বৃহস্পতিবার-২রা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি-২১শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব

আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার

আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসেম্মলন ২০১৭

আল্লামা শাহ মুহাম্মদ তৈয়ব (দা. বা.)

মুহতামিম, জামিয়া আরাবিয়া ইসলামিয়া জিরি,পটিয়া, চট্টগ্রাম

الْـحَمْدُ للهِ وَكَفَىٰ وَسَلَامٌ عَلَىٰ عِبَادِهِ الَّذِيْنَ اصْطَفَىٰ صَلَّى اللهُ تَعَالَىٰ عَلَيْهِ وَعَلَىٰ آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَبَارِكْ وَسَلِّمْ.

أَمَّا بَعْدُ! فَأَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ، [وَذَرُوْا ظَاهِرَ الْاِثْمِ وَبَاطِنَهٗؕ ۰۰۱۲۰] {الأنعام: ১২০} صَدَقَ اللهُ الْعَظِيْمِ.

আল্লাহ পাকের দয়া ও মায়া এবং বুযুর্গানে দীনের দোয়ায় মাহফিলে আমাদের মত নগণ্য ব্যক্তিরাও অনেক কাজ কর্ম ছেড়ে এখানে আসার এবং বসার সুযোগ হয়েছে, না আসলেও কি হয়? আসছি শুধুমাত্র শরীক হওয়ার জন্যে। মাহফিল পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে আমাকে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দিয়েছে আত্মশুদ্ধি বিষয়ে কথা বলার জন্য, আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে নির্ধারিত বিষয়ের ওপর আলোচনা করার চেষ্টা করব। আত্মশুদ্ধির শাব্দিক অর্থ হচ্ছে আত্মাকে ইছলাহ তথা সংশোধন করা। আমার কাছে আত্মাকে সংশোধন করাই হচ্ছে একমাত্র অপরিহার্য বিষয়, কিন্তু এখন আমরা শুধু শরীর নিয়ে ব্যস্ত; লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে যাই চেকআপ করার জন্যে, কিন্তু মুখে কেউ এ কথা বলে না যে, এগুলো আমার বাইরের অংশ তথা ‘বডি’ আসল অংশ হচ্ছে আত্মা। কোন দিন আত্মাকে চেক আপ করাইছেন? এগুলোর চেক ফাপ কোথায় হয়? আগেকার ওলামায়ে কেরাম ও মাশায়েখগণ নিজেদের আত্মাকে সংশোধন করেছেন এবং তাদের আত্মা চরম উন্নতমানের হয়ে গেছে। তাই আল্লাহ তাআলা

তাদেরকে বেলায়ত দান করেছেন। আমার আত্মা যদি উন্নতমানের হয়, আমার শরীর ও দামী হয়, আর যদি আমার আত্মার গুণ বলতে কিছুই নেই, গোনাহে পরিপূর্ণ, এবং শরীর লিবাস তথা পোশাক পরিচ্ছেদে অনেক সু-সজ্জিত। কিন্তু সে শরীর এর কোন দাম নেই। যেমন একটা শিশির (বোতল) দামি হয় তার ভিতরের আতরের মাধ্যমে, এবং মূল্যহীনও হয় তার ভিতরের আতরের মাধ্যমে। যদি আতর দামী হয় শিশিরও দামি। যদি আতর ভাল না হয় তাহলে শিশিরও দামী নয়। বাইরে যত উন্নতমানের কভার দেওয়া হোক না কেন তার কোন মূল্য নেই। আল্লাহ পাক বলেন, যদি বান্দা তুমি তোমার আত্মাকে সংশোধন করতে চাও, তাহলে তুমি আত্মা সম্পর্কিত যত গোনাহ আছে ছেড়ে দাও। কিছু গোনাহ আছে শারীরিক যে গুলো শরীরের সাথে সম্পর্কিত। যেমন কবিরা, ছগিরা ইত্যাদি। আর কিছু গোনাহ আছে যে গুলো আত্মার সাথে সম্পৃক্ত এ গুলোও ছাড়তে হবে। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন ,

