানিতে বা ভাতের মাঝে দিয়ে সিদ্ধ করা হয় তবে পানি নাপাক হবে না। অবশ্য যদি ডিমের ওপরে বাহ্যত কোনো নাপাকি থাকে যেমন; রক্ত বা পায়খানা এবং ওই নাপাকযুক্ত ডিম পানিতে বা ভাতে সিদ্ধ করতে দেওয়া হয় তখন ওই পানি ও ভাত নাপাক হয়ে যাবে। তাই এক্ষেত্রে মাস্তুরাতদের খুব ভালোভাবে খেয়াল করে, দেখেশুনে ডিম সিদ্ধ করতে দেওয়া উচিৎ। – রদ্দুল মুহতার: ১/৩৪৯; গুনইয়াতুল মুতামাল্লী শরহু মুনইয়াতিল মুসাল্লী: ১৩১

সালাত-নামায
আতাউল্লাহ
সাতকানিয়া
সমস্যা: বিনীত নিবেদন এই যে, কোনো ইমাম সাহেব যদি ইশার নামাযে ভুলবশত প্রথম দুই রাকাতে শুধু সূরায়ে ফাতিহা তিলাওয়াত করে, তখন তার করণীয় কী? বিশেষ করে দ্বিতীয় দুই রাকাতে যদি সূরা মিলায় তখন উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করবে? নাকি নিম্নস্বরে? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
সমাধান: যদি কোনো ইমাম সাহেব ইশার নামাযে ভুলবশত প্রথম দুই রাকাতে শুধু সূরায়ে ফাতিহা তিলাওয়াত করে, তখন তার করণীয় হল, শেষ দুই রাকাতে পুনরায় সূরায়ে ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলাবে এবং উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করবে আর শেষে সিজদায়ে সাহু দিবে। তবে যদি দ্বিতীয় দুই রাকাতে সূরা না মিলায়, তাহলেও সিজদায়ে সাহু দিলে নামায আদায় হয়ে যাবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়াহ, ১/১২৭; ফাতাওয়া কাজী খান: ১/১১৩; হিদায়া: ১/২৫১
মাহমুদুল হাসান
জয়পুরহাট
সমস্যা: মুহতারাম, আমরা জানি, নামাযের মধ্যে কিয়াম তথা দাঁড়ানো ফরয। এখন কোনো ব্যক্তি যদি আসুস্থার কারণে দাঁড়াতে সক্ষম না হয়, তাহলে সে কীভাবে নামায আদায় করবে? বিশেষ করে বর্তমানে চেয়ারে বসে নামায আদায় করার হুকুম কী? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
সমাধান: যে ব্যক্তি অসুস্থতার কারণে নামাযে দাঁড়াতে সক্ষম নয়; একেবারেই দাঁড়াতে পারে না বা যদি দাঁড়ায় অসুস্থার কারণে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তাহলে তার জন্য বসে নামায আদায় করার সুযোগ রয়েছে। হ্যাঁ, তবে যদি ওই ব্যক্তি কিছু সময় দাঁড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে যে পরিমাণ দাঁড়াতে সক্ষম সে পরিমাণ দাঁড়িয়ে তারপর বাকি নামায বসে আদায় করবে। আর যদি বসে নামায আদায় করতেও সক্ষম না হয় তাহলে হেলান দিয়ে নামায আদায় করবে। আর যদি হেলান দিতেও সক্ষম না হয়, তাহলে শুয়ে নামায আদায় করবে। এ ব্যাপারে হাদীস শরীফে স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত,
عن عمران بن حصين رضي الله عنهما قال: قال النبي صلى الله عليه و سلم: (صل قائما، فإن لم تستطع فقاعدا، فإن لم تستطع فعلى جنب) (رواه البخارى، رقم الحديث:১০৬৬)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “তুমি দাঁড়িয়ে নামায আদায় করো, যদি না পারো, তাহলে বসে পড়ো, আর যদি বসতেও না পারো, তাহলে হেলান দিয়ে পড়ো।” (সহীহ বোখারী, হাদীস: ১০৬৬)
আর চেয়ারে বসে নামায পড়ার বিধান হল, যে ব্যক্তি রুকু-সেজদাহ করতে সক্ষম সে যদি চেয়ারে বসে নামায আদায় করে, তাহলে তার নামায শুদ্ধ হবে না। কারণ, রুকু-সেজদাহ নামাযের রোকন। ওজর ছাড়া কোনো রুকন ছেড়ে দিলে নামায শুদ্ধ হয় না। এমনকি যদি কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কিন্তু দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতে পারে না, এমন ব্যক্তি যতুটুকু সময় দাঁড়াতে পারে ততটুকু দাঁড়ানোর চেষ্টা না করেই যদি চেয়ারে বসে নামায আদায় করে, তাহলে তার নামায শুদ্ধ হবে না। সুতরাং যারা শুধু আরামের জন্য বা মামুলি কষ্টের বাহানায় চেয়ারে বসে নামায আদায় করে, তাদের নামায শুদ্ধ নয়। তাদের ওপর ফরয হল, দাঁড়িয়ে নামায আদায় করা এবং যথা নিয়মে রুকু, সেজদাহ আদায় করা। চেয়ারে বসে কেবল ওইসব লোকই নামায আদায় করতে পারবে যারা দাঁড়াতে ও রুকু-সেজদাহ করতে অক্ষম, এমনকি বসে নামায আদায় করতেও সক্ষম নয়। -রদ্দুল মুহতার: ২/৬৮১; ফাতাওয়া তাতারখানিয়‍্যাহ: ২/৬৬৮; ফাতাওয়া কাসেমিয়্যাহ: ৯/৫৪, ৬৫, ৬৬, ৭০
মাও: হাবিবুর রহমান
ঢাকা
সমস্যা: আমরা জানি, নামাযের মধ্যে সতর ঢাকা ফরয। জানার বিষয় হল, গেঞ্জি এবং প্যান্ট পরে নামায আদায় করলে সতর ঢাকা হয়ে যায়। তাহলে তাতে সমস্যা কোথায়? বিশেষ করে জানতে চাই, গেঞ্জি এবং প্যান্ট পরে নামায আদায় করলে সওয়াবের কোনো কমতি হবে কি? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
সমাধান: গেঞ্জি এবং প্যান্ট দ্বারা যেহেতু সতর ঢাকা হয়ে যায়, তাই এগুলো পরে নামায আদায় করলে নামায শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে সেটা মাকরুহ বলে গণ্য হবে। কারণ এগুলো বিধর্মীদের পোশাকের সাথে সাদৃশ্য রাখে। তাছাড়া এগুলো সালেহীনদের পোশাক নয়। বিশেষ করে অর্ধ হাতাবিশিষ্ট গেঞ্জি বা টি-শার্ট ও টাইট প্যান্ট—যার ওপর দিয়ে সতরের অঙ্গ-পতঙ্গের অবস্থা পুরোপুরি বুঝা যায়, এমন পোশাক পরিধান করা নিষেধ। মোটকথা, এই ধরণের পোশাক পরিধানের কারণে যেহেতু নামায মাকরুহ হয়ে যায়, তাই সাওয়াবের মধ্যেও কমতি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৬৫; আলবাহরুর রায়েক: ৩/৪৩; আদ্দুররুল মুখতার: ৩/৩০৬

নেকাহ-তালাক
মুহাম্মাদ রবিউল হাসান
চট্টগ্রাম
সমস্যা: মুহতারাম, আমি একজন আলেম, জামাতে ছাহারুম থেকে পটিয়া মাদরাসায় পড়েছি। আমার স্ত্রীর সাথে দীর্ঘদিনের সাংসারিক বনিবনা এবং ঝামেলা চলে আসছে। তা থেকে উত্তরণের জন্য সাধ্য মতো চেষ্টা চালিয়েছিলাম। গত ৫ মাস আগে একদিন ঝামেলা হলে আমার শ্বশুর বাড়িতে কল দিয়ে আমাদেরকে মিলিয়ে দেওয়ার জন্যে লোক আসতে বলি। পরে আমার স্ত্রীর বড় বোন এবং বড় ভাইয়ের স্ত্রী (তার বড় ভাবি) এসে আমাদের মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সামনে আমার স্ত্রীর মেজাজ এবং অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। তাই তাদের সামনে আমার স্ত্রীকে এক তালাক দিই। তখন তারা ওই সময়েই তার বোন জামাই যিনি আলেম, তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি (আলেম বোন জামাই) বলেন, সেটা তালাকে রজঈ হয়েছে। সমস্যা নেই, তাদেরকে মিলিয়ে দিয়ে চলে আসো। কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিলো তাকে বেশ কিছু সময় তালাকের নাম