শনিবার-২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি-১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্য কিছু কথা

শায়খুল ইসলাম মুফতি তকী উসমানী

[গত ১১ সফর ১৪৪৩ হিজরী, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের সভাপতি নির্বাচনের এজলাস হয়৷ সে এজলাসে হযরত ফযলুর রহমান সাহেব হাফিযাহুল্লাহ সদরে বেফাকের জন্যে হযরত তকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহর নাম পেশ করেন৷ পেশ করা মাত্রই হানীফ জালান্ধারী হাফিযাহুল্লাহসহ উপস্থিত সকল ওলামায়ে কেরাম এক বাক্যে তকী সাহেবের নাম পেশ করেন৷ এরপর শায়খুল ইসলাম তকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহকে সর্বসম্মতিক্রমে বেফাকের সভাপতি নির্ধারণের ঘোষণা করা হয়৷ সকলেই আল-হামদু লিল্লাহ বলেন৷ শায়খুল ইসলাম হাফিযাহুল্লাহকে সভাপতি নির্ধারণের পর, হযরত উপস্থিত ওলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে যে বক্তব্য প্রদান করেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তথ্যসমৃদ্ধ৷ গুরুত্বের প্রতি লক্ষ করে পাঠক মহলের সম্মুখে তা পেশ করা হল৷ দোয়া করি আল্লাহ হযরতের মাধ্যমে বেফাকের তরাক্কী নসীব করুন৷ আমাদের ওপর তাঁর ছায়া দীর্ঘায়িত করুন৷  উল্লেখ্য, গত ১ জুলাই ২০২১ বেফাকের সভাপতি, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নূরীটাউনের মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস ড. আবদুর রাযযাক ইস্কান্দার ইন্তিকাল করেন৷ ইন্তিকাল পূর্ব পর্যন্ত হযরত সদরে বেফাক ছিলেন৷ মৃত্যুর এই আজকের তারিখ পর্যন্ত এই পদ খালি ছিল৷ আজ হযরত শাইখুল ইসলাম তকী উসমানী হাফিযাহুল্লাকে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণ হল৷ (যুবাইর হানীফ)]

হামদ, সানার পর

হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান (দা. বা.), হযরত মাওলানা নূরুল হক সাহেব মুদ্দাজিল্লুহু, মাওলানা হানীফ জালন্ধারী হাফিযাহুল্লাহ ও উপস্থিত সকল আকাবির ওলামায়ে কেরাম,

السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

আমার জীবনে অনেক বড় বড় কনফারেন্সে কথা বলার সুযোগ হয়েছে৷ মাইকের সামনে এসে নিজের অক্ষমতার কথা খুব কম জাগায়ই অনুভব হয়েছে৷ পুরো জীবনে হাতেগোনা মুষ্টিমেয় কয়েক জায়গা হবে হয়ত৷ আজকের এ মাজলিসে কথা বলাও সেসব অক্ষমতা অনুভবের মাজলিসগুলোর একটি৷

আপনারা যে মহাব্বত ও সম্মানের মাধ্যমে আমার প্রতি সুধারণা ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ করেছেন তার জন্যে আমি আপনাদের ও আল্লাহ তাবারাকা ওয়াতালার কীভাবে শুকরিয়া আদায় করব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না৷ কেননা এর পূর্বে আমার অনেক বৈশ্বিক ফিকহি সংস্থা পরিচালনার সুযোগ হয়েছে৷ এখনও বিভিন্ন সংস্থার পরিচালক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি৷ কিন্তু আজ আপনারা আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন তা শুধু সম্মান নয় বরং অনেক বড় ভারী জিম্মাদারী৷ এ জন্যে আমি আল্লাহ তাআলার দরবারে অক্ষমতার সাথে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি আর দোয়া করছি যেন আপনাদের এ সুধারণা আমার মাধ্যমে পূরণ করেন৷

