জামেয়া ওয়েবসাইট

সোমবার-৮ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৫ হিজরি-২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ-১০ই আশ্বিন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ঈদে মীলাদুন্নবী ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ঈদে মীলাদুন্নবী ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ঈদে মীলাদুন্নবী ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মুহাম্মদ নোমান মাহমুদ আনচারী

 

আল-কুরআনের আলোকে ঈদে মীলাদুন্নবী (সা.)

ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি চারটি- কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। সকল জাতিই একমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি। তা থেকে আল্লাহ তায়ালা তার অনুগ্রহেই আদমসন্তানকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। মানুষ বলতেই আল্লাহর বান্দা। আর বান্দার বন্দেগী তখনেই গ্রহণযোগ্য হবে যখনই তা আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের আদর্শ মোতাবেক হবে। সুতরাং ঈদে মীলাদুন্নবীও তার থেকে ব্যতিক্রম নয়। তহলে আসুন তা সম্পর্কে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী? পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘তাদের কি এমন শরীক দেবতা রয়েছে, যারা তাদের জন্য ধর্মের এমন কোন বিধান প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। (সূরা আশ-শূরা: ২১)

এ আয়াত দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তায়ালার অনুমতি ব্যতীত (অর্থাৎ শরয়ী দলীল ব্যতীত) দীনের কোন বিষয় নির্ধারণ করার অনুমতি কাউকে দেয়া হয়নি। আর সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে, ঈদে মীলাদুন্নবীকে শরয়ী কোন দলীল ব্যতীত দ্বীনি বিষয় মনে করেই নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সুস্পষ্ট ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে ইসলামী শরীয়তের কোথাও তার হুকুম বিদ্যমান নেই। এটা সম্পূর্ণ নতুনভাবে সৃষ্ট।

যদি শরয়ী কোন মুলনীতির অন্তর্ভুক্ত করে তাকে জায়েয সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলেও তা জায়েয হয়ে যাবে না। কারণ তার কার্যকারণ পূর্ব থেকে বিদ্যমান, চাই উক্ত কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) শুভাগমনের ওপর আনন্দ প্রকাশ হোক কিংবা ইসলামের শান ও মর্যাদা সমুন্নত করা হোক। আমাদের বক্তব্য হলো, এ কার্যকারণ যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরাম ও তাবিয়ীগণের যুগেও ছিলো। আর তাঁরা কুরআন ও হাদীসের মর্মার্থ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অনুধাবন করতেন। উপরন্তু উল্লিখিত কার্যকারণও তখন বির্দমান ছিলো- অর্থাৎ মীলাদুন্নবীর ওপর আনন্দ প্রকাশ এবং ইসলামের শান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তখনো ছিলো। বরং এ যুগের তুলনায় তখন আরো অধিক প্রয়োজনীয় ছিলো। অথচ তাঁরা এ কাজ করেছেন বলে কোথাও প্রমান পাওয়া যায় না।

এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ঈদে মীলাদুন্নবীর বিষয়টিকে শরয়ী কোন মূলনীতির অধীন করার অবকাশ নেই এবং এটা সম্পূর্ণ নিজস্ব রচিত ও মনগড়া বিষয়। শরীয়তে যার কোনই ভিত্তি নেই। আর বিদআতের মূলকথা এটাই যে, দীন বহির্ভূত বিষয়কে দীন মনে করে করা। মীলাদুন্নবীর প্রবক্তগণ এটাকে দীন মনে করে করে। সুতারাং তা বিদআত ও পরিত্যাজ্য।

হাদীসের আলোকে ঈদে মীলাদুন্নবী

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনে দীন বহির্ভূত কোন ‘নতুন কথা সংযোজন করলো, তা প্রত্যাখান করা আবশ্যক।

 পূর্বোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় যে আলোচনা করা হয়েছে, তা এ হাদীসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ ঈদে মীলাদুন্নবীকে দীনী বিষয় মনে করে প্রবর্তন করা হয়েছে।

 আলোচ্য হাদীসে ‘নতুন কথা দ্বারা এমন বিষয় উদ্দেশ্য, যার কার্যকারণ পূর্বে বিদ্যমান ছিলো না, কিন্তু তার ওপর শরয়ী কোন বিধান নির্ভরশীল, তা শরীয়তের অনিবার্য বিষয় সমূহের অন্তর্ভূক্ত।