وَذَرُوْا ظَاهِرَ الْاِثْمِ وَبَاطِنَهٗؕ ۰۰۱۲۰

প্রকাশ্য গোনাহ যেমন ডাকাতি চুরি, রাহজানি, সন্ত্রাস ছাড় তেমনি আত্মার ব্যাধিসমূহও ছাড়। তোমার উপরের সব ঠিক টাক যেমনÑ তুমি নামায পড়, রোজা রাখ, হজ কর, যাকাত আদায় কর। কিন্তু তোমার আত্মাকে সংশোধন করনি, এগুলো করা ঠিক হয়েছে? কিন্তু আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহর কাছে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য আত্মাকে সংশোধন করা ফরযে আইন। আমার কথা নয়, এটা হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর কথা যিনি অসংখ্য কিতাবের লেখক, তিনি বলেন, হে ওলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিসীনে ইযাম, ওয়ায়েজীনে কেরাম এবং সাধারণ পাবলিক! তোমরা জেনে রাখ, আত্মশুদ্ধি করা ফরযে আইন। তোমার আত্মাকে সংশোধন কর, পরিষ্কার কর আত্মাকে রোগ মুক্ত কর, এটাকে আমি ফরযে আইন মনে করি। নামায পড়া, রোযা রাখা যে রকম ফরযে আইন তেমনি আত্মাকেও সংশোধন করা ফরযে আইন। যে আলেম বলে আমি অনেক বড় বড় কিতাব পড়াই আমার কোন পীর মাশায়েখের দরকার নেই। থানবী (রহ.) বলেন, আমি তাকে বদজাত (অসৎ) মনে করি। তাই পীর ধরার সময় দেখতে হবে সে কোন ধরনের পীর, যেমন আমার পীর হারদুয়ী (রহ.) এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন এখন যদি এরকম ব্যক্তি পাওয়া যায় তার সান্নিধ্যে থাকার কারণে তুমিও জান্নাতি হয়ে যাবে।

হারদুয়ী (রহ.) বলেন, আত্মশুদ্ধি এমন একটা জিনিস নয় যেটা দু’একটা টেবল্যাট খেলে রোমুক্ত হয়ে যাবে। এটা এমন একটা রোগ যেটার পরিশুদ্ধি করার জন্য কোন একজন খাঁটি পীরের কাছে যেতে হবে তার থেকে সবক নিতে হবে, তার পরামর্শ নিতে হবে। এখন চেয়ারম্যান মনে করে আমি পীরের কাছে কিভাবে যাই? লজ্জা লাগে এই লজ্জাশীল আবু তালেব জাহান্নামে যাবে। اخترت النار على العار আমার হযরত বলতেন, পীর বানাও না। পরামর্শদাতা বানাও। তুমি তার কাছে গিয়ে বল হযরত আমার অন্তর এ রকম কেন? আমি ঘুমিয়ে থাকি, আমার তাহাজ্জুদ ছুটে যায়। জিকির করতে যাই মজা আসে না, স্বাদ আসে না, নামায পড়তে গেলে ওখানে মজা লাগে না। সুরা কাউসার ও সুরা ইখলাছ দিয়ে নামায শেষ করে দিই। মসজিদে যাওয়ার আগে বের হওয়ার ইচ্ছা করি। আমার ঈমান এ রকম কেন? হুযুর আমার ঈমান নেই, যেহেতু আমার চোখ সুন্দরী মেয়ের দিকে যায় এবং আমার অন্তরটা ভোগী, আমার অন্তর বলে কুফরী গোনাহ করে ফেল। পরে তাওবা করবে। বড় শয়তান, এ রকম মনে করলে ঈমান নাই। এ রকম ঈমানওয়ালা উম্মতকে ঠিক করার লোক অনেক আছে, কিন্তু আত্মাকে ঠিক করার মানুষ খুব কম। আত্মাকে ঠিক কর, বক্তা বলেন, হে ভাই! এটা কি জিনিস? যদি আমার আত্মা পাক হয় নজর-দৃষ্টি পাক হবে, রূহ যদি পাক হয় দৃষ্টি পাক হবে। চোখের সম্পর্ক আত্মার সাথে, কানের সম্পর্ক দিলের সাথে, মুখের সম্পর্ক দিলের সাথে। সব জিনিস দিলের, দিল ভাল কাজ ভাল। আল্লাহ পাক আমাদের বোঝার তাওফীক দান করুন। যেমন রাজা ভালো হলে প্রজাও ভাল হবে, রাজা যদি নামাযী হয় প্রজাও নামাযী হবে।

