আরবি ভাষা : চর্চায় ও ভালোবাসায়
আল্লামা মুফতি তকি উসমানী
মনজাগা উন্মুখ এক কৈশোরে আমার আরবি শেখার সূচনা। তখন ১৩৭২ হিজরির শাওয়াল মাস। ইংরেজি বর্ষপঞ্জিতে তখন ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই। বয়স দশ পেরিয়েছে মাত্র।
আরবি শেখার শুভসূচনা হয় ‘আরবি কা মুয়াল্লিম’ কিতাব দিয়ে। তা পড়েছি মাওলানা মুফতি ওলি হাসান সাহেব (রহ.)-এর কাছে। ছাড়া বাকি সব কিতাব পড়েছি মাওলানা সুবহান মাহমুদ সাহেব (রহ.)-এর কাছে। সে-বছর আমি তাঁর কাছে পড়েছি একের পর এক বহু কিতাব : সরফে ‘মিযান-মুনশায়িব’, ‘পাঞ্জেগাঞ্জ’, ‘ইলমুস-সিগাহ’; নাহুতে ‘নাহুমীর’, ‘শরহে মিয়াতে আমেল’, ‘হিদায়াতুন্নাহু’ ও আরবি সাহিত্যে হযরত মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী (রহ.)-এর ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’, ‘দুরুসুল আদব’ ও তারপরে ‘মুফীদুত তালিবীন’।
মুফতি ওলি হাসান সাহেবের ছিল আরবি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সম্পর্ক। শুধু সম্পর্ক তো নয়, বলা চলে, আরবি ভাষায় ছিল অসাধারণ বৈদগ্ধ। তাই তিনি আমাকে বড় আগ্রহ-উদ্দীপনার সাথে আরবি লেখার অনুশীলন করিয়েছেন। বয়সের স্বল্পতার দরুন নাহু-সরফের কঠিন-জটিল বিষয়গুলো তখনও পুরোপুরি আত্মস্থ হয় নি; কিন্তু আরবি শেখার সূচনা থেকেই আমার মধ্যে আরবিতে লেখার প্রতি ছিল অন্যরকম ঝোঁক ও আকর্ষণ। তাই আরবির অনুশীলনগুলোতে আমার সাফল্য ছিল লক্ষণীয় পর্যায়ের। খুব একটা কষ্ট ছাড়াই অনুশীলনগুলো আমি পেরে যেতাম। মনের কথাগুলো যখন আররি শব্দে খাতায় হেসে উঠত, তখন তনুমনে ছেয়ে যেত অন্যরকম একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি।
আমার হস্তাক্ষর ছিল খুবই খারাপ। অনেক অনেক দিন পর তাতে মোটামুটি শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল। তবুও উস্তাদগণ আমার অল্প বয়সের প্রতি লক্ষ্য রেখে আমার এই ভাঙাচোরা লেখাকেও অনেক সুন্দর মনে করে ভালোবাসা দেখাতেন। স্নেহ করতেন, সাহস দিতেন। তাকরার (গ্রুপস্টাডি) করাতে আমার খুব কষ্ট লাগত তখন। মুখ দিয়ে সাবলীলভাবে কথা আসত না। জড়তায় পেচিয়ে আটকে যেতাম কখনও কখনও। তাই অধিকাংশ সময় তাকরার করাত আমার বড় ভাই মুফতি রফি উসমানি সাহেব। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে কথা বলার একটা অন্যরকম যোগ্যতা ছিল। চমৎকারভাবে কথা বলতে পারতেন তিনি কথার খৈ ফোটা যাকে বলে। এতো কথা কোত্থেকে আসত কি জানি! অবাক লাগত আমার!!
মাওলানা সুবহান মাহমুদ সাহেব (রহ.) প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আমাদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক পরীক্ষা নিতেন। তাই পুরো সপ্তাহ আমাদেরকে পড়তে হত ভালোভাবে, অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে। তাঁর এই সুন্দর পাঠদান-পদ্ধতির ফলে এক বছরেই সে সময়ের দু’বছরের পড়া সম্পন্ন হয়েছে। নাহুমীরের সাথে শরহে মিয়াতু আমেল ও ফহদায়াতুন্নাহু, মিনের সাথে পাঞ্জেগাঞ্জ ও ইলমুস সিগাহ এবং দুরুসুল আদব ও মুফীদুত তালিবীনের সাথে নুরুল ইযাহও পড়া হয়ে গেছে একই বছরে।
হুযুরের কাছে একটা লম্বা বেত ছিল, শুধু ছাত্রদের ভয়ে রাখার জন্যে। খুব কমই তার ব্যবহার হত। কখনও-সখনও ব্যবহারও হত। তবে নিতান্ত কম। দুয়েকবার আমার পিঠও তার পরশে ধন্য হয়েছে।
আমার শ্রেণিতে আমার সমবয়সী একজনও ছিল না। সবাই ছিল আমার চেয়ে বয়সে বড়। ফলে পাঠ-শেষে খেলাধূলায় বা ঘোরাঘুরিতে তাদের সাথে আমার জমত না। আমার বন্ধুত্ব ছিল নিচের শ্রেণির ছাত্রদের সাথে। আমার সহপাঠীদের মধ্যে আমার বড় ভাই ছাড়াও শহীদ হাবীবুল্লাহ মুখতার সাহেব (রহ.) (সাবেক মুহতামিম, জামেয়া ইসলামিয়া বিন্নুরী টাউন)-এর বড় বড় ভাই মাওলানা আহমদ সাহেব ছিলেন, যিনি এখন মক্কা মুকাররমায় থাকেন। আর শহীদ হাবীবুল্লাহ মুখতার সাহেব (রহ.) ছিলেন আমাদের এক বছর নিচে। আমার ভাগিনা হাকিম মুশাররফ হোসাইন সাহেবও ছিল তাদের সহপাঠী। তাদের সাথে আরও ছিল কারী মুহাম্মদ ইসমাঈল (রহ.)।