দারুল উলূম দেওবন্দ ও সুন্নাতের অনুসরণ

আমি পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশে সফর করেছি৷ সেসব দেশুলোকে কাছ থেকে দেখেছি৷ বিশেষ করে মুসলিম কান্ট্রিগুলো, দুয়েকটা ছাড়া সবগুলিতে সফর করেছি৷ সেখানকার ওলামায়ে কেরাম ও আহলে ইলমদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্যে সফর করেছি৷ আমি তাদের সাথে বসেছি, এখনও বসি, একসাথে চলেছি, এখনও চলি, সফর করি৷ তাদের সাথে এখনও কথাবার্তা অব্যহত আছে৷ থাকবে ইনশা আল্লাহ তাঁদের জীবন ইতিহাস পড়েছি৷ শুধু এক দুই রাষ্ট্রের নয়, অনেক ইসলামি রাষ্ট্রের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস পড়েছি৷ শুধু পড়িনি বরং তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেছি৷ সে জীবন ইতিহাস অধ্যয়নে এমন এমন ক্ষীণজন্মা, মহীরুহ ইলমি ব্যক্তিত্বকে পেয়েছি যাদের তুলনায় নিজেকে মক্তবের শিশুর মতো মনে হয়৷ তাঁদের গবেষণার সামনে নিজেকে অতি নগণ্য মনে হয়৷

এসব কিছুর পরও কুরআন-সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা এবং সুন্নাহ অনুসরণের যে আগ্রহ , উদ্দীপনা দারুল উলূম দেওবন্দ ও তার শাখা-প্রশাখাগুলিতে দেখেছি; দারুল উলূম দেওবন্দ সুন্নাহ অনুসরণের যে মডেল বিশ্বের আনাচে-কানাচে পেশ করেছে৷ তার দৃষ্টান্ত পুরো মুসলিম বিশ্বের অন্য কোন গবেষণাগার বা প্রতিষ্ঠানে আমি দেখিনি৷

দেওবন্দের সন্তান ও নম্রতা

যদি গবেষণা, তাহকীক ও প্রবন্ধ লেখার প্রতিযোগিতা হয় যে, কে কত সুন্দর করে লিখতে পারে, কত নিখুঁতভাবে প্রবন্ধ-নিবন্ধ তৈরি করতে পারে, তাহলে তারাই উত্তীর্ণ হবে, বিজয় লাভ করবে৷ এতে কোন সন্দেহ নেই৷ কিন্তু যদি দীনকে আকড়ে ধরা, নিজেদের মাঝে সুন্নাহর বাস্তবায়ন করা কিংবা দীনের জন্যে নিজের জান, মাল কুরবান করার প্রতিযোগিতা হয় তাহলে নিশ্চিত ওলামায়ে দেওবন্দ সর্বাগ্রে থাকবে৷ ‘জান, মাল কুরবান করা’ ওলামায়ে দেওবন্দের সাধারণ অভ্যাসগুলোর অন্যতম৷

আমার মারহুম পিতা হযরত মুফতি শফী (রহ.) ওলামায়ে দেওবন্দের ব্যাপারে সবসময় এ কথা লিখে থাকতেন , আমি আকাবিরদের যে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেছি তা হল, একদিকে তাঁরা ইলম ও মারেফাতের বটবৃক্ষ ও পাহাড় সমতূল্য, অন্যদিকে দীনের জন্যে নিজেদের জান, মাল, ইজ্জত-সম্মান কুরবান করতে সদা প্রস্তুত ৷ নিজেদের কিছুই মনে করতেন না৷ একদম সাদাসিধে মানুষের মতো চলা-ফেরা করতেন৷ কখনও কাউকে বুঝতে দিতেন না যে তাঁরা ইলমের জাহাজ, যুগের মহীরুহ ব্যক্তিত্ব!

