দাওরায়ে হাদীসের সনদের স্বীকৃতি: এক নতুন ইতিহাসের সূচনা
এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হলো। ১৯ সেপ্টেম্বর18 আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উজ্জ্বল মাইলফলক, এ দিন কওমি সনদ আইনের বিল জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। ১৩ আগস্ট’১৮ কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান দেয়া সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব, প্রস্তাবিত খসড়া আইন নিরীক্ষণের জন্য গঠিত সরকারি কমিটির প্রতিনিধিগণ, কওমি শিক্ষা কমিশনের সদস্যসহ সংশিষ্ট সকলকে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানাই। এতদিন দেশে শিক্ষা বিস্তার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণের সঙ্গে সংশিষ্ট একটি বিশাল অংশ এই স্বীকৃতি থেকে অন্যায্যভাবে বঞ্চিত ছিল। এর মাধ্যমে ১৫ লাখ কওমি ছাত্র-শিক্ষকদের দীর্ঘ দিনের দাবী পূর্ণতা পেল। দেশের ভেতরে বাইরে উচ্চতর জ্ঞান আহরণ ও বিতরণে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন। সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ফলে কওমি শিক্ষার্থীদের খিদমতের পরিধি আরো বিস্তৃতি লাভ করলো এবং তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধা যাচাইয়ের সুযোগ পাবেন। রাষ্ট্র বিপুল সংখ্যক মেধাবী মানুষের সেবা লাভ করবে।
গণভবনে কওমি মাদরাসার আলিম-ওলামাদের সঙ্গে এক বৈঠকে ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে ও দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিগুলোকে (উসুলে হাশতগানা) ভিত্তি ধরে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান করে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়।
‘কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে এমএ-এর সমমর্যাদা প্রদানের সংগ্রামকে জোরদার করুন’ শিরোনামে ১৯৮৪ সালে ইসলামী ছাত্রসমাজ কর্তৃক ঢাকায় একটি লিফলেট প্রকাশিত হয়। সে লিফলেটটি আজ ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। হাজার হাজার কপি দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বীকৃতির দাবিতে সেমিনার ও মিছিল করা হয়। সেসময় অনেকের কাছে এটা বিস্ময় ঠেকে, অনেকে সংশয় ব্যক্ত করেন। দৃঢ়তার সাথে এ কথা বলা যায় ইসলামী ছাত্রসমাজের আগে খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.) ছাড়া স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেননি। কেউ দাবী পর্যন্ত করেননি। খতিবে আযম (রহ.) পাকিস্তান আমলে শিক্ষা কমিশনের সাথে প্রদত্ত সাক্ষাতকারে স্বীকৃতি প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ইসলামী ছাত্রসমাজের আন্দোলনের ফলে পরবর্তীতে আমাদের নেতৃবৃন্দ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
বিভিন্ন সংগঠন স্বীকৃতির দাবি উত্থাপন করতে থাকে। বিএনপির শাসনামলে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) মুক্তাঙ্গনে অবস্থান ধর্মঘট করে জনমত তৈরী করেন। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে মাস্টার্সের সমমান দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় (প্রজ্ঞাপন স্মারক নং শিম/পাঃ১৬/বিবিধ-১১(৯)/২০০৩(অংশ)/৮৮৭/১০৩১)। চরমোনাইর পীর সাহেব সাইয়েদ মাওলানা ফজলুল করীম (রহ.), মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.), বেফাক মহাসচিব মাওলানা আবদুল জাব্বার (রহ.), গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মওলানা রুহুল আমিন (দা. বা.), বেফাকুল মাদারিস আল-আরাবিয়ার সম্মানিত চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফী সাহেব (দা. বা.)সহ আঞ্চলিক বোর্ডসমূহের নেতৃস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম বিশেষত জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সম্মানিত মুহতামিম আল্লামা মুফতি আবদুল হালিম (দা. বা.) স্বীকৃতির দাবিকে ধাপে ধাপে পূর্ণতার দিকে নিয়ে গেছেন। তাঁরা সরকারকে স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হন। সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বারেবারে বৈঠক করেন। একটি মহল চেয়েছিল মাদরাসার ওপর যেন সরকারি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ থাকে। কওমি সংশ্লিষ্ট আলিমদের মেহনতে এমনভাবে আইন প্রণীত হয়েছে যে, সরকারের কোন ধরনের নজরধারী বা অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। একটা বিষয় স্মরণ রাখতে হবে সেটা হলো, কোন কওমি মাদরাসা যদি ৬ বোর্ডের বাইরে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে চায় এবং স্বীকৃতি নিতে আগ্রহী না হয়; তা হলে তাদের বাধ্য করা হবে না। বাধ্যবাধকতার কথা আইনে উল্লেখ নেই। তাঁরা তাঁদের মত করে মাদরাসা পরিচালনা করতে পারবেন, সে স্বাধীনতা থাকবে।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন