নামাযের এতো গুরুত্ব কেন?
ডা. ফিরোজ মাহবুব কামাল
যে ইবাদতটি অমুসলিম থেকে মুসলিমকে পৃথক করে তা হলো নামায। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে নামায কাফের ও মুসলিমের মাঝে দেয়ালরূপে কাজ করে। নামায না থাকলে মুসলিম আর অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্যই থাকে না, উভয়ে একাকার হয়ে যায়। ব্যক্তির ঈমান দেখা যায় না। রোযাও দেখা যায় না যদি না সে নিজে থেকে তা প্রকাশ করে। তেমনই কে যাকাত দেয়, সেটিও বোঝা যায় না যদি না সে ব্যক্তি অন্যদের জানিয়ে দেয়। আর হজ তো সবার জন্য ফরজ নয়; ফলে হজ না করাতে কেউ অমুসলিম হয় না। কিন্তু নামায দেখা যায়। কারণ নামাযে যে শুধু দৃশ্যমান ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা ও বৈঠক আছে তা নয়। নামায পড়তে হয় লোকালয়ের মসজিদে হাজির হয়ে। ঘরে বা দোকানে নামায পড়লেও তা অন্যদের নজরে পড়ে। তাই কে নামাযী আর কে বেনামাযী সমাজে সেটি গোপন থাকে না। অপর দিকে নামাযই ব্যক্তির ঈমানের পরিমাপ দেয়; মুসলিম না অমুসলিম সেটি প্রকাশ করে দেয়। প্রতিদিনের প্রশিক্ষণে যদি কোন সৈনিক হাজির না হয় তবে সৈনিকের খাতায় তার নাম থাকে না। সেনাবাহিনী থেকে সে বহিস্কৃত হয়। তেমনি মসজিদের জামায়াতে যে ব্যক্তি হাজির হয় না তাকেও কি মুসলিম বলা যায়? মসজিদে ৫ ওয়াক্ত নামাযে নিয়মিত হাজির হওয়ার সামর্থ্য মুনাফিকদের থাকে না বিশেষ করে ফজর ও এশার নামাযে। ফলে কে মুনাফিক সেটিও প্রকাশ পায় নামাযে অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে।
হৃদয়ে ঈমান প্রবেশ করলে, সে ব্যক্তির জীবনে নামায-রোযা আসবেই। আগুন থেকে যেমন তার উত্তাপকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ঈমানদার থেকে পৃথক করা যায় না তার নামাযকে। হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যে ইবাদতের হিসাব নেবেন সেটি হলো নামায। সুরা মুলকে বলা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞাসা করা হবে তোমরা কীরূপে এখানে পৌঁছলে? সর্বপ্রথম যে কারণটিকে তারা উল্লেখ করবে তা হলো, তারা নামায পড়তো না। নামাযের মূল্য বেনামাযীগণ ইহকালে না বুঝলেও বুঝবে জাহান্নামে প্রবেশের পর। জাহান্নামবাসীদের সে বেদনাদায়ক উপলব্ধিকে মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সেটি মূলত যাদের জীবনে এখনো মৃত্যু আসেনি তাদেরকে সাবধান করতে। জাহান্নামে পৌঁছার আগেই তারা যেন বুঝতে পারে নামাযের গুরুত্ব। নইলে জাহান্নামে পৌঁছে শুধু আফসোসই হবে, করার কিছু থাকবে না। কুরআন মজীদ মানবজীবনের রোডম্যাপ। এ রোডম্যাপ শুধু জান্নাতের পথই দেখায় না, সামনে অপেক্ষমাণ জাহান্নামের বিপদের কথাও বলে।
কীরূপে ব্যর্থ হয় নামায?