সুনানে নাসায়ী সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমার কবরকে উৎসবের বস্তুতে পরিণত করো না। আমার উপর দুরূদ পাঠ কর। কারণ তোমরা যেখানেই তাক তোমাদের দুরূদ আমার কাছে পৌছে যাবে। (সুনানে নাসায়ী)

এ হাদীসে ঈদ নয় এমন বস্তুকে ঈদ মনে করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। হয়তো প্রশ্ন হতে পারে, রাসূলের কবরে তো সকলে সমবেত হয়। এর জবাব হলো , সমবেত হওয়া তো জায়েয। কিন্তু ঈদ উৎসবের ন্যায় সমবেত হওয়া জায়েয নেই। অর্থাৎ মানুষ ঈদগাহে যেভাবে সমবেত হয় সেভাবে আমার কবরে সমবেত হয়োনা। আর ঈদ উৎসবে সমবেত হওয়ার নিয়ম হলো, তার জন্য দিন-তারিখ নির্দিষ্ট থাকে, তাতে একজন অপজনকে সমবেত হওয়ার জন্য আহবান করে। সুতরাং এভাবে সমবেত হওয়ার ওপর হাদীসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাবে একে অপরকে আহবান করা ব্যতীত অপ্রত্যাশিতভাবে সমবেত হয়ে গেলে তা হাদীসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভূক্ত নয়। যেমন রওযা শরীফ যিয়ারতের জন্য সমবেত হওয়ার ক্ষেত্রে এ দু’টির কোনটিই পাওয়া যায় না। তার জন্য সুনির্দিষ্ট কোন দিন-তারিখ নির্ধারিত নেই। বরং আগে পরে যখন যার ইচ্ছা সুযোগমত গেয়ে যিয়ারত করে আসে এবং সকলে এক সাথে সমবেত হওয়াকে আবশ্যকও মনে করা হয় না। মোট কথা, এ হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাওযা শরীফে ঈদের পদ্ধতিতে সমবেত হওয়া না জায়েয। সুতরাং স্থানের দিক থেকে যেমন ঈদ পালন (রওযা শরীফকে ঈদগাহ বানানো) নিষিদ্ধ ও না জায়েয। তদ্রƒপ কোন দিবসকে ঈদের দিন মনে করা (যেমন, বারই রবিউল আউয়ালকে ঈদের দিন মনে করা) নিষিদ্ধ ও না জায়েয।

উল্লিখিত হাদীসের ভিত্তিতে দুরূদ শরীফ পাঠ করার জন্য (যা কখনো ফরয, ওয়াজিবও হয়ে থাকে) যখন ঈদের ন্যায় সমবেত হওয়া না জায়েয। তাহলে অন্য কোন মনগড়া উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়া কিভাবে জায়েয হয়?

মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তোমরা সমস্ত রাতের মধ্য থেকে শুধু জুমুআর রাতকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করো না এবং সমস্ত দিবসের মধ্য থেকে শুধু জুমআর দিবসকে রোযা রাখার জন্য নির্দিষ্ট করো না। তবে যদি কেউ পূর্বের দিন থেকে রোযা রেখে থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। (সহীহ মুসলিম শরীফ)

এ হাদীস থেকে এ মূলনীতি বের হলো যে, যে সীমাবদ্ধকরণ শরীয়ত কর্তৃক প্রমাণিত নয়,তা নিষিদ্ধ ও না জায়েয। তবে জুমআর দিন রোযা রাখার হুকুম কী হবে, তা ভিন্ন কথা। এটা প্রাসঙ্গিক আলোচনা। এখানে হাদীস দ্বারা আমার উদ্দেশ্য তো শুধু এ মূলনীতি অহরণ করা যে, শরীয়ত কর্তৃক প্রমাণিত নয় এমন সীমাবদ্ধকরণ দীনের ক্ষেত্রে না জায়েয। আর এ মূলনীতি সকলের নিকটই স্বীকৃত। যারা রোযার জন্য জুমুআর দিনকে নির্দিষ্ট করে নেয়া জায়েয মনে করে, তারাও এ মূলনীতির গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করে না।

এবার দেখা প্রয়োজন যে, বারই রবিউল আউয়ালকে ঈদ উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করা কোন স্তরের? বলা বাহুল্য যে, এটা শরীয়ত কর্তৃক প্রমাণিত নয়। অথচ তা শুধু প্রথাগতভাবে করা হয় না, বরং দীনের অংশ হিসেবে করা হয়। কারণ যদি কেউ তা না করে, তাহলে তাকে ধর্মহীন মনে করা হয়। বিভিন্ন রকম তিরস্কার ও নিন্দার ঝড় তার ওপর দিয়ে বয়ে যায়। মোট কথা এটাকে দীনের অন্তর্ভুক্ত বিষয় মনে করা হয়। সুতরাং এটা দীনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধকরণ হলো। অতচ তা শরীয়ত কর্তৃক প্রমাণিত নয়। আর এ ধরনের সীমাবদ্ধকরণের উপর-ই হাদীসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

 বর্তমানে মানুষ যে সব বিষয় নিজের থেকে নিার্ধারণ করে নিয়েছে (যেমন ঈদে মীলাদুন্নবী ইত্যাদি), রাসূল (সা.) আমাদেরকে সে সকল বিষয়ের শিক্ষা দান করেন নি। বরং সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। আর শরীয়তের উসূল ও নীতিমালার আলোকে পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এ কাজ সম্পূর্ণ না জায়েয, বিদআত ও গোমরাহী। এবং আর একটি সুস্পষ্ট হাদীস আছে যা দ্বারা অত্যন্ত পরিস্কারভাবে ঈদে মীলাদুন্নবী পালনের নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হয়। হাদীসটি হলো- ‘‘ তোমরা আমার কবরকে ঈদগাহ বানিও না। এ হাদীস দ্বারা অত্যন্ত পরিস্কারভাবে ঈদে মীলাদুন্নবীর নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হয়। হাদীসটির মর্মার্থ ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। প্রথমে মনে রাখতে হবে, রাসূল (সা.)-এর রওযা মুবারকে মর্যদা অনস্বীকার্য। কারণ তাঁর পবিত্র দেহ মুবারক তাতে বিদ্যমান। বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) দেহ ও রূহ সহকারে তাতে অবস্থান করছেন। কারণ, প্রায় সকল উলমায়ে কেরামের সর্বসম্মত মতে তিনি কবরে জীবিত রয়েছেন। সাহাবায়ে কেরামের আক্বীদা বা বিশ্বাসও এটাই ছিল। হাদীস শরীফেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় কবরে জীবিত আছেন এবং তিনি সেখানে রিযিক লাভ করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ হায়াত (জীবন)-এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি সেখানে জাগ্রত অবস্থায় রয়েছেন। বরং সেখানে তাঁর ভিন্ন রকমের জীবন, যাকে হায়াতে বরযখিয়্যাহ (কবর জগতের জীবন) বলে। আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম- এর হায়াত বরযখিয়্যাহ (কবর জগতের জীবন) শহীদের শাহাদাতের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। মোটকথা, এটা সর্বসম্মত ভাবে সুপ্রমাণিত যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম কবরে জীবিত থাকেন। উলমায়ে কেরাম একথাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সেই পবিত্র ভূখণ্ড, যেখানে নবীজীর পবিত্র দেহ মুবারক সমাহিত আছে, পৃথিবীর সমস্ত স্থানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এমনকি আরশের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। কারণ, আরশে (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ  তা’আলা উপবেশনরত নন। যদি উপবেশনরত থাকতেন তাহলে নিঃসন্দেহে তা সর্বশ্রেষ্ঠ হতো। কিন্তু আল্লাহ পাক নির্দিষ্ট জায়গায় সমাসীন হওয়া থেকে পবিত্র। মোটকথা, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র রওযা মুবারক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান।

এবার বুঝতে হবে, রওযা শরীফ (যার এতো শ্রেষ্ঠত্ব, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবিত রয়েছেন এবং যে স্থান আরশে ইলাহীর চেয়েও শ্রেষ্ঠ) সন্দেহাতীতভাবে হুবহু বিদ্যমান রয়েছে। এতে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকতে পারে না। পক্ষান্তরে তাঁর জন্মদিন, মি’রাজে গমনের দিন এবং তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির দিন অবশ্যই বিদ্যমান নেই। কারণ, সময় পরিবর্তনশীল। রাসূলুল্লাহ (সা.) যে দিন জন্মগ্রহণ করেছেন, তা কিছুতেই ফিরে আসবে না। বরং তার অনুরূপ দিন ফিরে আসে।

