মুহাম্মাদ আদম আলী
মাদরাসায় নতুন জীবন
১৯৬৭ সাল। হযরতকে মাদরাসায় ভর্তি করানো হয়েছে। এখন তার এক নতুন জীবন শুরু হবে। অবশ্য জীবনের সব রুটিন না পাল্টালে জীবন নতুন হয় না। স্কুলের রুটিনের সঙ্গে এ মাদরাসার খুব বেশি পার্থক্য নেই। এ এক অদ্ভুত মাদরাসা!
শরীয়ত উল্লাহ সাহেব পূর্বসুরীদের ইসলাম লালন করতেন। পূর্বসুরীরা কট্টর বিদআতি ছিল। ইসলামের মূল ধারা থেকে অনেক বাইরে। অবশ্য স্ত্রী মাবিয়া খাতুনের পরিবার বিদআতি ছিল না। কিন্তু স্বামীর জেদের কাছে কিছু করতেও পারেননি। অগত্যা তিনি সবর করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এ সবরের ফল পেয়েছেন।
শরীয়ত উল্লাহ সাহেবকে এলাকার মুরব্বীরা ছেলেকে কাছাকাছি কোনো কওমী মাদরাসায় ভর্তি করানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অনড়; বিদআতীদের মাদরাসা ছাড়া অন্য কোথাও দিবেন না। চট্টগ্রামের ষোলশহরে প্রসিদ্ধ জামেয়া আহমাদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসায় গিয়ে ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন। যারা ইসলামের নামে বিদআত করে, এ মাদরাসা তাদের বিদআত সাপ্লাই করে। কেবল সাপ্লাই করে না, নতুন নতুন বিদআত প্রোডাকশন করে। এটি বিদআতের কারখানা। এই মাদরাসায় হযরতের নতুন জীবন শুরু হলো। তার কাছে পড়ালেখাটাই মূখ্য। তিনি সেদিকেই মনোযোগ দিলেন।
অভিাবকরা যদি মাদরাসার শিক্ষকদের খেদমত করে, তাহলে ছেলে বড় আলেম হয়। এটি শরীয়ত উল্লাহ সাহেব মনে-প্রাণে ধারণ করতেন। এজন্য প্রায়ই মাদরাসায় ছুটে যেতেন। শিক্ষকদের খেদমত করতেন। তাদের চা-বিস্কুট খাওয়াতেন। এ মাদরাসার শিক্ষকরা বিড়ি-সিগারেটও খায়। তিনি তা-ও কিনে দিতেন। এজন্য শিক্ষকদের মন জয় করতে বেশি দিন লাগেনি। কিন্তু এতেও কাজ হলো না। পাঁচ-ছয় মাস পরেই মাদরাসার ছাত্ররা কি এক অদ্ভুত কারণে আন্দোলন শুরু করল। স্কুল-কলেজের মতো আন্দোলন, ভাঙচুর। এ আন্দোলনে মাদরাসা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। হযরতের পড়ালেখাও বন্ধ।
হযরত বাসায় ফিরে এলেন। মাদরাসা খোলার অপেক্ষায় থাকলেন। দিন শেষে মাস যেতে লাগল। শরীয়ত উল্লাহ সাহেব অন্য কোথাও ছেলেকে ভর্তি করাবেন না। ওই মাদরাসা যেদিন খুলবে, সেদিন পড়বে। কট্টর সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আর টেকেনি। যিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের একজন রাহাবার হবেন, তিনি বিদআতীদের মধ্যে বেড়ে উঠতে পারেন না। তার জন্য আল্লাহ নতুন পথ খুলে দিলেন।
কৈয়গ্রাম মাদরাসা
সমুদ্রের বিশালত্ব মনের বিশালতাও বাড়ায়। তবে একবার সমুদ্র দেখলেই এটি হয়ে উঠে না। সমুদ্রের সঙ্গে সখ্যতা করতে হয়। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। এ সখ্যতার শেষ নেই। মনের বিশালত্বেরও কোনো সীমানা নেই।
সমুদ্রের সঙ্গে আজন্ম সখ্যতা গড়ে তুলেছেন হযরত। শিশু থেকে এখন দুরন্ত কৈশোর। লোনা জলেই চোখের পাপড়ি খোলে। আবার বালুচরেই ঘুম। মাথার ওপরে টিনের ছাউনি। ছনের বেড়ায় বাতাস ঠেকলেও শব্দ আটকায় না। ঢেউয়ের পাড়-ভাঙা শব্দে ঘুম আরও গভীর হয়। তবে ইদানিং মাঝরাতেই হযরত জেগে উঠছেন। দুঃস্বপ্ন কিনা জানেন না। অজানা ভয় কাজ করছে। কবে যে আবার মাদরাসা খুলবে!
