শুক্রবার-২৫শে রজব, ১৪৪৭ হিজরি-১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আল্লাহ তাআলার অসাধারণ কিছু নিয়ামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা

আল্লাহ তাআলার অসাধারণ কিছু নিয়ামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা

আল্লাহ তাআলার অসাধারণ কিছু নিয়ামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা

মুহাম্মাদ শামীম হুসাইন

 

মহান আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত অগণিত নিয়ামতের মাঝে আমরা প্রতিনিয়ত ডুবে আছি। আমাদের জন্য তাঁর কী ব্যাপক আয়োজন, সুবিশাল নীলাকাশ, সুবিস্তৃত জমিন, চন্দ্র-সূর্য আর তারকাখচিত আসমান, সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত, নয়নাভিরাম পুষ্পরাজি, জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রজনী, উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী, দৃষ্টিনন্দন সমুদ্র-সৈকত, সবুজ বৃক্ষরাজি, সুদৃশ্য ঝর্ণাধারা, নির্মল সমীরণ, সুশীতল তৃষ্ণার পানি এবং আমাদের না-জানা এরকম আরও বহুকিছু। পবিত্র কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে,

وَاِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَةَ اللّٰهِ لَا تُحْصُوْهَاؕ ۰۰۱۸

‘আর যদি তোমরা আমার নিয়ামতসমূহ গণনা করতে থাক, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।[1]

কিন্তু কেন এত কিছুর আয়োজন তা কী ক্ষণিকের তরেও আমরা একটু চিন্তা করে দেখেছি?

আল্লাহ তাআলার এসব নিয়ামত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে অনেক হতাশা, ক্ষোভ ও না-প্রাপ্তির বেদনা প্রশমিত হয়ে মনের গভীরে এক অনাবিল প্রশান্তির অনুভূতি জাগ্রত হয়। যেমন কী না, দামী জুতা না-প্রাপ্তির বেদনায় ব্যথিত যুবক দুই পা-বিহীন কাউকে পর্যবেক্ষণ করে নিমিষে মনের মধ্যে এক স্বস্তি ও সান্ত্বনা অনুভব করতে পারে এ কথা ভেবে যে, জুতা না থাকলেও নিজের অন্তত দুটো পা তো আছে, আর তার যে পা-ই নেই।

সামান্য এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানির কথা ভাবলেই অনুভব করা যায় এটা কত বড় নিয়ামত। দ্বীনদার বাদশাহ হারুন-অর-রশীদ একবার ভীষণ পিপাসার্ত অবস্থায় পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পান করতে যাবেন এমন সময় বাহলুল নামক এক অত্যন্ত বিচক্ষণ ও জ্ঞানী আল্লাহঅলা পাগল, যার সাথে বাদশাহর ভালো সম্পর্ক ছিলো, তাঁকে প্রশ্ন করেন, আচ্ছা, পানি পানের আগে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। বাদশাহ বললেন, ঠিক আছে, কী প্রশ্ন? বাহলুল বললেন, এখন যদি আপনাকে পানি পান করতে না দেওয়া হয়, তাহলে এই পানির জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে রাজী আছেন। বাদশাহ বললেন, প্রয়োজনে আমার রাজ্যের অর্ধেকের বিনিময়ে হলেও আমি এক গ্লাস পানি পান করতে প্রস্তুত। বাহলুল বললেন, ঠিক আছে আপনি পান করুন। পানি পানের পর বাহলুল আবার প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, যে পানি আপনি পান করলেন তা যদি কোনো কারণে প্রস্রাব হয়ে আপনার শরীর থেকে বের না হয়, তাহলে তা বের করবার জন্য আপনি কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছেন। বাদশাহ বললেন, প্রয়োজনে রাজ্যের বাকী অর্ধেক দিয়ে হলেও আমি তা বের করার জন্য তৈরি আছি। বাহলুল বললেন, তাহলে বোঝা গেল আপনার রাজত্বের মূল্য এক গ্লাস পানির কাছে কিছুই না।

এভাবে আল্লাহ তাআলার নিয়ামত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে এসব নিয়ামতের অপরিসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্য কিছুটা হলেও আমাদের উপলব্ধিতে আসে।