অতঃপর দেখার বিষয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন তাঁর কবরকে ঈদগাহ বানাতে নিষেধ করলেন এবং সেটাকে ঈদগাহ বানানো হারাম সাবস্ত করলেন, যা সন্দেহাতীতভাবে অবশিষ্ট রয়েছে। তাহলে এমন বিষয়কে ঈদ উৎসব বানানো, যা হুবহু অবশিষ্ট নেই, কিভাবে জায়েয হতে পারে? আমার মতে এ হাদীস দ্বারা ঈদে মীলাদুন্নবী সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এরপরও তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কারো সন্দেহ থাকলে তাকে তার বিবেকের ওপর ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। এ আলোচনা দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের ভাষা অলঙ্কাররিত্ব ও বক্তব্যের সারগর্ভতাও ফুটে উঠলো যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কেন সুনির্দিষ্টভাবে শুধু তাঁর কবরকে ঈদগাহ বনাতে নিষেধ করলেন? এজন্য নিষেধ করলেন যে, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা তো সুনির্ধারিত ও সুনিশ্চিত হওয়ার কারণে সকলের কাছে স্বীকৃত। এ ধরনের বস্তু সম্পর্কে যখন শরীয়তের কোন বিধান বলে দেয়া হবে, তখন তার ওপর সাধারণ বিষয়সমূহকে তুলনা করে সেগুলোর বিধানও যেন অবগত হওয়া যায়।

ঈদে মীলাদুন্নবী ও ইজমায়ে উম্মত

কুরআন ও হাদীস দ্বারা তো ঈদে মীলাদুন্নবীর নিষিদ্ধতা ও তা বিদ‘আত হওয়া সাব্যস্ত হয়ে গেলো। এখন অবশিষ্ট থাকলো ইজমায়ে উম্মত। ইজমায়ে উম্মত দ্বারও ঈদে মীলাদুন্নবীর নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হয়। কারণ, ফিকাহ শাস্ত্রের মূলনীতি হলো, সমস্ত উম্মত কোন বিষয় পরিত্যাগ করার ওপর একমত হওয়া একথা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি না জায়েয হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে। ফিকাহবিদগণ অসংখ্য ক্ষেত্রে এ মূলনীতিকে দলীলরূপে গ্রহণ করেছেন। সাহাবায়ে কেরামও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লমের কোন কাজ সর্বদা পরিত্যাগ করাকে তা না জায়েয হওয়ার স্বপক্ষে দলীলরূপে গ্রহণ করতেন। যেমন তাঁরা বলতেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামায পড়েছেন; কিন্তু তাতে আযান ও ইকামত ছিলো না।

অনুরূপ যে কাজ সমগ্র উম্মত বর্জন করেছে (অর্থাৎ যা কেউ করেনি), তা বর্জন করা ওয়াজিব। এ মূলনীতির ভিত্তিতেই ফিকাহবিদগণ দুই ঈদের নামাযে আযান ও ইকামত অনুমোদন করেন নি। সুতরাং যদি এ মূলনীতি মেনে না নেয়া হয়, তাহলে দুই ঈদের নামাযে আযান ও ইকামত যুক্ত করা উচিত। আর যদি মেনে নেয়া হয়, তাহলে এ মূলনীতি অন্য ক্ষেত্রেও দলীলরূপে গ্রহণ করা আবশ্যক।

প্রশ্ন হতে পারে যে, গোটা উম্মত ঈদে মীলাদুন্নবী বর্জন করেনি। কারণ, উম্মত দ্বারা তো এ যুগের উম্মতও উদ্দেশ্য। এ যুগের উম্মত হিসেবে আমরা তা করছি। সুতরাং ইজমা থাকলো কিভাবে? জবাব এই ও যে, ফিকাহ শাস্ত্রের সর্বসম্মত নীতি হলো, অতীতে যে বিষয়ের ওপর গোটা উম্মতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, পরবর্তীতে তাতে মতানৈক্য গ্রহণযোগ্য নয়। পূর্ববর্তীদের ঐক্যমতকে পরবর্তীদের মতানৈক্য বাতিল করতে পারে না। আর পরবর্তীগণ ঈদে মীলদুন্নবী প্রথা চালু করার পূর্ব পর্যন্ত পূর্ববর্তীগণের তা বর্জন করার ওপর ঐক্যমত ছিলো। সেই ঐক্যমত এখন বাতিল হতে পারে না।

এ মূলনীতির আরেকটি দৃষ্টান্ত এই যে, হানাফী ইমামগণ মৃত ব্যক্তির একাধিক জানাযার নামায (একই ব্যক্তির জন্য) না জায়েয বলেছেন এবং প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, এটা সাহাবী ও তাবি‘য়ীগণ কর্তৃক স্বীকৃত নয়।