চিনিকলে আঁখ চিনিতে পরিণত হয়। সেরূপ না হলে বুঝতে হবে চিনিকলে ত্রুটি রয়েছে? নামাযের মধ্যেও তেমনি একটি প্রক্রিয়া কাজ করে যা পরিশুদ্ধি আনে ব্যক্তির জীবনে। সে পরিশুদ্ধি না এলে বুঝতে হবে নামাযে ত্রুটি আছে। এবং ত্রুটি কোথায়, সেটি বুঝতে হলে নামাযকে মিলিয়ে দেখতে হয় সাহাবীদের নামাযের সাথে। কারণ তারাই হলেন নামাযসহ সকল ইবাদত-বন্দেগির মডেল। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ শুধু ক্বিয়াম, রুকু, সিজদা বা বৈঠক নয়। স্রেফ সুরা পাঠ, তাশাহুদ পাঠ, দরুদ ও তাসবীহ পাঠও নয়। বরং সেটি হলো মহান আল্লাহ তাআলার সাথে নামাযীর মনের সংযোগ। এবং সে সংযোগটি ঘটে তাঁর রহমত, কুদরত, ফযীলত ও আয়াতসমূহের স্মরণের মধ্য দিয়ে। সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, ‘ফাযকুরূনী আযকুরুকুম’ অর্থাৎ ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।’ এটি বান্দার প্রতি মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া পবিত্র ওয়াদা। আর ওয়াদা পালনে তাঁর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠ হতে পারে? সুরা যুখরুফে বলা হয়েছে, যখন কারো মন থেকে আল্লাহ তাআলার স্মরণ বিলুপ্ত হয় তখন তার ওপর শয়তান নিযুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সে শয়তান তাকে জাহান্নামে নেয়। সুরা হাশরে বলা হয়েছে যারা আল্লাহকে ভুলে থাকে তাদের জীবন থেকে ভুলিয়ে দেওয়া হয় নিজেদের কল্যাণের বিষয়গুলি। নামাযের মুল কাজ তো ঈমানদারের মনে মহান আল্লাহ তাআলার স্মরণকে জাগ্রত করা। সেটি শুরু হয় নামাযের আযান ও ওযু থেকে। নামাযে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহ তাআলার স্মরণের মাধ্যমে ঈমানদার নিজেও স্থান করে নেয় মহান আল্লাহ তাআলার স্মরণে। এটিই তো নামাযের শ্রেষ্ঠ দান। কিন্তু নামাযীর মন থেকে সে স্মরণ বিলুপ্ত হলে সে নামাযের কি কোন মূল্য থাকে?
কুরআন নিজেই যিকরের কিতাব। সে যিকরের সাথে নিজেকে জড়িত করতে তো যিকিররত মন চাই। সুরা কাফে বলা হয়েছে, ‘ইন্না ফি যালিকা লা যিকরা লিমান কানা লাহু কালবুন আও আলকাস সাময়া ওয়া হুয়া শাহীদ’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই এ কিতাব (কুরআনের) মধ্যে রয়েছে যিকর; (এবং সেটি) তাদের জন্য যাদের রয়েছে কলব এবং কাজে লাগায় শ্রবনশক্তিকে এবং সাক্ষ্য দেয় সত্যের পক্ষে। (সুরা কাফ: ৩৭) অর্থাৎ কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে চাই জাগ্রত কলব, তীক্ষ্ণ শ্রবনশক্তি এবং সত্যকে সত্য রূপে দেখার দৃষ্টিশক্তি।
সুরা জুমায় বলা হয়েছে, ‘যখন জুমার দিনে নামাযের জন্য ডাকা (আযান দেওয়া) হয়, তখন তোমরা আল্লাহর যিকিরে (অর্থাৎ নামাযে) ছুটে যাও।’ নামায ঈমানদারকে প্রতিদিন ৫ বার সে যিকিরে হাজির করে। ঈমানদার ব্যক্তি এভাবেই অন্তত দিনে ৫ বার মহান আল্লাহ তাআলার স্মরণে জায়গা করে নেয়। এভাবেই গড়ে ওঠে মা’বুদের সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক।
বস্তুত প্রতিটি ইবাদতই হলো মহান আল্লাহ তাআলার যিকির। রোযার যিকির হয় সমগ্র দিনব্যাপী এবং সেটি সমগ্র রমযানের মাসজুড়ে। হজে সে যিকির চলে হজের ইহরাম বাধাকালীন সময়ে। মহান আল্লাহ তাআলার যিকির তখনও হয় যখন বান্দা যাকাত দেয়। এদিক দিয়ে নামায অনন্য; যিকিরের আয়োজন হয় কম পক্ষে দিনে ৫ বার এবং চলে আমৃত্যু। যারা তাহাজ্জুদ ও নফল নামায পড়ে তাদের জীবনে যিকিরের মাত্রা আরও অধিক। অপর দিকে একমাত্র নামাযেই যিকিরের কিতাব তথা পবিত্র কুরআন থেকে পাঠ করাটি বাধ্যতামূলক; রোযা, হজ বা যাকাতের ন্যায় অন্য কোন ইবাদতে নয়।