আব্বাজান (রহ.) অনেক রাষ্ট্রে সফর করেছেন৷ কিন্তু তিনি তাঁর জীবনের সে সব সফরের আলোচনা করতে গিয়ে বলতেন,

تو لائے مردان ایں پاک بوم
برانگختم خاطر از شام و روم

কতক মহামনীষীদের সংশ্রব আমার দিল থেকে সিরিয়া, প্যারিসের মতো দুনিয়ার বড় বড় সবকিছুর লোভ-লালসা দূর করে দিয়েছে।

একটু ভেবে দেখুন! বিশ্বে বড় বড় রাষ্ট্র সফর করে নিজের ব্যাপারে এ মন্তব্য করেছেন৷ অথচ যুগের মুফতি আযম তিনি৷ এমনি ছিলেন আমাদের আকিবরে দেওবন্দ৷ তাঁদের মাঝে দুনিয়ার কোন লোভ, লালসা ছিল না৷ দুনিয়াতে বসে আখেরাতের ফিকির ও সুন্নাতের অনুসরণ করাই একমাত্র অবলম্বন ছিল৷

এটা আমাদের ওলামায়ে দেওবন্দের প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ দয়া ও অনু্গ্রহ৷ কিছুক্ষণ পূর্বে মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব ও মাওলানা হানীফ জালন্ধারী সাহেব বলেছেন যে, আল্লাহ তাঁআলা এ জামাতকে এ কাজের জন্যে এমনি এমনি নির্বাচন করেননি৷ বস্তুত তাঁদের নিষ্ঠা, নম্রতা ও একাগ্রতার কারণে এ মর্যদা দান করেছেন৷

عن أبي هريرة: «من تواضعَ للهِ رفعَه الله». أخرجه الطبراني في «المعجم الأوسط» (٧٧١١)، والبيهقي في «شعب الإيمان» (٨١٤٤) مطولاً، وأبو نعيم في «حلية الأولياء» (٨/٤٦) واللفظ له.

আর এ নম্রতা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ওলামায়ে দেওবন্দের বিশেষ্টগুলোর অন্যতম৷

বেফাকুল মাদারিস

আমি তো বলি যে, ‘বেফাকুল মাদারিস’ আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নেয়ামত৷ এটা এমন একটি ছাদ যার নিচে ছায়ায় বসে আমরা দুনিয়ার সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু একটি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র একত্রিত হই৷ কীভাবে দীনী মাদরাসাসমূহের হেফাজত করা যায়৷ কীভাবে কওমি মাদরাসাগুলো সকল ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকবে, ছাত্রদের উন্নতি কীভাবে হবে৷ সামনে পদক্ষেপ কেমন হওয়া উচিৎ ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আমাদের একত্রিত হওয়া৷ দুনিয়াবী কোন পদমর্যদা বা লোভ-লালসা নয়৷

একটি অবিস্মরণীয় বিজয়

আল্লাহ তাআলা বর্তমান সময়ে আফগানী তালেবানের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল শক্তিকে এভাবে লজ্জিত ও অপদস্থ করেছেন, যার দৃষ্টান্ত আমার জানা মতে ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া মুশকিল৷ ব্রিটিশদের সময় থেকে এ চক্রান্ত চলে আসছে ‘কীভাবে আফগান দখল করা যায়৷’ ব্রিটিশরা পূর্বে ‘সুপার পাওয়ার’ ক্ষমতার অধিকারী ছিল৷ তারাও আফগানীদের সাথে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল কিন্তু পাহাড়ের সাথে টক্কর খেয়ে চূর্ণ- বিচূর্ণ হয়ে গেছে৷ তারা সাহস পায়নি দীর্ঘদিন যুদ্ধ করার৷

এ আফগানিস্তানে ব্রিটেন, রাশিয়ার এজেন্ডা ছিল৷ তাদের পতনের পর অবশেষে আমেরিকারও এজেন্ডা ছিল৷ তাদের সকলেরই এক বক্তব্য ছিল যে, ‘মোল্লাদেরকে পাহাড়ি এ উর্বর এলাকা থেকে বের করে দাও৷’ কিন্তু এই মোল্লারা ঈমানী চেতনায় এত সুদৃঢ় ও পরিপক্ক ছিল যা বলার অপেক্ষা রাখে না৷

