সৌদি আরব পৃথিবীর ২০০ কোটি মুসলমানের সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ। পবিত্র মক্কা ও মদীনা তীর্থস্থান (হারামাইন) হওয়ায় এ দেশের প্রতি প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ের বিশেষ টান বিদ্যমান। বিশ্বনবী রহমাতুল লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থান ও রওজা মুবারক এ দেশে অবস্থিত। রসুলুল্লাহ (সা.)-এর ২৩ বছরের নবুওয়তি জীবনের কর্মস্থল, দাওয়াত, জিহাদ, ইসলামী বিধি বিধানের বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রপরিচালনা সৌদি আরবকে ঘিরে আবর্তিত হয়। এ দেশে নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআনুল করীম। হাদীসে রসুলের চর্চার ক্ষেত্র ছিল এ পবিত্র ভূমি। বিপুলসংখ্যক সম্মানিত সাহাবী ও তাবেঈন এ দেশে ইসলামের বহুমাত্রিক খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। এখান থেকে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের মর্মবাণী। প্রতি বছর গোটা দুনিয়া থেকে লাখ লাখ ঈমানদার জনগোষ্ঠী পবিত্র ওমরাহ ও হজব্রত পালনের জন্য সৌদি আরব সফর করে থাকেন। অন্যান্য আরবদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বিগত চৌদ্দশ বছর ধরে এ পবিত্র ভূমির যারা শাসক ছিলেন বিশেষত খুলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া, আব্বাসীয়, সেলজুক, ফাতেমী ও উসমানীয় খলীফারা ইসলামী সংস্কৃতি, তাহজিব, তামাদ্দুন ও ঐতিহ্য লালন করেছেন। ১৯৩২ সালে বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে আল-সাউদ সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাদশাহ আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আজিজ (মৃত্যু ২০১৫ খ্রি.) পর্যন্ত ৮৩ বছর ধরে সৌদি আরব রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী, ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ ও বিভিন্ন এনজিওয়ের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে এবং এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও ল্যাটিন আমেরিকায় মসজিদ, কালচারাল কমপ্লেক্স নির্মাণ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সম্প্রীতি সমাবেশের আয়োজন করে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার চেষ্টার কমতি করেনি।
বাদশাহরা নিজেদেরকে পবিত্র দুই মসজিদের সেবক (খাদেমুল হারামাইন আশ-শারিফাইন) হিসেবে পরিচয় দিতে গৌরববোধ করতেন। পবিত্র মক্কা ও মদীনার মসজিদের সম্প্রসারণ, সৌন্দর্যবর্দ্ধন ও হাজিদের সুযোগ সুবিধা সম্প্রসারণে দৃশ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মদীনায় কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর ছাপিয়ে বিনামূল্যে হাজিদের মাঝে লাখ লাখ কপি বিতরণ করা হয়।
ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ ইবনে সালমান ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ নামে কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো ঘোষণা করেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে তেলের নির্ভরতা কমানো, অর্থনৈতিক অগ্রগতি তরান্বিতকরণ, তেলবিহীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নমনীয় ও অধিকতর সেক্যুলার ইমেজ বৃদ্ধি, জনসেবা খাতের উন্নয়ন তথা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো, বিনোদন, পর্যটন, বিনিয়োগসুবিধা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম উৎপাদনপূর্বক সামরিক খাতকে সমৃদ্ধকরণ। এর মাধ্যমে সৌদি তরুণ-তরুণীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নারীদের কর্মশক্তিকে কাজ লাগানো। বাহ্যত এ ভিশনের বেশকিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যেগুলোর ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার। বিশেষত চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্প কারখানা নির্মাণ ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রভৃতি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। এসব পরিবর্তন দুই-চার বছরে সম্ভব নয়, কয়েক দশকের প্রয়োজন। ভিশনের নেতিবাচক দিক মাত্রাতিরিক্ত ভীতিপ্রদ ও ঐতিহ্যপরিপন্থী।