স্কুলে থাকতেই হযরত তার বাবার কাজে সাহায্য করতেন। এখন তো মাদরাসা বন্ধ। পড়ালেখা নেই। সারাদিন বাবার সঙ্গে কাজ করে দিন কাটছে। কাজ করতে তার কষ্ট হয় না। কিন্তু পড়ালেখা করতে না পারার কষ্ট এড়ানো যাচ্ছে না। বাবাও গো ধরে আছেন। যেদিন আহমাদিয়া মাদরাসা খুলবে, সেদিন নিয়ে যাবেন। অন্য কোনো মাদরাসায় পড়াবেন না। তার সঙ্গে কেউ এ বিষয়ে কথাও বলতে পারছে না। একঘুঁয়ে লোকদের কেউ ক্ষেপাতে চায় না—যা ইচ্ছে করুক; বাঁচুক, না হয় মরুক; তাকে কিছু বলার চেয়ে না বলাই ভালো ইত্যাদি। কিন্তু একজন ব্যতিক্রম মানুষ পাওয়া গেল।
মানুষটা এলাকার জমিদার। নূর মুহাম্মাদ শিকদার সাহেব। খুব পয়সাওয়ালা। যার-তার বাড়িতে যান না। তবে এলাকার লোকদের খবরাখবর রাখেন। একদিন তার দৃষ্টিতে পড়লেন হযরত। জমিদার সাহেব বেশ কয়েকদিন ধরেই খেয়াল করছেন, হযরত তার বাবার সঙ্গে ক্ষেতে কাজকাম করছেন। মাদরাসায় যাচ্ছেন না। সুযোগ বুঝে একদিন নিজেই এগিয়ে এলেন। হযরতকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি মাদরাসায় যাচ্ছ না?
—মাদরাসা বন্ধ। খুললে আব্বু নিয়ে যাবেন বলেছেন।
—কবে খুলবে?
—জানি না। ছাত্ররা স্ট্রাইক করেছে। কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য মাদরাসা বন্ধ করে দিয়েছে।
—আচ্ছা। এখানে কাছকাছি কৈয়গ্রামে একটা মাদরাসা আছে। তুমি সেখানে ভর্তি হবে?
—আমি যেতে চাই। কিন্তু আব্বা তো যেতে দিবেন না।
—তামার আব্বাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।
জমিদার সাহেব চলে গেলেন। তারা কিছু বললে ভুলেও যান তাড়াতাড়ি। ব্যস্ত মানুষ। কতকিছু সামাল দিতে হয়। কিন্তু শিকদার সাহেব ভুললেন না। একদিন ঠিকই হযরতের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। গ্রামের লোকেরা মাগরিবের পরেই রাতের খাবার খেয়ে ফেলে। হযরতের পরিবারও রাতের খাবার খেতে বসেছেন। জমিদার সাহেব বাইরে থেকে শরীয়ত উল্লাহর নাম ধরে ডাকছেন। পুরুষের শব্দ পেয়ে হযরতের মা পর্দা করলেন।
জমিদার সাহেবকে দেখে শরীয়ত উল্লাহ সাহেব খুব ভড়কে গেলেন। এত বড়লোক মানুষ তো তার বাড়িতে আসার কথা নয়! তিনি তাকে তাড়াতাড়ি দস্তরখানে শরীক হতে বললেন। জমিদার সাহেব বললেন, —‘খেতে পারি এক শর্তে।’
—কী শর্ত?
—আপনার ছেলেকে দিয়ে দিতে হবে। আমি তাকে কৈয়গ্রাম মাদরাসায় নিয়ে যাব।
শরীয়ত উল্লাহ সাহেব বিস্ময়করভাবে সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেন। তবে তিনি এতে এক শর্ত দিলেন। অদ্ভুত শর্ত—আহমাদিয়া মাদরাসা যেদিন খুলবে, সেদিন আবার ছেলেকে নিয়ে আসব! এ অবাক করা শর্ত আর পূরণ করতে হয়নি। হযরতের জীবনে বিদআতীরাও আর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বিদআতী থেকে সুন্নাতী
কৈয়গ্রাম মাদরাসাটা কওমী মাদরাসা। বাঁশখালি থেকে বেশি দূরে নয়। একই থানা। ছেলেকে ভর্তি করানোর পর শরীয়ত উল্লাহ সাহেব একদিন সেখানে গিয়ে হাজির। ছেলেকে দেখবেন, শিক্ষকদেরও খেদমত করবেন। মাদরাসার মুহতামিম সাহেব জানতেন, নতুন ছাত্রের পিতা একজন কট্টর বিদআতী। এজন্য তিনি শরীয়ত উল্লাহ সাহেবকে বললেন, ‘সম্ভব হলে এখানে দু-একদিন থেকে যান। ভালো লাগবে।’
মানুষ যখন হেদায়েতের পথে অগ্রসর হতে থাকে, তখন এরকম গায়েবি সাহায্য আসে। যারা কদর করে, তারা পার পেয়ে যায়। শরীয়ত উল্লাহ সাহেবের কপাল ভালো। তিনি মাদরাসায় থাকতে রাজি হয়ে গেলেন। শিক্ষকদের খুশি করার মেজাজটা তাকে এ কাজে আরও উৎসাহিত করল।
মাদরাসার শৃঙ্খলা দেখে তিনি খুব খুশি হলেন। দুদিন পরে বাড়িতে ফিরে এলেন।
সুযোগ বুঝে স্ত্রী মাবিয়া খাতুন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাদরাসাটা কেমন দেখলেন?’
—ভালো।
—আহমাদিয়া মাদরাসা থেকে কোনো পার্থক্য চোখে পড়েছে?
—হ্যাঁ। অনেক পার্থক্য।
—কীরকম?
—এখানে ছাত্ররা আযান হলেই মসজিদে যায়। আর আহমাদিয়াতে ছাত্ররা এদিক-সেদিক ছুটোছুৃটি করত।
—আর কি দেখলেন?
—এখানে শিক্ষকরা বিড়ি-সিগারেট খায় না। আহমাদিয়াতে প্রায় সবাই বিড়ি-সিগারেট খেত।
—আর?
—এখানে সবাই পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত। অন্য কোনো ধান্দা নেই। স্ট্রাইক করার তো প্রশ্নই আসে না।
যা-হোক, মাদরাসাটা শরীয়ত উল্লাহ সাহেবের মনে ধরেছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার ছেলে এখানেই পড়বে।
নোট : পরে শরীয়ত উল্লাহ সাহেব হযরত বোয়ালভী রহ.-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বিদআত পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে তাওবা-ইস্তেগফার করে সুন্নাতের পথ ধরেছেন। কিন্তু সুন্নাত তো কিছু শেখা হয়নি। এজন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠলেন। তিনি তখন সরকারি ডিলারের কাজ করতেন। সেখানে একজন আলেম নিয়োগ দিলেন। তার কাছেই বেহেশতি জেওরসহ অন্যান্য কিতাবাদি পড়া শুরু করলেন। এ অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করেন।
আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া
কৈয়গ্রাম মাদরাসায় বছর ঘুরে গেল। প্রথম বছরের অর্ধেক কেটেছিল আহমাদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসায়। বাকি সময়টুকু কৈয়গ্রামে। এরপর আরও দুবছর—দুই জামাত। এখানে আর মন টিকছে না। মন না টিকার কোনো কারণ নেই। পড়ালেখা ঠিকই ছিল। কারও সঙ্গে কোনো গণ্ডগোলও হয়নি। সমস্যা হলো, নতুন একজন ছাত্র এসে হযরতের সঙ্গে ভর্তি হয়েছে। সে-ই তার মনকে বিষণ্ন করে তুলেছে। সে একদিন হযরতকে বলল, ‘তুমি এখানে পড়ে আছ কেন?’
—কেন কোথায় যাব?
—পটিয়া মাদরাসায় যাও। সেখানে পড়ালেখা অনেক ভালো।
—তাহলে তুমি এখানে কেন?
—আমি তো ওখানেই পড়তাম। একটা সমস্যা হওয়ায় এখানে এসে ভর্তি হয়েছি।
পটিয়ায় পড়ালেখা ভালো—তা এই নতুন ছাত্রকে দেখেই বোঝা যায়। তার মেধা প্রখর। কিতাবাদি ভালো বোঝে। কোনো কিছু না বুঝলে তাকে জিজ্ঞেস করলেই হয়। সুতরাং পটিয়া যেতে হবে। আগে মাদরাসাটা একবার দেখে আসা দরকার। হযরত গেলেন।
পটিয়া মাদরাসা। বিশাল পরিসর। অনেক ছাত্র। খেলার মাঠ, পুকুরের স্বচ্ছ পানি, গাছের ছায়ায় নিরিবিলি পরিবেশ হযরতের মন কেড়ে নিল। এখানেই পড়তে হবে। বাবাও রাজি। চতুর্থ বছরের শুরুতেই পটিয়া ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু হলো না। ভেজাল লেগে গেল। এলাকার একজন আলেম আনোয়ারার বোয়ালিয়া হোসাইনিয়া এহইয়াউল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তার সঙ্গে হযরতের পিতার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি অনেকটা জোর করেই হযরতকে ওই মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেন।
কৈয়গ্রাম থেকে আনোয়ারা মাদরাসায় পড়ালেখার মান ভালো না। খারাপ। হযরতের মনটাই ভেঙে গেল। কিছু করারও নেই। বছর শেষ না হলে মাদরাসা পাল্টানোর সুযোগ নেই। দীর্ঘ এক বছর! চিন্তা করলেই কষ্ট লাগে। সব কষ্ট চেপে রাখলেন। এই এক কাজ তিনি খুব ভালো রপ্ত করেছেন। ছোটবেলা থেকেই। সহসা দুঃখের কথা বলেন না কাউকে। পটিয়া মাদরাসার স্বপ্ন দেখে দেখে একসময় সেই দুঃসহ বছর শেষ হয়।
তারপরে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। পটিয়ায় এসে ভর্তি হলেন। কিন্তু সমস্যা পিছু ছাড়ল না। ৫-৬ মাস ক্লাস করতেই দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মাদরাসা বন্ধ। ফের সমুদ্রের খোলা আকাশে কৈশোরের মন্ত্রমুগ্ধ সময়। হযরতের কাছে এ সময় ভালো লাগত না। তিনি পড়ালেখাতেই মজা পেতেন বেশি। পটিয়া বন্ধ। আনোয়ারা তো খোলা। সেখানেই বছরের বাকি সময় কাটালেন।
তারপর একসময় পটিয়া মাদরাসা খুলল। হযরত আবার পটিয়ায় ফিরে এলেন। হেদায়া জামাতে ভর্তি হলেন। তারপর আর মাদরাসা পাল্টাতে হয়নি। দাওরা, তাখাস্সুস—এখানেই। সেই গল্প অনেক দীর্ঘ। দীর্ঘ কথা বলতে সময় লাগে। আর সময় অধরাই থাকে!
প্রথম খেদমত—গোরকঘাটা মাদরাসা
১। হযরত দাওরার বোর্ড পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়েছিলেন। প্রায় সব বিষয়ে ১০০% নম্বর; কেবল একটা বিষয়ে (মুসলিম ২য় খণ্ড) হাফ নম্বর কম ছিল। তারপর একবছর তাখাসসুস ফিল ফিকহ পড়েছেন। এরকম একজন মেধাবীকে পটিয়ায় উস্তাদ হিসেবে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন হাজী ইউনুস সাহেব। তিনি তখন পটিয়া মাদরাসার মুহতামিম। কিন্তু মুফতী আব্দুর রহমান সাহেব বললেন, ‘এখন তাকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কিছুদিন বাইরে ঘুরে আসুক। তারপর দেখা যাবে।’
মুফতী আব্দুর রহমান সাহেব খুব দূরদর্শী ছিলেন। মাদরাসায় তার প্রভাবও ছিল প্রবাদতুল্য। তার কোনো পরামর্শকে হাজী সাহেব ফেলতে পারতেন না। এজন্য তিনি মুফতী সাহবের কথা মেনে নিলেন। হযরতকে এখন অন্য কোথাও খেদমত করতে হবে। কোথায় যাবেন? উস্তাদদের মধ্যে এ নিয়ে তোড়জোড় শুরু হলো। ভালো ছাত্ররা উস্তাদের কথার বাইরে যান না। হযরতও সবর করলেন।
হযরতের একজন উস্তাদ ছিলেন মুফতী ইবরাহীম সাহেব। তিনি মাদরাসার ফতোয়া বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। এ বিভাগ থেকে কোনো ফতোয়া দেওয়ার আগে সেটি মাদরাসার রেজিস্টারে উঠাতে হতো। এ কাজটি হযরত করতেন। এজন্য তাদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে। এই উস্তাদই হযরতের জন্য গোরকঘাটা মাদরাসায় খেদমত ঠিক করে দেন। হযরত এ নির্দেশ মেনে গোরকঘাটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।
২। গোরক ঘাটা মাদরাসা। কক্সবাজারের মহেষখালীতে বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা, গাছগাছালি আর মাঠ-পুকুরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গড়ে উঠেছে এটি। তবে মাদরাসার অবস্থা ভালো না। কয়েক জামাত পর্যন্ত যৎসামান্য ছাত্র নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে। মুহতামিম সাহেবও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এটি পটিয়া মাদরাসার অধীনেই পরিচালিত হতো। হাজী ইউনুস সাহেব এবং মুফতী আব্দুর রহমান সাহেব একবার মাদরাসা পরিদর্শনে এসে খুব বিস্মিত হলেন। তারা সঙ্গে সঙ্গে শূরা কমিটির মিটিং ডাকলেন। মাদরাসার জন্য একজন যোগ্য মুহতামিম নিয়োগ দিতে হবে। কাকে নিয়োগ দিবেন—এ নিয়ে চলছে আলোচনা।
ওই এলাকায় তখন মাওলানা নুরুস সামাদ সাহেব ছিলেন। তিনি পটিয়া ফারেগ, মাওলানা মুজাফফর সাহেবের ক্লাসমেট এবং মাওলানা সুলতান যওক সাহেবের দু-এক বছর জুনিয়র ছিলেন। প্রচণ্ড মেধাবী এবং খুব কর্মঠ ছিলেন। তিনি ফারেগ হওয়ার পর দু-এক বছর শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু গত ২০-২৫ বছর যাবৎ মাদরাসার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি। ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষেত-খামার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। শূরা কমিটি তাকেই বেছে নিলেন।
মাওলানা নুরুস সামাদ সাহেব এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তিনি তখন অনেক দূরে—চর এলাকায় নিজের কাজে ব্যস্ত। সেখানে তার একটি ইঞ্জিন-বোট মেরামত করছিলেন। তাকে সেখান থেকে ডাকা হলো। তিনি এলেন। তার পায়ে কাঁদামাটি; পরনে ছেঁড়া কোর্তা। এ অবস্থায় তিনি মুহতামিম হওয়ার প্রস্তাব শুনে বললেন, ‘আমি তো দীর্ঘদিন মাদরাসার সঙ্গে নেই। আর চাঁদাও তুলতে পারি না। এটি আমার তবিয়ত-বিরোধী। আমি কীভাবে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করব?’ শূরা কমিটি তার কোনো কথা শুনলেন না। তারা তার যোগ্যতা সম্পর্কে জানতেন। অনেকটা জোরজবস্তিতে তিনি মুহতামিমের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হলেন।
৩। হযরত গোরকঘাটা মাদরাসায় যাওয়ার আগেই মাওলানা নুরুস সামাদ সাহেব মুহতামিম হয়েছিলেন। তিনি হযরতকে নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব দেন। এ দুজনের চেষ্টায় পুরো মাদরাসার চেহরাই পাল্টে গেল। হযরত বলেন, ‘মাওলানা নুরুস সামাদ সাহেব মাওলানা মুজাফফর এবং মাওলানা সুলতান যওক সাহেব থেকেও বেশি মেধাবী ছিলেন। এতদিন মাদরাসা থেকে দূরে থাকার পরও কোনো ধরনের মুতালাআ ছাড়াই ক্লাস নিতেন।’
বিদায়—গোরকঘাটা মাদরাসা
১। গোরকঘাটা মাদরাসায় দিনকাল ভালোই চলছে। প্রায় তিন বছর হতে চলল। টুকটাক কিছু সমস্যা হচ্ছে না যে, তা নয়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। হিংসা-বিদ্বেষ জাতীয় ঘটনা। হযরত সেগুলো আমলে নিচ্ছেন না। নিজের মতো কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এবার নতুন বর্ষ শুরু হতেই হযরতের মনে বিষন্নতা ভর করেছে। এর কারণও ভিন্ন। গেল বছর হযরতের বাবা ইন্তেকাল করেছেন। বাড়িতে ঘরের অবস্থা বেশি ভালো না। মেরামত করা প্রয়োজন। বাড়ির কাছাকাছি কোথাও খেদমত করতে পারলে সুবিধা হতো। তাছাড়া বিয়ে করাও প্রয়োজন। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। দেখতে বড় মনে না হলেও সময়ের প্রভাব পড়ছেই। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বছর শেষে এ মাদরাসা থেকে বিদায় নেবেন।
এর মধ্যে বোয়ালিয়া মাদরাসা থেকে প্রস্তাব এসেছে। মাদরাসাটা দীর্ঘদিন মরা মরা অবস্থায় চলছে। মাদরাসা-কমিটি উদ্যোগ নিয়েছে, তাদের মাদরাসায় পড়েছে এমন আলেম ছাত্রদের কয়েকজনকে নিয়োগ দিবে। এজন্য তারা খুঁজে খুঁজে মাওলানা আব্দুল জলিল, মাওলানা আব্দুল লতিফ (কুযালা), মাওলানা মুকিত সাহেব (চন্দ্রগোনা)—এরকম তিন-চারজনের সঙ্গে হযরতের নামও প্রস্তাব করেছে। এ প্রস্তাবে হযরত খুশি হলেন। গোরকঘাটা অনেক দূরে। কাছাকাছি বোয়ালিয়া গেলে সুবিধাই হবে। বিষয়টা গোপনীয়তার সঙ্গেই এগুচ্ছিল। কিন্তু হাজী ইউনুস সাহেব বিষয়টি টের পেয়ে গেলেন। কারও নিকট থেকে হয়তো শুনেছেন। মুফতী আব্দুর রহমান সাহেবও শুনেছেন।
হঠাৎ করেই একদিন হাজী ইউনুস সাহেব হযরতকে ডেকে বললেন, ‘তুমি এবার গোরকঘাটা মাদরাসা থেকে আসার সময় ইস্তফা দিয়ে এসো। আমি তোমার জন্য মাদরাসা ঠিক করে রেখেছি। অন্য কোথাও কথা দিও না।’ তিনি পটিয়া মাদরাসার কথা বলেননি। কথাটা একটু ঘুরিয়ে বলেছেন। তারপর বললেন, ‘মাদরাসা থেকে বাড়ি না গিয়ে পটিয়া এসে সরাসরি আমার সঙ্গে দেখা করবে।’ হযরত শুনলেন। পুরো বিষয়টি চেপে রাখলেন।
হযরত শাবান মাসের শুরুতেই মাদরাসায় ইস্তফানামা জমা দিলেন। মুহতামিম সাহেব খুব অবাক হলেন। তিনি নতুন বছরে মেশকাত জামাত খোলার ঘোষণা দিয়েছেন। দারসও ঠিক করেছেন। মেশকাত আওয়াল পড়াবেন মুহতামিম সাহেব নিজে, আর মেশকাত সানী পড়াবেন হযরত। আর জালালাইন আওয়াল পড়াবেন হযরত, জালালাইন সানী পড়াবেন মুহতামিম সাহেব। এগুলো চূড়ান্ত হয়ে গেছে। মুহতামিম সাহেব এর বিপরীত কিছু চিন্তা করতে পারছেন না। তিনি হযরতের ইস্তফানামা নিজের কাছে রেখে দিলেন। এ ব্যাপারে হযরতকে ডাকলেন না, কিছু বললেনও না। অন্য কোনো উস্তাদকেও কিছু জানাননি। তিনি ধরে নিয়েছেন, সময় হলে তাকে জোর করে রেখে দেওয়া যাবে। যেতে চাইলেও যেতে দিবেন না।
[চলবে]