মাত্র ৪০, ৫০ হাজার আফগান যোদ্ধাদের হাতে পঞ্চাশটিরও বেশি রাষ্ট্রের লাখ লাখ সৈন্যরা এভাবে পরাজয় ও লাঞ্চিত হয়েছে, যা দেখে আজ সারা বিশ্ব চিৎকার করছে!

বিশেষ করে ভারতের রেডিও বা কোনো চ্যানেলের সংবাদ শুনলে বুঝতে পারবেন৷ আজ তাদের চিৎকার আকাশ পর্যন্ত পৌঁছছে৷ তাদের ভয়ের কোন ইয়ত্তা নেই৷ ‘তালেবান এসে গেছে’, ‘তালেবান এসে গেছে’৷ আমাদের কী হবে! এ ধরণের শ্লোগান দিয়ে হা হুতাশ করছে৷ তাদের হা হুতাশ ও চিন্তার কোন শেষ নেই৷

তারা মোল্লাদের বের করতে এসেছিল, আল্লাহর অনুগ্রহে মোল্লারা তাদেরকে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, আল-হামদু লিল্লাহ ৷

আল্লাহ তাআলা এই ইজ্জত ও সম্মান চাটাইয়ে বসে জীবন যাপনকারী মোল্লাদের দান করেছেন৷ তাদেরকে এ দান এমনি এমনি দেননি৷ এর পেছনে বিশ বছরের ঐতিহাসিক মেহনত ও শ্রম রয়েছে৷ জান, মাল, সম্পদ, সম্মান, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন কুরবানি দেওয়ার পর এই সম্মান লাভ করেছে৷

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تَنْصُرُوا اللّٰهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ اَقْدَامَكُمْ۰۰۷

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করলে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে সুদৃঢ় রাখবেন৷ (মুহাম্মদ: ৭)

আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াতের স্পষ্ট অলৌকিক ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছেন৷

‘বেফাক’ হল শিক্ষার পাশাপাশি দীক্ষারও প্রতিষ্ঠান 

আমার প্রিয় ভাইয়েরা! বেফাক তো হলো মূলত শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম৷ কিন্তু এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান যা মানুষকে বাস্তব মানুষের রূপ দেয় ৷ শিক্ষা দানের পাশাপাশি দীক্ষার প্রতিও যত্নশীল৷ ‘বেফাক’ মানুষের মাঝে সে ঈমানী আত্মা সঞ্চার করে, যে ঈমানী আত্মা মুহাম্মদ (সা.)-এর শরীর থেকে বের করার জন্যে সকলেই চক্রান্ত করেছিল, কিন্তু পারে নি৷ সে রূহে মুহাম্মদী তৈরি করার প্রতিষ্ঠান এটি৷

বেফাকের বিরুদ্ধে চক্রান্তসমূহ

আজ একদিকে তো আল্লাহ তাআলা দেখিয়ে দিয়েছেন মোল্লা কী জিনিস! অপর দিকে সাদা চামড়ার ইংরেজরা আজও এ চক্রান্তে লিপ্ত যে, কীভাবে এ মোল্লাদের পাকিস্তান থেকে বের করা যায়৷ তার জন্যে বিভিন্ন ধরণের চক্রান্ত, পরিকল্পনা ও ফন্দি এঁটে রেখেছে৷ সর্বদা ইসলামের বিরুদ্ধে পরাশক্তিগুলোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল ডিভাইড এন্ড রোল পলিসি৷

তাদের কোন নিয়ম-নীতি হয় না, কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী হয় না৷ তাদের মূলনীতি হল ডিভাইড এন্ড রোল পলিসি৷ মুসলমানদের মাঝে পরস্পর ফাটল তৈরি করে ক্ষমতার মসনদ দখল করা৷ তার কিছু চিত্র আমাদের বেফাকের মধ্যে রয়েছে, যার প্রতি হযরত ফজলুলর রহমান সাহেব (দা. বা.) ও মাওলানা হানীফ জালান্ধারী হাফিযাহুল্লাহ কিছুটা আলোকপাত করেছেন৷

চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা কীভাবে হবে?

আমারা বহু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন৷ চ্যালেঞ্জেগুলো থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আমাদের এখনি ভাবতে হবে৷ সেগুলো নির্মূল ও প্রতিহত করতে হবে৷ আমাদের সেসব চ্যালেঞ্জের মুকাবিলা-প্রতিহত করা দুটি জিনিসের মাধ্যমে সম্ভব৷

  1. আমাদের একতার মাধ্যমে৷ নিজেদেরকে সুদৃঢ় প্রাচীরের ন্যায় শক্ত ও অবিচল রাখা যাতে আমাদের মাঝে বাইরের কোন শক্তি ফাটল তৈরি করতে না পারে৷ এই একাত্বতাই আমাদের উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছাবে, ইনশা আল্লাহ।
  2. দ্বিতীয় বস্তু হল, যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের আকাবিরে দেওবন্দ শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছেন৷ তা ঠিক রাখা৷ আমাদের এ শিক্ষা সিলেবাসের মাকসাদ কী? এ সিলাবাস থেকে আকাবিরদের চাহিদা কী ছিল৷ তা কতটুকু পূরণ হচ্ছে, কী কী করা দরকার সে চাহিদা ফিরিয়ে আনতে, ইত্যাদি বিষয়ে খুব মনোযোগী হওয়া৷

দারুল উলূম দেওবন্দের বিশেষ বৈশিষ্ট্য

আমার এখনও স্মরণ আছে যে, মিসরের এক বড় আলিম দারুল উলূম দেওবন্দ পর্যবেক্ষণে আসেন৷ দেওবন্দ এসে ভালোভাবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেন৷ তখন আকিবিরে দেওবন্দের অনেকেই জীবিত ছিলেন৷ ফিরে যাওয়ার প্রক্কালে আকাবিদের সম্মুখে যে মন্তব্য করেছেন তা নিম্নরূপ: ‘আমি এমন এক প্রতিষ্ঠান দেখেছি যেখানে দিনভর قال الله، قال الرسول-এর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় আর রাতভর প্রতিটি রুম থেকে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও অক্ষমতা প্রকাশের আওয়াজ গুঞ্জিত হয়।’ এ মন্তব্য যেন সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে করা এক অমুসলিমের মন্তব্য৷ ইয়ারমুকের যুদ্ধে এক অমুসলিম গোপনে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাযি.)-এর সৈন্যদলের অবস্থা পর্যবেক্ষণে এসেছিল৷ সে অমুসলিম যখন নিজ এলাকায় ফিরে যায়, তখন তার সম্প্রদায়ের প্রধান তাকে জিজ্ঞেস করল, মুসলমানদের কেমন পেলে? উত্তরে সে বলেছিল,

إنهم رهبان بالليل فرسان بالنهار.

‘রাতে গিয়ে যদি দেখতে যাও তাদেরকে সন্যাসীর মতো ইবাদতে মগ্ন পাবে৷ দিনের বেলায় দেখতে গেলে তাদেরকে রণাঙ্গনের বীরসেনার মতো পাবে।’

আল্লাহ তাআলা এ ইখলাস, লিল্লাহিয়াত, আল্লাহর প্রতি মনোনিবেস ও ভয়ের ওপর আমাদের মাদরাসাগুলোর ভিত্তি রেখেছেন৷