বলে তার বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে কিছুটা হয়তো বুঝ আসবে। কিন্তু তার বোন জামাইয়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপরে আবারো ঝামেলা চলতে থাকে। এবং বারংবার আমার স্ত্রীকে ওয়ার্নিং দিতে থাকি যে, এভাবে ঝামেলা করতে থাকলে আমি যেকোনো সময় তালাক দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেবো, কিন্তু তখন সে বলে আপনি ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর ওয়াস্তে আমার এত বড় সর্বনাশ করবেন না। তখন আমি বলি, তাহলে আমার সাথে খারাপ আচরণ এবং খারাপ ব্যবহার বন্ধ করো এবং ঠিক হয়ে যাও। দুই একদিন ঠিক থাকার পর আবারো তার সেই চিরচেনা আচরনে অতিষ্ঠ হয়ে গত ২৫ মার্চ’২৫ ইং (তোকে তালাক দিলাম) বলে ২ নং তালাক দিই। এবং তার এসলাহ এবং সংশোধনের নিয়তে তাকে (স্ত্রী) বলি, তোর সাথে আমার সাথে শেষ হয়ে গেছে, তুমি তোমার বাড়ি চলে যাও। তখন আমার স্ত্রী বলে, এখন তো ২ টা হয়েছে, শেষ কীভাবে হয়? আমি উত্তরে তার সংশোধনের নিয়তে তাকে বলি—তালাক শব্দ উচ্চারণ না করে, আমি দিয়েছি নাকি তুমি দিয়েছ? উত্তরে সে বলে, আপনি দিয়েছেন। তখন আমি বলি, আমি জানি নাকি তুমি জানো? তখনও সে বলে, আপনি জানেন। তারপর আমি বলি, আমাদের সব কিছু শেষ হয়ে গেছে। তুমি তোমার বাড়ি চলে যাও। আমি একজন আলেম হিসেবে যতটুকু আমার জানা আছে, কেনায়া শব্দে নিয়তে তালাক না থাকলে তালাক পতিত হবে না, তাই তার সংশোধনের জন্য ওভাবে বলা। পরে তার বাড়িতে মোবাইল করে তাকে নিয়ে যেতে বললে, তার মেঝো ভাবি এবং ছোট ভাবি তাকে নিতে আসেন। যেহেতু আমরা আমার মা-বাবা থেকে আলাদা থাকি, আমার শ্বশুর বাড়ির মাধ্যমে আমার মা-বাবা জানতে পারলে আমাকে আমার বাবা-মা মোবাইল করে জিজ্ঞেস করে, তুমি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছো নাকি? আমি উত্তরে (তালাক শব্দ উচ্চারণ না করে) জী বলে উত্তর দিই। আব্বু আবার জিজ্ঞেস করে, শেষ করে ফেলছো নাকি? আমি আবারো জী বলে উত্তর দিই (৩নং তালাক পতিত হওয়ার ভয়ে শব্দ ৩ এবং তালাক উচ্চারণ না করে)। ২নং টা দিয়ে (তালাক) শব্দ উচ্চারণ না করে শেষ করে ফেলেছি বলার কারণ হচ্ছে যে, আমার আব্বু-আম্মুকেও যদি শেষ হয়নি কথাটা বলা হয় তখন আব্বু আম্মু তাদেরকে (স্ত্রীর বাড়িতে) হালকাভাবে বলবে যার দরুন স্ত্রীকে সংশোধনের যে পরিকল্পনা নিয়ে ২নং তালাকে রজঈ দিয়েছি তা হবে না বা সে সংশোধন হবে না। এদিকে বাসায় তার দুই ভাবি তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সবাই কাপড় নিয়ে দরজা থেকে বের হলে আমি তাকে ডেকে বাসার ভিতরে নিয়ে মাফ চাওয়ার বাহানা করে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রজাআত করে নিই, এবং আমি যে রজাআত করেছি সেটা তাকে কোনোভাবে বুঝতে দেইনি। যেহেতু ছেলে মেয়েদের কারণে যোগাযোগ করা লাগবে এবং তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে যেন ইদ্দত শেষ হয়ে তালাকে বায়েনা বা মুগাল্লাজা হয়ে না যায়। পরে তাকে বাসায় নিয়ে আসলে কেউ যেন আমাকে ভুল বুঝতে না পারে, তার জন্যে আমার ছোট ভাই ও আমার স্ত্রীর চাচাতো ভাই তার আব্বু (আমার চাচা শ্বশুর)-কে বিস্তারিত খুলে বলি যে, এই এই কারণে আমি আব্বু-আম্মুসহ সবাইকে তালাক শব্দ এবং ৩ শব্দ উচ্চারণ না করে শেষ করে ফেলেছি বলি বা বলা হয়েছে।
