বুধবার-২৪শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি-১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.)

হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.)

এমএ ইমরান

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লিকুল্লি উম্মাতিন আমীনুন, ওয়া আমীনু হাযিহিল উম্মাহ আবু উবাইদা (প্রত্যেক জাতিরই একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি আছে। আর এ মুসলিম জাতির পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি আবু উবাইদা)।’

তিনি ছিলেন উজ্জ্বল মুখমণ্ডল, গৌরকান্তি, হালকা পাতলা গড়ন ও দীর্ঘদেহের অধিকারী। তাঁকে দেখলে যে কোন ব্যক্তির চোখ জুড়িয়ে যেত, সাক্ষাতে অন্তরে ভক্তি ও ভালবাসার উদয় হত এবং হৃদয়ে একটা নির্ভরতার ভাব সৃষ্টি হত। তিনি ছিলেন তীক্ষ্ম মেধাবী, অত্যন্ত বিনয়ী ও লাজুক প্রকৃতির। তবে যে কোন সংকট মুহূর্তে সিংহের ন্যায় চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁর মধ্যে ফুটে উঠত। তাঁর চারিত্রিক দীপ্তি ও তীক্ষ্মতা ছিল তরবারির ধারের ন্যায়। রাসুল (সা.)-এর ভাষায় তিনি ছিলেন উম্মতে মুহাম্মদীর আমীন (বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি)।

তাঁর পুরো নাম আমীল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ আল-ফিহরী আল-কুরাইশী। তবে কেবল আবু উবাইদা নামে তিনি সবার কাছে পরিচিত। তাঁর পঞ্চম ঊর্ধ্ব পুরুষ ফিহরের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। তাঁর মাও ফিহরী খান্দানের কন্যা। সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.)-এর মন্তব্য হল, ‘কুরাইশদের তিন ব্যক্তি অন্য সকলের থেকে সুন্দর চেহারা, উত্তম চরিত্র ও স্থায়ী লজ্জাশীলতার জন্য সর্বশেষ্ঠ। তাঁর তোমাকে কোন কথা বললে মিথ্যা বলবেন না, আর তুমি তাদেরকে কিছু বললে তোমাকে মিথ্যুক মনে করবেন না। তাঁরা হলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাযি.) ও হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.)।’

ইসলাম প্রচারের প্রথম ভাগেই যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর মুসলমান হওয়ার পরের দিনই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর হাতেই তিনি তাঁর ইসলামের ঘোষণা দেন। তারপর তিনি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাযি.), হযরত উসমান ইবনে মাযউন (রাযি.), হযরত আল-আরকাম ইবনে আবুল আরকাম (রাযি.)-এর তাঁকে সঙ্গে করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হন। সেখানে যারা সকলেই একযোগে ইসলামের ঘোষণা দেন। এভাবে তাঁরাই হলেন মহান ইসলামি ইমারতের প্রথম ভিত্তি।

মক্কায় মুসলিমদের তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) শরীক চিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অটল থেকে আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি বিশ্বাসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় কামিয়াব হন। কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে দু’বার হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের পর তিনিও মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় হযরত সা’দ ইবনে মুআয (রাযি.)-এর সাথে তাঁর দীনী মুয়াখাত বা দীনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বদর যুদ্ধের দিন হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর পরীক্ষার কঠোরতা ছিল সকল ধ্যান-ধারণা ও কল্পনার ঊর্ধ্বে। যুদ্ধের ময়দানে এমন বেপরোয়াভাবে কাফিরদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকেন যেন তিনি মৃত্যুর প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। মুশরিকরা তাঁর আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের অশ্বারোহী সৈনিকরা প্রাণের ভয়ে দিশেহারা হয়ে দিকবিদিক পালাতে থাকে। কিন্তু শত্রুপক্ষের এক ব্যক্তি বার বার ঘুরে ফিরে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াতে লাগল। আর তিনিও তার সামনে থেকে সরে যেতে লাগলেন যেন তিনি সাক্ষাত এড়িয়ে যাচ্ছেন। লোকটি ভীড়ের মধ্যে প্রবেশ করল। হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) সেখানেও তাকে এড়িয়ে চলতে লাগলেন। অবশেষে সে শত্রুপক্ষ ও হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর মাঝখানে এসে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। যখন তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল, তিনি তাঁর তরবারির এক আঘাতে লোকটির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছন্ন করে ফেলেন। লোকটি মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।