পাঠ শেষ করে আমরা কাছের কোনো পার্কে বা দারুল উলুমের সুন্দর ভবনের বাইরে কিছুক্ষণ খেলতাম। কাবাডি, ডাংগুলি ও ক্রিকেটসহ প্রায় সব খেলায় এ-দুজন ছিলেন খুবই পারদর্শী। আমি নামে মাত্রই ওদের সাথে লেগে থাকতাম। কোনো খেলায় আমি দক্ষ ও পরদর্শী হতে পারি নি। তাছাড়া আসরের পরে ঘরে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবার ভয় থাকত। তাই খেলার সময়ও পেতাম খুব কম।
মাদরাসার সামনে ছিল এক বিশাল পার্ক। পাশে একটি কুলিং কর্নার। সেখানে চনামুড়ি, চটপড়ি এবং ভুট্টার খৈ পাওয়া যেত। এসব কিশোরভোলানো খাদ্যের ভুরভুর সুঘ্রাণ দুপুরের খিদেটাকে চাগিয়ে তোলত বহুমাত্রায়। বাড়ি থেকে আম্মাজান আমাকে প্রতিদিন পকেট খরচের জন্য দিতেন এক আনা, যা সে-সময়ে একজন শিশুর চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। তার আধ আনা দিয়ে আমি ভুট্টার খৈ অথবা চনা ভাজা খেতাম। আর অবশিষ্ট আধ আনা দিয়ে বাড়িতে এসে খাবারদাবার খেয়ে কাঁচা পেয়ারা, কাঁচা আম অথবা খোসাছাড়ানো বাদাম কিনে খেতাম। আর ভক্ষণপর্বের ফাঁকে-ফাঁকে হয়ে যেত সামান্য খেলাধূলাও।
আমার মনে আছে, ব্রাঞ্চ রোডের বাড়ির কাছে ইউসুফ নামের একটা ছেলে ছিল। একবার সে আমাকে বলল, পকেট খরচের জন্য সে চার আনা পায়। তখন আমার চক্ষু ছানাবড়া! ফুর্তি করার জন্যে সে এত্তো বেশি সুযোগ পায়!!! আর এখন সে-কথা মনে পড়লে আমার হাসি পায়। আপনিও নিশ্চয় হাসবেন যে, চার আনার এমন কী মূল্য যার জন্য ঈর্ষা করা যায়! কিন্তু আজ আমরা যে ধনসম্পদ আর যে জমিজিরাতকে চরম কাঙ্ক্ষিত বস্তু মনে করছি; যার জন্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা করছি, মামলা-মুকাদ্দমা চালিয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর, সেগুলোকে একসময় চার আনার চেয়েও মূল্যহীন মনে হবে। তখন হাসি আসবে যে, আমি কী তুচ্ছ বস্তুর প্রেমেই না মজে ছিলাম! তখনই আমাদের চরমভাবে বুঝে আসবে: কুরআন তো আমাদেরকে এই পরম সত্য কথা আগে থেকে বলে দিয়েছিল। কিন্তু আমরা আমলে নেই নি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ۰۰۱۸۵
‘এই পার্থিব জীবন ধোকার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।’[1]
এভাবে আমার আরবি ভাষা শেখার প্রথম বছর পূর্ণ হলো।
পরের বছর (১৩৭৩ হিজরী মোতাবেক ১৯৫৩ খ্রি.) আমার সব কিতাব পড়ানোর দায়িত্ব ছিল মাওলানা সুবহান মাহমুদ সাহেব (রহ.)-এর কাছে। কাফিয়া, নফহাতুল আরব, তাইসিরুল মানতিক, মিরকাত, শরহে তাহযীব তাঁর কাছে পড়েছি। পাঠদানের ক্ষেত্রে তাঁর ছিল উন্মেষশালীনী প্রতিভা। তাঁর সপ্রতিভ-সৃষ্টিশীল পাঠদানশৈলীতে আমি এতো বেশি অভিভূত হলাম যে, অন্য শৈলীতে, অন্য পাঠদান পদ্ধতিতে আমি আর নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না।
গতবছর হুযুরের কাছে নুরুল ইযাহ পড়েছি। এ-বছর কুদুরি পড়তে হবে। কিন্তু মাদরাসার কোনো প্রয়োজনে কুদুরি হুযুরকে না দিয়ে আরেকজন নতুন উস্তাদকে দেওয়া হলো। কিন্তু আমাদের শ্রেণির ছাত্ররা, যেখানে আমরা দুই ভাই ছাড়াও মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ সাহেব, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক মুরাদাবাদী সাহেব এবং আরও কয়েকজন মেধাবী ছাত্র ছিল। তাতে আমাদের মন বসছে না। তৃপ্ত হচ্ছে না আমাদের মন। উস্তাদের বিরুদ্ধে দরখাস্ত দেওয়া ছিল তখনকার সময়ে এক জঘন্য ব্যাপার। কিন্তু মাদরাসার শিক্ষা-পরিচালনা বিভাগ কিছু একটা আঁচ করে সেই কিতাবটি মাওলানা আমিরুজ্জামান কাশ্মিরী (রহ.)-এর কাছে অর্পণ করলেন। তখন সবাই খুশি হলো। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
আরবি ভাষা শেখার কেন্দ্র
সৌভাগ্য আমার প্রসন্ন হলো। আরবি শেখায় রচিত হলো নতুন জ্যোতির্ময় এক আনন্দলোক। ঘটনাক্রমে সিরিয়া থেকে একজন রাষ্ট্রদূত এলেন। নাম জাওয়াদ আল-মুরাবিত। পোষাক-আষাক ও বাহ্যিক হালচালে ইংরেজদের মতো, কিন্তু অন্তঃপ্রকৃতিতে বড় মুত্তাকি ও আল্লাহওয়ালা। আমার আব্বাজান মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর কাছে বড় ভক্তি ও ভালোবাসা নিয়ে আসতেন। তিনি আব্বাজানের কাছে একটি প্রস্তাব রাখলেন যে, সিরিয়া দূতাবাস ও দারুল উলুমের যৌথ উদ্যোগে করাচি শহরের বিভিন্ন জায়গায় কমিনিকেটিভ পদ্ধতিতে আরবি শেখানোর কোর্স চালু করতে পারে।