এখন আমার জানার বিষয় হচ্ছে, উপরোক্ত কথা বা ঘটনার মাধ্যমে কি ৩ তালাক হয়ে যাবে, নাকি ২ তালাকই পতিত হবে? কারণ আমি দু-একজন আলেমকে ঘটনা বিস্তারিত খুলে বলার পর একেকজন একেক কথা বলেছেন। মুহতারাম, ওপরে উল্লেখিত বিষয়কে সামনে রেখে শরয়ী বিধিবিধান জানানোর জন্য বিনীত আরজ পেশ করছি।
সমাধান: প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনার স্ত্রীর ওপর দ্বিতীয়বার এক তালাকে রজঈ পতিত হয়েছে। উক্ত দ্বিতীয় তালাক দেওয়ার পর আপনি আপনার স্ত্রীকে “আমাদের সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, তুমি তোমার বাড়ি চলে যাও” বলেছেন। এতে আপনার তালাকের নিয়ত না থাকার কারণে অতিরিক্ত কোনো তালাক পতিত হয়নি। পূর্বের এক তালাকে রজঈ ও পরের এক তালাকে রজঈ মিলে মোট দুই তালাকে রজঈ পতিত হয়েছে। তবে যেহেতু আপনি রজাআতের নিয়তে তাকে জড়িয়ে ধরেছেন। এর দ্বারা রজাআত হয়ে আপনাদের বিয়ে পূর্বের ন্যায় বহাল আছে। ভবিষ্যতে আপনি মাত্র এক তালাকের অধিকারী থাকবেন। অর্থাৎ যদি কখনো তাকে এক তালাক দেওয়া হয় তাহলে পূর্বের দুই তালাকসহ মোট তিন তালাক পতিত হয়ে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে এভাবে রুজু করার দ্বারা কিংবা নতুন বিবাহের মাধ্যমে একত্রিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। অতএব ভবিষ্যতে তালাকের ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতে হবে।
উল্লেখ্য, তালাক হল বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্নকারী চূড়ান্ত পদক্ষেপ। দাম্পত্য জীবনের সমস্যা জটিল হয়ে পড়লে উভয়ের জন্য তা থেকে নিষ্কৃতির সর্বশেষ পথ। তাই অত্যন্ত ভেবে-চিন্তে ও পরামর্শ সাপেক্ষে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। কোনো কথা বা সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে তালাক দেওয়া অন্যায়। এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আরো উল্লেখ্য যে, শরীয়তে তালাক অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। যা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বা স্বাভাবিক অবস্থায় এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে দিলেও কার্যকর হয়ে যায়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। – ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৩৭৫, ৪৭০; রদ্দুল মুহতার: ৩/৩৯৭

ওয়াকফ
হাফেজ আরিফুল ইসলাম
পশ্চিম বড়ঘোনা, বাঁশখালী
সমস্যা: একটা জমিন ps, rs, bs খতিয়ান মতে কবরস্থানের নামে ওয়াকফ আছে, তবে প্রায় ২০০ বছর যাবত এখানে কাউকে কবরস্থ করতে দেখা যায়নি। এখন বিভিন্ন মহল সে জায়গা ভোগ করতে চেষ্টা করছে। মুহতারামের কাছে আমার জানার বিষয় হলো, এই জায়গায় কি মসজিদ ও মাদরাসা করা যাবে? এই জায়গায় দুইশত বছর যাবত কোনো মসজিদ-মাদরাসা ছিল না। তাই কবরস্থানের প্রয়োজন না থাকায় মাস দুয়েক আগে একটি পাঞ্জেগানা মসজিদ করা হয়েছে। উক্ত মসজিদ শরয়ী মসজিদ হিসেবে গণ্য হবে কি?