তার ফলে আল্লাহ তাআলা সেখান থেকে এড় বড় বড় হাস্তিদের সৃষ্টি করেছেন যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া মুশকিল৷ তো আমি বলতে চাচ্ছিলাম যে, ইন শা আল্লাহ মাদরাসা বিশ্বের কোন শক্তি মাদরাসাসমূহ বন্ধ করতে পারবে না৷ যদি শেষ হয় আমাদের কারণে শেষ হবে৷ আমরা আকাবিরদের পথ থেকে দূরে সরে গেলে কিংবা আমাদের ভেতর ইখলাস ও লিল্লাহিয়াত না থাকলে৷

হযরত রফী উদ্দীন (রহ.)-এর খোদাভীতি

তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম ছিলেন৷ প্রতি বছর মাদরাসার কালেকশানে তিনি দিল্লী যেতেন৷ ‘তিনশ রুপি’ কালেকশান করে নিয়ে আসতেন৷ তখনকার তিনশ রুপি এখনকার তিন লাখ টাকার কাছাকাছি৷

এক বছর কালেকশানের পর সে ‘তিনশ রুপি’ চুরি হয়ে যায়৷ তখন হযরত পুরো সম্পত্তি বিক্রি করে দারুল উলূমের ফাণ্ডে দিয়ে দিতে চাইলে কর্তৃপক্ষের অন্যান্যরা দেখে বলে যে, হযরত! আপনার ওপর তো ক্ষতিপূরণ আসবে না, আপনি পূর্ণ সতর্কতার সাথে আমানত রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন৷ কিন্তু চুরি হয়ে যাওয়া তো আপনার ইচ্ছের বাইরে ছিল৷ তখন হযরত উত্তরে বললেন, না৷ আমি মাদরাসার ফান্ডে জায়গা জমি বিক্রি করে হলেও ওই কালেকশানের টাকা পরিশোধ করব৷

হযরতের এ উত্তর শুনে দারুল উলূম দেওবন্দের লোকজন হযরত রশীদ আহমদ গঙ্গুহী (রহ.)-কে পুরো ঘটনা বর্ণনা করে এ মর্মে চিঠি পাঠান যে, হযরতকে যেন তিনি নিষেধ করা হয় সম্পত্তি বিক্রি করতে এবং দারুল উলূমে পয়সা না যেন দেয়৷ অন্যথায় তার নিকট কিছুই থাকবে না৷ হযরত গঙ্গুহী (রহ.) তখন দারুল উলূম দেওবন্দের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন৷

কর্তৃপক্ষের চিঠি পেয়ে হযরত গাঙ্গুহী (রহ.) উত্তরে লিখেন, মাওলানা! আপনার ওপর কোন ক্ষতিপূরণ আসবে না৷ আপনি এর জন্যে কষ্ট করবেন না৷

হযরত রফী উদ্দীন (রহ.) এ চিঠি পেয়ে বললেন, মৌলভী রশীদ আহমদ মনে হয় পুরো ফিকহ আমার জন্যেই পড়েছে, আমার জন্যেই পড়েছে৷ (কয়েকবার বলছেন) আমি তাকে বলব, তুমি নিজের বুকে হাত রেখে দেখো, যদি তোমার সাথে এমন ঘটনা ঘটত তাহলে তুমি কী করতে? অবশেষে জমি বিক্রয় করে সে রুপী মাদরাসার ফান্ডে জমা করেই দেন৷

হযরত রফী উদ্দীন (রহ.)-এর তাকওয়া

হযরত (রহ.)-এর একটি গাভী ছিল৷ মাঝে মাঝে বিকেল বেলায় বিচরণের জন্যে চারণভূতিতে নিয়ে যেতেন৷ একদিন বিকালে দফতের কোন কাজ ছিল৷ গাভী নিয়ে মাঠ থেকে আসার পথে মাদরাসার আঙিনায় গাভীটি রেখে দফতরে কাজে যান৷ ইত্যবসরে দারুল উলূমে একজন শেখপুত্র আসল৷ (তখনকার সময়ে শেখপুত্রদের খুব প্রভাব থাকত, যাচ্ছেতাই বলত) শেখপুত্র গাভীকে মাঠে দেখে মন্তব্য করতে দেরি করল না৷ বলা শুরু করল, আচ্ছা, এখন তাহলে ‘দারুল উলূম’ মুহতামিম সাহেবের গোয়ালঘরে পরিণত হবে৷ মাঠে গাভী দাঁড় করিয়ে রাখল কেন! এ কথা বলে চিৎকার শুরু করল৷ তাকে লোকজন বোঝানোর চেষ্টা করল যে, মাত্র রাখা হয়েছে৷ সে কোনভাবেই মানতে রাজি নয়৷ ইতোমধ্যে হযরত মুহতামিম সাহেব (রহ.)-এর কানে খবর পৌঁছালে হযরত এসে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে? উত্তরে বলা হল, এই লোক বলাবলি শুরু করছে যে, মুহতামিম সাহেব নিজের গরু মাঠে দাঁড় করিয়ে রেখেছে৷ মাদরাসাকে গোয়ালঘর বানিয়ে ফেলছে, মাঠ নষ্ট করছে!

হযরত কথাগুলো শুনে তাকে বললেন, ভাই আপনি ঠিক বলছেন৷ আমার ভুল হয়েছে৷ ভাই! গাভীটি আপনি নিয়ে যান৷ এ ভুলের মাশুল হল, আপনি এটি নিজে নিয়ে যান৷ আপনাকে এটি দিয়ে দিলাম৷ নিয়ে যান৷ সে আল্লাহর বান্দা এমন ছিল, হুজুর বলা মাত্র গাভীটি নিয়ে চলে গেল৷

আকাবিরদের পথে চলার মাঝেই সফলতা 

এমন মুখলিস, মুত্তাকী, নিষ্ঠাবান আকাবির হযরতগণই দারুল উলূম দেওবন্দের মতো ইলমের দূর্গ তৈরি করেছেন৷ দেওবন্দের মতো ছোট্ট একটি অজোপাড়া গাঁয়ে বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন৷ আজ আমরা সকলেই সে ছোট্ট গ্রামের প্রতি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আনন্দ বোধ করি৷ এটি আকাবিরদের ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতের বরকতেই হয়েছে৷

মুআমালাত, টাকা-পয়সার লেনদেন এক স্পর্শকাতর জিনিস৷ টাকা পয়সা লোভ এমন এক মোহ যা মানুষকে ধ্বংসের মুখে পর্যন্ত ঠেলে দেয়৷ আল্লাহ আকাবিরে দেওবন্দেকে এই মহা ব্যাধি থেকে রক্ষা করেছেন৷ কেয়ামত পর্যন্ত করুন সেই প্রত্যাশা৷

আল্লাহর রহমতে আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআন, সুন্নাতকে আকড়ে ধরব, আকাবিরদের পথে নিজেদের পরিচালিত করব ইনশাআল্লাহ কোন শক্তি মাদরাসাসমূহেকে নিঃশেষ করতে পারবে না৷ আল্লাহর নিকট দোয়া করি যেন তিনি আমাদেরকে আকাবিরদের পথে অবিচল, অটল থাকার তাওফীক দেন৷

আপনারা এই অক্ষম বান্দার ওপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পন করেছেন, দোয়া করুন আল্লাহ যেন আমাকে তার মর্জিমতো সঠিক পদ্ধতিতে আঞ্জাম দেওয়ার তাওফীক দেন৷

আল্লাহ তাআলা আপনাদের সকলের সাহায্য করুন৷ সকলের নেক মাকসাদ পূর্ণ করুন৷ সকলকে দীনী মাদরসাসমূহে এখলাসের সাথে খেদমত করার তাওফীক দিন৷

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

সংকলন: যুবাইর হানীফ

শিক্ষক, ইফতা বিভাগ, জামউল ফাতাওয়া

আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