শুক্রবার-২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহিলা মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা ও আবশ্যিক কিছু বৈশিষ্ট্য

মহিলা মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা

ও আবশ্যিক কিছু বৈশিষ্ট্য

 

 ইবরাহীম খলিল

اِنَّ الْمُسْلِمِيْنَ وَالْمُسْلِمٰتِ وَالْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنٰتِ وَالْقٰنِتِيْنَ وَالْقٰنِتٰتِ وَالصّٰدِقِيْنَ وَالصّٰدِقٰتِ وَالصّٰبِرِيْنَ وَالصّٰبِرٰتِ وَالْخٰشِعِيْنَ وَالْخٰشِعٰتِ وَالْمُتَصَدِّقِيْنَ وَالْمُتَصَدِّقٰتِ۠ وَالصَّآىِٕمِيْنَ۠ وَالصّٰٓىِٕمٰتِ وَالْحٰفِظِيْنَ فُرُوْجَهُمْ وَالْحٰفِظٰتِ وَالذّٰكِرِيْنَ اللّٰهَ كَثِيْرًا وَّ الذّٰكِرٰتِ١ۙ اَعَدَّ اللّٰهُ لَهُمْ مَّغْفِرَةً وَّ اَجْرًا عَظِيْمًا۰۰۳۵

‘নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়াম পালনকারী পুরুষ ও নারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’[1]

وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ١ۘ يَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللّٰهَ وَرَسُوْلَهٗ١ؕ اُولٰٓىِٕكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللّٰهُ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ۰۰۷۱

‘বিশ্বাসী পুরুষ ও বিশ্বাসী নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কাজের নির্দেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আনুগত্য করে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের। এদেরই ওপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করবেন।’[2]

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: «الْـمَرْأَةُ إِذَا صَلَّتْ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَأَحْصَنَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ بَعْلَهَا فَلْتَدْخُلْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْـجَنَّةِ شَاءَتْ».

‘হযরত আনাস (রযি.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে মহিলা (১) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (নিয়মমতো) আদায় করবে, (২) রমজানের রোজা (ঠিকমতো) রাখবে, (৩) লজ্জাস্থান হেফাজত করবে এবং (৪) স্বামীকে মান্য করবে, তাকে (কিয়ামতের দিন) বলা হবে, যে দরজা দিয়ে মন চায় সে দরজা দিয়ে তুমি বেহেশতে প্রবেশ করো।”[3]

ইসলাম সম্পর্কে যারা অবগত আছেন তারা জানেন যে শরীয়তের অধিকাংশ হুকুম আহকাম ও বিধি-বিধান এর ব্যাপারে নারী ও পুরুষ সমপর্যায়ের। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, কোরবানী, ব্যবসা-বাণিজ্য, হালাল-হারাম, বিয়ে-শাদি ইত্যাদি বিষয়। আর ইসলামের বিধি-বিধানগুলো এতই ব্যাপক যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া শুধু ঘরে বসে বই পড়ে এসব বিষয় অনুধাবন করা ও পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব নয়। এ কারণেই যুগে যুগে উম্মতে মুহাম্মদীকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার মানসে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দীনী মাদরাসা। তবে এসবের বেশিরভাগই ছিল পুরুষদের জন্য। ইসলামের সোনালি যুগের নারীদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও নারীগণ নিজ আগ্রহে অথবা পারিবারিক ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে ঘরোয়া পরিবেশে প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করে নিতেন।

কিন্তু পরিবেশ ও সমাজের পরিবর্তনের কারণে নারীদের ধর্মীয় শিক্ষার দ্বারগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নারীরা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। যার ফলে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থাপনায় একটা অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে মুসলিম পরিবারের মেয়েরাও বাধ্য হয়ে জাগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। যেখানে নেই প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা, নেই জীবন ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা। যেখানে মেয়েরা পাচ্ছে না প্রকৃত শিক্ষা বরং সেখানে রয়েছে সর্বদা বিপদের আশঙ্কা।

ধর্মীয় শিক্ষার অভাবে নারীদের মধ্যে বেপর্দা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ইত্যাদি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি নারীদের অনেকেই কুরআন মজীদ দেখে পড়া কিংবা সালাত (নামাজ) আদায়ের জন্য আবশ্যকীয় সূরাগুলোও শিখতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের পরামর্শে বাংলাদেশে মহিলা মাদরাসা গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার শুরুলগ্নে কিছু প্রসিদ্ধ আলেম বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে মহিলা মাদরাসার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। তাদের বিরোধিতার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণও ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই বিরোধিতা এবং সমস্যাগুলো অতিক্রম করে মহিলা মাদরাসার অগ্রসরমাণ যাত্রা শুরু হয়। এবং এর সুফল প্রত্যক্ষ করে আলেম সমাজ এবং সাধারণ মুসলমানরা মহিলা মাদরাসার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং নারীদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের প্রবল আগ্রহ দেখা দেয়।

একথা সবারই জানা যে, একজন মা হচ্ছেন শিশুর প্রথম শিক্ষক। তিনি যদি ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানবতী হন এবং পর্দানশিন হন তাহলে সন্তানও ধার্মিক হবে আশা করা যায়। এছাড়া ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী একজন মা তার সন্তানকে পারিবারিক, সামাজিক শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তাকে একজন আদর্শ সন্তান ও একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।

আদর্শ মহিলা মাদরাসার আবশ্যিক কিছু গুণাবলি

  1. মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় নিয়তের বিশুদ্ধতা:প্রত্যেক কাজের ফলাফল বা পরিণাম নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সকল কাজের বিশুদ্ধতা এবং প্রতিফল তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং নিয়তের আছর বা প্রতিক্রিয়া আমল এবং আমলকারী উভয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং মাদরাসা নির্মাণে প্রতিষ্ঠাতার ইখলাস ও নিয়তের বিশুদ্ধতা মহিলা মাদরাসাকে একটি মাকবুল দীনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
  2. দক্ষ ও মুত্তাকী শিক্ষক শিক্ষিকা:মহিলা মাদরাসার সিলেবাস এবং পুরুষ মাদরাসার সিলেবাস প্রায় একই। অপরদিকে মহিলা মাদরাসার শিক্ষা সমাপনীর কাল ছেলেদের তুলনায় কম। তাই পুরুষ মাদরাসার মতোই মহিলা মাদরাসার শিক্ষক শিক্ষিকাদেরকেও যথেষ্ট যোগ্য এবং পরিশ্রমী হতে হবে। অন্যথায় ছাত্রীরা সঠিকভাবে দীন শিখতে ব্যর্থ হবে। অনেক ক্ষেত্রে মহিলা মাদরাসায় শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগে যোগ্যতার বিষয়টি চরমভাবে অবহেলা করা হয়। এর কারণে মহিলা মাদরাসার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
  3. শতভাগ শরয়ী পর্দার বাধ্যবাধকতা:পর্দা মহিলা মাদরাসার প্রাণ। মূলত নারী জাতিকে পর্দানশীল জাতিতে পরিণত করা এবং পর্দাহীনতার বেহায়াপনা থেকে বাঁচানোর জন্যই মহিলা মাদরাসাগুলো প্রতিষ্ঠার একটা বড় উদ্দেশ্য। পর্দাহীনতা অনেক গুনাহের মূল উৎস। সুতরাং মহিলা মাদরাসায় পর্দার নিশ্চয়তা থাকতে হবে শতভাগ। মহিলা মাদরাসার ব্যাপারে বড় বড় আলেমদের যে আপত্তি এসেছে তার বেশিরভাগই হচ্ছে পর্দাহীনতার আশঙ্কার কারণে। মনে রাখতে হবে, মাদরাসায় কেউ গুনাহ করতে আসেনি বরং দীন শিখার জন্য এসেছে। পর্দাহীনতা মহিলা মাদরাসার মকসাদকে ধ্বংস করবে।
  4. পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যবস্থা:আবাসিক মহিলা মাদরাসার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা ও যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা থাকা আবশ্যক। যাতে ছাত্রীদের গাদাগাদি করে ক্লাসে বসতে না হয় এবং রাতে ঘুমাতে না হয়। পড়ালেখার জন্য সুস্থ শরীর ও মন আবশ্যক। সুন্দর পরিবেশ শরীর ও মনকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। আবাসিক মাদরাসার বড় সুবিধা হলো মাদরাসার দীনী পরিবেশ। দীন শিখা ও আমল করার জন্য দীনী পরিবেশে অবস্থান একটি অপরিহার্য বিষয়। মাদরাসার দীনী পরিবেশে থাকলে পড়ালেখা যেমনিভাবে হবে তেমনি প্রাত্যহিক আমল তথা নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, পর্দা ইত্যাদি আদত বা অভ্যাসে পরিণত হবে খুব সহজে, যেটা বাড়ির পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।
  5. লেখাপড়ার সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ:মাদরাসা হচ্ছে দীন শিখার জায়গা। দীন না শিখলে আমল করবে কিভাবে? তাই আমল করে জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে ইলমে দীন শিখতে হবে। গল্পগুজব আর হাসি তামাশার পরিবেশে তো আর লেখাপড়া হবেনা বরং এতে জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় হবে। খুপরি একটা পেলাম তো ভাড়া নিয়ে মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে মুহতামিম বনে যাব—এ জাতীয় মন-মানসিকতা বর্জন করতে হবে। মহিলা মাদরাসাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আদলেই গড়ে তুলে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
  6. লেখাপড়ার সাথে আমল ও আখলাকের সুষ্ঠু সমন্বয়:মানুষের অপর নাম চরিত্র। চরিত্রই মানুষ। ভালো চরিত্রের একজন লোক মারা গেলে আলোচনা হয় একজন মানুষ মারা গেছে। পক্ষান্তরে মন্দ চরিত্রের কেউ মারা গেলে লোকেরা বলে একটা অমানুষ মারা গেছে। কুরআন-হাদীস হচ্ছে উত্তম চরিত্রের উৎস। সুতরাং কুরআন ও হাদীসের গুণাবলির আলোকে ছাত্রীদের জীবন গড়ে দেওয়াও মাদরাসার একটা প্রধান কাজ। প্রশিক্ষণটা তো এমন হওয়া চাই যে, বাসায় বাড়িতে সবাই বলবে, মাশাআল্লাহ একজন মাদরাসার ছাত্রী। এসকল বিষয় যদি যথাযথভাবে একটা মাদরাসায় থাকে তাহলে কোনো মহিলা মাদরাসা ফিতনায় পরিণত হবে না।

মহিলা মাদরাসার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বেড়েই চলছে। মেয়েদের দীন শেখাতে মহিলা মাদরাসার অবদান আজ অনস্বীকার্য। প্রকৃত দীন মুসলিম ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিতে মহিলা মাদরাসা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ইসলামবিদ্বেষী অপশক্তি ইসলামকে চিরতরে মুছে দিতে জাগতিক শিক্ষার মাধ্যমে যে পাঁয়তারা চালাচ্ছে তা আজ অনেকটা বাধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে মহিলা মাদরাসা সঠিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কারণে।

[1] আল-কুরআনুল করীম, ৩৩ (সূরা আল-আহযাব): ৩৫

[2] আল-কুরআনুল করীম, ৯ (সূরা আত-তাওবা): ৭১

[3] (ক) আত-তাবরীযী, মিশকাতুল মাসাবীহ, আল-মাকতাবুল ইসলামী লিত-তাবাআ ওয়ান নাশর, বয়রুত, লেবনান (তৃতীয় প্রকাশ: ১৪০৫ হি. = ১৯৮৫ খ্রি.), খ. ২, পৃ. ৯৭১, হাদীস: ৩২৫৪; (খ) আবু নুআয়ম আল-আসবাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া, মাতবাআতুস সাআদা, কায়রো, মিসর (প্রথম সংস্করণ: ১৩৯৪ হি. = ১৯৭৪ খ্রি.), খ. ৬, পৃ. ৩০৮

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