সমাধান: উপরোল্লিখিত স্থানটি যেহেতু দীর্ঘসময় ধরে খালি পড়ে আছে এবং সেখানে কবরস্থানেরও প্রয়োজন হচ্ছে না। তাই এই জমিটি অন্যান্য ওয়াকফকৃত কাজে ব্যবহার করতে পারবে। সুতরাং এলাকাবাসী একমত হয়ে উক্ত স্থানে মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ করতে চাইলে তা করতে পারবে। তাই নির্মিত মসজিদটি শরয়ী মসজিদ হিসেবে গণ্য হবে। উল্লেখ্য, ওয়াকফিয়া জমি ওয়াকফ বহির্ভূত কোনো কাজে কিংবা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার করা কোনোক্রমেই বৈধ নয়। অতএব যেহেতু জায়গাটি অপাত্রে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে, তাই তা মসজিদের কাজে ব্যবহার করা এলাকাবাসীর কর্তব্য। -উমদাতুল ক্বারী: ৩/৪৩৫; রদ্দুল মুহতার: ৩/১৩৯; আলবাহরুর রায়েক: ২/৩৪২

মুআমালা-লেনদেন
মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াছেয়
পুকুরিয়া, বাঁশখালি
সমস্যা: আমাদের দেশে বিভিন্ন সুদি ব্যাংকের ভেতর কোথাও কোথাও মসজিদ থাকে। সেসকল মসজিদে ইমাম-মুয়াযযিনের বেতন ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেয়া হয় তদ্রূপ যেসকল মসজিদ কোনো সুদি ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হয়, সেসকল মসজিদে ইমামতি, মুয়াযযিনি করে বেতন নেওয়া জায়েয হবে কি? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
সমাধান: সুদি ব্যাংকে চাকরি করে অর্থোপার্জন করা যেভাবে হারাম। তদ্রূপ সুদি ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠাানসমূহে চাকরি করাটাও হারাম। এটি হারাম অর্থোপার্জনের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সুদি ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত মসজিদসমূহে ইমামতি বা মুয়াযযিনি চাকরি করে সুদের অর্থ থেকে বেতন নেওয়াটা কোনোক্রমেই বৈধ হবে না। বরং হারাম অর্থায়নে মসজিদ পরিচালনা করাটা এক ধরণের প্রতারণার শামিল। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বেতন না নিয়ে শুধু মুসলমানদের নামাযের উদ্দেশ্যে (নিজের পক্ষ থেকে) ইমামতি করে তাহলে তা জায়েয হবে। -আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস ১/৫৫৩; রদ্দুল মুহতার: ২/৪৩১

ভুল সংশোধনী!
মাসিক আত-তাওহীদ এপ্রিল: ২০২৫ (গত সংখ্যার) “ফতওয়া বিভাগ”-এ ‘মুআমালা- লেনদেন’ অধ্যায়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমরা মা’আজিরাত পেশ করছি।
উক্ত অধ্যায়ে একটি সমস্যার সমাধানে পিতা কর্তৃক তার সন্তানকে হেবাকৃত মাসআলায় যে সমাধানটি দেওয়া হয়েছে তা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভুলক্রমে উভয় মাসআলার একই হুকুম লিখা হয়েছে। তাই প্রশ্নকারীকে তার ছোট বেলায় পিতা যে জমিখানা দান করেছেন, সমাধানে জমিখানা তার পিতার জীবদ্দশায় দখলে নেওয়ার যে শর্তারোপ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। কেননা পিতা যদি নাবালেগ সন্তানকে কোনো জমি দান করেন এবং ওই জমি সন্তান ছোট হওয়ার কারণে পিতা নিজের দখলে রাখেন তখন সন্তান বড় হওয়ার পর উক্ত জমির মালিকানা পেতে পৃথকভাবে দখলে নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বরং সেক্ষেত্রে পিতার দখলই সন্তানের দখল বলে বিবেচিত হয়। -রদ্দুল মুহতার: ৫/৬৯৫

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