বাদশাহ যদি ভাল হয় তার সান্নিধ্যের প্রভাবে এবং তার পরহেজগারীতে প্রজাও ভাল হবে। তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন আসমান নীল রঙ্গের সবুজ তার সান্নিধ্যের কারণে সমস্ত গাছ-পালা ও সবুজ শ্যামল হয়ে গেছে। যদি আমার আত্মা পাক হয় তাহলে নজরও পাক হবে। আর নজর পাক হলে আমার দৃষ্টি কোথাও যাবে না। তোমার চক্ষুকে বল তোমাকে বের করে দেব, কিন্তু এই মহিলা যাকে দেখা হারাম যার কারণে আমার ঈমান চলে যাবে, আমার ঈমানে আঘাত আনবে, আমার আত্মাতে দাগ লাগবে সে দিকে আমি দেখব না। এরকম কে বলতে পারবে। আত্মা যদি অসুস্থ হয় তাকে সংশোধন কর। আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْؕ ۰۰۳۰

‘হে আমার নবী! পুরুষদের বলে দিন যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে।’  চক্ষু হেফাজত হয় নিচের দিকে তাকালে, আপনি যদি এদিকে ওদিকে তাকান তাহলে কি চক্ষু হেফজত হবে? আপনি মৌলভী মৌলভী থাকবেন মুফতী মুফতী থাকবেন মুফাস্সির মুফাস্সির থাকবেন। কিন্তু খারাপ দৃষ্টির কারণে আপনার অন্তর শেষ হয়ে যাবে, বেলায়তের ওহী বন্ধ হয়ে যাবে, এই ভাই এটা একটা সত্যি কথা, ইসলামী ইতিহাসের কথা, খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত ওমর ফারুক (রাযি.)-এর যুগে সিরিয়ার গভর্ণর ছিলেন আবু ওবায়দা ইবুনুল র্যারাহ (রাযি.) তিনি সাহাবীদের মধ্যে অনেক উঁচুমানের সাহাবী ছিলেন, তিনি একদিন ভাবলেন খ্রিস্টানদের একটি গির্জা কোনো ভাবে জয় হচ্ছে না, তখন সেখানের গভর্নরের দায়িত্ব তাঁর হাতে, ইসলামের ঝান্ডা কিন্তু বিজয় হচ্ছে না, মুসলমানদের একটি বড় জামায়াত এই গির্জাকে ঘিরে রেখেছে। মাসের পর মাস খ্রিস্টানরাও গির্জা থেকে বের হচ্ছে না। আর মুসলমানরা গির্জার ফটক ছাড়ছে না। সংঘর্ষ তুমুল হচ্ছে কথা ভালো করে খিয়াল রাখবেন। দিল পাক নেগাহ (দৃষ্টি) পাক। আমার দিল যদি পাক হয় আমার চোখও পাক হবে। দিল যদি পাক হয় আমার হজ কবুল হবে। দিল যদি পাক হয় আল্লাহর পক্ষ হতে কেরামতের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। আল্লাহর পক্ষ হতে বলা হবে ইনি আল্লাহর অলি, বহু মানুষ আছে না? যারা হজ করার জন্য যাচেছ, কিন্তু কানের মধ্যে গান বাজনার আওয়াজ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এই হজের দ্বারা তার কি লাভ হবে?