সর্বকালে ও সর্বজনপদে মানবের মনে যিকির তথা ধ্যানমগ্নতাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়াই হলো মহান আল্লাহ তাআলার নীতি। কারণ এ যিকিরই দেয় জান্নাতের পথে চলার আগ্রহ। দেয় সত্য পথের সন্ধান। এবং সে যিকির প্রতিষ্ঠায় প্রতি যুগেই নামায গণ্য হয়েছে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম রূপে। তাই হযরত মুসা 5-এর সাথে প্রথম বাক্যালাপেই তাঁকে নামাযের হুকুম দেওয়া হয়। হযরত মুসা 5-এর সাথে মহান আল্লাহ তাআলার প্রথম বাক্য বিনিময় হয় পবিত্র তুয়া উপত্যাকায়। নিজ পরিবারকে নিয়ে তখন তিনি মিসরে ফিরছিলেন। হযরত মুসা 5-কে নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘নিশ্চয় আমিই আল্লাহ এবং আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে যাতে আমার যিকির করতে পার।’ (সুরা তাহা: ১৪)
নামাযে যিকিরের মূল ভূমি হলো কুরআনের আয়াত। নামাযীর মনের গভীরে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র বাণীগুলি গেঁথে দেন পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলির মাধ্যমে। তখন ধ্যানমগ্ন হয় নামাযীর মন। কিন্তু ধ্যানের সে সামর্থ্য অবচেতন মনের থাকে না।
এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলির কোটি কোটি নামাযীর ব্যর্থতাটি বিশাল। নামায পড়ছে আবার মিথ্যা বলছে, ঘুষ খাচ্ছে এবং দুর্নীতিও করছে। বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশগুলি রেকর্ড গড়ছে দুর্বৃত্তিতে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতাটি নামাযের নয়, বরং যারা নামায পড়ে তাদের। কিন্তু কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে যে অক্ষমতা, সেটি ব্যক্তিকে অক্ষম রাখে আমৃত্যু। এ অক্ষমতা ডেকে আনে মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতা।সেটি জাহান্নামে পৌঁছার। ঈমান পুষ্টি পায় কুরআনের জ্ঞান থেকে। তাই মানব জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো কুরআন বোঝার সক্ষমতা অর্জন। সে ভয়ানক ব্যর্থতা থেকে বাঁচতেই মিসর, ইরাক, সিরিয়া, সুদান, মরক্কো, আলজিরিয়া, লিবিয়া, মালি, তিউনিসিয়ার ন্যায় বহু দেশের জনগণ মাতৃভাষাকে দাফন করে কুরআনের ভাষাকে আপন করে নেয়। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ভাষাপ্রেম তাদের জান্নাতে নেবে না। বরং জান্নাতে নেবে কুরআনের জ্ঞান।
মহান আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ দান হলো পবিত্র কুরআন। এ কুরআনই দেখায় জান্নাতের পথ। দেয় সভ্যতর ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রনির্মাণের রোডম্যাপ। কুরআনের কারণেই নামাযের শ্রেষ্ঠত্ব। প্রতিটি নামাযীকে নামাযের প্রতি রাকআতে কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করতে হয়। নইলে নামাযই হয় না। নামাযের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ক্বিয়াম অর্থাৎ জায়নামাযে দাঁড়ানো থাকাকালীন সময়। এ সময়টিতে কুরআন থেকে কিছু পাঠ করা হয়। কুরআন পাঠের সে কাজটি রুকু, সিজদা বা বসাকালীন সময়ে হয় না। তাই যে নামাযে দীর্ঘ সময় ক্বিয়ামে কাটানো হয় -সে নামাযের ওজন অধিক। নামাযের সাথে কুরআনের গভীর সম্পর্কের বর্ণনাটি এসেছে সুরা আরাফে। বলা হয়ছে, ‘এবং যারা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো কুরআনকে এবং প্রতিষ্ঠা দিল নামাযকে, নিশ্চয়ই আমরা (এরূপ) সৎকর্মশীলদের প্রতিদানকে নষ্ট করি না।’ (সুরা আরাফ: ১৭০)