আব্বাজানের প্রস্তাবটি খুব পছন্দ হলো। অনুমতি দিলেন তিনি। দারুল উলুমকে প্রধান কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় তার শাখা খোলা হলো। উস্তাদ মুহাম্মাদ আমিন মিসরি সে-সময় সিরিয়া দূতাবাসের সাংস্কৃতিক এটাচি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আরবি শেখানো সেই কর্মসূচিটির দেখাশোনা ও পাঠ্যক্রম তৈরি করেই তিনি ক্ষান্ত হন নি; উপরন্তু নিজে এসে পড়ানোর জন্যও প্রস্তুত হয়ে যান।
সৌভাগ্য এভাবে নিজের ঘরে এসে ধরা দেয়- ভেবে আমার আরবিপ্রেমিক মনে নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো।
তিনি নিজের পাঠদান শুরু করলেন দারুল উলুমে। প্রতিদিন যা পড়াতেন, তা লিখে আনতেন। আরবিতেই পড়াতেন। তাঁর পাঠদান পদ্ধতি ছিল; যে শব্দটি শেখাতেন তার অর্থ প্রয়োগসহকারে বুঝিয়ে দিতেন। তারপর একেকজন ছাত্রকে দিয়ে শব্দটি বলাতেন। উচ্চারণ শুদ্ধ করানোর প্রতি সবিশেষ জোর দিতেন।
সর্বপ্রথম তিনি كتاب শব্দটি পড়িয়েছেন। যদিও তিনি জানতেন, শব্দটি উর্দু ভাষায়ও একই অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং সব ছাত্র শব্দটির অর্থ বুঝে। আমার মনে আছে, কিতাব হাতে নিয়ে كتاب শব্দটি তিনি কমপক্ষে পঞ্চাশবার বলেছেন। তারপর প্রত্যেক ছাত্রকে দিয়ে পঞ্চাশবার করে বলিয়েছেন। যেন সবার উচ্চারণ শুদ্ধ হয়, আরবি উচ্চারণভঙ্গিটা রপ্ত হয়। এভাবে তিনি প্রত্যেক পাঠ লিখে আনতেন। এবং সম্পূর্ণ পাঠ অনুশীলন করাতেন। পরবর্তী সময় তার এই পাঠগুলি গ্রন্থাকারে طريقة جديدة لتعليم العربيّة নামে প্রকাশিত হয়েছে।
শুরুর কিছুদিন আমি উস্তাদ আহমদ আমিন মিসরির দরসে বসেছি। তিনি যেহেতু দিনের পাঠ দিনে তৈরি করতেন, তাই কখনও পরীক্ষা করার জন্য কিছু ছাত্রকে নিজের কাছে ডেকে নিতেন এবং সেই কাজে সৌভাগ্যবশত প্রায় সময় লটারিতে আমার নাম উঠে আসত। সেই দলে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। সম্ভবত সে কারণেই মনে হয়, طريقة جديدة لتعليم العربيّة কিতাবে আমার নামও চলে এসেছে।
কিছুদিন পর উস্তাদ আমিন মিসরি (রহ.)-এর অনুভব করলেন যে, ছাত্রদের মাঝে নানান মেধা ও স্তরের ছাত্র আছে, সবাইকে طريقة جديدة -এর স্তরের ছাত্রদের সাথে পড়ানো ঠিক হবে না। তাই তিনি ছাত্রদেরকে যোগ্যতা হিসেবে তিন ভাগে ভাগ করলেন। আমাকে রাখলেন দ্বিতীয় ভাগে। ফলে আরও তিনজন অতিরিক্ত সিরিয়ান উস্তাদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হলো। তাঁরা হলেন, উস্তাদ আহমদ আল-আহমদ, উস্তাদ আবদুল হামিদ হাশেমি, উস্তাদ ইয়াসিন আল-হুলউ। উস্তাদ ইয়াসিন আল-হুলউ-এর কাছে পড়ার আমার সুযোগ হয় নি। কারণ, তিনি আমাদের উপরের দলটিকে পড়াতেন। উস্তাদ আহমদ আল-আহমদ ও উস্তাদ আবদুল হামিদ আল-হাশেমির কাছ থেকে খুব বেশি উপকৃত হয়েছি।
উস্তাদ আহমদ আল-আহমদ শান্ত-গম্ভীর ব্যক্তি ছিলেন। প্রখর ও প্রদীপ্ত এ মানুষটির চেহারায় অনন্যতার দ্যুতি সবসময় ছড়িয়ে থাকত। একবার দারুল উলুমে কোনো মেহমান আসছেন। তিনি আমাকে বললেন, অনুষ্ঠানে আরবিতে বক্তৃতা দিতে হবে। আর তাই তিনি বক্তৃতাটি আগে লিখে ফেলতে বললেন। আমি এলোথেলো কিছু লিখে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম বক্তৃতাটি। সেখানে শুরুতে আমি নিজের জ্ঞানের স্বল্পতা ও অযোগ্যতার কথা লিখেছি। তিনি প্রথমে দেখেই বললেন, অযোগ্যতার কথা কেটে দাও। একথাগুলো বক্তার মাঝে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে এবং বক্তৃতাকে নিজের কাছেই ফিকে করে দেয়।
তারপর তিনি নিজেই বক্তৃতাটি লিখে আমাকে দিলেন। এবং বললেন, এটি মুখস্থ করে নাও। আমি মুখস্থ করে নিলাম। তারপর তিনি বললেন, এবার আমাকে বক্তৃতা করে দেখাও যে, কীভাবে মঞ্চে বক্তৃতা দেবে। আমি আমার দেশীয় স্টাইলে মুখস্থ করা বক্তৃতাটি পড়া শুরু করলাম। একটু শুনেই তিনি আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, এভাবে বক্তৃতা করে না। এসো, আমার সাথে দাঁড়াও। তারপর তিনি নিজের ডান পা আগে এবং বাম পা একটু পেছনে রেখে বললেন, এভাবে আমার মতো করে দাঁড়াও। এভাবে দাঁড়ালে নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। তারপর তিনি একেকটি বাক্য আমাকে দিয়ে বলাতেন এবং বলতেন, ওভাবে নয় এভাবে বল। তারপর বাক্যটি কিছুক্ষণ ভরাট কণ্ঠে উচ্চারণ করাতেন এবং যতক্ষণ আমার স্বর ও বাচনভঙ্গিতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রা অর্জিত হত না, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই বাক্যটিই আওড়াতে থাকতেন। বারবার বলাতেন। এভাবে তিনি বক্তৃতা করার পদ্ধতি অনুশীলন করিয়েছেন। যথারীতি আমি তাঁর নির্দেশিত ঢঙে বক্তৃতা করলাম। শ্রম ও শীলনের টাটকা ফলাফল দেখে তিনি চমকিত হয়েছিলেন এবং আমাকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন উচ্ছ্বসিতভাবে।
একজন বড়মাপের শিক্ষক সম্পূর্ণ কৈশোরে নেমে এসে একজন ছাত্রকে হাতে-কলমে গড়ার যে প্রয়াস আমি তার ভেতর লক্ষ্য করেছি, তা মনে করলে আমি উদ্বেলিত হয়ে ওঠি এখনও। সে সময় আমার তরুণ চেতনাকে তিনি পুরোপুরি অধিকার করে নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে উস্তাদ আবদুল হামিদ হাশেমি ছিলেন সুদর্শন, হাস্যোজ্জ্বল ও রসপ্রিয় টগবগে যুবক। তিনি কোনো দিন কোনো কিছু লিখে আনেন নি। বরং তিনি ছাত্রদের সাথে খোশগল্প করে ও হাস্যরস মিশিয়ে আরবি শেখাতেন। কখনও কখনও ব্ল্যাকবোর্ডে কুরআনের কোনো আয়াত অথবা কোনো হাদীস অথবা আরবি সাহিত্যের চমৎকার কোনো বাক্য লিখে দিতেন। তারপর তার রূপ-রস-সৌন্দর্য আমাদের সামনে তুলে ধরতেন। আবার কখনও কোনো কবিতা লিখে তার ব্যাখ্যা করতেন। আরবি উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গির অনুশীলনও করাতেন। মাঝে-মধ্যে পাঠদানের মাঝখানে হঠাৎ কোনো ছাত্রকে নিজের পাশে দাঁড় করাতেন। ব্ল্যাকবোর্ডে যে বাক্যটি লিখেছেন, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন। অবতারণা করতেন চমক-জাগানো রসকথার। ছাত্রদেরকে বোঝানোর যে নিজস্ব আঙ্গিক তিনি রচনা করেছিলেন, সেটি ছিল তার একান্তই নিজস্বায়িত অঙ্গন, অন্য এক পৃথিবী।
একবার সমম্ভবত ‘তানাফুরুল হুরুফ’-এর ব্যাখ্যা করছিলেন আমাদের সামনে। বুঝাচ্ছিলেন যে, একটি বাক্যে একই ধরনের অনেকগুলো হরফ এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে উচ্চারণ-জাটিল্য সৃষ্টি হয়। এবার তাকে উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। দেখুন, কি চটকদার উদাহরণ দিলেন। এক জেলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বললেন, জেলের গ্রাম্য ভাষায় নৌকাকে বলে ككك যে শব্দে তিনটি কাফ আছে। একবার জেলেটি নৌকায় চড়ে মাছ ধরার জন্য বের হয়েছে। তখন দেখল আরেক লোক হুবহু তার মতো একটি নৌকায় চড়ে মাছ ধরার জন্য সাগরে জাল ফেলেছে। তখন জেলেটি ওই লোকটিকে লক্ষ করে দুইটি কবিতা বলল,
يا راكبا في كككك
وصائدا في شركك
كككك ككككي
وكككي كككك
ষোলটি কাফ-বিশিষ্ট এই কবিতাটি তিনি বোর্ডে লিখলেন। তারপর ছাত্রদের একজন একজন করে পড়ার জন্য ডাকতে লাগলেন। একেকজন ছাত্র আসে, পড়তে যায়, কিন্তু পড়তে গিয়ে আটকে যায়। তখন অন্য ছাত্ররা হেসে ওঠে। সে কি হাসির হল্লা! বলা যায়, হাসির হিল্লোও।
এভাবে তাঁর পাঠদান ছিল হাস্য-রসে ভরা, আনন্দে-উদ্দীপনায় টইটম্বুর| আমরা সবসময় তাঁর পাঠদানের মুহূর্তটির জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। একদিন কি হলো, তিনি তাঁর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ছাত্রদের কাছে চ্যালেঞ্জ দিলেন, ‘যে আমার মুষ্টি খুলতে পারবে, আমি তাকে পুরস্কৃত করব।’ শ্রেণিতে বড় বড় স্বাস্থ্যবান ছাত্র ছিল। একে একে সবাই গিয়ে তাঁর মুষ্টি খোলার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু কেউ পারল না। সবাই বিফল মনোরথে ফিরে এল। শেষে আমাদের এক সহপাঠী ছিল, তার নাম আবদুর রাজ্জাক মুরাদাবাদি (যিনি পরে মদিনায় হিজরত করেছিলেন এবং সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে।) অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী যুবক ছিলেন। তিনি কারো কাছে হারতেই শিখেন নি। চ্যালেঞ্জ নিয়েই তিনি সামনে গেলেন। জোর দিয়ে খুলতে চেষ্টা করতে লাগলেন উস্তাদের মুষ্টি। উস্তাদও শক্ত করে মুষ্টি ধরে আছেন। সমবেত সবাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, মুষ্টিখোলার তুমুল যুদ্ধ চলছে। উস্তাদ-শাগরিদ উভয়ের চেহারার রং লালচে বর্ণ ধারণ করছে। আর এই লালচে চেহারায় উস্তাদকে চমৎকার লাগছে- আরব বলেই কথা; তাদের অদ্ভুত ফর্সা রং স্বর্গীয় লাবণ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তিনিও মুষ্টি খুলতে পারলেন না। শেষে উস্তাদ বললেন, চল, আমি তোমাকে একটু সহযোগিতা করি। এই বলে তিনি মুষ্টিবদ্ধ আঙুলগুলোতে একটু ফাঁক করলেন, সামান্য ঢিল দিলেন। ফলে আঙুলগুলো এতটুকু ফাঁক হলো যে, যাতে অন্য আঙুল প্রবেশ করানো যায়। এবার তিনি আবদুর রাজ্জাককে বললেন, ‘আপনি যদি একটি আঙুল এখানে প্রবেশ করান, তাহলে আপনার জন্য মুষ্টি খোলাটা সহজ হয়ে যাবে হয়তো! কথা শুনে আবদুর রাজ্জাক যুদ্ধজয়ের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। ফস করে নিজের আঙুল ঢুকিয়ে দিলেন উস্তাদের মুষ্টিতে। আর তখনই উস্তাদ সাথে সাথে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে গুটিয়ে নিলেন, মুষ্টিকে শক্ত করে ফেললেন। মাঝখানে আটকা পড়ল আবদুর রজ্জাকের আঙুল। এবার আবদুর রাজ্জাক কি উস্তাদের মুষ্টি খুলবে, উল্টো নিজের আঙুল ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। টানাটানি হ্যাচকাহেঁচকি চলছে বিস্তর- যেন নাটকীয় এক তুলকালাম কাণ্ড! তখন পুরো ক্লাসের ছাত্ররা তো হেসে কুটিকুটি! শেষ পর্যন্ত আবদু রাজ্জাক পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। তখন উস্তাদ তার আঙুলটি ছেড়ে দিলেন। এককথায় তিনি রুচিশোভন হাস্যরসের ভেতর দিয়ে একটা আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করতেন এবং ছাত্রদের শেখানোর পদ্ধতিকে রসঘন করে তোলতেন।
আল্লাহ তাআলা উভয় উস্তাদকে উত্তম থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। তাঁরা আরবির প্রতি আমাদের অনুরাগী করে তোলার জন্য সীমাহীন চেষ্টা করেছেন। আজ যখন কোনো আরব দেশে আরবিতে কথা বলি, বক্তৃতা দেই, অথবা প্রবন্ধ পাঠের সুযোগ হয়, তখন সাধারণত লোকেরা তীক্ষ্ম কৌতূহলরঞ্জিত চোখে আমার দিকে থাকায় এবং জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি মিসরে বা সৌদি আরবে পড়ালেখা করেছেন?’ যখন আমি এই উত্তর দিই, ‘আমার সম্পূর্ণ আরবি এবং দ্বীনি শিক্ষা লাভ হয়েছে দারুল উলুম করাচিতে।’ তখন তারা হতচকিত হয়ে ওঠে। তাদের চেহারায় ফুটে ওঠে একরাজ্য অবিভূতি ও বিস্ময়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আল্লাহ তাআলা আমাকে আরবি লেখার ও বলার যে যোগ্যতা দিয়েছেন, তার প্রথম অসিলা হলেন আমার উস্তাদ শায়খুল হাদীস মাওলানা সুবহান মাহমুদ সাহেব (রহ.)-এর সচেত ও সপ্রাণ দীক্ষা ও যুগোপযুগী শিক্ষাপদ্ধতি। তিনি আমাকে শুধু আরবির নিয়ম-কানুন শিখিয়ে তৃপ্তিবোধ করেন নি, বরং আরবি লেখার প্রতিও প্রচণ্ড তাগিদ দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় অসিলা হলো সিরিয়ার উস্তাদদ্বয়, যারা প্রতিদিন কোনো না কোনো আরবি অনুচ্ছেদের ব্যবেচ্ছেদ করতেন, বিশ্লেষণ করতেন। নানা আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন। আর এভাবেই আরবি লেখার ও বলার অনুশীলন করাতেন।
প্রথম প্রথম তাদের পাঠদান দারুল উলুম নানকউড়ার একটি হলে হত। পরে সুল হাসপাতালের সামনে একটি স্কুলে স্থানান্তর করা হলো। আর আমরা আসরের পর সেখানে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা অনুশীলন করতাম।
আরবি সাহিত্যের পাঠদান
ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ছিল আমার বিশেষ আগ্রহ ও অনুরাগ। এ কথা মাদরাসার দায়িত্বশীলদের জানা ছিল। ফলে শিক্ষক জীবনে আমাকে যে শ্রেণির নাহু-সরফ-ফিকহের কিতাব দেওয়া হত, তার ঠিক উপরের শ্রেণিতে থাকত আরবি সাহিত্যের কিতাব।
এরই ধারাবাহিকতায় আমাকে মাকামাতে হারিরি পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। এই কিতাবের কষ্টকল্পিত অন্ত্যমিল ও অনুপ্রাসের প্রতি আমার তেমন আকর্ষণ ছিল না। আমার অনুরাগ ছিল সাবলীল গদ্যের প্রতি। তবু পড়ানোর জন্য শ্রম দিয়েছি বিস্তর। ভালোভাবে অধ্যয়ন করে, পাঠপ্রস্তুতি নিয়ে, ছাত্রদের পড়িয়েছি। কারণ, তাতে আরবি ভাষার বিশাল শব্দভাণ্ডার ও প্রচুর বাগধারা রয়েছে। আমি পাঠপ্রস্তুতি নেওয়ার সময় শুধু ‘সুরাইশি’ ও ‘ইযাফাত’র মতো ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো দেখে তৃপ্তির ঢেকুর নেই নি, বরং অতলস্পর্শী শব্দবিশ্লেষণের জন্য রীতিমতো অভিধানের দারস্থ হয়েছি বারবার। জরুরি তত্ত্বগুলো খাতাবন্দিও করেছি। তাই বলে ছাত্রদের সামনে সবকিছু উগরে দিয়েছি এমন নয়, বরং তারা যতটুকু হজম করতে পারবে, ততটুকুই বলেছি। তবে একটি বিষেয়র প্রতি আমি খুব জোর দিতাম। সেটা হলো, কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে শব্দের ব্যবহার ও ব্যবহারবিধি দেখানো। কখনও কখনও আরবি প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারা দেখিয়ে শব্দ-বাক্যের বিশ্লেষণ করতাম।
এছাড়াও ‘দিওয়ানুল মুতানব্বী’, ‘সবয়ু মুয়াল্লাকা’ এবং ‘দিওয়ানুল হামাসা’ খুব আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে পড়িয়েছি। ‘মুতানব্বি’র ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আকবরি’, ‘সবয়ু মুয়াল্লাকা’ ও ‘দিওয়ানুল হামাসা’র ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘যুযনী’ তো আলাদাভাবে আমার অধ্যয়নে ছিল। আর ‘হামাসা’র সাথে আমি ‘মাফদলিয়্যাত’ও অধ্যয়ন করার চেষ্টা করতাম, যেন সে-সময়ের কবিতার গতিধারা বুঝতে সক্ষম হই।
‘মাকামাত’ পড়ানো শুরু করার পূর্বে আমি যখন আরবি সাহিত্যের পরিচিতি সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাব অধ্যয়ন করা শুরু করি, তখন একটি তত্ত্ব আমার চোখে পড়ল: আরবি সাহিত্যের মূল স্তম্ভ চারটি। যথাক্রমে : ১. البيان والتبيين للجاحظ, ২. الكامل للمبرد, ৩. أدب الكاتب لابن قتيبة, ৪. الأمالي لأبي علي القالي|
এবার নেমে পড়ি এ গ্রন্থগুলো অধ্যয়নের অভিযানে। উপর্যুক্ত গ্রন্থসমূহের তৃতীয় ও চতুর্থটি দারুল উলুমের গ্রন্থাগারে তখন ছিল না; প্রথম দু’টি অবশ্যই ছিল। সময়-সুযোগ মতো আমি সেসব পড়ে দেখতাম; তবে খুব গভীরাশ্রয়ী পাঠ নয়; যাকে বলে ‘আমোদে অধ্যয়ন’ ঠিক সেরকম।
এছাড়াও গ্রন্থাগারে ছিল, العقد الفريد لابن عبد ربه । সেটি উপরোক্ত দুটির তুলনায় আমার হৃদয়ে দাগ কাটল বেশি। ‘ইকদুল ফরীদ’-এ সন্নিবেশিত হয়েছে সময়ের সেরা আরবি গদ্য ও কবিতা এবং অনবদ্য ভাষণের বিশাল সমাহার, যা ছিল পাঠকহৃদয় মাতিয়ে তোলার মতো। সঙ্গত কারণেই আমি খুব একাগ্রচিত্তে তা অধ্যয়ন করতাম। আরবি ভাষা-সাহিত্যের পুঁজিসংগ্রহের ক্ষেত্রে এ গ্রন্থের বিশাল ভূমিকা রয়েছে আমার জীবনে।
ভাষারীতি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রীতি ছাড়া ভাষা চলে না, ভাষা গড়ে ওঠে না। ভাষারীতির ওপর আল্লামা জালালুদ্দীন আস-সুয়ুতীর একটি প্রোজ্জ্বোল গ্রন্থ আছে, নাম: المزهر| সেটিও দারুণ লাগল আমার কাছে। সেটি অধ্যয়ন করেও উপকৃত হয়েছি অন্যরকম। একসময় ফুটপাথ থেকে কিনে নিয়ে আসি ইবনে রশিকের العمدة আর ইবনে হিলাল আসাকিরের كتاب الصناعتين| দারুণ সুস্বাদু দুটি গ্রন্থ। পড়েছি আর অনাস্বাদিতপূর্ব স্বাদে শিহরিত হয়েছি- মনে পড়ে এখনও।
এসব ছিল প্রাচীন ও ক্লাসিক আরবি সাহিত্যের বই। আধুনি আরবি সাহিত্যের প্রতি ছিল আরও হৃদয়-উপচে-পড়া উদগ্র আগ্রহ। গ্রহণযোগ্য আরবি সাহিত্যিকের রচনা যখনই পেয়েছি, উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, শাকিব আরসালান, আব্বাব মাহমুদ আক্কাদ, মানফালুতী ও মুস্তফা সিবায়ী প্রমুখের রচনা গভীর আগ্রহের সাথে পাঠ করেছি এবং উপকৃত হয়েছি নানা নিরিখে, নানা আঙ্গিকে।
আরবি সাহিত্যের ভূমিকা
যেকোনো শাস্ত্র পাঠদানের ক্ষেত্রে একটি অগ্রগণ্য বিষয় হলো, তার সংজ্ঞা, আলোচ্যবিষয়, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা। আমাদের মাদরাসাগুলোতে এটি খুব সুন্দরভাবেই হয়ে থাকে। সাধারণত শিক্ষাবর্ষের আকাঙ্ক্ষিত রাঙা প্রভাতে যখন কোনো কিতাবের পাঠদান আরম্ভ হয়, তখনই শিক্ষকগণ ভূমিকাস্বরূপ সংশ্লিষ্ট তত্ত্ব-উপাত্তগুলো গুছিয়ে বর্ণনা করেন।
মাদরাসায় পাঠদানভুক্ত নানান বিষয়ের ভূমিকাসম্ভার থাকলেও আরবি সাহিত্যের ওইরকম সুবিন্যস্ত ও সমৃদ্ধ কোনো ভূমিকা আমি পাই নি। ‘মাকামাত’ গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতে ভূমিকাস্বরূপ যা বিধৃত হয়েছে তা আমার মনে তেমন দাগ কাটে নি। বলতে ইচ্ছে করে, অনুসন্ধিৎসু মনের ক্ষুৎ-পিপাসা তেমন মেটে নি তাতে।
ভাবলাম, একটি ঋদ্ধপ্রাণ ভূমিকা আমি নিজেই লিখে ফেললে কেমন হয়, যাতে আমি উপরোল্লিখিত গ্রন্থসমূহের সারনির্যাস তো সন্নিবেশিত করবই, উপরন্তু আরবি সাহিত্যের নানান শাখা-প্রশাখার পরিচয় ও ইতিহাসও স্থান পাবে বীর্যবান এক ধারাভাষ্যে।
ইচ্ছা, সংকল্প অতঃপর সম্যক প্রস্তুতি; এভাবে কাজটি শুরু করে দিলাম। প্রচণ্ড আগ্রহ ও অন্তর্গত আবেগ নিয়ে আরবি ভাষায় একটি ভূমিকা লিখলাম। ভূমিকাটাকে আমি নানা আঙ্গিকে সাজাবার চেষ্টা করেছি। আদবের সংজ্ঞা, নামকরণের কারণ, আলোচ্যবিষয় ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উল্লেখ করার পাশাপাশি আদবকে ‘গদ্য ও পদ্য’ দু’প্রকারে ভাগ করে গদ্যের বিভিন্ন প্রকারও উল্লেখ করেছি। সেই সাথে আদবের বিভিন্ন শাখা, যেমন- কথোপকথন, বক্তৃতা, চিঠি, গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রায়োগিক উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে যে, প্রত্যেকটি শাখায় সময়ের পরিক্রমায় কী কী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, এবং পরিবর্তগুলোকে আরবি ভাষা কীভাবে স্বাগত জানিয়েছে। অনুরূপভাবে পদ্যের ব্যাপারে বর্ণনা দিয়েছি যে, এর শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? অতঃপর পদ্যের বিভিন্ন প্রকারের পচিয়ও প্রদান করা হয়েছে, যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দীর্ঘ কবিতা, প্রেমকাব্য এবং রণসঙ্গীত ছাড়াও স্পেনের ‘মুশাহাত’ (তথা স্প্যান গীতিকাব্য)’র পরিচয়ও। আর আরব কবিদের বিভিন্ন স্তর যেমন জাহেলি যুগের কবি, মুখদারামি (ইসলাম ও জাহেলি উভয় যুগের কবি), ইসলাম যুগের কবি এবং তৎপরবর্তী কবিদের পরিচিতি ও তাদের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে এ ভূমিকাটি একটি বড় গ্রন্থের রূপ নেয়। লেখাগুলোকে আমি খুবই যত্নসহকারে একটি ফাইলবন্দি করে রেখেছিলাম এবং পাঠদানের সময় প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজনও করে যাচ্ছিলাম।
এমন মুহূর্তে একটা সুন্দর কাকতাল ঘটল। একদিন খবর পেলাম, হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলি নাদবি করাচী তাশরিফ এনেছেন। খবরটা পেয়ে ভেতরে একটা অন্যরকম আনন্দ খেলে গেল। ভাবলাম, এই সুযোগে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াসের কথা হযরতকে জানাব এবং পারলে একটু সংশোধনের জন্য বিনয়ের সাথে আরজ করব। তিনি অন্তত এতে একবার দৃষ্টি বুলালেও তা আমার জন্য বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার হবে।
উদ্দীপ্ত এক তাজা মন নিয়ে আমি বের হলাম তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। গিয়ে উপস্থিত হলাম তার কাছে। তিনি পরম সহৃদয়ভাবে আমার পাণ্ডুলিপি দেখলেন এবং আমার যতটুকু মনে পড়ে, যথেষ্ট উৎসাহিতও করেছিলেন। তিনি একজন কর্মবীর, শশব্যস্ত মানুষ। কর্মসূচির তালিকা দীর্ঘ। প্রতিটি মুহূর্ত উম্মতের জন্য উৎসর্গকরা একজন ব্যক্তিত্ব। মনের কোণায় সুপ্ত বাসনা থাকলেও আমি তার ব্যস্ততার দিকে লক্ষ্য করে অভিমত ইত্যাদি লেখার আবেদন করি নি। তিনি যে একটু নজর বুলিয়েছেন, বরকতের জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এরপর যে মর্মান্তিক ঘটনাটি আমার পেছনে ধেয়ে আসছিল, সেটা মনে পড়লে এখনও সারা শরীর শিউরে উঠে।
ফিরতি পথে চড়লাম এক টেক্সিতে। সাথে ছিল এক প্রিয়ভাজন। তার সাথে ছিল বেশকিছু মালপত্র। ঘরে পৌঁছার পর তার সরঞ্জামাদি নামানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ায় গাড়ীর পেছনে রাখা আমার ফাইলের কথা একেবারেই ভুলে গেলাম। ফাইলটা টেক্সিতে রয়ে গেল, টেক্সি চলে গেল। টেক্সি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার পর আমার ফাইলের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। টেক্সির খোঁজে আমি সাধ্যের সবকিছুই করেছি; সম্ভবত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিলাম; কিন্তু এর কোনো সন্ধান আর পাওয়া যায় নি। তাকদিরে যা ছিল তাই হলো। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তো আর কিছুই হয় না। তখন ফটোকপি ও কম্পিউটারের প্রচলন তেমন হয় নি। পাণ্ডুলিপি আলাদা করে কপি রাখার ব্যবস্থা আর কী হবে? সুতরাং দীর্ঘদিনের সাধনা এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। হয়ত এই রচনাটা জনসম্মুখে না আসাটাই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল। আর নিশ্চয় এতেই নিহিত ছিল কোনো কল্যাণ, অন্যকোনো বড় প্রাপ্তি। মুমিনদের জন্য এটাই বড় সান্ত্বনা।
আরবি বক্তৃতা
সিরিয়ান শিক্ষকদের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে উস্তাদ আহমাদুল আহমাদের পক্ষ থেকে আমার প্রতি অপত্যস্নেহের একটি নিদর্শন ছিল, ছাত্রদের পক্ষ হয়ে আরবি বক্তৃতা দেওয়ার দায়িত্বটা আমার ওপরই বর্তাত। মনে হত, এ বিষয়ে আমার ওপর তাদের আস্থা ছিল অখণ্ড ও অদ্ভুত! দারুল উলুমে কোনো আরব মেহমান আসলে তাঁর উদ্দেশ্যে স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হত। ওই সময় ১৩৮২ হিজরির জুমাদাল উলা মোতাবেক ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে সিরিয়ার প্রসিদ্ধ আলেম শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ পাকিস্তানে সর্বপ্রথম আগমন করেন।
আমার আব্বাজান (রহ.) সিরিয়া সফরকালে হযরতের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন তিনি সেখান থেকে আমাদের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন তাতে তিনি শায়খের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
শায়খের পাকিস্তানসফরকালে তাঁর সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তাঁর গুণ-জ্ঞানে ভরাট বিশাল ব্যক্তিত্বের স্পর্শ পেয়ে আমি তাঁর ভক্তই হয়ে গেলাম। তিনি যখন দারুল উলুম আগমন করলেন, তখন যথারীতি তাঁর উদ্দেশ্যে স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্বটা আমার উপর ন্যস্ত হয়। আমি বক্তৃতায় তাকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি দারুল উলুম দেওবন্দ-প্রতিষ্ঠার শ্বাসরুদ্ধকর প্রেক্ষাপট এবং ভারতের উলামায়ে কেরামের বর্ণবহুল দীপ্তিমান অবদানের কথাও উল্লেখ করেছিলাম উদ্বেলিত এক আবেগে। পরবর্তী সময় শায়খ দারুল উলুম করাচির ‘পরিদনর্শবহি’তে আমাকে সাহস যোগানোর লক্ষ্যে কিছু প্রশংসাবাক্য লিখেন,
لقد كان من فصاحة الأخ الحبيب في الله الشيخ محمد تقي العثماني ما كشف عن تقصير العرب في لغتهم.
‘ভাই তাকি উসমানি, যাকে আমি কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসি, তাঁর আরবি ভাষার পাণ্ডিত্য এত উচুঁ পর্যায়ের যে, তিনি আরবি ভাষাভাষীদের সামনে নিজেদের ভাষায় তাদের দুর্বলতার কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।’[2]
আমার ব্যাপারে শায়খের এই পর্যবেক্ষণ ছিল নিশ্চতভাবেই একজন নগন্য ছাত্রকে উৎসাহিত করার নামান্তর। সেই উৎসহপ্রদানে তিনি একটু ‘বাড়ি বলা’কেও খারাপ কিছু মনে করেন নি; বরং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। এই সফরে তাঁর সাথে আমার এক নির্মল আন্তরিকতা গড়ে ওঠেছিল। তিনি যেখানেই যেতেন আমি সাথেই থাকার চেষ্টা করতাম। তাঁর আরবি বক্তৃতাগুলো উর্দু অনুবাদ করে দিতাম। এভাবে তার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার উচ্ছল ধারা বয়ে চলল কিছুদিন। ছায়ার মতোই লেগে আছি তাঁর সাথে। তিনি আরবিতে বক্তৃতা দেন, আমি উর্দুতে তরজমা করি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, لو كنت تفاحة لأكلتك (তুমি যদি আপেল হতে, তোমোকে আমি খেয়ে ফেলতাম)।
এরপর তিনি আমাকে تفاحة الهند وباكستان (ভারত ও পাকিস্তানের আপেল) উপাধিতে ভূষিত করেন। এমনকি তিনি নিজের একটি কিতাবে التصريح-এর টীকায় আমার নামের পাশে এই উপাধিটিও উল্লেখ করেছিলেন।
তাঁর প্রকাশমান আত্মজীবনী থেকে অনূদিত
মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ
শাহাদত হোসাইন হাবীবী
[1] আল-কুরআন, সুরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
[2] রোয়েদাদে দারুল উলুম দেওবন্দ, পৃ. ২৬
PDF ফাইল…
[button link=”http://at.jamiahislamiahpatiya.com/wp-content/uploads/2019/11/November19.pdf”]ডাউনলোড করতে এখানে টাচ বা ক্লিক করুন[/button]