ভাষা আন্দোলনের অকুণ্ঠ সমর্থক খতিবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (রহ.)
সাঈদ হোসাইন
খতিবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (রহ.) এ দেশের খ্যাতনামা একজন আলিম, মুহাদ্দিস, বক্তা, রাজনীতিক ও জাতীয় সংসদ সদস্য। বাংলাদেশে ও ভারতে উরদু ও আরবি মাধ্যমে লেখাপড়া করলেও নিজ মাতৃভাষার প্রতি তাঁর দরদ ছিল অকৃত্রিম। তিনি সারা জীবন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ওয়ায, নসিহত ও তাফসীর করেছেন বাংলা ভাষায়। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান পারলামেন্টে প্রদত্ত, ইংরেজি ও বাংলা এ ৩ ভাষায় বক্তব্য রাখার সুযোগ থাকলেও তিনি সব সময় বাংলায় বক্তব্য রাখেন এবং বিতর্কে অংশ নেন। বাংলা ভাষায় বেশ কিছু গ্রন্থও রচনা করেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মাদরাসা শিক্ষার ক্রমবিকাশের ধারা, আলেমসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য, খাতমুল মুরসালীন, মাওয়ায়েযে খতিবে আযম (২ খণ্ড), শানে নুবুওয়ত (৮ খণ্ড), খতমে নুবুওয়ত, মিরাজুন্নবী (সা.), শিক্ষা কমিশনের প্রশ্নমালার উত্তর, সত্যের দিকে করুণ আহ্বান, বাংলায় মুসলিম সমাজের ক্রমবিকাশধারা ইত্যাদি।[1]
তিনি কেবল মাদরাসা পাস একজন আলেম হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষা ও তার সাহিত্যের প্রতি ছিলেন বিশেষ অনুরাগী। বাংলা ভাষাভাষী জনগণ বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষিতদের মাঝে লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহের অমীয় বাণী তুলে ধরার নিমিত্ত বাংলা ও ইংরেজি ভাষা তিনি আয়ত্ত্ব করেছিলেন। মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক এবং মুসলিম যুব সমাজকে বাংলা ভাষা ও তার সাহিত্যের প্রতি উৎসাহিত করতেন।[2]
তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় পাক আমলে দৈনিক নাজাত, সাপ্তাহিক নেজামে ইসলাম, আল-হেলাল, জিন্দেগী, সওতুল ইসলাম প্রভৃতি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এমনিভাবে তিনি তৎকালীন সাহিত্য-সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আনজুমানে তাহাফফুজে ইসলাম নামক একটি ইসলামি গবেষণা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উক্ত একাডেমির মাধ্যমে কুরআন ও হাদিস সংবলিত বহু জ্ঞানগর্ভ বই-পুস্তক প্রকাশ করেছিলেন এবং ইসলাম বিদ্বেষীদের স্বরূপ উন্মোচন করে জাতিকে সতর্ক করেছিলেন, যার জুড়ি আজও মিলেনি। এমনিভাবে জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি আজিজুল হক মাতৃভাষায় ইসলামি সাহিত্য চর্চার নিমিত্ত যে ইসলামি গবেষণা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি ছিলেন এ একাডেমির পরিচালক।[3]
কওমি মাদরাসাসমূহ যেন মাতৃভাষার প্রতি গুরুত্ব দেয় সেজন্য আনজুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস (কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)-এর এক ইশতেহারে তিনি বলেন, দরসে নেজামীতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা শিক্ষা দেয়ার গুরুত্ব নেই। এ কারণেই আমাদের কওমি মাদরাসাসমূহের ফারিগ (গ্র্যাজুয়েট) ছাত্ররা বিশুদ্ধ বাংলা না বলতে পারে আর না লিখতে পারে। অথচ আমাদের শ্রোতা বা পাঠকগণের অধিকাংশ বাংলাই বুঝে। এর ফলে ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য তাবলীগ ও দাওয়াতের পরিধি অধিক থেকে অধিক সংকোচিত হয়ে পড়ছে।[4] বাংলা চর্চা, কথ্য ও লিখিত আরবি ভাষার উৎকর্ষের মাধ্যমে মাদরাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ইসলামি জ্ঞানে পারদর্শী ও যোগ্য নাগরিক হিসেবেগড়ে তোলার লক্ষ্যে যুগচাহিদার প্রতি সংগতি রেখে খতিবে আযম একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করেন।[5]
যখন পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মাতৃভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে গড়িমসি শুরু করল, তখন তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন মিটিং-মিছিলের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেনন।
এ সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রফেসর জনাব সিরাজুল ইসলাম বলেন, মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীন, জনাব আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী, মাওলানা সাখাওয়াতুল আম্বিয়া, মৌলভী ফরিদ আহমদ, মাওলানা সিদ্দিক আহমদসহ গুরুত্বপূর্ণ আলমদের নেতৃত্বে গঠিত নেজামে ইসলাম পার্টি ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কাজ করে।[6]
১৯৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ তারিখে কিশোরগঞ্জের হযরতনগরে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর রাজনৈতিক দল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের ঐতিহাসিক সম্মেলন। এতে সর্বমহলের বিশিষ্ট আলেমগণ অংশগ্রহণ করেন। এ ঐতিহাসিক সম্মেলনের প্রথম দিন জমিয়তের কাউন্সিল মাওলানা আতহার আলী (রহ.)-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে গৃহীত প্রস্তাবাবলীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবই ছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা প্রসঙ্গে। প্রস্তাবটি ছিল নিম্নরূপ:
চতুর্থ প্রস্তাব: খ. পূর্বপাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের এই সম্মেলন পাকিস্তান গণপরিষদের নিকট দৃঢ়তার সহিত দাবি জানাইতেছে যে, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা রুপে গ্রহণ করা হোক।[7]
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে শুধুমাত্র প্রস্তাব করেই ক্ষান্ত ছিল না তাঁর দল; বরং দলের সংবিধানেও এই দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দিয়েছে। এটা শুধু দাবি হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দলের আদর্শগত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এমনকি এটা শুধু পূর্বপাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টির সংবিধানেই নয়, বরং সাবেক পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজধানী করাচীতে পশ্চিম পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টির সংবিধানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আদর্শগত ঘোষণা ছিল।[8]
ভাষা আন্দোলনে খতিবে আযম (রহ.) এবং তাঁর দল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি যে শ্রম, মেধা ও সাহসিকতার সঙ্গে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে তা ইতিহাসের পাতায় গৌরবোজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
[1] ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.): জীবন ও কর্মসাধনা, খতীবে আযম ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম (দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৪৩৫ হি. = ২০১৪ খ্রি.), পৃ. ৫০
[2] মুফতি আবদুস সাত্তার কিশোরগঞ্জী, ইসলাম ও মাতৃভাষা, দারুল হুদা কুতুবখানা (প্রথম সংস্করণ: ডিসেম্বর ২০১২), পৃ. ১৫৮
[3] মুফতি আবদুস সাত্তার কিশোরগঞ্জী, ইসলাম ও মাতৃভাষা, দারুল হুদা কুতুবখানা (প্রথম সংস্করণ: ডিসেম্বর ২০১২), পৃ. ২৪৪
[4] আল্লামা সুলতান যওক নদভী, আমার জীবনকথা, নদভী প্রকাশনী, চট্টগ্রাম (প্রথম সংস্করণ: ১৪৩৫ হি. = ২০১৪ খ্রি.), পৃ. ১৮৪
[5] ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.): জীবন ও কর্মসাধনা, খতীবে আযম ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম (দ্বিতীয় সংস্করণ: ১৪৩৫ হি. = ২০১৪ খ্রি.), পৃ. ২৪
[6] ((ক) মুকুল চৌধুরী সম্পাদিত, অগ্রপথিক সংকলন: ভাষা আন্দোলন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, (প্রথম সংস্করণ: ১৯৯৩), পৃ. ১৩৩; (খ) মুফতি আবদুস সাত্তার কিশোরগঞ্জী, ইসলাম ও মাতৃভাষা, দারুল হুদা কুতুবখানা (প্রথম সংস্করণ: ডিসেম্বর ২০১২), পৃ. ১৫৮-১৫৯
[7] মাওলানা শফিকুর রহমান জালালাবাদী, হায়াতে আতহার, প্রকাশনা বিভাগ, আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ, (প্রথম সংস্করণ: ২০০৪ খ্রি.), পৃ. ১৩৮
[8] মাওলানা শফিকুর রহমান জালালাবাদী, হায়াতে আতহার, প্রকাশনা বিভাগ, আল-জামিয়াতুল ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ, (প্রথম সংস্করণ: ২০০৪ খ্রি.), পৃ. ১৩৮