আমাদের মজাদার খাবারসমূহের মধ্যে ইলিশ অন্যতম। একজন জেলে তার রাতের ঘুমকে নষ্ট করে, সংসার-সন্তানের মায়া ত্যাগ করে, নৌকাডুবি কিংবা উত্তাল ঢেউয়ের পরোয়া না করে নিজের জীবনকে বাজি রেখে পদ্মায় বা সাগরে মাছ ধরতে যায়। মাছ ধরতে গিয়ে অনেক সময় নানারকম দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় অনেক জেলের সলিল সমাধিও হয়ে থাকে। আহরিত মাছ জেলে বাজারে ছেড়ে দেন। সে মাছ কিনে এনে অনেকে রসনাকে তৃপ্ত করে। জেলে যদি মাছ না ধরতো বা ধৃত মাছ বাজারে না দিত তাহলে টাকা-পয়সা থাকা সত্ত্বেও ইলিশের ঘ্রাণ নেওয়া হয়তো সম্ভব হতো না। কেননা টাকা দিয়ে সব কিছু হয় না আর টাকা থাকলেই সবকিছু কেনা যায় না। জেলে বা অন্য কেউ যদি এ দয়াটুকু না করতো তাহলে ইলিশ খেতে চাইলে মাছ ধরার প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে পদ্মায় গিয়ে হাজির হতে হতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কত সহজ করে দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দেওয়ার জন্য তিনি অন্যের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করে দিয়েছেন। আজ দুনিয়াতে হাজারও পেশা থাকা সত্ত্বেও একজন জেলের দিলে ইলিশ ধরার স্পৃহা যিনি জ্বেলে দিলেন, ইলিশ খাওয়ার সময় সেই মহান দয়ালু রবের কথা কি একটিবারও আমরা স্মরণে আনি?

মজার পোলাও-এর স্বাদ নিতে গিয়ে আমরা কী কখনও দিনাজপুরের সেই হতদরিদ্র কৃষকের কথা ভেবেছি? যে কী না বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে অনেক কষ্ট আর পরিশ্রম করে পোলাও চালের চাষ করে ওই চাল আমাদের খাওয়ার জন্য বাজারে দিয়েছেন। আর যিনি পোলাওয়ের চালের চাষ করবার বাসনা ওই কৃষকের মনের মধ্যে তৈরি করে দিলেন একটিবারের জন্যও কী আমরা তাঁকে স্মরণ করি?

মানুষের আত্মিক প্রশান্তি ও স্বর্গীয় অনুভূতির এক চমৎকার ও উৎকৃষ্ট নিদর্শন ফুল। পৃথিবীতে কত সহস্র প্রজাতির ফুল আছে তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। প্রতিটা ফুলের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় ফুলের মতো অতি সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল উপকরণের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য। এর রঙ, বর্ণ, গন্ধ, আকার নিয়ে ভাবলে দিশেহারা হতে হয়। মহান রবের যে কী অপরিসীম রুচিবোধ আর পছন্দজ্ঞান চিন্তা করলে অবাক হতে হয়। এত অজস্র প্রকার আর প্রজাতির ফুল না হলেও তো কোনো অসুবিধা ছিল না। হাতে গোনা কয়েক প্রকার ফুলই তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু দয়ার সাগরের অফুরন্ত ভাণ্ডার যেন বান্দাকে সমস্ত কিছু দেবার জন্য সদা প্রস্তুত। মহাদানশীল সেই রব তাঁর প্রিয় বান্দার মনোরঞ্জনের জন্য দিয়েছেন মানুষের চিন্তা-চেতনা, ভাবনা আর কল্পনারও বাইরে। যিনি ফুলের মতো চিত্তাকর্ষক ও অসম্ভব সুন্দর জিনিস তৈরি করে তাঁর সৃষ্টি নৈপুণ্য ও কুদরতের কারিশমা প্রদর্শন করেছেন, সেই রব কতোই না মহান! বিন্দুমাত্র বিবেকবোধ আছে এমন কি কেউ পারে তার বিরোধিতা করতে? পারে কি তাঁর মহান হুকুমকে উপেক্ষা করতে? অন্তত যে মানুষ তার পক্ষে কখনও সম্ভব না সেই দয়ালু দাতার অযাচিত দানের কথা অস্বীকার করে বেমালুম তাঁকে ভুলে যাওয়া। নিজের অজান্তেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার মস্তক মহাপ্রভুর সীমাহীন অনুগ্রহের কথা স্মরণে নমিত না হয়ে পারে না। তার ভাবাবেগ আর অনুভূতিতে জোয়ার না এসে পারে না। এসব অকৃপণ দানের কথা ভেবে একজন মানুষ মহান রবের দেওয়া বিধি-বিধান হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার সাথে না মেনে পারে না, পারা সম্ভব না। কী আশ্চর্যের কথা! আমি দুনিয়ার সবকিছু চিনলাম কিন্তু আমার মালিককে চিনলাম না। কুকুরের মতো একটা নিকৃষ্ট প্রাণিও তার মালিককে চিনতে ভুল করে না। তাহলে আমি কি কুকুরের চেয়েও অধম হয়ে গেলাম? কিন্তু আমি না সৃষ্টির সেরা জীব। তাহলে আমার সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ কোথায়?

আল্লাহ তাআলার এক অসাধারণ সৃষ্টি ফল। কতো রকম স্বাদ, গন্ধ আর গড়নের ফল যে আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন তার হিসাব মেলানো অসম্ভব। কী অসাধারণ ও সুদৃশ্য মোড়কে অতি যত্ন ও আন্তরিকতার সাথে তিনি এসব ফল পাঠিয়েছেন ভাবলে অবাক লাগে। মানুষের প্রতি মহান রবের সীমাহীন মমতা ও হৃদ্যতার ব্যাপারটি অনুভব করা যায়। দুনিয়াতে বান্দার অস্তিত্বের গুরুত্ব ও তাৎপর্যও উপলব্ধি করা যায়। বান্দার কাছে মহান মালিকের উপঢৌকন প্রেরণের যে দৃষ্টিনন্দন ব্যবস্থাপনা তাতে আল্লাহ তাআলার অকল্পনীয় ও অসীম রুচিবোধ এবং সীমাহীন সৌন্দর্যজ্ঞান অনুভব করা যায়। দুনিয়াতে কোনো রাজা-বাদশাহ তার গোলামকে কোনো উপহার দেবার সময় তা কোনো মোড়কে মুড়িয়ে অত্যন্ত মর্যাদা ও যত্নের সাথে দেন কি? কখনো না। এটা সাধারণ রীতিও না। এটা কেউ চিন্তাও করে না। আর এটা চিন্তা বা কল্পনায় আনাও একজন গোলামের জন্য ভীষণ স্পর্ধার কাজ। বান্দার জন্য তাঁর অজস্র প্রকরণ ও ধরনের ফলের যোগান প্রমাণ করে কতো উদার সেই মহান আল্লাহ। দুনিয়ার কোনো রাজা-বাদশাহও তাঁর ঘনিষ্ঠ মেহমানের -যে কি না ভীষণ ফলপ্রিয়- আত্মতৃপ্তি ও সন্তুষ্টির জন্য অসংখ্য পদের ফল তাঁর সামনে পরিবেশন করে না। দুনিয়ার সুস্বাদু সকল প্রজাতির একটি করে ফল মেহমানের সম্মানে তাঁর সামনে পরিবেশনের কথা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনীর পক্ষে কল্পনায় আনাও সম্ভব না। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য তা করে দেখিয়েছেন। বান্দা মা’বুদ মাওলার কাছে কতটুকু প্রিয় তা কি ভাবা যায়? কী অসীম স্নেহ আর মমতা তাঁর এই অনুভূতিশূন্য বান্দার প্রতি!

এমন যে মহাদয়াময় মালিক তাঁকে কী কখনও ভুলে থাকা, স্মরণে না-আনা বা তাঁর নির্দেশ-নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা এই বান্দার পক্ষে সম্ভব?