একই রূপ বর্ণনা এসেছে সুরা আনকাবুতে। বলা হয়েছে, ‘(হে মুহম্মদ!) তোমার ওপর অহীরূপে যা নাযিল করেছি তা পাঠ করো কিতাব থেকে (অর্থাৎ কুরআনকে) এবং প্রতিষ্ঠা দাও নামাযকে। নিশ্চয়ই নামায বাঁচায় ফাহেশা (অশ্লীলতা, জ্বিনা, পাপাচার) ও দুর্বৃত্তি থেকে। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহর যিকিরই সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম। এবং আল্লাহ জানেন যা কিছু তোমরা করো। (সুরা আনকাবুত: ৪৫)
উপর্যুক্ত দুটি আয়াতে পবিত্র কুরআন এবং নামাযে কুরআন পাঠের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দিনের অন্য সময়ে কুরআন পাঠের সুযোগ না মিললেও সেটিকে ৫ বার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নামাযে সুরা তেলাওয়াতের মাধ্যমে। রোগের ভ্যাকসিন নিলে সে রোগ থেকে বাঁচা যায়। কুরআনের জ্ঞান ব্যক্তির চেতনা রাজ্যে তেমনি এক ভ্যাকসিনের কাজ করে। ফলে যে ব্যক্তি প্রতিদিনে ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করে সে বাঁচে সকল প্রকার অশ্লীলতা, জিনা, পাপাচার ও দুর্বৃত্তি থেকে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়েছে মিরাজের পর অর্থাৎ হিজরাতের প্রায় এক বা দেড় বছর আগে। প্রশ্ন হলো, এর আগে প্রায় ১১ বছর যাবত নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাগণ কি করতেন? সে সময় কি ছিল তাদের ইবাদতের ধরণ? সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ছিল পবিত্র কুরআন পাঠ তথা কুরআনের জ্ঞানার্জন। জ্ঞানই গড়ে চেতনা ও চরিত্র। অজ্ঞ ও জ্ঞানী ব্যক্তির চেতনা-চরিত্র কখনোই একই রূপ হয়না। সাহাবায়ে কেরাম যেরূপ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গড়ে উঠতে পেরেছিলেন তার মূলে ছিল কুরআনের জ্ঞান। নবুয়ত লাভের পর প্রথম যে কয়েকটি সুরা নাযিল হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো সুরা মুজাম্মিল। এ সুরায় নবীজী (সা:)-এর ওপর নির্দেশ এসেছে যিনি তিনি রাতের অর্ধেক অংশ বা তার চেয়ে কিছু বেশি বা কম অংশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন। সাহাবাগণও সেটিই করতেন। ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে ১১ বছর ধরে সে কাজ অবিরামভাবে চলতে থাকে। এভাবেই সাহাবাদের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান করে নেয় কুরআনের জ্ঞান। সে জ্ঞানের ওপর নির্মিত হয় তাদের বিস্ময়কর চারিত্রিক কাঠামো।
যে নামায কল্যাণ আনে
নামায মুসলিম জীবনে কল্যাণ দেবে সেটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আজকের মুসলিম জীবনে নামাযের সে কল্যাণ কতটুকু? বাস্তবতা হলো, কোটি কোটি মানুষ নামায পড়লেও সবার নামায একই রূপ হয় না। সকল নামাযীর চেতনায় ও চরিত্রে একই রূপ বিপ্লবও আসে না। বরং অনেক নামাযীর জীবনে আসে মারাত্মক স্খলন। নামাযকে সফল করতে হলে যত্নবান হতে হয় নামাযের প্রতিটি ধাপে। প্রতি ওয়াক্ত নামাযের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট সময়; খেয়াল রাখতে হয় ওয়াক্তের দিকে। যেমন বলা হয়েছে, ‘নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায়ের জন্য মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা নিসা: ১০৩)
তবে জরুরি শুধু নির্দিষ্ট সময়ই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাযের জন্য নির্দিষ্ট স্থান মসজিদে গিয়ে নামায আদায়। এজন্যই জরুরি হলো, নামাযের আযান শুনে মসজিদের দিকে ধাবিত হওয়া। তাই মসজিদে নামায পড়া ও সঠিক ওয়াক্তে নামায পড়ার ক্ষেত্রে যারা গাফেল তাদের রোগটি ঈমানে।
হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যখন কোন মুমিন ব্যক্তি নামাযের জন্য মসজিদ অভিমুখে রওয়ানা দেয়, তখন থেকেই সে নামাযে দাখিল হয়ে যায়। এবং প্রতি কদমে বৃদ্ধি করা হয় তার মর্যাদা। এবং মসজিদে গিয়ে নামাযের অপেক্ষায় বসে থেকেও সে নামাযের সওয়াব পায়।’ মসজিদে নামায আদায়ের সওয়াব ঘরে নামায আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ অধিক। এমন কি অন্ধ ও পঙ্গুদেরও মসজিদে গিয়ে নামায আদায়ের উৎসাহ দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মকতুম (রাদি:) ছিলেন অন্ধ। তিনি নবীজী (সা:)-কে বললেন, ‘আমি তো চোখে দেখি না, ফলে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করা কঠিন। আমি কি অনুমতি পেতে পারি ঘরে নামায পড়ার?’ নবীজী (সা:) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি ঘর থেকে আযান শুনতে পান?’ বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি আযান শুনতে পাই।’ নবীজী (সা:) বললেন, ‘তবে আপনাকে মসজিদে এসেই নামায পড়তে হবে।’ (আবু দাউদ শরীফ)
হযরত আবু হুরায়রা (রাদি:) থেকে বর্ণিত হাদীস: নবীজী (সা:) বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের নির্দেশ দিই। এরপর আযানের পর কাউকে ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে সেসব লোকদের বাড়িতে যাই যারা মসজিদে নামাযে আসেনি এবং তাদের ঘরগুলি জ্বালিয়ে দেই।’ (বুখারী ও মুসলিম শরীফ) আবু দাউদ শরীফের হাদীস: ‘যদি কোন মহল্লায় তিন জন মুসলিমও বাস করে তবে তাদের উচিত জামায়াতবদ্ধভাবে নামায আদায় করা।’
তাছাড়া মসজিদে নামায আদায়ে মনের যে একাগ্রতা ও ধ্যানমগ্নতা থাকে তা ঘর, অফিস বা দোকানের নামাযে থাকে না। কারণ ঘর, অফিস ও দোকানে অন্যদের শোরগোল, কথা-বার্তাসহ দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মত অনেক কিছুই থাকে। ফলে সেখানে থাকে না যিকিরের পরিবেশ। কিন্তু মসজিদ সাজানো হয় নামাযের জন্য। তাছাড়া মসজিদে বসে অন্যের নামায দেখে শেখারও অনেক কিছু থাকে। নামাযরত পাশের ব্যক্তির একাগ্রতা, ধ্যানমগ্নতা ও দীর্ঘ রুকু-সেজদা দেখে নিজের মনেও ভালো নামায আদায়ের আকাঙ্ক্ষা জাগে। তাছাড়া নেকড়ের পাল যেমন বিশাল মহিষকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে, তেমনি ঈমানদারকে একাকী পেলে ঘিরে ধরে শয়তানও।
মুসলিমের মিশন ও নামায
ইসলাম শুধু ব্যক্তির জীবনে পরিশুদ্ধি চায় না। পরিশুদ্ধি চায় সমাজ ও রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতেও। চায়, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে চায়, ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। সেরূপ একটি প্রকল্পকে বিজয়ী করতে প্রতিটি ঈমানদারকে তাই ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচতে হয়। মুসলিমের মিশন তো তাই যা মহান আল্লাহ তাআলার ভিশনকে বিজয়ী করার জন্য জরুরি। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহ তাআলার সে ভিশনটি হলো ‘লি-ইউযহিরাহু আলাদ্দিনি কুল্লিহি’ অর্থাৎ সকল দীনের ওপর তাঁর দীন তথা ইসলামের বিজয়। ঈমানদারের দায়বদ্ধতা হলো সে ভিশন নিয়ে বাঁচা। ফলে মুসলিমের বাঁচার মিশনে লড়াই তখন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
