---

শতকের তুখোড় মনীষা আলেম আল্লামা খালেদ মাহমুদ (রহ.)

মুহাম্মদ নুরুল্লাহ

বিংশ ও একবিংশ শতকের আন্তর্জাতিক আলেমগণের মধ্যে পাকিস্তানের বিশিষ্ট আলেমে দীন চিন্তাবিদ, বহু কীর্তি ও যোগ্যতার অধিকারী আল্লামা খালিদ মাহমুদ (রহ.)-এর নাম উল্লেখ্য। তিনি একাধারে একজন আলেম, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলার ও দায়ী, গ্রন্থকার, সম্পাদক, সংগঠক, চিন্তাবিদ, বিতার্কিক, হাদীসবিশারদ, ধর্মতত্ত্ববিদ, সমাজ-সংস্কারক, সমাজসেবক, সুবক্তা ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ইত্যাদি পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল গত বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এবং সেই অব্যাহত কর্মক্লান্ত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলো আজ একুশ শতকের প্রথম প্রহরের পর। বিরাট কীর্তি ও যোগ্যতার অধিকারী এই মহান মনীষী সম্পর্কে লেখা বড় কঠিন ব্যাপার। তাঁর কর্ম ও গুণাবলির বর্ণনা দেওয়া খুব সহজ নয়।

তাঁর সমগ্র জীবনজুড়েই দেখা যায়, যুগশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞ মনীষীগণের তিনি খিদমত করেছেন। তাদের তত্ত্বাবধানে শিখেছেন। শেখা ও অর্জন করার পেছনে তাঁর মেহনত ছিল অকল্পনীয়। এবং সারাজীবন তিনি বিলিয়েছেন। তার হৃদয় ছিল তার শান্ত সৌম্য বিভাময় চেহরার মতোই বিরাট দীপ্তিমান।

ড. আল্লামা খালেদ মাহমুদ (১৭ অক্টোবর ১৯২৫-১৪ মে ২০২০ খ্রি.) এ শতকের একজন খ্যাতিমান হাদীসবেত্তা ও শরীয়া বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কর্মজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সুপ্রিমকোর্টের বিচারক ছিলেন। জন্মভূমি পাকিস্তান।

এই মনীষী আলেম ১৭ অক্টোবর ১৯২৫ সালে লাহোরের কুসুর নগরিতে জন্মলাভ করেন। তাঁর পিতার নাম পীর মুহাম্মদ গনী (রহ.)। ওই শহরে দারুল উলুম হানাফিয়া কসুর নামক মাদরাসায় শিক্ষা দীক্ষার হাতেখড়ি। এরপর অমৃতসর চলে যান। মাহমুদুল উলুম আল ইসলামিয়ায় শিক্ষা লাভ করেন। উসতায যাকারিয়া কান্দলভী (রহ.)-এর নিকট শিক্ষাগ্রহণ করেন। সেখানে মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করেন। তিঁনি ১৯৪৩-৪৪ সালে শায়খুল আরব ওয়াল আজম হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর কাছে দারুল উলুম দেওবন্দে হাদীসের পাঠ গ্রহণ করেন। এরপর হযরত মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.)-এর সঙ্গে ১৯৪৪ সালে জামিয়া ইসলামিয়া তালীমুদ্দীন ডাবেল (গুজরাট) চলে যান। সেখানে আবার দাওরায়ে হাদীস জামায়াতে অধ্যয়ন করেন। জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে যখন দাওরায়ে হাদীস খোলা হলো তখন মুফতি মুহাম্মদ হাসান (রহ.)-এর নির্দেশে আবার দাওরায়ে হাদীসের পাঠ গ্রহণ করেন।

ডাবেলে তিনি উস্তাদ হিসেবে আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা বদরে আলম মিরাঠী (রহ.), আল্লামা শামছুল হক আফগানী (রহ.), আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরী (রহ.) প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত মনীষীর সান্নিধ্য লাভ করেন।

তাঁর শিক্ষকগণের মধ্যে হযরত আল্লামা ইবরাহীম বোলয়াভী (রহ.), মাওলানা মুহাম্মদ হাসান (রহ.), শায়খুল কুল মাওলানা রসুল খান হাজারভী (রহ.), মুফতি শফী (রহ.), শায়খুল আদব এজাজ আলী (রহ.) ও মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শাহ আতাউল্লাহ বুখারী (রহ.), আবদুশ শাকুর লাখনোভী (রহ.) মুহাম্মদ আলী জালান্ধরী (রহ.), মাওলানা লাল হুসাইন আখতার (রহ.), মাওলানা আহমদ আলী লাহোরী (রহ.), হাকিমুল ইসলাম কারী তাইয়িব (রহ.), শাহ আবদুল কাদের রায়পুরী (রহ.) ও মাওলানা গোলাম গওস হাজারভী (রহ.) প্রমুখ বিজ্ঞ সাগরতুল্য আলেম থেকে শিখেছেন। তাদের সঙ্গে বাড়িতে ও সফরে থাকতেন, খিদমত করতেন।

১৯৭০ সালে বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি হতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। আরবি ভাষা, ফারসি ভাষা, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে মাস্টার্স করেন এবং আইন বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন।

হযরত মাওলানা আহমদ আলী লাহোরী (রহ.), মাওলানা মসিহুল্লাহ খান (রহ.) ও মাওলানা শাহ আবরারুল হক হারদুয়ী (রহ.)-এর হাতে পর্যায়ক্রমে তাসাউফের বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ মাওলানা মসিহুল্লাহ খান (রহ.)-এর খলীফা মাওলানা অসিউল্লাহ সাহেবের হাতে বায়আত হন এবং খিলাফত লাভ করেন।

হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া (রহ.) ও কারী তাইয়িব (রহ.)-এর মতো ব্যক্তিত্ব তাঁদের মজলিসগুলোতে তাঁর কিতাবের সূক্ষ্ম বিষয়াবলি আলোচনা করতেন।

কর্মজীবনে পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। জামিয়া ইসলামিয়া ম্যানচেস্টের পরিচালক ছিলেন। আধুনিক ফিকহি বিষয়াবলির সমাধানে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। ধর্মতত্ত্ব বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। খ্রিস্টবাদ, ইহুদিবাদ ও হিন্দু ইজম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ছিল তার। উলুমে শরীয়ায় শাস্ত্রীয় দক্ষতায় খ্যাত ছিলেন। ইলমে ফিকহ, হাদীস, মানতেক, মুনাযারা ইত্যাদি বহু বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল খ্যাতির ঊর্ধ্বে।

অনেক শরয়ী ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। আলেমগণের মধ্যে পাকিস্তানের বাইরে কর্মের ময়দানে তিনি সবচাইতে সক্রিয় ছিলেন। উপমহাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্যাপক অভিজ্ঞতা লাভের কারণে তাঁর দৃষ্টি ছিল অতি তীক্ষ্ম, বুদ্ধি ছিল খুবই ভারসাম্যপূর্ণ। বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বের দ্যুতনায় আধুনিক বিশ্বের নেতৃস্থানীয় আলেমরূপে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর দুর্লভ দার্শনিকতা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও উজ্জ্বল চিন্তা চেতনার কারণে আর দশজনের চাইতে তিনি বিশিষ্ট ছিলেন।

তাঁর ইলমি আমলি উচ্চতায় ও বিপুল অধ্যয়নের দিক বিচারে সারা পৃথিবীর শীর্ষ আলেমগণের মধ্যে ছিলেন অনন্য। বাতিল ফিরকার আমল আকিদা বিষয়ক অধ্যয়ন ও সেগুলোর রদ বিষয়ে তার দক্ষতা ছিল নযিরবিহীন। আহলে হক ও আহলে সুন্নাহর ওপর আরোপিত প্রশ্নের মুদাল্লাল মুযাইয়ান মাকুলি মানকুলি উত্তর প্রদান, দলিলের ওপর বসিরত, নকদ ও তাবসেরার যোগ্যতায় আহলে সুন্নাহর তরজুমান ছিলেন। বাতিলের উপস্থিত জবাব যেমন দিতে পারতেন তেমনি তাৎক্ষণিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইলযামি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বাতিলকে একেবারে লাজওয়াব করে দিতেন। বাহাস মুনাযারার আশ্চর্য জ্ঞান ছিল তাঁর।

আধুনিক যুগে তাঁকে এ বিষয়ক সালাফের সত্যিকার ভাষ্যকার গণ্য করা হতো। প্রখর মেধা, জ্বলন্ত প্রতিভা, প্রচণ্ড স্মৃতিক্ষমতা, স্থানোপযোগী যুৎসই দলিল প্রয়োগক্ষমতা ও উপস্থিত জবাব দানের দক্ষতায়, ইলম আমলের আত্মিক পবিত্রতা ও ব্যক্তিত্বের ওজস্বিতায় ঈর্ষণীয় মানুষ ছিলেন। সমকালীন আলেমগণের সাক্ষী অনুযায়ী ছিলেন গুণাবলির আধার আলেমে রাসেখ।

শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যে, চিন্তাগত আদর্শে ও জ্ঞানানুশীলতায় গণ্য হতেন হযরত নানুতাভী (রহ.)-এর ভাষ্যকার। সর্ববিচারে ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম। পৃথিবীর বিজ্ঞ আলেমগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন। অতীত ও আধুনিক শাস্ত্রসমূহে তাহকিকি অধ্যয়ন করেন। হকের তরজুমান ছিলেন। সুন্নাহর প্রচারক ছিলেন। আহলে সুন্নাহর ভাষ্যকার, ফিকহ ও সুন্নাহর সংকলক, প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতদের আরোপিত প্রশ্নের দাতভাঙ্গা ইলমি তাহকিকি জবাব দিতে এমন এক উচ্চতার শিখরে অধিষ্ঠিত ছিলেন যে, সে পর্যন্ত কম মানুষই পৌঁছুতে সক্ষম হয়। সারাজীবন ইলমের খিদমত ও দীনের প্রচারে ব্যয় করে গেছেন।

তাঁর দীনি ইলমি খিদমাত দ্বারা প্রাচ্য প্রতীচ্যের মানুষ উপকৃত হয়েছেন। সত্তরের দশক হতে ব্রিটেন বসবাস শুরু করেন। ইউরোপের মানুষ তাঁর ইলম দ্বারা বেশি উপকৃত হয়। সপরিবারে বিলেত থাকলেও কিছু সময়ের জন্য প্রতি বছর পাকিস্তান আসতেন।

ব্যাপক অধ্যয়নের ফুল ও ফসল তিনি ছাত্রদের কাছে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত করতেন। তাঁর আলোচনায় আত্মা ও বুদ্ধির খোরাক যেমন থাকতো তেমনি প্রচুর তথ্য থাকতো।

ষাটের দশকে পাকিস্তান হতে প্রকাশিত আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মুখপত্র সাপ্তাহিক দাওয়াত পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তাঁর বিজ্ঞ সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। পত্রিকাটি সম্পর্কে দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম হাকিমুল ইসলাম আল্লামা কারী তাইয়িব (রহ.) মন্তব্য করেন, দাওয়াত নামেও যেমন কাজেও তেমনি অসাধারণ পত্রিকা। দাওয়াত পত্রিকার রচনাশৈলী ও তাজা ইলমি অসাধারণ রচনাসূহের গ্রহণযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, এর তত্ত্বাবধান করেন আল্লামা খালিদ মাহমুদ সাহেব। আল-হামদু লিল্লাহ, এই পত্রিকা, তার ইলমি ও দীনি প্রবন্ধসমূহ এই ভয়ঙ্কর ফেতনার যুগে দীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার সহীহ ও ভারসাম্যপূর্ণ কণ্ঠস্বর বিবেচিত হচ্ছে।

তাঁর তত্ত্বাবধানে দাওয়াত পত্রিকার রসুলে করীম (সা.) সংখ্যা ১৯৬২, সিদ্দিকে আকবর (রাযি.) সংখ্যা ১৯৬২, ফারুকে আযম (রাযি.) সংখ্যা ১৯৬২, উসমান গনী (রাযি.) সংখ্যা ১৯৬৩, আলী মুরতাজা সংখ্যা, খাতামুন্নাবিয়্যিন সংখ্যা বের হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

আল্লামা আল্লাহওসায়া (রহ.) বলেন, একটা সময় দেশের কোনো দীনি প্রোগ্রামই আল্লামা খালেদ মাহমুদ সাহেব ছাড়া হতো না।

খতমে নবুয়ত আন্দোলনে ঝড়ের গতি দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৫৩ সালে তাঁকে জেলেও পুরা হয়েছিল এ কারণে। খতমে নবুয়ত লন্ডন নামক সংস্থাটিকে তিনি ব্যাপকতা দিয়েছিলেন। ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়েছিল তাঁর এই সংগঠন। প্রতি বছর কনফারেন্স হতো। তিনি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বক্তব্য রাখতেন। এবং আমাদের ধারণা এই মহামনীষী সত্তরের দশকে দেশ ত্যাগ করে পশ্চিমে পাড়ি দিয়েছিলেন এই ইসলামের শত্রু কাদিয়ানিদের ইসলাম বিকৃতিকে প্রতিহত করার জন্যই। কে না জানে পশ্চিমা বিশ্বে কাদিয়ানিরা আধিপত্য বিস্তার করে আছে এবং তাদের সেন্টারগুলোই ওই দেশগুলোতে বৃহৎ মসজিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের লাহোর শরয়ী আপিল কোর্টে তিনি কাদিয়ানি ইজমের রদে যে বক্তব্যগুলো দিয়েছিলেন তার লিখিতরূপ প্রকাশিত হয়েছে। জমিয়তে ওলমায়ে ইসলাম ব্রিটেন ও জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।

আতাউল্লাহ শাহ বুখারী (রহ.) তাকে নির্দেশ দিয়ে আকিদাতুল উম্মাহ ফি মা’না খাতমিন নুবুওয়া গ্রন্থটি লিখিয়েছিলেন। এরপর ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন যে, ‘যদি আছরের সময় কোনো বাতিল শক্তির জন্ম হয় আর আল্লামা খালিদ মাহমুদকে তা রদ করে পুস্তক লিখতে বলা হয় তাহলে মাগরিবের আগে তিনি এর বিরুদ্ধে দলিলসমৃদ্ধ গ্রন্থ লিখে দিয়ে দেবেন।’

সত্যিই তাঁর ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলি সম্পর্কে লেখা খুবই দুরূহ ব্যাপার। এত বিপুল প্রাচুর্যময় জীবন যা নবুয়তের ধারায় পরিপূর্ণ অকুল দরিয়ার মতো যা দুনিয়াজুড়ে প্রবাহিত।

তিনি আধুনিক ও প্রাচীন দর্শনের ওপরও প্রচুর অধ্যয়ন করেছেন। দেশে থাকাকালে শিয়ালকোট মিররি কলেজ, খানেওয়াল ডিগ্রি কলেজ, লাহোর এমএ কলেজ ইত্যাদিতে প্রফেসর হিসেবে ক্লাস করতেন। দীনি মাদরাসাসমূহে নিত্য যাওয়া আসা করতেন। বিভিন্ন জামিয়ায় পাঠদান করতেন। জামিয়া আশরাফিয়ায় বুখারী শরিফের পাঠদান করতেন। জামিয়া বিন্নুরী টাউনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারী ছাত্রদেরকে ধর্মতত্ত্ব পড়াতেন।

কলেজ ইউনিভার্সিটির ক্লাসগুলোতে তিনি দীনি ইলম ও দীনি মাদারেস সম্পর্কেও বক্তব্য রাখতেন। এসব বিষয়ে যেসব অমূলক ধারণা ও বিদ্বেষ প্রচলিত আছে তা খণ্ডন করতেন।

জীবনের দীর্ঘ সময় ব্রিটেনে বাস করলেও অনেকগুলো অঙ্গনে কাজ করেছেন এবং প্রত্যেক স্তরে নেতৃত্বস্থানীয় ছিলেন। মুনাযির ও বাহিস হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল।

তিনি ছিলেন দীনে ইসলামের উজ্জ্বল প্রদীপ। আন্দোলন, সংগ্রাম, দাওয়াত- আযিমাত, চিন্তা ও গভীরতায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা হচ্ছিল তখন জামিয়া আশরাফিয়ার শায়খের নির্দেশে তিনি সেখানে মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক (রহ.) পাঠদান করেন। তার সেই দরস ছিল ইলম ও মাআরিফে পরিপূর্ণ। তার ছাত্ররা শুধু আহলে সুন্না ওয়াল জামাআর আকিদাই শিখতো না বরং কুরআন সুন্নাহর দলিলের আলোকে যুগের সমস্যা সমাধানের কৌশলও শিখতো।

দীনের জন্য তাঁর সংগ্রাম ছিল তার রক্তের মতোই প্রবাহিত। তাঁর প্রয়াস ও সাধনা কখনো থেমে থাকতো না। যেকোনো বাতিল মতাদর্শ খণ্ডন করতেন অসাধারণ শৈলীতে, দলিলসমৃদ্ধ পন্থায়।

একবার সিনেমার ইতিবাচক দিক প্রচারের জন্য বড় ধরনের একটি সেমিনারের ব্যবস্থা করা হয়। তাঁকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি দাওয়াত গ্রহণ করেন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘সিনেমার আলোকিত (রওশন) দিক’। তাঁর যাওয়া নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুললেন। কিন্তু তিনি গেলেন। যথারীতি মঞ্চে উঠলেন। হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘যে জিনিস আলো বন্ধ করে দেখা হয় তার আবার আলোকিত দিক কোনটা?’ তার কথায় সমস্ত জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়লো ও দাঁড়িয়ে গেলো। তিনিও মঞ্চ থেকে নেমে চলে আসলেন। (সিনেমার পর্দায় যখন শো শুরু হয় তখন লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি সেদিকে ইঙ্গিত করে কথাটা বলেছিলেন। এবং একটিমাত্র বাক্য ব্যয় করে পুরো বিষয়ের অসারতা প্রমাণ করে চলে এলেন।)

জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের শায়খুল হাদীস ও মারকাজুল ইসলামির পরিচালক ছিলেন। কর্মজীবনে আরব বিশ্বের বড় আলেম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। শায়খ আসেফ হুসেন ফারুকি, মাওলানা ইউসুফ মুতালা প্রমুখের সহকর্মী তিনি।

সত্তরের দশকে মাতৃভূমি পাকিস্তান ত্যাগ করে সপরিবারে ব্রিটেন চলে যান। ওখানে থেকেই সারা বিশ্বে ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করেন। ইংল্যান্ডে ম্যানচেস্টার নগরির ইসলামী একাডেমি ও মসজিদুল মদীনার দুটি ইলমি ও দাওয়াতি ইদারা প্রতিষ্ঠা করেন।

দীনি কাজে পঞ্চাশোর্ধ্ব রাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন। খতমে নবুয়তের পয়গাম তিঁনি পৌঁছে দেন। এসব কাজে মাওলানা মনসুর আহমদ শিনয়াতাবি তার সহচর হয়েছিলেন। সত্তরের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকা খতমে নবুয়ত বিষয়ক একটি মামলায় ছয় মাস তিনি লড়েছিলেন। ওই অঞ্চলে দীর্ঘজীবন কাজ করেছেন। তিনি অনেক দাতব্য সংস্থা গড়ে তুলেন। গানা, গাম্বিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে তিনি দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এতিম ও দুস্থদের জন্য আশ্রায়ণ, স্বাস্থ্য সংস্থা ও খাদ্য রিজার্ভ ব্যাংক গড়ে তুলেন। এক্ষেত্রে তার আমিরিকান শিকাগো নিবাসী ছাত্র শায়খ মুহাম্মদ আমিন খালওয়াদি বিশেষ সহযোগী হয়েছেন। এই ছাত্র সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইলম ও মায়ারেফের একটি কিতাব আমি লিখেছি। যে পড়তে চায় তাকে নাম বলবো। সে মাওলানা মুহাম্মদ আমিন।’

সাহিত্য কীর্তি

ড. খালিদ মাহমুদ (রহ.) পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে খুলাফায়ে রাশেদিন ২ খণ্ড, মুতালায়ে বেরেলভিয়াত ১০ খণ্ড, Aathar ut downoadel, আছারুল হাদীস ২ খণ্ড, আছারুত তাশরি’ ২ খণ্ড, আছারুল ইহসান ২ খণ্ড,  মুকাদ্দামায়ে আসারুল ইসতিফসার, ফি মা’না খতমে নবুওত আওর মুতালায়ে কাদিয়ানিয়াত, আকিদায়ে খাইরুল উমাম ফি মাকামাতে ইসা ইবনে মারয়াম, আকিদাতুল আলাম ফিল ফারকি বাইনাল কুফরি ওয়াল ইসলাম, মিরজা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি আপনি সিয়াসাত আওর কিরদার কে আয়নে মেঁ, তাজাল্লিয়াতে আফতাব, শাহ ইসমাইল শহীদ, হুজ্জিয়তে হাদীস, ইসলাম এক নযর মেঁ, শাজারায়ে ইলমি ইমাম আবু হানিফা, শাজারায়ে মুহাদ্দিসিনে দিল্লি, শাজারায়ে ওলামায়ে দেওবন্দ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

তিনি ১৪ মে ২০২০ যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে ইন্তেকাল করেন। রমাযান মাস ছিল। তাঁর জানাযার গোসলের সময় লোকেরা দেখতে পায়, তার তর্জনী উপরের দিকে উঠানো ছিল। ধারণা করা হয়, কালেমায়ে শাহাদাত পড়ার সময় তিনি তর্জনী আকাশের দিকে তুলেছিলেন।

তার মৃত্যুতে শুধু ইউরোপের মুসলমানদের হাহাকার শুরু হয়নি উপমহাদেশেও আহলে ইলম ও দীনি হালকাসমূহে শোকের আবহ বিরাজ করেছে।

তিনি সুদীর্ঘ হায়াতে বিরাট ইলমি কীর্তি গড়ে তুলেন। হকের কালিমা বুলন্দ করার জন্য আমরণ সংগ্রাম করেন। তাঁর এই খিদমাত ও সংগ্রাম আগামী শতকে পৃথিবীর মানুষকে পথ প্রদর্শন করবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ তাঁর সমস্ত কীর্তির সর্বোত্তম বিনিময় আখিরাতে দান করুন।

সূত্র: বিভিন্ন আরবি, উর্দু সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকার কলাম

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