বুধবার-১৫ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি-৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলেমদের সান্নিধ্য কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জনের অনন্য সোপান

আল্লামা আবদুল বাসেত খাঁন সিরাজী

 

ان الحمد لله، نحمده ونستعينه، ونستغفره ونتوكل عليه، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل الله فلا هادي له، ونشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، أنا أشهد عن سيدنا وسندنا وشفيعنا وطبيبنا وطبيب قلوبنا وأولانا ومولانا محمدًا عبده ورسوله، الذي أرسله بالحق بشيرًا ونذيرًا وداعيًا إلى الله بإذنه سراجًا وقمرًا منيرًا. أما بعد!

أعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمٰن الرحيم، قال تعالىٰ: [يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ١ۙ وَالَّذِيْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍؕ ۰۰۱۱] {المجادلة: 11}، وقال صاحب القران ﷺ: «إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ، إِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَـمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا، إِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ، فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ»، صدق الله مولانا العظيم النبي الأمي الكريم، ونحن علىٰ ذلك لمن الشاهدين الشاكرين والذاكرين، والحمد لله رب العالمين، اللّٰهم صل علىٰ سيدنا ومولانا محمد وعلىٰ آله وأصحابه وبارك وسلم، اللّٰهم صل علىٰ محمد النبي الأمي وعلىٰ آله وسلم تسليمًا، يا ربي صلي وسلم دائمًا أبدًا علىٰ حبيبك خير الخلق كلهم.

অদ্যকার আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার দুইদিনব্যাপী আর্ন্তজাতিক ইসলামী মহাসম্মেলনের শ্রদ্ধাভাজন সম্মানিত সভাপতি, সম্মানিত ওলামা কেরাম, বিভিন্ন দীনী মাদারিস থেকে আগত ছাত্ররা, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত সম্মানিত সুধী!

সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে লাখ ও কোটি শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদের হায়াতকে দীর্ঘ করে পবিত্র জুমাবারে বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান, সাম্প্রতিককালের শ্রেষ্ঠ মানুষ ওলামায়ে কেরামের সান্নিধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ পবিত্র আল-কুরআনের আলোচনার মজলিসে উপস্থিতির সৌভাগ্য দান করেছেন। সেই মহা-মহিয়ানের দরবারে প্রত্যেকেই কৃতজ্ঞ হয়ে উচ্চস্বরে বলুন, আল-হামদু লিল্লাহ।

সম্মানিত উপস্থিতি!

আপনারা গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক সময়ের বুজুর্গ ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা শুনছিলেন। এ পর্যায়ে আল্লাহ পাক আমাকে আপনাদের খেদমতে উপস্থিত করে দিয়েছেন। আমিও আল্লাহ পাকের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তার কালামে মজীদ থেকে কিছু অংশ তেলাওয়াত করেছি। মহানবী (সা.)-এর অগণিত অসংখ্য হাদীসে থেকে একখানা হাদীস পাঠ করেছি। মহান রব্বুল আলামীন যদি আমাকে তওফিক দান করেন এবং তার রহমত যদি শামেলে হাল হয়, তেলাওয়াতকৃত আয়াত এবং হাদীসকে সামনে রেখে বিশেষ একটি টার্গেটে আমি আমার বয়ানকে আপনাদের সামনে পেশ করব। আমি আমার বয়ানের শুরুতেই আমার টার্গেট আপনাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি।

আজকে আমার আলোচনার মূল লক্ষ্য মুসলিম জাতির ইসলামী জীবন যাপনে ওলামায়ে করামের প্রয়োজনীয়তা। এটা হলো আমার মূল টার্গেট। এ টার্গেটের মূল লক্ষ্য পর্যন্ত যাওয়ার পূর্বে আমাকে একটু অনেক পেছন থেকে আসতে হবে। পেছন থেকে আলোচনাটা নিয়ে আসলে পরবর্তীতে মূল টার্গেট এর মূল অংশটা আমাদের অন্তরের গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করবে, ইনশা আল্লাহ। এ কারণে একটু কথাটা সাজিয়ে-গুছিয়ে আপনাদের সামনে পেশ করার লক্ষ্যে আমি পেছন থেকে আলোচনা নিয়ে আসতে চাচ্ছি।

আমরা প্রত্যেকেই জানি, পৃথিবীর মানুষগুলো প্রথমত দুই প্রকার। এক প্রকার, যারা পরকাল, আখেরাত, জান্নাত-জাহান্নাম; কোনোটাকেই বিশ্বাস করেন না। আরেক প্রকার, মানুষ আছে, যারা পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম; সবগুলোকে বিশ্বাস করে। যারা পরকাল, আখেরাত, জান্নাত-জাহান্নাম; কোনোটাই বিশ্বাস করে না, তাদেরকে নিয়ে আজকে আমার কোনো আলোচনা নেই। আজকের আলোচনা শুধুমাত্র আল্লাহ পাকের বিশ্বাসীদেরকে নিয়ে, যারা পরকালে বিশ্বাস করে, আখেরাতকে বিশ্বাস করে, তাদেরকে নিয়ে আমার আলোচনা।

আমার বিশ্বাস, গোটা বিশ্বের যত মানুষ পরকাল, আখেরাত, জান্নাত এবং জাহান্নামকে বিশ্বাস করে, তাদের সকলেই পরকালে জান্নাতি হতে চায়। কোনো একজন মানুষও জাহান্নামে যেতে চায় না। কিন্তু আমি যদি জান্নাতে যেতে চাই, তাহলে কি জান্নাতে যাওয়া সম্ভব? জান্নাত এটি এমন একটি বস্তু, আমরা কেউ কিন্তু তা তৈরি করিনি। আমরা কেউ এটার মালিক‌ও নই। এটা নানা-দাদার সম্পদ‌ও না। এটা মা-বাবার সম্পাদ‌ও না, বাপ-দাদা না থাকলে দাদার অবর্তমানে বাবার মাধ্যমে আমি একদিন এটার মালিক হয়ে যেতাম। নানার মালিক হলে তার অবর্তমানে মায়ের মাধ্যমে আমি এটার মালিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এটা তো কারো বাপ-দাদার সম্পদ না। জান্নাত তৈরি করেছেন আল্লাহ। তার মালিক‌ও আল্লাহ তাআলা। এই জান্নাতে কেউ যদি যেতে চায়, এই জান্নাত কেউ যদি পেতে চায়, তাহলে তার জন্য দুটি পদ্ধতি আছে। একটি পদ্ধতি অবৈধ। আরেকটি পদ্ধতি হল অবৈধ। সংক্ষেপে কথা উপস্থাপন করার জন্য চেষ্টা করছি। যেমন- এই মোবাইল ফোনটির বর্তমান মালিক হলাম আমি। ‘বর্তমান’ বললাম কেন? কারণ একটু পর যদি আমার মৃত্যু হয়, তখন এই ফোনটির মালিকানা আর আমার থাকবে না। আমার পকেটে যে টাকা আছে এর মালিকানাও আমার থাকবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নিঃশ্বাস আছে, ততক্ষণ আমি এটির মালিক আছি। নিশ্বাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমার ফোনের মালিকানা অন্যত্র চলে যাবে। আমার টাকার মালিক হবে অন্য জন। এ জন্য আমি বললাম, এই ফোনটির বর্তমান মালিক আমি। এখন কেউ এই ফোনটি নিতে চাইলে, তাহলে তাদের জন্য দুটা পদ্ধতি আছে। একটি হল বৈধ। আরেকটি হল অবৈধ। অবৈধ পদ্ধতিতে কেমনে নেবে? চুরি করে অথবা জোর করে নেবে। এটা অবৈধ। আল্লাহ পাকের জান্নাত অবৈধ পথে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিলে বৈধ পদ্ধতিতে নিতে হব।

আমার এই ফোনটি যদি আমার কাছ থেকে কেউ বৈধ পদ্ধতিতে নিতে চায়, তাহলে তার জন্য অপশন দুটি। একটা হলো আমি যদি এটি বিক্রি করি, তাহলে সে আমাকে উচিত মূল্য দিয়ে আমার কাছ থেকে এই ফোনটির মালিক হয়ে যেতে পারবে। আরেকটি হল সে আমার কাছ থেকে এটা কিনে নিবে না বরং তার সাথে আমার খুব খুব ভালোবাসা যে আমি তার প্রতি খুব দুর্বল হয়ে গেলাম এবং সে আমার কাছ থেকে চেয়েই যেকোনো জিনিস তাকে দিতে আমার মজা লাগে। একই পদ্ধতিতে সে যে কেউ আমার কাছ থেকে এই ফোনটার মালিক হতে পারে। এখন আল্লাহ পাকের জান্নাতের কেউ যদি মালিকানা নিতে চায় তাহলে তার জন্য এই দুইটা অপশন খোলা আছে। একটা হল সে কিনে নেবে আল্লাহর জান্নাত এটা যদি কেউ কিনতে চায় আল্লাহপাক কুরআনে করীমে এই জান্নাত বিক্রি করার ঘোষণাও দিয়েছেন,

اِنَّ اللّٰهَ اشْتَرٰى مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ اَنْفُسَهُمْ وَاَمْوَالَهُمْ بِاَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَؕ ۰۰۱۱۱[1]

আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি ঈমানদারদের জান এবং মাল কিনে নিয়েছি।’ কিন্তু আল্লাহ পাকের জান্নাত কিনতে চাইলে এটা বড় কঠিন। কারণ এটি ক্রয় করার জন্য দিতে হবে দুটি বস্তু। আর নিতে হবে একটি; জান্নাত। আল্লাহ তার জান্নাত আমার কাছে বিক্রি করে দেবেন, তবে শর্ত হলো আমার জানও দিতে হবে এবং মাল‌ও দিতে হবে। এই দুটি দিলে তিনি একটি দেবেন, সেটি হলো জান্নাত। এভাবে জান্নাত অর্জন করা আমাদের মতো মানুষের জন্য কষ্টকর। এর জন্য আসান পদ্ধতি হলো, আল্লাহ পাকের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হলে, সহজেই জান্নাত পাওয়া যাবে।

আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দিয়ে আপনাদেরকে একটি উদাহরণপেশ করছি। আজ থেকে দুই বছর পূর্বে, সম্ভবত বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় ওয়ায়েজ এবং বুজুর্গ আলেম হযরত মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী (হাফি.)-এর প্রোগ্রাম ছিল দিনাজপুরে। রাত্রিবেলা তিনি আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ভাই, আপনি কোথায় আছেন? আমি বললাম, আমিতো সিরাজগঞ্জে আছি। আমি বললাম, আপনি কোথায় আছেন? তিনি বললেন, আমি দিনাজপুরে আছি। আমি বললাম, তাহলে সকালের নাস্তা এক সাথে হলে কেমন হয়? তিনি তাতে সম্মতি দিলেন। তিনি একজন ভালো মানুষ এবং বড় মনের মানুষ। আমি জানি, তাঁর আগমনের কথা যদি আশপাশের আলেম-ওলামা জানতে পারেন, তাহলে তারা এখানে ভিড় জমাবে। এজন্য আমি ভালো ইন্তেজাম করেছি। ভাড়া বাসায় থাকি, আমার নিজস্ব বাসা নেই। বাসাটি অত বড়ও না। যাইহোক, তিনি চলে এলেন। আশেপাশের অনেক আলেম-ওলামা জড়ো হয়েছে। আমি তাকে বসিয়ে দিলাম। কাউকে মোড়ায়, কাউকে খাঁটের ওপর, কাউকে মেঝেতে বসতে দিলাম। সেখানে একটি প্লাস্টিকের মোড়া ছিলো। দেখতে খুব সুন্দর। এটি তখন প্রথম বের হয়েছে। আমি যখন তাকে খাঁটে বসিয়ে খাবার আনতে গেলাম, তখন তিনি ড্রাইভারকে বলেন, আবদুল বাসেত ভাই রুমে ঢুকার পূর্বেই মোড়াটি আমার গাড়িতে রেখে আসো। কথা বলতে বলতে আমি সেখানে উপস্থিত। আমি বললাম, ভাই কিসের ষড়যন্ত্র?! এটা ভাই কিসের ষড়যন্ত্র?! এটা কোন ষড়যন্ত্র? তখন তিনি বললেন, ষড়যন্ত্র না, মোড়াটা অনেক সুন্দর। তাই নিয়ে যাওয়ার জন্য মনস্থ করেছি। আমি বললাম, দুটিই সুন্দর দেখাচ্ছে, নাকি একটি? তখন তিনি বলেন, দুটিই সুন্দর। তবে দুটি নেওয়া ইনসাফ হবে না। তাই একটি রেখে অপরটি নিয়ে যেতে চাই। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি বললাম, রফিক সেটা গাড়িতে রেখে আসো।

মাওলানা আইয়ুবীর সাথে আমার খাতির ও ভালোবাসা আছে। তিনিও আমাকে অনেক মহব্বত করেন। তার প্রতি আমার ভালোবাসার কারণে সে যখন আমার মোড়ার দিকে তাকিয়েছেন, তখন আমি তাকে কোনো বিনিময় ছাড়া তা এমনিতেই দিয়ে দিয়েছি। আমি যদি আমার খাতির ও ভালোবাসার কারণে আমার প্রিয় জিনিসটি গিফট করতে আনন্দ পাই, তাহলে আমরা যদি আসমান জমিনের মালিক আল্লাহ পাকের সাথে খাতির তৈরি করতে পারি, সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারি, তাহলে আমরাও জান্নাতের দিকে দৃষ্টি দিতেই আল্লাহ পাক জান্নাত দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন, সুবহানাল্লাহ।

তাহলে যারা জান্নাতে যেতে চায়, তাদের জন্য বৈধ পদ্ধতি দুটি। অবৈধ পদ্ধতিতে জান্নাতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুই পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো, আল্লাহ পাকের সাথে খাতির পয়দা করা। এখন তার সাথে খাতির পয়দা করতে হলে, সেটা কোন পথে? সেটা আমাদের জানার দরকার আছে না? মহব্বত হলেই আল্লাহ আমাকে জান্নাত দেবেন।

মহব্বত তৈরি করতে হলে অনেক ফর্মুলার দরকার নেই। শুধুমাত্র দুটি ফর্মুলা ফলো করতে হবে। একটি হলো ‘ইমতেসালুল-আওয়ামের’ আল্লাহর নির্দেশ পালন করা। আর একটা হলো, ‘ইজতেনাবুন-নাওয়াহী’ তথা নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকা।

আল্লাহ তাআলার বান্দা আল্লাহর সাথে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করবেন? তার জন্য আল্লাহ পাক রব্বুল আ’লামীন দুনিয়াতে দুটি জিনিস পাঠিয়ে ছিলেন। একটি হলো ‘কিতাবুল্লাহ’ আরেকটা হলো, ‘রিজালুল্লাহ’। এই দুই জিনিসের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সাথে মানুষ খাতির ও সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারবে।

মুহতারাম হাযেরীন!

‘কিতাবুল্লাহ’ মানে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কিছু গাইডলাইন দিয়েছেন। এটা করো। সেটা করো। এটা করলে আমার সাথে তোমার খাতির হয়ে যাবে। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন, নামায পড়ো, রোযা রাখো, হজ করো, যাকাত দাও, ইনসাফ করো, তোমার সাথে আমার খাতির হয়ে যাবে। আরেকটা হলো, কিছু ছাড়ো। এটা ছাড়ো, এটা ছাড়ো, এটা ছাড়ো। যেমন- অবিচার ছাড়ো, অত্যাচার ছাড়ো, তাহলে তোমার সাথে আমার খাতির হয়ে যাবে। এখন এই করা বা ছাড়া কোন পদ্ধতিতে? তার সিস্টেম কি? যেমন আল্লাহ পাকের একটি কথা বারবার এসেছে ‘আকিমুস সালাত’ তথা নামায কায়েম করো। কিন্তু নামায কায়েম কীভাবে করবো? এ পদ্ধতি আল্লাহ তাআলা মানুষকে বোঝানোর জন্য মানুষের মধ্য থেকে কিছু বাছাইকৃত মানুষকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন নবী হিসেবে। যাদের দায়িত্ব ছিল আল্লাহ পাকের গাইডলাইনটিকে পৃথিবীর মানুষকে বাস্তবে প্রশিক্ষণ দেবেন। এদেরকে নবী এবং রসুল বলা হয়। আমাদের নবী স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি প্রেরিত হয়েছি শিক্ষক হিসেবে। কী শিক্ষা দেবেন? তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত গাইডলাইনের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেবেন।

কুরআনে করীমের মধ্যে বলা হয়েছে, ‘আকিমুস সালাত’ নামায কায়েক করো। কিন্তু কোথাও এর সংখার উল্লেখ নেই। আজকে পৃথিবীতে মুসলমানদের অনেক বিভক্তি সত্ত্বেও সকলেই এ ব্যাপারে একমত যে, ফজরের ফরয নামাজ দুই রাকআত, যোহরের ফরজ চার রাকআত, আসরের ফরজ চার রাকআত এবং মাগরিবের ফরজ তিন রাকআত। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, ফজরের ফরজ দুই রাকআত, যোহরের ফরয চার রাকআত, আসরের ফরজ চার রাকআত, মাগরিবের ফরজ তিন রাকআত, এশার ফরজ চার রাকআত; এগুলো কি কুরআন মজীদে বয়ান করা হয়েছে? এক রাক রাকআতে একটি রুকু এবং দুটি সেজদা করতে হয়। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে কি কোনো বিবরণ আছে? না, এ সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে নেই। তাই এগুলো শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছেন ‘মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ’ (সা.)-কে। তিনি এর যাবতীয় ব্যাখ্যা সাহাবায়ে কেরামকে শিখিয়ে দিয়েছেন। এজন্য কোনো ব্যাক্তি যদি আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক করতে চাই, তার জন্য দুইটি মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক করতে হবে। একটি হলো পূর্ণ কুরআন মজীদ। আরেকটা হল সুন্নতে রসুল। এই দুইটা জিনিসের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এই দুটিতে বর্ণিত আদেশগুলো পালন করতে হবে এবং যা কিছু সেখানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাহলে আল্লাহ তাআলাকে পাওয়া যাবে জান্নাতে যাওয়া যাবে।