মসলা মানবের জন্য মহান আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত এক অসাধারণ উপহার। পশু-পাখি, জন্তু-জানোয়ার কেবল খাবার পেয়েই খুশি। খাবার কতোটুকু সুস্বাদু বা মুখরোচক সে খবর তাদের নেই। কিন্তু মানুষের জন্য মেহেরবানি করে তিনি নানা বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদের মসলা প্রেরণ করেছেন। যদি তিনি এসব না দিতেন তাহলে হয়তো আমাদেরকে পশুর মতো কেবল খাবার খেয়েই খুশি থাকতে হতো। কী মহান সেই আল্লাহ যিনি আহারসামগ্রীকে স্বাদবর্ধক ও রুচিবর্ধক করার মাধ্যমে আমাদের রসনাকে পরিতৃপ্ত করার এক অভাবনীয় ব্যবস্থা রেখে দিয়েছেন। কোনো রাষ্ট্রপধান কারো মেহমান হলে মেজবান তাঁকে খুশি করবার জন্য যেভাবে তার সর্বোচ্চ আন্তরিক প্রয়াস চালায়, মহাদয়ালু মনিবও যেন আমাদের পরিপূর্ণ তৃপ্তির জন্য তাঁর অফুরন্ত ভাণ্ডারের সকল দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। সামান্য একটু বিরিয়ানির কথাই ধরা যাক। যদি রান্না করবার সময় তাতে আদা, জিরা, দারুচিনি, কিসমিস, লবঙ্গ, গোলমরিচ, পোস্তদানা, ক্যাওড়া জল, জায়ফল, জয়িত্রী, এলাচ, তেজপাতা, ধনিয়া কিংবা আলু বোখারার সংমিশ্রণ না ঘটে তাহলে এত লোভনীয় খাবারও খাবার অযোগ্য হয়ে যায়। কী আশ্চর্য! খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য মসলার ন্যায় অতি সূক্ষ্ম জিনিসও তিনি আমাদের জন্য প্রেরণ করেছেন।

কী অদ্ভুত আচরণ আমাদের! আমাদের হৃদয়হীনতার কী কোনো তুলনা আছে? দুনিয়াতে কেউ যদি কারো কোনো বড় ধরনের উপকার করে থাকে তাহলে সে ওই ব্যক্তির চাকর বনে যায়। শ্রদ্ধা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনো ভাষা সে খুঁজে পায় না। সর্বত্র সে এ উপকারের কথা বলে প্রশান্তি পায়। কিন্তু আফসোস! মহাপ্রভু আল্লাহ তাআলার সীমাহীন দান আর অকৃপণ অনুগ্রহ আমরা সর্বক্ষণ ভোগ করবার পরও একটিবারের জন্যও তাঁর নাম স্মরণ না করা কতবড় অকৃতজ্ঞতা তার কী কোনো সীমারেখা আছে? তাইতো মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাকে দেওয়া অফুরন্ত নিয়ামতের ব্যাপারে সূরা আর-রহমানেই তিনি ১৩ বার প্রশ্ন রেখেছেন,

فَبِاَيِّ اٰلَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبٰنِ۰۰۱۳

‘হে জিন মানব! তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?’

কেবল কল্পিত আর কাঙ্ক্ষিত জিনিস প্রাপ্তির আশায় আমাদের হস্তগত নিয়ামতও আমরা উপভোগ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। কী অদ্ভুত এক ধোঁকা আমাদেরকে বোকা বানিয়ে রেখেছে তা আমরা বুঝতেও পারছিনা। কী মহাসম্পদ দিয়ে মেহেরবান মা’বুদ আমাদেরকে কানায় কানায় ভরপুর করে দিয়েছেন তা কি একটু ভেবে দেখেছি? কেবল হায়-হায় আর নাই-নাই করেই জীবন অতিবাহিত হয়ে গেল। কী কী আছে তা ভাববার বা জানবার ফুসরতও পেলাম না। যদি কখনও তা অনভূতিতে ধরা পড়তো তাহলে এই দেহ ও মন দয়ালু দাতার দরবারে সিজদাবনত হতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হতো না।

সত্যিই বড় আশ্চর্যের বিষয়! এটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে? এতটা নিমকহারাম আমরা কীভাবে হতে পারি? তাহলে কি আমরা আমাদের অনুভূতি আর চেতনা সবকিছু বিসর্জন দিয়েছি? আমরা কি ল্যাবরেটরির ক্লোরোফরম করা ব্যাঙ না অপারেশন থিয়েটারের এনেস্থেসিয়া দেওয়া চেতনাবিহীন রোগী? একটি ব্যাঙ বা অজ্ঞান রোগীও কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময় পর তার হুঁশ ফিরে পায়। কিন্তু আমাদের কী হলো? আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা, বড় বড় ডিগ্রি, সার্টিফিকেট সবই কি বেকার হয়ে গেল আমাদের অনুভূতিকে ফিরিয়ে আনতে? আমরা কি নির্জনে ভেবে দেখেছি ব্যাপারটি কত ভয়াবহ? কী জবাব দিব সেই মহান প্রতিপালকের দরবারে যেখানে দিন শেষে আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে?

কোনো বিবেকবান, অনুভূতিসম্পন্ন ও ধর্মপ্রাণ কেউ যখন আল্লাহ তাআলার কোনো নিয়ামত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করে তখন নিজের অজান্তেই তাঁর দুচোখ বেয়ে পানি না এসে পারে না। অত্যন্ত সৎ, নীতিবান ও সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বিষয়ে আলোচনায় আসা যাক। অফিসের কাজে একদিন তিনি গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছিলেন। সাথে ছিল তাঁর দেহরক্ষী। পথিমধ্যে তিনি ড্রাইভারকে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন। কোনো প্রয়োজনে রাস্তার পাশের দোকানের দিকে এগিয়ে যান। দেহরক্ষীকে বলেন সাথে না-যেতে। দেহরক্ষী তাই দূর থেকে স্যারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ স্যারের নজর পড়ে রাস্তার পাশে ভাঙা-প্লেট-হাতে বসে থাকা এক অসহায় ভিক্ষুকের দিকে। তখন তিনি ভিক্ষুকের দিকে এগিয়ে যান এবং তাকে কিছু একটা দেন। এরপর তিনি গাড়ির দিকে ফিরে আসার সময় রুমাল দিয়ে চোখ মুছছিলেন। দেহরক্ষী ব্যাপারটি ঠিক বুঝে উঠতে না পেরে বিনীতভাবে স্যারকে জিজ্ঞেস করে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। উত্তরে স্যার কোনো সমস্যা না হবার কথা বলেন। দেহরক্ষী ক্ষমা চেয়ে আবার জানতে চায় স্যারের চোখে পানি কেন। অবশেষে স্যার বলেন, প্রখর রোদের ভেতর বসে থাকা ওই অসহায় ভিক্ষুকের অবস্থা দেখে ভাবছিলাম দুটি পয়সার জন্য কতো অনুনয়-বিনয় করছে কিন্তু কেউ তেমন ফিরেও তাকাচ্ছে না। ভাবছিলাম, আজ যদি ভাঙা-প্লেট হাতে দিয়ে আমাকে আল্লাহ তাআলা ওইখানে বসিয়ে দিতেন তো আমার কিছুই করার ছিল না। তাই আমার প্রতি মহান আল্লাহ তাআলার সীমাহীন দয়া-মায়ার কথা চিন্তা করতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।

সন্তানের জন্য মায়ের চেয়ে দরদি এই ভুবনে আর কেউ নেই। অনেক সময় মা-ও সন্তানের অবাধ্যতা, উচ্ছৃঙ্খলতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দুএক বেলা তার খাবার বন্ধ করে দেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলার কী মেহেরবানি যে, বান্দা নাফরমানি করার পরও সঙ্গে সঙ্গে তার খাবার বন্ধ করে দেন না, চোখের গুনাহের কারণে চোখ অন্ধ করে দেন না, হাত দিয়ে অন্যায় কাজ করায় হাতকে অবশ বা পঙ্গু করে দেন না। বান্দার জন্য আলো, বাতাস, পানি সবকিছুই তিনি চালু রাখেন। শুধু কী তাই? দুনিয়ায় এমন অনেক বান্দা আছে যারা তার সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে পর্যন্ত অস্বীকার করে। কী সীমাহীন দয়ার সাগর সেই রব্বুল আলামীন। দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট, ঘৃণিত ও পাপিষ্ঠ লোকের প্রতিও দয়াবানের দয়ার কথা চিন্তা করলে গা শিউরে ওঠে। যে বান্দা তার রবের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে তিনি তারও খাবারের যোগান দিয়ে যাচ্ছেন। কী বিশাল উদারতা আর মহানুভবতা যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কেবল অস্বীকার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সর্বশক্তিমান মালিকের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছে এমন নরাধম পশুর প্রতিও দয়ালু দাতার অনুগ্রহ ও কৃপার কোনো ঘাটতি বা কমতি নেই। এমন সীমাহীন দয়ালু আল্লাহর হুকুমকে কি অমান্য করা যায়? যে মানুষ সে কি কখনও তা পারে?

[1] আল-কুরআন, সুরা আন-নাহল, ১৬:১৮

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