যমযমের পানি পান করেছ, তার পরও তোমার পিপাসা নিবারণ হয়নি, কাবা দেখেছ তার পরও তোমার ঈমান তাজা হয়নি। হজ করতে পার হাজার বার, কিন্তু তোমার অন্তর পবিত্র নয়, তোমার এই হজ কবুল হবে না, হঠাৎ একদিন আবু উবাইদা ইবনুল র্যারাহ (রাযি.) যার নাম ইতিহাসবিদরা লিখেন, তিনি কোনো সাধারণ আলেম নন। বড় মাপের একজন সাহাবী। তার কাছে গির্জার প্রধান খবর পাঠিয়েছেন, হে আবু ওবায়দা! তোমার বাহিনীকে বল, আমি গেইটের দরজা খুলে দেব সবাইকে গির্জায় ঢুকে পড়ার জন্য বল, যদি আমার সিংহাসন পর্যন্ত আসে তাহলে আমি সবাইকে ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করব। আবু ওবাইদা বলেন, নিশ্চয়ই এখানে কোন রহস্য আছে। ৩ মাস ধরে এখানে আছি কোন দিনও এ রকম বলেননি। তিনি তো সাহাবী এখানে কোন দুর্ঘটনা হতে পারে,

اتَّقُوْا فِرَاسَةَ الْـمُؤْمِنِ فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُوْرِ اللهِ.

তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। হে রাসূলের সাহাবী! তোমরা পরামর্শ দাও। এখন কী করতে পারি, সাহাবায়ে কেরামরাও বলেন,আমাদের মনেও তো এই প্রশ্ন জাগছে। এতদিন খুলে দেইনি এখন কেন খুলে দিচ্ছে? নিশ্চয়ই এখানে কোন রহস্য থাকতে পারে। আবু ওবাইদা বলেন আমি এখন আল্লাহর সাথে পরামর্শ করছি। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অন্তরে একথা আসছে যে,হে আবুওবাইদাহ! সাহাবায়ে কেরাম ঢুকতে পারবে। কিন্তু সবাইকে একটা নসিহত কর। ‘ইলহাম’ বলা হয়, কোন ফেরেশতার মাধ্যমে নয় যা সরাসরি আল্লাহর আরশে আযীম থেকে বান্দার কলবে নাজিল হওয়া,আর এটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার ওপর ইলহামস্বরূপ। আবু ওবাইদা! তুমি সাহাবায়ে কেরামদেরকে নসীহত কর। তারা তোমার কথা মানবে। এই সাহাবায়ে কেরাম! সবাই ওয়াদা কর তোমরা আমার নসিহতটা মানবে কি? গেট খোলার যেই উদ্দেশ্য হোক না কেন? সাহাবারা বললেন, হুযুর নসীহত কী? গেট খোলার পর যতদিন যত কিছু লাগবে না কেন? ওয়াদা কর তোমাদের দৃষ্টি নিচের দিকে রাখবে। হাজার দুনিয়া ভাঙতে পারে, ভুমিকম্প হতে পারে, আসমান টুকরা টুকরা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তোমাদের নজর এদিক ওদিক যেতে পারবে না। তোমরা আমার সাথে ওয়াদা কর। এটা আল্লাহ পাকের হুকুম। আল্লাহ বলেন,

قُلْ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْؕ ۰۰۳۰

এটা কুরআনের আয়াত তোমরা এটার ওপর আমল করবে। সবাই একসাথে বললেন, হুযুর ঠিক আছে আমরা সবাই আমল করব। আমাদের জান যেতে পারে কিন্তু আমাদের চোখ এদিক ওদিক যাবে প্রবেশ করেন। আবু ওবাইদা (রাযি.) একদল বাহিনীকে আগে পাঠালেন, দেখছেন খ্রিস্টানরা রাস্তার উভয় পাশে হাজার হাজার দোকান বানিয়েছে। সব দোকান খোলা। সব দোকানে এক একজন সুন্দরী বসিয়ে দিয়েছেন, আর যিনি খ্রিস্টানদের মালিক তিনি তাদেরকে বলে দিয়েছেন। মুসলমান মদীনাবাসী হেজাজ থেকে আগত ব্যক্তিরা বহু দিন ধরে বউ, বেটি ছেড়ে এসেছে, তাই যদি তোমাদের থেকে কোনো কিছু চায়। তোমাদের শরীরে হাত লাগাতে চায়, তোমাদেরকে ভালো করে দেখতে চায়, তোমরা না বলবে না (নাউযুবিল্লাহ) সাথে সাথে তোমরা রাজি হয়ে যাবে। আত্মাকে হেফাযত করা খুব কঠিন। যেমন কবি বলেন, এটা আল্লাহ পাকের মুহাব্বতের টান। আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়ত আসার টান। তোমার দিল যদি খারাপ হয়, হেদায়তের আলো কোথায় আসবে? তোমার মাথায় না তোমার কানে? আল্লাহর হেদায়তরে আলো বান্দার অন্তরে নাযিল হয়। তোমার কলব তো বন্ধ। হযরত আবু ওবাইদা (রাযি.) বলেন, আমি তোমাদেরকে নসীহত করছি তোমাদের জন্য হাজার হাজার সুন্দরী নারী বসিয়ে রাখছে। যদি তাদেরকে খাসভাবে দেখ, সাহাবিয়ত, বুযর্গিয়ত, বেলায়ত সব ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁরা তো সাহাবায়ে কেরাম। তাঁরা কি? সাহাবা। সহজ ব্যাপার নাকি তাঁদের দৃষ্টি এদিক ওদিক যাবে? তাঁরা অনেক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এত ইলম, এত জ্ঞান কোথা থেকে এসেছে? যেমন কবি বলেন,

لوح محفوظ است پيشاں او کجا

زاد کونين است معہد عاشقاں

এখানে জ্ঞানের ভাণ্ডার আমির ভাণ্ডার নয়। কিন্তু সব ভাণ্ডার পেয়েছে রাসুলের চেহারা থেকে। কোন ফতোয়া দিতে হচ্ছে, কোন কিতাব বুঝতে হচ্ছে, কোন তাফসীর বুঝতে হচ্ছে, কোনো প্রশ্ন আসলে সাহাবারা বলেন, আমাদের কিতাব উল্টাতে হয়নি। আমরা রাসুলের চেহারার দিকে তাকিয়েছি, সাথে সাথে সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতাম। কিতাব দেখতে হয়নি, আমরা দেখেছি আমাদের নবীর চেহারা। তাঁরা কি মহিলার দিকে দেখবেন? তাঁরা কি দরবারি, তাঁরা কি দরগাহঅলা, না, না। তাঁরা হলেন রাসুলের সাহাবী। হযরত আবু ওবাইদা (রাযি.) বলার সাথে সাথে এরকম করে হাটছেন তাদের চোখ কদমের দিকে, এদিক ওদিক করে না। যিনি গির্জার মালিক মানুষ নিযুক্ত করে দিয়েছে, তাদের অবস্থা দেখার জন্য যদি একজন মহিলার দিকে দেখে তাহলে সব শেষ, সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এদিকে মহিলা সবাই প্রস্তুত, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম এদিক সেদিক দেখছেন না। বাদশাহ জিজ্ঞেস করছেন, তোমাদের সাথে কি আচরণ করেছে? এখন তারা বলল, তাঁরা তো মানুষ না, এ রকম সুন্দরী মহিলা সবাই সেজে-গুজে প্রস্তুত, কিন্তু তাঁরা আমাদের দিকে তাকাননি, তাঁদের মধ্যে যৌনতা নেই। মেয়েরা বলল, আমরা সুন্দর হয়ে কি লাভ। বাদশাহ বলল কেন? তারা বলল, আমরা এতো হাসলাম এত কাচি দিলাম এত দেখার জন্য দাওয়াত দিলাম তাদের চক্ষু নিচের থেকে উপরে উঠে না। বাদশাহ বলল, তাহলে কাজ হবে না। যদি চক্ষু নিচের দিকে থাকিয়ে আমার এখানে চলে আসে তাহলে আমরা তাদের ওপর জয়লাভ করতে পারব না। চল জয় করব না। কিন্তু তারা যে রাসুলের গোলাম হয়ে গেছে সাক্ষি থাক আমিও সে রাসুলের গোলাম হয়ে গেলাম। তলোয়ার লাগছে? না অস্ত্র? না খ্রিস্টানরা বলে ইসলাম তলোয়ারের মাধ্যমে প্রচার-প্রসার হয়েছে। এটা ভুল। কোন তলোয়ারের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার-প্রসার হয়নি; বরং প্রচার হয়েছে চরিত্রের মাধ্যমে। আত্মশুদ্ধির কারণেই হযরত আবু ওবাইদা বলেন, তোমার একটা তলোয়ারও কাজে আসেনি। শয়তানি কোন তলোয়ারও কাজে আসেনি। শয়তান পথভ্রষ্ট করতে পারেনি। হযরত আবুওবাইদা ভাষণ দিচ্ছেন, কেন পারেনি? তিনি বলেন, শয়তান আল্লাহর দরবার থেকে মাহরুম হয়ে গেছে, তখন শয়তান চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল হে আল্লাহ! যে আদমের কারণে আমি বেহেশত থেকে বঞ্চিত হলাম আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাই। আমি চাই তোমার বান্দাদের চতুপ¦ার্শ থেকে গোমরাহ করতে। আল্লাহর কাছে বলছে,