এই দুটি জিনিসের কোনো একটাকে ছেড়ে দিলে কোনোদিন আল্লাহকে পাওয়া যাবেনা। জান্নাতে যাওয়া যাবে না। রসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলে গেছেন,

«تَرَكْتُ فِيْكُمْ أَمْرَيْنِ، لَنْ تَضِلُّوْا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ».

নবীজী বলেন, ‘আমি চলে গেলাম দুনিয়া থেকে তোমাদের কাছে আমি দুটি মহান জিনিস রেখে গেলাম। কিতাবুল্লাহ ও আমার সুন্নত। যতক্ষণ এই দুটিকে আঁকড়ে ধরবে, তোমরা কস্মিনকালেও গোমরাহ হবে না।’[2]

মুহতারাম হাযেরীন!

কুরআন হল এক মহান শক্তি, সিরিয়াস পাওয়ার। এই সিরিয়াস পাওয়ারের কাছে কেয়ামত পর্যন্ত যত অস্ত্র আবিস্কার হবে, সবগুলো এর কাছে অসহায়। আমাদের একথাগুলি যাদের এতদিন বিশ্বাস হয়নি, এখন তো মহান রব্বুল আলামীনের কুদরত সারা বিশ্বকে আবারো দেখিয়ে দিলো ঈমানের কাছে, কুরআনের কাছে, সুন্নতের কাছে; পৃথিবীর নতুন আবিষ্কৃত কোনো অস্ত্রই কাজ করতে পারে না, যার জ্বলন্ত প্রমাণ আফগানিস্তান। পৃথিবী জানে, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করল দীর্ঘ বিশ বছর যাবৎ। বর্তমান বিশ্বের সুপার পাওয়ার একা যুদ্ধ করতে যায়নি, তার মিত্রবাহিনীকে নিয়ে সেখানে যুদ্ধ করতে গেলো। পৃথিবীর সবচেয়ে ল্যাটেস্ট অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে একটা বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘ বিশ বছর যাবৎ যুদ্ধ করলো, যারা হতদরিদ্র ও গরীব, যাদের পায়ে পরিধান করার মতো জুতা নেই, যারা সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোনো তরকারি দিয়ে রুটি খাওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি, যারা বছরের পর বছর পাহাড়ে পাহাড়ে আত্মগোপন করে মাসের-পর-মাস অনাহারে দিন কেটেছে। এই লোকগুলোর সামনে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সুপার পাওয়ার ও তার মিত্র বাহিনী ২০ বছর পর্যন্ত যুদ্ধ করলো। শেষ পর্যন্ত জুতাবিহীন, খাবারবিহীন এক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদেরকে আব্বা বলে জীবন রক্ষা করতে হয়েছে।

মুহতারাম হাযেরীন!

মুসলিম জাতির জন্য বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের দরকার নেই, তবে ঈমানকে মজবুত করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَاَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِيْنَ۰۰۱۳۹[3]

একটা কোয়ালিটি তোমরা অর্জন করো, দুনিয়ার যত অস্ত্র আছে সব তোমাদের সামনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে, সেটা হলো ঈমান।

মুহতারম উপস্থিতি!