মোটকথা এটা শরীয়তের এক সর্বসস্মত মূলনীতি যে, গোটা উম্মত কোন বিষয় বর্জন করা তা শরীয়ত স্বীকৃত না হওয়ার দলীল। সুতরাং আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে সাব্যস্ত হয়ে গেলো যে, প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত ও কুসংস্কার। তা বর্জন করা অপরিহার্য।

ঈদে মীলাদুন্নবী ও কিয়াস

এখন অবশিষ্ট থাকলো কিয়াস। কিয়াস দু’প্রকার- ১. এমন কিয়াস, যা মুজতাহিদ থেকে প্রমাণিত। ২. এমন কিয়াস, যা মুজতাহিদ থেকে প্রমাণিত নয়। আর শরীয়তের বিধান হলো, মুজতাহিদ নন এমন ব্যক্তির কিয়াস অগ্রহণযোগ্য। ঈদে মীলাদুন্নবী সে সব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত যা আইম্মায়ে মুজতাহিদগণের যুগে বিদ্যমান ছিলো। আইম্মায়ে মুজতাহিদগণের পরবর্তী যুগে যে সব নতুন নতুন বিষয় ও সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে, সে সব ক্ষেত্রে মুজতাহিদ নন এমন ব্যক্তির ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য। যেমন বর্তমানে ব্যবসার যে সব নতুন নতুন পদ্ধতি ও নিত্য নতুন বস্তুর আবিস্কার চলছে, তার বৈধতা মুজতাহিদগণ এমন ব্যক্তিদের কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত।

তাছাড়া কোন বিষয়ে আমরা কিয়াসের শরণাপন্ন তো তখন হবো, যদি তাতে পূর্ববতী মুজতাহিদগণের বক্তব্য না থাকে। তাঁদের কিয়াস আমাদের কিয়াসের ওপর অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ, আমাদের মহান পূর্বসূরীগণ জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি, তাকওয়া- আল্লাহভীতি, দুনিয়াবিকুখতা এবং দীনের জন্য ত্যাগ ও কুরবানী তথা প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। সুতরাং তাঁদের চিন্তার সাথে আমাদের চিন্তা সংঘাতপূর্ণ হলে তাঁদের চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আর পূর্ববর্তী মুজতাহিদগণের বক্তব্যে ঈদে মীলাদুন্নবী প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। যেমন আল্লামা ইবনে কাইয়িম (রহ.) প্রণীত তা‘বীদুশ শায়তোয়ান গ্রন্থে এবং আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) প্রণীত সিরাতে মুস্তাকীম গ্রন্থে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে স্থান পেয়েছে এবং বলা হয়েছে, কোন স্থান অথবা সময়কে উৎসবের বিষয় বানানো জায়েয নেই।

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়িম (রহ.) ছিলেন পরস্পরে ওস্তাদ ও শাগরিদ। এঁরা হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীরূপে প্রসিদ্ধ লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে হাম্বলী ছিলেন না। তাঁদের লেখনী ও বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা স্বয়ং ইজতিহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। এ ধরনের নির্ভরযোগ্য আলিম কোন বিষয়ে আইম্মায়ে মুজতহিদগণের সাথে ভিন্নমত পোষণ করলে তা দূষণীয় নয়।

ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়িম (রহ.) ও বিদগ্ধ আলিম ছিলেন, উঁচু স্তরের তাকওয়ার অধিকারী ছেলেন। আল্লাহ, আল্লাহর রসূল ও দীনের জন্য ত্যাগ স্বীকারকারী ছিলেন। কিন্তু তাঁরা কিছুটা রক্ষণশীল স্বভাবের অধিকারী হওয়ার কারণে তাঁদের দিক থেকে কিছুটা কঠোরতা হয়ে গেছে। ইবনে কাইয়্যিম (রহ.)-এর লেখনীসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি সাহেবে নিসবত বুযর্গ ছিলেন।

উসূলে ফিকহের আলোকে ঈদে মীলাদুন্নবী (সা.)