অন্যের ধর্মের অনুসারিগণ ক্লাবে বা মদ্যশালায় বন্ধুত্ব গড়ে ও জোটবদ্ধ হয়। ইসলাম ভাতৃত্বের বন্ধন গড়ে মসজিদের পবিত্র মেঝেতে। জায়নামাযে ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও এলাকাভিত্তিক কোন বিভক্তি থাকে না। সব নামাযীকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাতার বাঁধতে হয়। হাদীসে বলা হয়েছে, কাতারে ফাঁক থাকলে সেখানে শয়তান ঢুকে পড়ে এবং জামায়াতবদ্ধ হওয়ার এ রীতি শুধু জায়নামাযে সীমিত রাখলে চলে না, সেরূপ একতাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গণেও প্রতিষ্ঠা দিতে হয়। প্রতিষ্ঠা দিতে হয় রণাঙ্গণে। জামায়াতবদ্ধ নামাযের সেটিই তো গুরুত্পূর্ণ শিক্ষা। তখন মুসলিমদের ভূগোলের আয়োতন বাড়লেও ভূগোল খণ্ডিত হয় না। কিন্তু আজ মুসলিম উম্মাহর মাঝে যে বিভক্তি, তা দেখে নিশ্চিত বলা যায়, নামায থেকে তারা কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি।
যে নামায আযাব ডেকে আনে
নামায শুধু ঈমাদারগণই পড়ে না। মুনাফিকগণও পড়ে। মহান আল্লাহ তাআলা খুশি হন মুমিনদের নামাযে এবং প্রচণ্ড অখুশি হন মুনাফিকদের নামাযে। নামায তখন সওয়াবের বদলে আযাব ডেকে আনে। তাই শুধু নামায পড়লেই চলে না, নজর রাখতে হয় নামায যেন মুনাফিকের নামাযে পরিণত না হয়। কি ধরণের নামায মহান আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত ডেকে আনে সে বিষয়টি জানানো হয়েছে সুরা মাউনে। বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস সেসব নামাযীদের, যারা দেরিতে নামায আদায় করে এবং নামাযে খাড়া হয় লোক দেখানোর জন্য।’ (সুরা মাউন: ৫-৬)
নামায না পড়লে গর্দান থেকে ইসলামের রশি ছিন্ন হয়ে যায়। নবীজী (সা:)-এর জামানায় নামায গণ্য হতো মুসলিমের প্রধান পরিচিতি রূপে। যারা নামায পড়তো না, তারা গণ্য হতো কাফের রূপে। মুসলিম সমাজে কাফেররূপে পরিচিত হওয়ার বিপদ বুঝে মুনাফিকগণ নামাযকে বেছে নিত ঢাল রূপে। তারা শুধু নামাযই পড়তো না, বরং নবীজী (সা:)-এর পিছনে প্রথম কাতারে হাজির হতো। লোক-দেখানো সে নামাযের মধ্য দিয়ে তারা মুসলিমদের ধোঁকা দিত এবং ধোঁকা দিত মহান আল্লাহ তাআলাকেও। নামায নিয়ে মুনাফিকদের সে ষড়যন্ত্রকে ফাঁস করেছে সুরা নিসা। বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকগণ আল্লাহকে ধোঁকা দেয়, আসলে তিনিই (আল্লাহ) তাদেরকে ধোঁকা দেন। এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং লোক-দেখানোর উদ্দেশ্য। আল্লাহকে তারা সামান্যই স্মরণ করে।’ (আয়াত: ১৪২)
তাই নামায বা অন্যকোন নেক আমল করলেই মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তা গৃহীত হবে বিষয়টি তেমন সহজ সরল নয়। নেক আমল কবুলের কিছু শর্ত আছে। সে শর্তের কথা শোনানো হয়েছে সুরা তাওবাতে। বলা হয়েছে, ‘তাদের দান আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়া থেকে কোন কিছুই বাধা দেয় না একমাত্র এছাড়া যে তারা অস্বীকার করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে, নামাযে দাঁড়ায় আলস্য নিয়ে এবং দান করে অনিচ্ছা নিয়ে।’ (আয়াত: ৫৪) ইবাদত রূপে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে নামাযীকে তাই জায়নামাযে দাঁড়াতে হয় মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি গভীর আত্মনিবেদন ও আত্মসমর্পণ নিয়ে। পবিত্র কুরআনে সে ঘোষণাটি এসেছে এভাবে, ‘নিশ্চয়ই কামিয়াবী মুমিনদের জন্য। যারা নামাযে আত্মনিবেদিত।’ (সুরা মুমিনুন: ১-২)