আজকের বিশ্ব সর্বক্ষেত্রে উন্নত হচ্ছে। কিন্তু ঈমান ও আমলের চূড়ান্ত বিপর্যয় নেমে আসছে। শুধু নরমাল জায়গাগুলোতে যে এই বিপর্যয় নেমে আসছে তা নয়; বরং যেখান থেকে দিন বের হয়, সেখানেই এখন ঈমান ও আমলের অধঃপতন। তামাম দুনিয়াতে ঈমানের আলো ছড়িয়েছেন মক্কা-মদীনার পবিত্র জমিন থেকে, তামাম পৃথিবীতে হেদায়েতের আলো বিচ্ছুরিত হয়েছে; সেই মুকাদ্দাস জমিন থেকে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে তামাম দুনিয়াতে ফেতনা ছড়ানো হচ্ছে। আপনারা অবশ্যই জানেন, যে মুকাদ্দাস জমিন থেকে সারা পৃথিবীতে হেদায়েতের আলো ছড়িয়েছে, সেই জমিনের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার থেকে আজ ফেতনা ছড়ানো হচ্ছে। তাই আমাদেরকে খুব এলার্ট থাকতে হবে। সিরিয়াস এলার্ট থাকতে হবে মুসলিম জাতিকে। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, সৌদি আরবের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মাথার ওপর চেপে বসেছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইসরাঈল। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনারা দেখেছেন, হজ-ওমরা পালন করতে যারা যায়, তামাম দুনিয়া থেকে তাদের বিষয়গুলোকে নিয়ে অবজার্ভ করা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইজরাঈলকে। আমার তো সিরিয়াস ভয় লাগছে, তামাম দুনিয়া থেকে বর্তমান সময়ের ইসলামিক স্কলার ও বর্তমান পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব যাঁরা; তাঁরা তো মক্কা-মদীনার মহব্বত-ভালোবাসার টানে মক্কা মদীনা হজ-ওমরা করতে যাবে। যত মানুষ এখানে ঢুকবে তাদের প্রত্যেকের খবর থাকবে, ইজরাঈলের কাছে। আমার তো আশঙ্কা হচ্ছে, তামাম দুনিয়ার ইসলামী মনীষী ও বুজুর্গ স্কলারদেরকে দুনিয়া থেকে বিদায় করার কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কিনা? আমাদের খুব সজাগ থাকতে হবে।

মুহতারম হাযেরীন!

শুধু কী তাই? মানুষের চরিত্র নষ্ট করার জন্য যত মেশিন আবিষ্কার হয়েছে, তার মধ্যে সব চেয়ে উন্নত মানের অস্ত্র হলো, এই মোবাইল। মানুষের চরিত্র নষ্ট করার জন্য সারা দুনিয়াতে যত মেশিন আবিষ্কার হয়েছে, তার মধ্যে সব চেয়ে মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক যন্ত্র হলো মোবাইল। আজকে ওলামায়ে কেরাম, মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দ, কঠিন কঠিন আইন করেও এই ডিভাইস ব্যবহার করা বন্ধ করতে পারছেন না। দেশের সাধারণ মানুষ তো আছেই, বুদ্ধিজীবীরাও এই ব্যাপারটি নিয়ে শঙ্কিত ও খুব বেশি চিন্তিত। কিন্তু তথাকথিত প্রগতিবাদী স্লোগানধারীরা এটা নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। অথচ জাপানের একজন বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী বলেছেন, এই যন্ত্রকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে অবশ্যই দুনিয়া 20 বছর পর আবার মূর্খতার দিকে ধাবিত হবে।

সম্মানিত উপস্থিতি!

একটা কথা মনে রাখবেন, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদেরকে বলছি, যেহেতু তাদের উপস্থিতি এখানে বেশি, একটা ঘরের কোনো কারুকার্য করতে চাইলে দুই মাস-তিন মাস, দুই বছর-তিন বছরলাগে। তার ডিজাইন করতে, কোনো কোনো মসজিদের ডিজাইন করতে ১২ বছর লেগেছে। কিন্তু বলুনতো দেখি, এই ডিজাইনটি ভাঙতেও কি ১২ বছর লাগবে? ভাঙতে ১২ মিনিটও লাগে না। ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষকমণ্ডলী আমাদের পিছনে ১২ বছর মেহনত করে, যা গড়ে ছিলেন, তা ভাঙ্গার জন্য এই যে অস্ত্রটি ২মিনিট‌ই যথেষ্ট। তাই এ ব্যাপারে আপনারা সজাগ হবেন। ওলামায়ে কেরাম ও জামিয়ার শিক্ষার্থীদের জন্য একথাটি বললাম। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন, আমীন।

আমি বলছিলাম যে, আল্লাহ তাআলার জান্নাতে যেতে হলে এবং আল্লাহকে পেতে হলে কুরআন-সুন্নাহ লাগবে। কোনো একটা বাদ দিয়ে আল্লাহকে পাওয়া যাবে না। জান্নাতে যাওয়া যাবে না। আল্লাহকে পেতে চাইলে, জান্নাতে যেতে চাইলে, এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই যে, কুরআন আমার লাগবে। কুরআন আকড়ে ধরতে গেলে চারটি কাজ করতে হবে। এক নম্বরে আল্লাহর কুরআন পড়তে হবে। দুই নম্বরে আল্লাহর কুরআন বুঝতে হবে। তিন নম্বরে কুরআনের জীবন গড়তে হবে। চার নম্বরে মৃত্যু পর্যন্ত কুরআনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে হবে।