রাসূলুল্লাহ (সা.) যেসব ইদাদত অনুমোদন করেছেন, তার কার্যকারণও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ দৃষ্টিকোন থেকে শরীয়ত নির্দেশিত আহকাম ও বিধানসমূহ কয়েক প্রকার হতে পারে-

 ১. এমন হুকুম, যার কার্যকারণ বারবার পাওয়া যায়। কার্যকারণ বারবার পাওয়া যাওয়ার কারণে হুকুমও বারবার ওয়াজিব হয়। যেমনÑ নামায ওয়াজিব হওয়ার জন্য ওয়াক্ত কারণ। সুতরাং ওয়াক্ত যতবার আসবে নামাযও ততবার ওয়াজিব হবে। অনুরূপ রমযান মাস রমযানের রোযা ওয়াজিব হওয়ার জন্য কারণ। যাখনই রমযান মাস আসবে রোযা ওয়াজিব হবে। এভাবে ঈদের নামাযের জন্য ঈদুল ফিতর এবং কুরবানীর জন্য দশ-ই যিলহাজ্জ কার্যকারণ।

২. হুকুম একটি হবে এবং কার্যকারণও একটি হবে। যেমন কা’বা শরীফ হজ্জ ওয়াজিব হওয়ার জন্য কার্যকারণ। যেহেতু কার্যকারণ (বায়তুল্লাহ শরীফ) একটি, তাই হজ্জও জীবনে একবার ওয়াজিব হয়। এ উভয় প্রকার হুকুম যুক্তির নিরিখে অনুধাবন করা যায়। কারণ যুক্তির দাবিও এটাই যে, কার্যকারণ বারবার আসার কারণে হুকুমও বারবার ওয়াজিব হবে এবং কার্যকারণ একটি হলে হুকুমও একবার-ই ওয়াজিব হবে।

৩. কার্যকারণ তো একটি। কিন্তু হুকুম বারবার ওয়াজিব হয়। যেমন হজ্জের তাওয়াফের ক্ষেত্রে রমল-এর মূল কার্যকারণ তো শক্তি প্রদর্শন করা। অথচ এখন সেই শক্তি প্রদর্শন করার প্রয়োজন নেই। কারণ, ঘটনা এই ছিলো যে, মুসলমানগণ যখন মদীনা তাইয়্যিবা থেকে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করলেন, তখন মক্কার মুশরিকরা বলতে লাগলো, এদেরকে মদীনার জ্বর দুর্বল ও ক্লান্ত করে ফেলেছে। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে আদেশ দিলেন, তারা যেন তাওয়াফে রমল করে, অর্থাৎ দু’কাঁধ সঞ্চালন করে দৃঢ় পদক্ষেপে তাওয়াফ করে। তহলে মুশরিকরা মুসলমাগণের শক্তি প্রত্যক্ষ করতে পারবে। বর্তমানে সেই কার্যকারণ তো বিদ্যমান নেই। অথচ তাওয়াফে রমল করার হুকুম আপন অবস্থায় বহাল রয়েছে। এ হুকুম যুক্তির মানদণ্ডে অনুধাবন করা না গেলেও শরীয়ত তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর শরীয়তের কোন হুকুম যুক্তি পরিপন্থী হলে তা অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার জন্য কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট ভাষ্য প্রয়োজন।

এখন আমাদের জিজ্ঞাসা, ঈদে মীলাদুন্নবীর কার্যকারণ কি? নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মতারিখ। উক্ত তারিখ কি অতিবাহিত হয়ে যায় নি, নাকি বারবার আসছে? বলা বাহুল্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) জন্মগ্রহণের সেই নির্দিষ্ট তারিখ অবশ্যই অতিবাহিত হয়ে গেছে। কারণ এখন প্রতি বছর যে বারই রবিউল আউওয়াল আসছে, তা সেই নির্দিষ্ট জন্ম তারিখের সদৃশ, হুবহু সেই তারিখ নয়। সেই তারিখ তো গত হয়ে গেছে। সুতরাং কোন বস্তুর অনুরূপ বা সদৃশ বস্তুর জন্য উক্ত বস্তুর হুকুম আরোপ করতে হলে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট প্রমাণ আবশ্যক। যুক্তির পরিপন্থী হওয়ার কারণে তাতে কিয়াস প্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এখানে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবার রোযা রাখতেন বলে আমরা কেন উক্ত দিন রোযা রাখি? এ প্রশ্নের জবাব হলো, এ রোযা রাসূলুল্লাহ (সা.) ওহী কর্তৃক নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে রেখেছিলেন। সুতরাং এর ওপর কিয়াস করার অবকাশ নেই।

যুক্তির নিরেখে ঈদে মীলাদুন্নবী

এবার আমরা যুক্তির নিরিখে ঈদে মীলাদুন্নবী সম্পর্কে আলোচনা করবো। কারণ, ঈদে মীলাদুন্নবীর প্রবক্তাগণের মধ্যে এক

শ্রেণীর যুক্তিপূজারীও রয়েছে। তারা ঈদে মীলাদুন্নবীর স্বপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি পেশ করে থাকে। তাই আমরা এ দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি আলোচনা করছি।

এরা বলে থাকে, ঈদে মীলাদুন্নবী পালনের উদ্দেশ্য হলো খ্রিষ্টানদের মোকাবেলা করা। কারণ, খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম দিবসে ঈদ (উৎসব) পালন করে থাকে। এজন্য আমরাও তাদের মোকাবেলায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিবসে ঈদ (উসৎব) পালন করি। যেন ইসলামের শান ও মর্যাদা প্রকাশ পায়।

তাদের এ যুক্তির জবাব হলো, এটা তো তখনি কোন মতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি আমাদের ধর্মে ইসলামের শান ও মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য কোন ব্যবস্থা না থাকে। আমাদের ধর্মে ইসলামের শান ও মর্যাদা প্রকাশ করার জন্য জুমআ ও দুই ঈদ এ সব তো ইসলামের শান ও মর্যাদা প্রকাশ করারই জন্যই।

তাছাড়া খ্রিস্টানদের মোকাবেলাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তারা তো আরো কোন কোন দিবসেও ঈদ (উসৎব) পালন করে থাকে। সুতরাং এ যুক্তিবাদীদেরও উচিত, তাদের প্রতিটি উৎসব দিবসের মোকাবেলায় নিজেরাও ঈদ (উৎসব) পালন করা। এমনিভাবে ‘আশূরার দিন তা’যিয়া পূজা করা উচিত, যেন শিয়া সম্প্রদায়ের মোকাবেলা হয়ে যায়। যেমন অনেক মূর্খ লোক শুধু মোকাবেলার জন্য এরূপ করেও থাকে। মোকাবেলাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে হিন্দু সম্প্রদায়ও তো বিভিন্ন উৎসব পালন করে থাকে। তাই বলে আমরাও কি? তাদের মোকাবেলার জন্য অনুরূপ উৎসব পালন করতে যাবো?

আমি একটি ঘটনা বলছি (যা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে)। এ ঘটনা দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, অন্যদের অনুকরণে ঈদ (উৎসব) পালন করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার এক সফরে ছিলেন। কাফিররা হাতিয়ার ঝুলিয়ে রাখার জন্য একটি গাছ নির্ধারণ করে রেখেছিলো এবং তার নাম দিয়েছিল ‘জাতুল আনআয়াত। কতিপয় সাহাবী আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাদের জন্যও একটি জাতুল আনআয়াত নির্ধারণ করে দিন। যেন আমরা তাতে হাতিয়ার, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখতে পারি।

এখানে বাহ্যত কোন অসুবিধা মনে হয় না। কারণ, কোন গাছের সাথে কাপড় বা হাতিয়ার ঝুলিয়ে রাখা একটি জায়েয কাজ। কিন্তু যেহেতু তাতে বাহ্যিকভাবে কাফিরদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারা মুবারক রক্তিম হয়ে গেলো। তিনি বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার! এটা তো তেমনি হলো, যেমন হযরত মূসা (আ.)-এর জাতি মূসা (আ.)-কে বলেছিন, ‘(আপনি আমাদের জন্য একজন ইলাহ নির্ধারণ করুন, যেমন তাদের জন্য বিভিন্ন ইলাহ রয়েছে)।

সুতরাং যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) এতটুকু সাদৃশ্য গ্রহণও অনুমোদন করলেন না, তাহলে যে ক্ষেত্রে বিধর্মীদের পরিপূর্ণ সাদৃশ্য (অনুকরণ) হয়ে যায়, তা না জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ থাকে কিভাবে?

ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত হওয়ার স্বপক্ষে আরেকটি যুক্তি এই যে, বারই রবিউল আউয়াল আমরা আনন্দ প্রকাশ করতে পারি না। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওয়াফাতও হয়েছিল এদিনে। আবার শোকও প্রকাম করতে পারি না। কারণ, তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন এ দিনে। বড় অদ্ভুত মিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম দিবস ও ওফাত দিবস এবং তাঁর জন্মের মাস ও ওফাতের মাস প্রসিদ্ধ মতানুসারে এক ও অভিন্ন। এর কারণ কী? বিচিত্র নয় যে, এ অভিন্নতা দ্বারা এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, কেউ যেন বারই রবিউল আউয়ালকে উৎসব দিবসে পরিণত না করে, আবার শোক দিবসেও পরিণত না করে। কারণ, যদি কেউ উৎসব দিবস বানাতে চায়, তাহলে ওফাতের কল্পনা উৎসব প্রকাশে অন্তরায় হবে। আবার যদি কেউ শোক দিবস বানাতে চায়, তাহলে শুভ জন্মগ্রহণের কল্পনা শোক প্রকাশে অন্তরায় হবে। এ যুক্তি দ্বারাও বারই রবিউল আউয়াল উৎসব দিবস হওয়ার যৌক্তিকতা তিরোহিত হয়ে যায়। আনন্দ ও শোক প্রকাশের জন্য এ দুটি ঘটনার চেয়ে বড় আর কোন ঘটনা হতে পারে না (রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মগ্রহণের ঘটনার চেয়ে অধিক আনন্দদায়ক কোন ঘটনা নেই এবং তাঁর ওফাতের ঘটনার চেয়ে অধিক বেদনাদায়ক কোন ঘটনাও নেই)। যখন সাহাবায়ে কেরামের যুগেই উৎসব দিবস ও শোক দিবস পালনের যুক্তি তিরোহিত হয়ে গেলো, তাহলে পরবর্তী যুগের জন্য তো তা আরো সুস্পষ্টভাবেই তিরোহিত হয়ে যায়।

আমাদের এ যুক্তির স্বপক্ষে যদি শরয়ী কোন দলীল না থাকতো, আমরা তা গ্রহণ করতাম না। কিন্তু যেহেতু তা শরয়ী দলীলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই যুক্তিটি আমরা অবশ্যই গ্রহণ করবো।

তারা এটাও যুক্তি দিয়ে থাকে যে, আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের সুসংবাদ শুনে আনন্দের অতিশয্যে খুশি হয়ে ছোওয়াইবা নামক কৃতদাসী মুক্ত করে দিয়েছিল। এ কারণে তার ওপর শাস্তি লাঘব করে দেয়া হয়েছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মগ্রহণের ওপর আনন্দ প্রকাশ করা জায়েয ও বরকত লাভের উপায়।

এ যুক্তির জবাবও সুস্পষ্ট। আমরা নিছক আনন্দিত হতে নিষেধ করি না। আনন্দ তো আমরা প্রতি মুহূর্তেই বোধ করি। আমাদের বক্তব্য তো সেই বিশেষ পদ্ধতি সম্পর্কে, যা নিজেরা আবিস্কার করে রেখেছে। প্রচলিত এ বিশেষ পদ্ধতিও কি উল্লিখিত ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়? তার জবাব এটাও আমরা বলব যে, আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিলাদের খুশিতে দাসি আজাদ কারি। কিন্তু তিনি এখন কোথায়? তিনি তো জাহান্নামে। পক্ষান্তরে হযরত আবু বকর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের খুশিতে একটি মোরগির বাচ্ছাও তো জবেহ করে নাই তা সত্বেও তিনি এখন কোথায় তিনি তো এখন বেহেস্তে। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে শুধু মিলাদ মিলাদ করে কাজ হবে না সীরাতও অবশ্যই পালন করতে হবে।

তারা আরও একটি যুক্তি পেশ করে থাকে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যদি জন্ম না হত তাহলে আমরা এই দীন পেতাম না এজন্যেই আমরা তার জন্মের খুশিতে উৎসব পালন করি এবং জশনে জলুস বের করি।

তার উত্তর আমরা এভাবেই দেব যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহর জন্ম না হলে রাসূলের জন্ম হতো না। ঠিক এরকম আবদুল মাত্তালিবের জন্ম না হলে আবদুল্লহর জন্ম হতো না। এভাবে আদম (আ.) পর্যন্ত। সুতরাং যদি জন্ম দিবস পালন করতে হয় তাহলে পর্যায়ক্রমে আদম (আ.) পর্যন্ত জন্ম দিবস পালন করতে হবে। কেননা তিনি জন্ম না হলে রাসূলের জন্ম হতো না এবং রাসূল না হলে আমরাও হতাম না। আল্লাহ সকলকে সঠিকভাবে বুঝার তাওফিক দান করুক।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