নামায দেয় দোয়ার পরিবেশ
দোয়া সর্বাবস্থায় করা যায়। চলতে ফিরতে, কর্মস্থলে, এমন কি বিছানায় শুয়েও মহান আল্লাহর দরবারে আরজী পেশ করা যায়। মুমিনের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার দরবার সব সময় খোলা। তবে দোয়ার শ্রেষ্ঠতম সময় যেমন নামাযে, তেমনি নামায শেষে জায়নামাযে। নামায গড়ে আল্লাহ তাআলার সাথে সরাসরি সংযোগ। মহান দয়াময়ের স্মরণের জায়গাতে নামায মুমিনের জন্য স্থান করে দেয়। ফলে সৃষ্টি করে দোয়া কবুলের যথার্থ পরিবেশ। মহান আল্লাহ তাআলা চান, নামাযের মাধ্যমে তাঁর ঈমানদার বান্দাহ তাঁর দরবারে আবেদনটি পেশ করুক। এটিই হলো বান্দার জন্য নামাযের সবচেয়ে বড় দান। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ছবর ও নামাযের সাহায্যে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈয্যশীলদের সাথে।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩)
মহান আল্লাহ তাআলা থেকে মাগফিরাত লাভের এটিই হলো তাঁর নিজের দেখানো পথ। তাই দয়াময় রাব্বুল আলামীনের দরবারে দোয়া পেশের জন্য যেমন ছবর চাই, তেমনি চাই নামায।
দোয়ার গুরুত্ব কি, দোয়া কিভাবে করতে হয় এবং কোন দোয়াটি শ্রেষ্ঠ সেটিও শিখিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলা। সে শিক্ষাটি দেওয়া হয়েছে সুরা ফাতেহায় যা পাঠ করতে হয় নামাযের প্রতি রাকআতে। এ সুরা পাঠ না করলে নামাযই হয় না। তাই জরুরি শুধু সুরা ফাতেহা পাঠ নয়, বরং এ সুরার প্রতিটি বাক্যের অর্থ হৃদয়ে গভীরভাবে ধারণ করা। সুরা ফাতেহার মূল বিষয় তিনটি।
এক. প্রথমে বর্ণিত হয়েছে মহান আল্লাহ তাআলার মর্যাদা। বলা হয়েছে, ‘আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ অর্থাৎ সকল প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর। তিনিই ‘রহমানির রহীম’, তিনিই ‘মালিকি ইওয়ামিদ্দীন’ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা হলেন সবচেয়ে দয়াময় এবং দয়া করাই তার রীতি এবং তিনি রোজ হাশরের দিনের সর্বসময় কর্তা।
দুই. দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এ সুরায় বর্ণিত হয়েছে তা হলো মুসলিম জীবনের মিশন। সে মিশনটি হলো: ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা না’স্তায়ীন’ অর্থাৎ আমরা ইবাদত করি একমাত্র মহান আল্লাহর এবং একমাত্র আল্লাহ থেকেই আমরা সাহায্য ভিক্ষা করি।
তিন. তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো দোয়া। এবং সে দোয়াটি হলো ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম’ অর্থাৎ ‘(হে মহান আল্লাহ!) আমাকে সিরাতুল মুস্তাকীম তথা জান্নাতের পথটি দেখান।’ এটিই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া। যে ব্যক্তি সিরাতুল মুস্তাকীম পেল সেই জান্নাত পেল। এর চেয়ে বড় পাওয়া সমগ্র মানব জীবনে আর কি হতে পারে? ধনসম্পদ, সন্তান, স্বাস্থ্য তো কাফেরও পায়। কিন্তু তা কি জান্নাতে নেয়। যে ব্যক্তি ব্যর্থ হলো সিরাতুল মুস্তাকীম পেতে, সে পৌঁছে জাহান্নামে। এর চেয়ে বড় ক্ষতিই বা কি হতে পারে? নামায তাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি থেকে যেমন বাঁচতে শেখায়, তেমনি দেখায় সবচেয়ে বড় কল্যাণের পথ। নামায এভাবেই কাজ করে জান্নাতে চাবিরূপে।