আমার কথা ভালো করে বুঝবেন! কুরআন পড়তে হবে এই বিষয়টি আমি পরে বলব। দ্বিতীয় নম্বরের কথাটা প্রথমে বলতে চাই। আল্লাহর কুরআন আপনাকে বুঝতে হবে। আমি যদি কুরআনের জীবন গঠন করতে চাই, আর কুরআনে করিম যদি না বুঝি, তাহলে কুরআনের জীবন গড়বো কীভাবে? এখন আল্লাহর কুরআন যদি কোনো মানুষ বুঝতে চায়, তার জন্য দুইটা পদ্ধতি আছে। একটা হলো নিরাপদ পদ্ধতি।

আরেকটা হলো সুবিধাজনক। কিন্তু শঙ্কামুক্ত নয়। অনিরাপদ পদ্ধতির কথাটি আগে বলছি, আমি বাংলা ভাষায় বড় পণ্ডিত, ইংরেজিতে এক্সপার্ট, উর্দুতে মাহের, ফার্সিতে আমার বড় দক্ষতা আছে। এখন আমি বাজার থেকে একটা বাংলা ভার্সনের কুরআনের তফসির কিনে নিয়ে বাড়িতে বসে কুরআনের তফসির বোঝার চেষ্টা করছি। এই পদ্ধতিটি অনেক সহজ হলেও শঙ্কামুক্ত নয়। এই পদ্ধতিতে আল্লাহর কুরআন বোঝা নিরাপদ নয়।

যদি বলেন কেমনে? আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত বন্ধুরা আছে, যারা আমাদেরকে মহব্বত করে, ভালোবাসে, কিন্তু মাঝে মাঝে তারা আমাদের ব্যাপারে মন্তব্য করে যে, কওমি হুযুরদেরকে বর্তমান সময়ে খুব ভালো লাগে কেন? তারা একটু নম্র-ভদ্র। তাদের আমল-আখলাক অন্যদের তুলনায় ভালো। এদের তেলাওয়াত আরও সুন্দর। এরা কুরআনের অনেক গভীর পর্যন্ত ধরতে পারে, ঢুকতে পারে, তবে বেশি গোঁড়ামি করে। তাই এদেরকে একটু খারাপ লাগে। গোঁড়ামিটা কোথায়? এটাই তো, আমি বাংলা তাফসিরুল কুরআন নিয়ে এসে ঘরের ভেতর বসে তাফসির বুঝবো, এটা অত্যন্ত সহজ।

আমি তো এমন কোনো বাংলা শব্দ নেই, যার অর্থ বুঝি না। কিন্তু আপনারা বলেন, এই পদ্ধতিটা হল অনিরাপদ। ঘরে বসে একা একা কুরআন পড়লে, এটা আশঙ্কামুক্ত নয়। তাদের এই গোঁড়ামিটা ভালো লাগে না। তাদের এই প্রশ্নের জন্য আমি একটি উত্তর দেই। আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো, কুরআন করীম কি দুনিয়ার কোনো কিতাব, নাকি আসমানি কিতাব? আসমানি কিতাব। কারো কোনো দ্বিমত আছে কি? … না।

এখন আমি বলতে চাই, আমাদের দেশের যে মেডিকেল কলেজের মেডিকেল সাইন্সের বই পড়ানো হয় এটিও কি আসমানি কিতাব, নাকি এটাকে দুনিয়ার কোনো মানুষ লিখেছে? এছাড়াও অন্যান্য কিতাবগুলো পড়ানো হয় সাইন্সের। সেগুলো কি আসমানি কিতাব? না, সেগুলো আসমানি কিতাব নয়; মেডিকেল সাইন্সের বইগুলো পড়ানো হয় মেডিকেলে। সেখানকার একটিও আসমানি গ্রন্থ নয়, সবগুলো মানুষের লিখিত। পাঁচ বছর, ছয় বছর, সাত বছরপর্যন্ত সেগুলোকে অধ্যয়ন করার জন্য বিশেষ একটি জায়গায় অর্থাৎ মেডিকেল কলেজে অধ্যায়ন করতে হয়। অন্যের কাছে যেতে হয়। এখন আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, এই ছয় বছর, পাঁচ বছর কোর্স করার সময় কোনো একদিন কি তাদের ক্লাস করার জন্য কোনো ইঞ্জিনিয়ার এসে ছিলেন? …না। তাহলে তাদের ক্লাস কে নিয়েছেন? ডাক্তার শিক্ষকগণ।

মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা বইগুলো পড়ার জন্য ছয় বছর পর্যন্ত মেডিকেল কলেজে কোর্স করে। ডাক্তারের কাছ থেকে বইগুলো অধ্যায়ন করে। অতঃপর ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। অতঃপর সরকারের নীতি কী? এত কিছুর পরও সে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখতে পারবে না; বরং একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে দুই বছর বা এক বছর ইন্টার্নি করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত ইন্টার্নি না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত পেসক্রিপশন লেখার কোনো অনুমতি নেই। কেন? তুমি তো সূত্র পড়েছ। ডাক্তারের কাছে পড়েছ। থিওরি পড়েছ। কিন্তু ডাক্তারের সাথে প্র্যাক্টিস করেনি। সে দেখেনি, রোগের কতটুকু মাত্রায় কতটুকু মেডিসিন দিতে হয়, কয় মিলি দিতে হয়। এজন্য প্রেসক্রিপশন লিখতে পারবে না। কারণ শুধুমাত্র কোর্স সমাপ্ত করে প্রেসক্রিপশন দেওয়া শুরু করলে, রোগ ভালো হওয়ার চেয়ে রোগীর মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি হবে।

কুরআনে করীম তো আসমানি গ্রন্থ। তাই ঘরে বসে বাংলা ভাষার পাণ্ডিত্যের কারণে বাংলা তাফসীর পড়ে একাকি অর্জন করে যদি ধর্মের কোনো প্রেসক্রিপশন দেয়, তাহলে সেই প্রেসক্রিপশনে মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত হওয়া তো দূরে থাক, গোমরাহ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

মুহতারাম হাযেরীন!

খুব ভালো করে মনে রাখবেন, কুরআন বুঝার জন্য দুটি পথ আছে। একটা পথ সহজ। তবে আশঙ্কামুক্ত নয়। সেটা হলো ঘরে বসে বসে তাফসির পড়ে মুফাসসির হয়ে যাওয়া। এই পথটা শঙ্কামুক্ত নয়। ঝামেলামুক্ত না। সুতরাং কোনো আলেমে দীনের কাছ থেকে পবিত্র কুরআনে করীমের শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

মুসলমান ভাইয়েরা!

এতক্ষণ পর্যন্ত যে আলোচনা করেছি, তা দ্বারা একটি কথা সহজে বুঝা গেলো যে, আল্লাহর কুরআনকে বুঝতে হলে আলেমের শরনাপন্ন হতে হবে।

কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, একটা জিনিস আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে, সাধারণ মুসলমানদেরকে আলেমদের থেকে দূরে সরানোর ষড়যন্ত্র খুবই ‍বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলেমদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব তৈরি করার জন্য আমাদের দেশে হাজারো মিডিয়া কাজ করছে। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, তামাম দুনিয়ার মানুষ যদি আলেমদের বিরুদ্ধে যায়, আলেমদের কিছুই হবে না। তবে মুসলিম জাতি যদি আলেম থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে মুসলিম জাতির এমন ক্ষতি হবে, যা তামাম দুনিয়া এবং আখেরাতে শোধরানোর কোনো সুযোগ থাকবে না।

সম্মানিত উপস্থিত মুসলমান ভাইয়েরা!

দীর্ঘ আলোচনার পর একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আল্লাহ পেতে চাইলে, জান্নাতে যেতে চাইলে কুরআন অবশ্যই লাগবে। আর এই কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করতে চাইলে আলেম-ওলামার শরনাপন্ন হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। আল্লাহ পাক আমাদেরকে একথাগুলো বুঝার এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তওফিক দান করুন, আমীন। ওয়াল-হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

আলোচক: বিশিষ্ট খ্যাতিমান বক্তা ও মুফাসসিরে কুরআন

অনুলিখন: হামীদুল্লাহ

জামায়াতে দুয়াম

আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

 

[1] আল-কুরআন, সুরা আত-তাওবা, ৯:১১১

[2] মালিক ইবনে আনাস, আল-মুওয়াত্তা, দারু ইয়াহইয়ায়িত তুরাস আল-আরাবী, বয়রুত, লেবনান (প্রথম সংস্করণ: ১৪০৬ হি. = ১৯৮৫ খ্রি.), পৃ. ৮৯৯, হাদীস: ৩

[3] আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৩৯

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