সৌদি আরবে ঐতিহ্যগতভাবে চালু রয়েছে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ধর্মীয় বিধি-বিধান। বিচার ব্যবস্থায় রয়েছে শরিয়াহ আইনের প্রাধান্য। ‘নমনীয় ও অধিকতর সেক্যুলার ইমেজ’ বৃদ্ধি করতে গেলে সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সৌদি সরকার সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন ও বিনোদন খাতকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে জেদ্দা, রিয়াদ, জাজান, ইয়ানবু, আবহা, তায়েফ ও অন্যান্য শহরে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পপ সঙ্গীত, গীতিনৃত্য ও আধুনিক কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে এবং আরও আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সৌদি আরব ও অন্যান্য পার্শবর্তী আরবদেশের তরুণ-তরুণীদের উপচেপড়া ভীড় লক্ষ করা যায়। দুবাই, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মিলান, ন্যাপলস, ভেনিস ও প্যারিসের মতো সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে চায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। সেটা কতটুকু সম্ভব হবে বা করা গেলেও কতদিন টিকে থাকবে আগাম মন্তব্য করা বেশ কঠিন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রিয়াদের উপকণ্ঠে অনুষ্ঠিত হল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সঙ্গীত উৎসব। সাত লাখ দর্শক এমডিএলবিস্ট (MDLBeast)-এর সাউন্ডস্টর্ম ইভেন্টটিতে চার দিন ধরে অংশ নেন, ডিজেতে নৃত্য করেন এবং আমোদ ফুর্তিতে গা ভাসিয়ে দেন। উৎসবে নারী-পুরুষরা এমনভাবে মেলামেশা করেছেন যা সৌদি আরবে একসময় ছিল অকল্পনীয়।
আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুসারে, ভয়াবহ এক মরুঝড়ের কারণে সৌদি আরবে ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোরিয়ান পপ সঙ্গীতের একটি কনসার্ট বাতিল হয়েছে। তীব্র গতির এ বালুঝড়টি ঘণ্টায় ৩১ কি. মি. বেগে ধুলা-বালিসহ আঘাত হেনেছিল। সূর্যাস্তের পরেও সমগ্র শহরে বৃষ্টিপাত হয় এবং বিপুল ধুলা-বালিসহ বালুঝড় শুরু হয়। এ কোরিয়ান পপ কনসার্ট বাতিল হওয়ার এক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের জাজান প্রদেশে অর্ধনগ্ন নৃত্যের অনুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছিল দেশটির সরকার। ওই নৃত্যানুষ্ঠানে নারীরা অর্ধনগ্ন হয়ে ব্রাজিলের সাম্বা নৃত্য করেছিল। এ কোরিয়ান পপ কনসার্ট বাতিল হওয়ার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেক নেটিজেন বলেন, এ খারাপ আবহাওয়া ও বালুঝড় হলো অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আল্লাহর গজব (নয়াদিগন্ত অনলাইন, ১৭ জানুয়ারি ২০২২)।
২০১৮ সালে সৌদি আরব সিনেমার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পরপরই নতুন সিনেমা তৈরি, প্রদর্শন, প্রযোজনার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ইতোমধ্যে হলিউডি স্বপ্নের এ শিল্পে দেশটি ৬৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। পুরো দেশে ৩০০টি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে পবিত্র মদীনায় নির্মিত হবে দশটি। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম স্কলার বিচারপতি মুফতি তকি উসমানী এক টুইটবার্তায় লিখেছেন, ‘এ পরিবর্তনে আমি আহত হয়েছি। এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই।’
তেলের নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতির চাকা অন্যদিকে ঘোরানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। রাষ্ট্রীয় অর্থে শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আগামীতে খনিজ তেলমুক্ত বিশ্বে নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে সৌদি আরব দুই ট্রিলিয়ন ডলারের একটি সার্বভৌম তহবিল গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সৌদি তেলের মজুদ এখনই শেষ হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, সৌদি আরবে মাটির তলায় তেলের মজুদ রয়েছে প্রায় ২৬৮.৫ বিলিয়ন ব্যারেল। বিশেষ করে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশেই অধিকাংশ তেলের খনি অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, বিশ্বের মোট খনিজ তেলের পাঁচভাগের একভাগ মজুদ আছে শুধু সৌদি আরবের কাছেই। ঐতিহ্য ভঙ্গ করে বিনোদন, স্টর্ম কনসার্ট, পপ সঙ্গীত, ডিজে পার্টি, সিনেমা তৈরি ও প্রদর্শন এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে পাশ্চাত্যের অনুকরণ ‘ভিশন ২০৩০’ কী পরিমাণ সফলতা বয়ে আনে তা রীতিমত অনিশ্চিত ও চ্যলেঞ্জিং। সেক্যুলারিজমের বিকাশ ও পাশ্চাত্য কৃষ্টির প্রবর্তন সৌদিসমাজ কতটুকু গ্রহণ করে তা দেখার বিষয়। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার পালাবদল ও ভূরাজনীতির পরিবর্তন ঘটলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। সৌদি আরব ধর্মীয় কৃষ্টি ও উত্তরাধিকার ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, ২০০ কোটি মুসলমানের এটাই প্রত্যাশা ও আকুতি।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন