এই আলো নিভে যাবে
রোকন এনাম লোবান
এই জীবনের কোলাহল, কলরোল ও শোরগোল মরণ এসে মিটিয়ে দিবে। আপনি, আমি, শাহরুখ, কারযাবি ও ওরহান পামুক কবরের দিকে ধাবমান। আমরা মৃত্যুর সিঁড়ি ভেঙে কবরের দিকে চলমান। শুধু আপনি ও আমি কেন? সৃষ্টির সব নিচয় মৃত্যু বেয়ে কবরে শুয়ে যায়। অসৃষ্ট ছাড়া সৃষ্টির আবশ্যক পরিণতি লয়, ক্ষয়। আকাশপটের বহু তারা ঝরে ঝরে তাদের কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছে। বৃষ্টি দেখেছেন? কতো সুন্দর দৃশ্যাবলী প্রস্তুত করে, কেমন আবেগকেন্দ্রিক আবহাওয়া নিয়ে ঝুমঝুম ও ঝুমুরঝুমুর করে নেমে আসে! মূলত বৃষ্টির দল নিজেদের কবরের দিকে ছুটে। আপনার বাড়িতে ফুলগাছ আছে না? জারুল, পারুল, কামিনী, হাসনাহেনা? বা কচুরিপানা ফুল? বা মুকুলে ছেয়ে যায় না আমবাগান? সুপারি ও নারকোল গাছ ত আছেই! পাশের বাড়ি, বেলকনি বা উঠোনে ছোটখাটো ফুলচারা থাকবেই। কেমন মায়া, ছায়া ও ভালোবাসার কায়া হয়ে একেকটা পুষ্প চোখ মেলে! তারাও, সেই সুহাসিনী প্রসূনেরাও বেলা বা পক্ষ শেষে ঝরে যায়। কেন জানেন? ফুলেদের কবরে যাওয়ার সময় চলে আসে, এজন্য। মহাবিশ্বে চলমান সব কিছু অস্থায়ী ও অস্থির। সৃষ্টির অভিমুখ মৃত্যু। সৃষ্টির দীর্ঘস্থায়ী অবস্থিতি কবর। চন্দ্রধারা, অজবীথি, দুগ্ধসরণি থেকে সমুদ্রজ প্রাণী ও প্রাণীজ নৈসর্গিকতা সব কিছু ক্রমশ মৃত্যুর পথে হাঁটছে। আমাদের চোখের জ্যোতি নিকষকালোয় ডুবে যাবে। বুদ্ধির প্রদীপ্তি নিভে যাবে। এই জীবন ও উচ্ছ্বসিত মনের উদ্দীপনা নিশক্তির তমিস্রে দেবে যাবে। এই আলোকন উৎসব নিরব নিস্তব্ধ কবরস্থানের তিমিরে ছেয়ে যাবে। এটাই নিয়তি।
এরকমই সৃষ্টির অমোঘ পরিণতি। অংকুর যেমন বৃক্ষ বা মহীরুহ হয়ে আবার নিঃস্ব ও নিঃশেষ হয়ে যায়। ডিম যেমন বাচ্চা হয়ে পাখি হয়ে সমাধিস্ত হয়ে যায়। আমি, আপনি ও রাশনানও সেরকম নাই ও নেই হয়ে প্রকৃতির অতলান্তে মিশে যাব। কোটি বর্ষ তা হয়ে এসেছে। কোটি বর্ষ এ ধারাক্রমই অব্যাহত থাকবে। কোন বেদনা, কান্না বা অসহন যাতনা এ বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে পারে না। একদিন ভরপুর জোসনা হবে, আমি করবে শুয়ে থাকব। সোনালি শিশির মেখে রোদ ঝিলমিল করবে, তুমি কবরে নিরব ঘুমাবে। ঐশ্বর্যময় সুন্দরি Zš^xI মরে যাবে, কবরে অসহায় ঘুমাবে। ছুরির ফলার মতো শাণিত মেধাবিও কবরস্থ হবে। এখানে কারো নিস্তার নেই। মহুয়ার সুরভিত নালিকারারা কবরস্থানে যাচ্ছে না? নিয়মিত। অষ্টাধারা হীরক মনস্বী মরে যাবে, যাচ্ছে। কারো কারো সৌন্দর্য ও সৌকর্য এতো মোহনিয়া যে, মনে হয় মৃত্যু পরাস্ত হবে। ভুল। তাদেরও রেহাই নেই। আসলে সকলকে নীড়ে ফিরতে হয়। আমাদের প্রকৃত নীড় তো প্রকৃতিজ কবরস্থান। কবরস্থান আমার প্রিয় জায়গা। লাইব্রেরি ও কবরস্থান আমার ভীষণ প্রিয়। লাইব্রেরিও কি এক প্রকার কবরস্থান নয়? জানি না। কবরের নিরবতা ভালো লাগে। কবরের স্বার্থহীনতা আমাকে আকুল করে। কবরের শান্তমন্থ সৌম্যতা আমাকে প্রশান্তি দেয়। আপনাকে দেয় না? দেয়। কবরস্থানে কেমন জানি অশরীরী একটা ভয় কাজ করে। অন্যরকম একটা কষ্ট পীড়িত করে। কবরবাসির প্রতি মনটা বিষণ্ণ করে। এক অজানিত অসুখ মনকে সুখি করে। পৃথিবীর লোভ লালসা ও মন্দবৃত্তি কবরস্থানে নিয়মিত গেলে প্রশমিত হয়। সাদাকালো জীবনযাপনের চাপ অনুভূত হয়। কবরস্থানে গেলে, জীবনের প্রহেলিকা পরিষ্কার হয়। জীবনবোধ পরিস্বচ্ছ হয়। মন খারাপ হলে, কবরপাড়ে বসে থাকলে, মন আরো খারাপ হয়ে ভালো হয়ে আসে। মাঝেমাঝে কবরস্থানে গেলে অজান্তে চোখের জল নামতে শুরু করে! কী যে পুলকসঞ্চারিত হয়, বুঝাতে পারব না। কখনো কবরপাড়ে শুয়ে দেখেছেন? আমি কয়েকবার দেখেছি। অপার্থিব অনুভূতি। প্রকৃষ্ট প্রতীতি উদয় হয় প্রাণে। আমার একটা শখ আছে। শুনে হাসবেন। তবু বলছি। কবরস্থানে, বিশেষত কবরের শিয়রে ফুলগাছ রোপন করা। গোলাব লাগাতে আমার আগ্রহ বেশি। চাঁপা ফুলও ভালো লাগে। এটা পাগলামি। জানি। পটিয়া থাকতে আমার অত্যন্ত প্রিয়জনের শিয়রে গোলাব লাগিয়েছিলাম। সেখানকার খোশবো ছড়িয়ে পড়লে বেজায় আনন্দন পেতাম। জানি, এই খোশবো এই সুষমা ভেতরে পৌঁছাবে না। তবু, ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে। আমার গ্রামে দাদার কবরের উপর একটা সুগন্ধি ফুলগাছ সৌরভ বিলায়। সেটি আমি লাগিয়েছিলাম। দাদির কবরে গোলাপ ও হাসনাহেনা লাগিয়েছি। অযত্নে মরে গেছে। আবার লাগাব ইন শা আল্লাহ। কবরস্থানের শিয়র ও বুক শাদা শাদা ফুলের সাথে সবুজাভ শিশির খেলছে, বিষয়টি সুন্দর না? সুন্দর। আমাদের অন্তিম শয়ান ফুলের তুলিতে সেজে থাকলে, শিহরণ জাগে। দাদুর কবরে একটা কাঠচাঁপা ও লাল কাঠগোলাপ লাগাব এই বর্ষায়। আমি যখন মারা যাব। আমার কবরে কেউ একটা গাছ লাগিয়ে দিবেন? অন্তত বাতাবিলেবু। কবরস্থানে জোনাকিপোকা থাকলে, ভালো লাগে। আর বুনোপাখির বাসা। পাশে একটা ইয়া বড় দীঘি। কবরে যাতায়াত করে জিয়ারত করলে, স্মৃতিশক্তি বাড়ে। কবরে জিয়ারত না করলে, আমার জিয়ারতও কেউ করবে না। কবর জিয়ারত করা সুন্নত। কবর জিয়ারত করলে, মানুষের চৈতন্য সঠিক কাজ করে। কবরস্থান নিঝঝুম নিভৃতির প্রশান্ত জায়গা।