ثُمَّ لَاٰتِيَنَّهُمْ مِّنْۢ بَيْنِ اَيْدِيْهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ اَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَآىِٕلِهِمْ١ؕ وَلَا تَجِدُ اَكْثَرَهُمْ شٰكِرِيْنَ۰۰۱۷

শয়তান বলে হে আল্লাহ! তোমার বান্দাদেরকে আমি পথভ্রষ্ট করব, চারদিক থেকে সামনে থেকে পেছন থেকে ডানদিক থেকে। আল্লাহ বলেন, শয়তান ঠিক আছে তুমি চারদিক থেকে গোমরাহ কর। হে শয়তান! তুই নিজে বলেছিস দিক চারটা, আমি একটা খুলা রাখছি,এটা উপরের দিক, শয়তান বলে আমি ওপর থেকে আসব, নিচে এটা বলতে ভুলে গেছি। এটা ভুলে গেছে নাকি ভুলে দেওয়া হয়েছে, কেন আল্লাহ বলেছেন, তুই চারদিক থেকে গুনাহ কর, আমি ওপর দিয়ে রহমত নাযিল করব। আমাদের নজর দিয়ে কাজ হবে না, আল্লাহ পাকের রহমত যদি না থাকে, আর দৃষ্টি যদি নিচের দিকে থাকে। দুটা দিক শয়তানের জন্য বন্ধ মনে থাকবে? কয়টা দিক ২টি। যদি নজর নিচের দিকে থাকে। আল্লাহ! আমাদের মনে একটা প্রশ্ন আসে। কিছু শিক্ষিত মানুষ কলেজের প্রফেসর আমার কাছে এসেছে বায়াত গ্রহণ করার জন্য। আমি বললাম, তোমরা কেন এসেছ তোমরা এরকম কেন হয়ে গেছ? তারা বলল, হুযুর জানি না। আমাদের অন্তরে অনেকদিন ধরে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। আমরা কোথায় যাচ্ছি? কি করছি? কিছু বুঝছি না। আল্লাহর কাছে দোয়া কর আল্লাহ যেন সে রকম অস্থিরতা থেকে হেফাজত করেন। নিজে নিজে পারে না আমি নিজে নিজে আমার অন্তর পরিষ্কার করতে পারব না يُزَكِّيْهِمْؕ ۰۰۱۲۹ রাসুলের একটা দায়িত্ব, সাহাবায়ে কেরামকে তুমি তাযকিয়া তথা আত্মশুদ্ধি কর। আল্লাহ পাক আমাদেরকে আত্মশুদ্ধি করার তাওফীক দান করুক। যখন আত্ম পরিষ্কার হবে, তখন তোমার নাম একনিষ্টতার সাথে হবে, লোক দেখানো হবে না, মানুষ স্বাগতম বা সাধুুবাদ জানানোর জন্য দান কর না। আমাদের এখানে মারহাবা দেওয়া হয় না, তোমার টাকা আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দাও। মারহাবা তালাশ কর না। মারহাবা তালাশ করলে তোমার আত্মা ধ্বংস হয়ে যাবে। কি মারহাবা? আল্লাহ! আমাদেরকে আত্মশুদ্ধিমূলক জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

আল্লাহ পাকের কাছে কাকুতি মিনতি কর, বেশি না ১৫ মিনিটের জন্য উঠে ২ রাকাত নামায পড়ে চোখের পানি প্রবাহিত কর, আল্লাহ আল্লাহ জিকির কর। তুমি এসব করবে আত্মশুদ্ধি করা ও আত্মা পরিষ্কার হওয়ার জন্য। তাহাজ্জুদ থেকে বড় মেডিসিন আর নাই। আল্লাহ সবাইকে তৌফীক দান করুক। এখন তো সব ঘর বাড়ি কবরস্থানের মত নিরব, নিস্তদ্ধ থাকে। এতো লম্বা রাত কেন উঠতে পার না? হযরত সৈয়দ সুলাইমান নদভী (রহ.) এক বড় বিখ্যাত আলেম। ওলামায়ে কেরাম তাঁর সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। সুলাইমান নদভী (রহ.) কোনো দিন পীর মানেননি কেমনে কেমনে মুজাদ্দেদে মিল্লাত হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর হাতে বায়আত হয়ে গেলেন। তাঁর অবস্থা দেখুন তিনি একবার এসে বলছেন হুযুর বায়আত তো হলাম তরীকতের তাশাদ্দুদের প্রভাব কি? তাঁর প্রশ্ন অনুযায়ী নম্র ভাষায় তিনি বলেন, হে নদভী সাহেব! ‘আব তো বড়ি আল্লামা হে (আপনি তো বড় আলেম)। মাই এক তিফলে মকতব হুঁ (আমি তো একজন মকতবের শিশু) আব কূ কিয়া মকাম হে? তাশাদ্দুদ তরিকত কা নাম হে (তাশাদ্দুদ তরিকতের নাম)’ নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। তার একথা শোনার সাথে সাথে হযরত নদভীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত আগুন জ্বলে উঠল এবং এরকম কান্না করলেন। তিনি এক জায়গায় বলেছেন, আমি থানবী (রহ) এর হাত ধরার পর এমন ভাবে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছি যখন আমি কুরআন শুনতাম তখন আমার মনে হত কোরআন এখন নাযিল হচ্ছে,

آج آج ہی پایا مزہ برہان کا

جیسا قرآں آج ہی نازل ہوا

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করন। অহংকার করব না। হযরত আযিযুল হাসান মজযুব থানভীর দরবারে এসে বলছেন,

یہ اور کوئی خواہش تیرے در پہ لایا ہوں

নিজেকে মিটিয়ে দেওয়া আত্মশুদ্ধির ১নং বিষয়। তাকাব্বুরি, আমিত্ব, বড়ত্ব, লিপ্সা রুহানী মনীষীগণ এগুলো বিলুপ্ত করার জন্যে অনেক জনের হাতে হাত দিয়ে কিছু মেডিসিন ব্যবহার করেন। আল্লাহ! আমাদেরকে আত্মশুদ্ধি অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

অনুলিখন: হাফেজ মু. ইবরাহীম

আদব বিভাগ ২০১৭

আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া

————————————————————————————————————————————————————————————————————————

  আল-কুরআন, সূরা আল-আনআম, ৬:১২০

  আল-কুরআন, সূরা আন-নুর, ২৪:৩০

  আত-তিরমিযী, আল-জামি‘উল কবীর = আস-সুনান, মুস্তফা আলবাবী অ্যান্ড সন্স পাবলিশিং অ্যান্ড প্রিন্টিং গ্রুপ, হলব, সিরিয়া, খ. ৫, পৃ. ২৯৮, হাদীস: ৩১২৭

  আল-কুরআন, সূরা আন-নুর, ২৪:৩০

  আল-কুরআন, সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৭

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