লোকটি কে? সে আর কেউ নয়। সে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ। প্রকৃতপক্ষে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) তাঁর পিতাকে হত্যা করেননি, তিনি তাঁর পিতার আকৃতিতে শিরক বা পৌত্তলিকতা হত্যা করেছেন। এ ঘটনার পর আল্লাহ তাআলা হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) ও তাঁর পিতার শানে নিম্নের এ আয়াতটি নাযিল করেন,

لَا تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُوْنَ بِاللّٰهِ وَ الْيَوْمِ الْاٰخِرِ يُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللّٰهَ وَرَسُوْلَهٗ وَلَوْ كَانُوْۤا اٰبَآءَهُمْ اَوْ اَبْنَآءَهُمْ اَوْ اِخْوَانَهُمْ اَوْ عَشِيْرَتَهُمْ١ؕ اُولٰٓىِٕكَ كَتَبَ فِيْ قُلُوْبِهِمُ الْاِيْمَانَ وَاَيَّدَهُمْ بِرُوْحٍ مِّنْهُ١ؕ وَيُدْخِلُهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِيْنَ فِيْهَا١ؕ رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ١ؕ اُولٰٓىِٕكَ حِزْبُ اللّٰهِ١ؕ اَلَاۤ اِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَؒ۰۰۲۲

‘তোমরা কখনো এমনটি দেখতে পাবে না যে, আল্লাহ পরকালের প্রতি ঈমানদার লোকেরা কখনো তাদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করে যারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে তারা তাদের পিতাই হোক কিংবা তাদের পুত্র-ই হোক বা ভাই হোক অথবা তাদের বংশ-পরিবারের লোক। তারা সেই লোক যাদের দিলে আল্লাহ তাআলা ঈমান দৃঢ়মূল করে দিয়েছেন এবং নিজের তরফ হতে একটা রূহ দান করে তাদেরকে এমন সব জান্নাতে দাখিল করবেন যার নিম্নদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান হবে। তাতে তারা চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও সন্তুষ্ট হয়েছেন তাঁর প্রতি। এরা আল্লাহর দলের লোক। জেনে রাখ, আল্লাহর দলের লোকেরাই কল্যাণপ্রাপ্ত হবে।[1]

হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর এরূপ আচরণে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, আল্লাহর প্রতি তাঁর দৃঢ় ঈমান, দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠা, এবং উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি তাঁর আমানতদারী তাঁর মধ্যে এমন চূড়ান্ত রূপলাভ করেছিল যে, তা দেখে অনেক মহান ব্যক্তিও ঈর্ষা পোষণ করতেন। হযরত মুহাম্মদ ইবনে জাফর (রাযি.) বলেন, ‘খ্রিস্টানদের একটা প্রতিনিধি দল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে বললো, হে আবুল কাসিম! আপনার সাথীদের মাঝ থেকে আপনার মনোনীত কোন একজনকে আমাদের সাথে পাঠান। তিনি আমাদের কিছু বিতর্কিত সম্পদের ফায়সালা করে দেবেন। আপনাদের মুসলিম সমাজ আমাদের সবার কাছে মনোপূত ও গ্রহণযোগ্য। একথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, ‘সন্ধ্যায় তোমরা আমার কাছে আবার এসো। আমি তোমাদের সাথে একজন দৃঢ়চেতা ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে পাঠাব।’ হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) বলেন, ‘আমি সেদিন সকাল সকাল জোহরের নামায আদায়ের জন্য মসজিদে উপস্থিত হলাম। আর আমি এ দিনের মত আর কোন দিন নেতৃত্বের জন্য লালায়িত হইনি। এর একমাত্র কারণ, আমিই যেন হতে পারি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ প্রশংসার পাত্রটি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সাথে জোহরের নামায শেষ করে ডানে বায়ে তাকাতে লাগলেন। আর আমিও তাঁর নজরে আসার জন্য আমার গর্দানটি একটু উঁচু করতে লাগলাম। কিন্তু তিনি তাঁর চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে এক সময় হযরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রাযি.)-কে দেখতে পেলেন। তাঁকে ডেকে তিনি বললেন, ‘তুমি তাদের সাথে যাও এবং সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে তাদের বিতর্কিত বিষয়টির ফায়সালা করে দাও।’ আমি তখন মনে মনে বললাম, আবু উবাইদা এ মর্যাদাটি ছিনিয়ে নিয়ে গেল।

হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) কেবল একজন আমানতদারই ছিলেন না, আমানতদারীর জন্য সর্বদা সকল শক্তি পুঞ্জিভূত করতেন। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে কুরাইশ কাফিলার গতিবিধি অনুসরণের জন্য রাসুল (সা.) একদল সাহাবীকে পাঠান। তাঁদের আমীর নিযুক্ত করেন আবু উবাইদাকে। পাথেয় হিসাবে তাঁদেরকে কিছু খোরমা দেওয়া হয়। প্রতিদিন হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) তাঁর প্রত্যেক সঙ্গীকে মাত্র একটি খোরমা দিতেন। তাঁরা শিশুদের মায়ের স্তন চোষার ন্যায় সারাদিন সেই খোরমাটি চুষে চুষে এবং পানি পান করে কাটিয়ে দিত। এভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র একটি খোরমা দিতেন। তাঁর শিশুদের মায়ের স্তন চোষার ন্যায় সারাদিন সেই খোরমাটি চুষে চুষে এবং পানি পান করে কাটিয়ে দিত। এভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র একটি খোরমাই তাঁদের জন্য যথেষ্ট ছিল। কোন কোন বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, অষ্টম হিজরীতে রজব মাসে রাসুল (সা.) হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর নেতৃত্বে উপকূলীয় এলাকায় কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য একটি বাহিনী পাঠান। কিছু খেজুর ছাড়া তাঁদের সাথে আর কোন পাথেয় ছিল না। সৈনিকদের প্রত্যেকের জন্য দৈনিক বরাদ্দ ছিল মাত্র একটি খেজুর। এই একটি খেজুর খেয়েই তাঁর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত করেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁদের এ বিপদ দূর করেন। সাগর তীরে তাঁরা বিশাল আকৃতির এক মাছ লাভ করেন এবং তার ওপর নির্ভর করেই তাঁরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। হয়তো এ দুটি পৃথক পৃথক ঘটনা ছিল।

উহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা যখন পরাজয় বরণ করে এবং মুশরিকরা জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে থাকে, মুহাম্মদ কোথায়, মুহাম্মদ কোথায়?। তখন আবু উবাইদা ছিলেন সেই দশ ব্যক্তির অন্যতম যারা বুক পেতে রাসুল (সা.)-কে মুশরিকদের তীর থেকে রক্ষা করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাঁত শহীদ হয়েছে, তাঁর কপাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে এবং গণ্ডদেশে বর্মের দুটি বেড়ি বিঁধে গেছে। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.) বেড়ি দুটিকে উঠিয়ে ফেলার জন্য তড়িঘড়ি এগিয়ে এলেন। হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) তাঁকে বললেন, ‘কসম আল্লাহর! আপনি আমাকে ছেড়ে দিন।’ তিনি ছেড়ে দিলেন। ঘযরত আবু উবাইদা (রাযি.) ভয় করলেন হাত দিয়ে বেড়ি দুটি তুললে রাসুল (সা.) হয়তো কষ্ট পাবেন। তিনি শক্তভাবে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে প্রথমে একটি তুলে ফেললেন। কিন্তু তাঁরও অন্য একটি দাঁত ভেঙে গেল। তখন হযরত আবু বকর (রাযি.) মন্তব্য করলেন, ‘আবু উবাইদা সর্বোত্তম ব্যক্তি।’ খন্দক ও বনি কুরাইযা অভিযানেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। হুদাইবিয়ার ঐতিহাসিক চুক্তিতে তিনি একজন সাক্ষী হিসেবে সাক্ষর করেন। খাইবার অভিযানে সাহস ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। যাতুস সালাসিল অভিযানে হযরত আমর ইবনুল আস (রাযি.)-এর বাহিনীর সাহায্যের জন্য ২০০ সিপাহীসহ রাসুল (সা.) হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-কে পিছনে পাঠান। তাঁরা জয়লাভ করেন। মক্কা বিজয়, তায়িফ অভিযানসহ সর্বক্ষেত্রে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) শরীক ছিলেন। বিদায় হজ্জেও তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সফরসঙ্গী ছিলেন।

ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) সর্বক্ষেত্রে ছায়ার ন্যায় সর্বদা তাঁকে অনুসরণ করেন।

সাকীফায়ে বনি সায়িদাতে খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে তুমুল বাক-বিতণ্ডা চলছে। হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) আনসারদের লক্ষ করে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন। তাদের সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘ওহে আনসার সম্প্রদায়! তোমরাই প্রথম সাহায্যকারী। আজ তোমরাই প্রথম বিভেদ সৃষ্টিকারী হয়ো না।’ এক পর্যায়ে হযরত আবু বকর (রাযি.) হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-কে বলেন, আপনি হাত বাড়িয়ে দিন, আমি আপনার হাতে বায়আত করি। আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক জাতিরই একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি আছে, তুমি এ জাতির সেই বিশ্বস্ত ব্যক্তি।’ এর জবাবে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) বললেন, ‘আমি এমন ব্যক্তির সামনে হাত বাড়াতে পারি না যাকে রাসুল (সা.) আমাদের নামাযের ইমামতির আদেশ করেছেন এবং যিনি তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ইমামতি করেছেন।’ একথার পর হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর হাতে বায়আত করা হল। হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর খলীফা হওয়ার পর সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের ক্ষেত্রে তিনি তাঁর সর্বোত্তম উপদেষ্টা ও সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করেন। হযরত আবু বকর (রাযি.)-এর পর হযরত ওমর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) তাঁরও আনুগত্য মেনে নেন।

হযরত আবু বকর (রাযি.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হিজরী ১৩ সনে সিরিয়ায় অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেন। হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-কে হিমস, হযরত ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রাযি.)-কে দিমাশক, হযরত শুরাহবীল (রাযি.) কে জর্দান এবং হযরত আমর ইবনুল আস (রাযি.)-কে ফিলিস্তিনে যাত্রার নির্দেশ দিলেন। সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করলেন হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-কে। দিমাশক, হিমস, লাজেকিয়া প্রভৃতি শহর বিজিত হয় হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর হাতে। ইয়ারমুকের সেই ভয়াবহ যুদ্ধ তিনিই পরিচালনা করেন। হযরত আমর ইবনুল আস (রাযি.)-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বায়তুল মাকদাস বিজয়ে শরীক হন। বায়তুল মাকদাসবাসীরা খোদ খলীফা হযরত ওমর (রাযি.)-এর সাথে সন্ধির ইচ্ছা প্রকাশ করলে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)ই সে কথা জানিয়ে খলীফাকে পত্র লেখেন। সন্ধিপত্রে ¯^v¶i করার জন্য খলীফা জাবিয়া পৌঁছলে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। হিজরী ১৭ সনে হযরত খালিদ সাইফুল্লাহ (রাযি.)-কে দিমাশেকর আমীর ও ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করে খলীফা ওমর হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-কে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন। হযরত খালিদ সাইফুল্লাহ লোকদের বলেন, ‘তোমাদের খুশি হওয়া উচিত যে, আমীনুল উম্মত তোমাদের ওয়ালী।’

হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সিরিয়ায় একের পর এক বিজয় লাভ করে সিরিয়ার সমগ্র ভূখণ্ড দখল করে চলেছে। এ সময় সিরিয়ায় মহামারী আকারে প্লেগ দেখা দেয় এবং প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তার শিকারে পরিণত হয়। খলীফা হযরত ওমর রা. নিজেই খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য রাজধানী মদীনা থেকে সারগ নামক স্থানে পৌঁছুলেন। অন্য নেতৃবৃন্দের সাথে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) সেখানে খলীফাকে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রবীণ মুহাজির ও আনসারদের সাথে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করলেন। সবাই একবাক্যে সেনাবাহিনীর সদস্যদের স্থান ত্যাগের পক্ষে মত দিলেন। হযরত ওমর সবাইকে আহ্বান জানালেন তাঁর সাথে আগামী কাল মদীনায় ফিরে যাওয়ার জন্য। তাকদীরের প্রতি গভীর বিশ্বাসী হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) বেঁকে বসলেন। খলীফাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আ ফিরারুম মিন কাদলিল্লাহ একি (আল্লাহর তাকদীর থেকে পলায়ন নয়?)’ খলীফা দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, ‘আফসুস! আপনি ছাড়া কথাটি অন্য কেউ যদি বলতো! হাঁ, আল্লাহর তাকদীর থেকে পালাচ্ছি। তবে অন্য এক তাকদীরের দিকে। হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) তাঁর বাহিনীসহ সেখানে থেকে গেলেন। খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত ওমর মদীনা পৌঁছে দূত মারফত হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-কে একখানা পত্র পাঠান। পত্রে তিনি লিখেন, ‘আপনাকে আমার খুবই প্রয়োজন। অত্যন্ত জরুরীভাবে আপনাকে আমি তলব করছি। আমার এ পত্রখানি যদি রাতের বেলা আপনার কাছে পৌঁছে তাহলে সকাল হওয়ার পূর্বেই রওয়ানা দেবেন। আর যদি দিনের বেলা পৌঁছে তাহলে সন্ধ্যার পূর্বেই রওয়ানা দেবেন।’ খলীফা ওমরের এ পত্রখানি হাতে পেয়ে তিনি মন্তব্য করেনঃ ‘আমার কাছে আমীরুল মুমিনীনের প্রয়োজনটা কি তা আমি বুঝেছি। যে বেঁচে নেই তাকে তিনি বাঁচাতে চান। তারপর তিনি লিখলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন! আমি আপনার প্রয়োজনটা বুঝেছি। আমি তো মুসলিম মুজাহিদদের মাঝে অবস্থান করছি। তাদের ওপর যে মুসিবাত আপতিত হয়েছে তা থেকে আমি নিজেকে বাঁচানোর প্রত্যাশী নই। আমি তাদেরকে ছেড়ে যেতে চাই না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেন। আমার এ পত্রখানি আপনার হাতে পৌঁছার পর আপনি আপনার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করুন এবং আমাকে এখানে অবস্থানের অনুমতি দান করুন।’

হযরত ওমর (রাযি.) এ পত্রখানি পাঠ করে এত ব্যাকুলভাবে কেঁদেছিলেন যে, তাঁর দু’চোখ থেকে ঝর ঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর এ কান্না দেখে তার আশেপাশের লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমীরুল মুমিনীন! হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) কি ইনতিকাল করেছেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘না। তবে তিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।’

হযরত ওমর (রাযি.)-এর ধারণা মিথ্যা হয়নি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্লেগে আক্রান্ত হন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে উপদেশমূলক একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদেরকে যে উপদেশটি আমি দিচ্ছি তোমরা যদি তা মেনে চলো তাহলে সবসময় কল্যাণের পথেই থাকবে। তোমরা নামায কায়েম করবে, রামাযান মাসে রোযা রাখবে, যাকাত দান করবে, হজ ও ওমরা আদায় করবে, একে অপরকে উপদেশ দেবে, তোমাদের শাসক ও নেতৃবৃন্দকে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলবে, তাদের কাছে কিছু গোপন রাখবে না এবং দুনিয়ার সুখ সম্পদে গা ভাসিয়ে দেবে না। কোন ব্যক্তি যদি হাজার বছরও জীবন লাভ করে, আজ আমার পরিণতি তোমরা দেখতে পাচ্ছ তারও এই একই পরিণতি হবে।’ সকলকে সালাম জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন। অতঃপর হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাযি.)-এর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘মুআয! তুমি নামাযের ইমামতি কর।’ এর পরপরই তাঁর রূহটি পবিত্র দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরম সত্তার দিকে ধাবিত হয়। মুআয উঠে দাঁড়িয়ে সমবেত সকলকে লক্ষ করে বলেন, লোক সকল! তোমরা এ ব্যক্তির তিরোধানে ব্যথা ভারাক্রান্ত। আল্লাহর কসম! আমি এ ব্যক্তির থেকে অধিক কল্যাণদৃপ্ত বক্ষ, পরিচ্ছন্ন হৃদয়, পরকালের প্রেমিক এবং জনগণের উপদেশ দানকারী আর কোন ব্যক্তিকে জানিনা। তোমরা তাঁর প্রতি রহম কর, আল্লাহও তোমাদের প্রতি রহম করবেন। এটা হিজরী ১৮ সনের ঘটনা।

এরপর লোকেরা সমবেত হয়ে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর মরদেহ বের করে আনলো। মুআয ইবনে জাবালের ইমামতিতে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হল। মুআয ইবনে জাবাল, আমর ইবনুল আস ও দাহ্‌হাক ইবনে কায়েস কবরের মধ্যে নেমে তাঁর লাশ মাটিতে শায়িত করেন। কবরে মাটিচাপা দেওয়ার পর মুআয এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে তাঁর প্রশংসা করে বলেন, ‘হযরত আবু উবাইদা (রাযি.), আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন! আল্লাহর কসম! আমি আপনার সম্পর্কে যতটুকু জানি কেবল ততটুকুই বলবো, অসত্য কোন কিছু বলবো না। কারণ আমি আল্লাহর শাস্তির ভয় করি। আমার জানা মতে আপনি ছিলেন আল্লাহকে অত্যধিক স্মরণকারী, বিনম্রভাবে যমীনের ওপর বিচরণকারী ব্যক্তিদের একজন। আর আপনি ছিলেন সেইসব ব্যক্তিদের অন্যতম যারা তাদের রবের উদ্দেশ্যে সিজদারত ও দাঁড়ানোর অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করে এবং যারা খরচের সময় অপচয়ও করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করে থাকে। আল্লাহর কসম; আমার জানা মতে আপনি ছিলেন বিনয়ী এবং ইয়াতিম-মিসকীনদের প্রতি সদয়। আপনি ছিলেন অত্যাচারী অহংকারীদের শত্রুদেরই একজন।’

খাওফে খোদা, ইত্তেবায়ে সুন্নাত, তাকওয়া, বিনয়, সাম্যের মনোভাব, স্নেহ ও দয়া ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। একদিন একটি লোক হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর বাড়িতে গিয়ে দেখতে পেল, তিনি হাউমাউ করে কাঁদছেন। লোকটি জিজ্ঞেস করলো, ব্যাপার কি আবু উবাইদা, এত কান্নাকাটি কেন? তিনি বলতে লাগলেন, ‘একবার রাসুল (সা.) মুসলমানদের ভবিষ্যত বিজয় ও ধন-ঐশ্বর্যের আলোচনা প্রসঙ্গে সিরিয়ার প্রসঙ্গ উঠালেন। বললেন, ‘আবু উবাইদা তখন যদি তুমি বেঁচে থাক, তাহলে তিনটি খাদেমই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। একটি তোমার নিজের, একটি পরিবার-পরিজনের এবং অন্যটি তোমার সফরে সঙ্গী হওয়ার জন্য। অনুরূপভাবে তিনটি বাহনও যথেষ্ট মনে করবে। একটি তোমার, একটি তোমার খাদেমের এবং একটি তোমার জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য।’ কিন্তু এখন দেখছি, আমার বাড়ি খাদেমে এবং আস্তাবল ঘোড়ায় ভরে গেছে। হায়, আমি কিভাবে রাসুলুল্লাহকে (সা.) মুখ দেখাবো? রাসুল (সা.) বলেছিলেন, সেই ব্যক্তিই আমার সর্বাধিক প্রিয় হবে, যে ঠিক সেই অবস্থায় আমার সাথে মিলিত হবে যে অবস্থায় আমি তাকে ছেড়ে যাচ্ছি।’

খলীফা হযরত ওমর (রাযি.) সিরিয়া সফরের সময় দেখতে পেলেন, অফিসারদের গায়ে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক-পরিচ্ছদ। তিনি এতই ক্ষেপে গেলেন যে, ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন এবং তাদের দিকে পাথরের টুকরো নিক্ষেপ করতে করতে বললেন, তোমরা এত তাড়াতাড়ি অনারব অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছো কিন্তুহযরত আবু উবাইদা (রাযি.) একজন সাদামাটা আরব হিসেবে খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। গায়ে অতি সাধারণ আরবীয় পোশাক, উটের লাগামটিও একটি সাধারণ রশি। খলীফা ওমর (রাযি.) তাঁর বাসস্থানে গিয়ে দেখতে পেলেন, সেখানে আরও বেশি সরল-সাদাসিধে জীবনধারার চিহ্ন। অর্থাৎ একটি তলোয়ার একটি ঢাল ও উটের একটি হাওদা ছাড়া তাঁর বাড়িতে আর কিছু নেই। খলীফা বললেন, আবু উবাইদা, আপনি তো আপনার প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের ব্যবস্থা করে নিতে পারতেন।’ জবাবে হযরত আবু উবাইদা (রাযি.) বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আমাদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

একবার হযরত ওমর (রাযি.) উপঢৌকন হিসেবে ৪০০ দীনার ও চার হাজার দিরহাম হযরত আবু উবাইদা (রাযি.)-এর নিকট পাঠালেন। তিনি সব অর্থই সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। নিজের জন্য একটি পয়সাও রাখলেন না। হযরত ওমর (রাযি.) একথা শুনে মন্তব্য করেন, ‘আল-হামদু লিল্লাহ! ইসলামে এমন লোকও আছে।’

তিনি এতই বিনয়ী ছিলেন যে, সিপাহসালার হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ সৈনিকদের থেকে তাঁকে পৃথক করা যেত না। অপরিচিত কেউ তাকে সিপাহসালার বলে চিনতে পারতো না। একবার তো এক রোমান দূত এসে জিজ্ঞেস করেই বসে, ‘আপনাদের সেনাপতি কে? সৈনিকরা যখন আঙ্গুর উঁচিয়ে তাঁকে দেখিয়ে দিল, তখন তো সে সেনাপতির অতি সাধারণ পোশাক ও অবস্থান দেখে হতভম্ব হয়ে গেল।

[1] আল-কুরআন, সূরা আল-মুজাদালা, ৫৮:২২

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