দখলদারমুক্ত মুসলিম ভূমির স্বপ্ন
যুবায়ের আহমাদ
বর্তমান পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু ইসলাম। ইউরোপ-অ্যামেরিকাসহ গোটা পৃথিবীতেই ব্যাপক হারে অন্য ধর্ম ত্যাগ করে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। বহু বাধা-বিপত্তির কণ্টকাকীর্ণ পথ পারি দিয়ে গত এক যুগে প্রায় এক লাখ নেপালি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কিন্তু তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মুসলমানদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো দখলদারদের বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত। পৃথিবীজৃড়ে মুসলমানের পরিমাণ বাড়লেও মুসলমানদের ভূমিগুলো দখলমুক্ত হচ্ছে না।
পবিত্র ভূমি জেরুজালেম, আরাকান, উইঘুরিস্তান আর কাশ্মীর সবই আজ ইহুদি খৃস্টানের দখলের শিকার। ইহুদিরা ব্রিটেনের মদদে ফিলিস্তিনের জায়গা দখল করে স্বাধীন ফিলিস্তিনের মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হয়ে গিয়ে তারা আলাদা রাষ্ট্রের দাবি করে। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে ব্রিন বিষয়টিকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়। আর ব্রিটেনের ইশারায় জাতিসংঘ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ১০ শতাংশ জমির মালিকদের জন্য গোটা ফিলিস্তিনের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি বরাদ্দ করে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। রাতারাতি ইসরায়েলকে তারা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু যে স্বাধীন রাষ্ট্রের জায়গা দখল করে ইসরায়েল নামক বিষফোঁড়ার জন্ম দেওয়া হলো সে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আজও দেয়নি জাতিসংঘ। ইসরায়েলিদের ট্যাঙ্ক বা কামানের বিপরীতে শান্তিকামী ফিলিস্তিনীরা যখনই আত্মরক্ষার জন্য ইট পাটকেল হাতে নিয়েছে তখন ইহুদি নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়া ট্যাঙ্ক বা কামানের দিকে তাদের ক্যামেরাটা না ধরে ট্যাঙ্কের দিকে ইট-পাটকেল ছুড়া লোকটির ছবি তুলে পৃথিবীবাসীকে দেখিয়েছে, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনীরাই মস্তবড় জঙ্গি। আর জঙ্গিদের নিধনে তো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আপোষহীন। তাই ফিলিস্তিনীদের নিধনও বৈধ। এভাবেই পশ্চিমারা জঙ্গি’ তকমায় কৌশলে আড়াল করে দেয় ফিলিস্তিনী মুসলমানদের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে। অথচ তারাই পূর্বতিমূরের স্বাধীনতাকামীদের পক্ষে কথা বলেছে। ইন্দোনেশিয়াকে ভেঙে স্বাধীন পূর্ব তিমুর প্রতিষ্ঠায় সব ধরণের আয়োজনে সহযোগিতা করেছে। পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতাকামীদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আনুকূল্য পেতে কোনো সমস্যা হয়নি কারণ তারা মুসলমান নয়, খ্রিস্টান।
অর্ধশত বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা চীনা সরকারে নির্যাতনের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সর্ববৃহৎ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী উইঘুর। জিংজিয়ায় এলাকার মূল অধিবাসী উইঘুররা মূলতই জিংজিয়াং বা কাশগর এলাকায় হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে। জিংজিয়াং চীনের অধিকারে ছিল না, তা ছিল মুসলমানদের স্বাধীন ভূমি। মুসলমানদের শাসনে থাকাকালে এ এলাকার নাম ছিল উইঘুরিস্তান বা পূর্ব তুর্কিস্তান। ১৬৬৪ সালে বর্তমান চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাঞ্চু শাসকরা কিং সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলে অন্যান্য এলাকার সঙ্গে মুসলমানদের স্বাধীন এ এলাকাও দখল করে নেয়। স্বাধীনচেতা মুসলমানরা অব্যাহত স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে ১৮৬৪ সালে ২ শ বছর পর কিং শাসকদের বিতাড়িত করে কাশগর কেন্দ্রিক আবার স্বাধীনতার পতাকা উড়ান। স্বাধীনতাকামী এ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আবারো আক্রমন করে চীন। সমাজতন্ত্রের বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত হয়ে আবারো স্বাধীনতা হারায় উইঘুরিস্তান। ১৮৭৬ সালে চীন আবারো উইঘুর স্রামাজ্য দখল করে এর নাম দেয় জিনজিয়াং। জিনজিয়াং অর্থ নতুন ভূখ-। সেই থেকেই পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হয় উইঘুর মুসলিমরা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভূসর্গ হয়েও দখলদারের আক্রমণে আক্রান্ত কাশ্মীর আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় কাশ্মীরকে ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে না রেখে একে পূর্ণ আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে রাখা হয়। রাখা হয় তাদের জন্য আলাদা জাতীয় পতাকা ও স্বায়ত্মশাসনের ব্যবস্থা। কাশ্মীরের সরকারপ্রধানের পদকে রাখা হয় প্রধানমন্ত্রী। হঠাৎ কাশ্মীরিদের বুকেরর ওপর জগদ্দল পাথরের মতোই চেপে বসে ভারতীয় দখলদার বাহিনী। রাতের অন্ধকারে কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহকে তার পদ থেকে অপসারণ করে গ্রেফতার করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কাশ্মীরের স্বতন্ত্র মর্যাদা লুপ্ত করে একে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে এর প্রধানমন্ত্রীর পদকে করা হয় মূখ্যমন্ত্রী। ঘোষণা করা হয় কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেড়ে নেওয়া হয় কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার অধিকার। কাশ্মীরিরা তা মেনে নেয়নি। তারা নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের চেষ্টাকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে দখলদাররা। স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের অব্যাহত চেষ্টায় ক্রমেই যখন কাশ্মীরের স্বাধীনতার সূর্যোদয় সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে তখনই তাদের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক বড় একটি সমস্যা হলো রোহিঙ্গা সমস্যা।
রোহিঙ্গারা হাজার বছর ধরে বংশানুক্র তাদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ) বসবাস করে আসছিল। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ দেশটিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এর পাশে থাকা বার্মার দখলদার সরকার ১৭৮৪ সালে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দখল করে নেয়। দখলদার বার্মিজরা ক্রমেই আরাকানিদের সুযোগ সুবিধার পথ সংকোচিত করতে থাকে। সর্বশেষ ১৯৮২ সালে তথাকথিত নিউ সিটিজেনশিপ ল বা নতুন নাগরিত্ব আইন প্রণয়ন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বটুকুও কেড়ে নেয়। তাদের বিদেশী হেসেবে গণ্য করা হয়। নিজেদের হাজার বছরের আবাসভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়ে রোহিঙ্গারা। তারা যখনই তাদের মৌলিক অধিকারের দাবি করেছে তখনই তাদের ওপর নেমে এসেছে আইয়ামে জাহিলিয়াতকে হার মানানো নির্যাতন। শতবছরেরও বেশি সময়ের নির্দয় আচরণে একটি বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট যে মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের অধিকার পাওয়ার আশা আর করা যায় না। ক’দিন পরপরই কোনো না কোনো অজুহাতে তারা রোহিঙ্গা নিধন শুরু করবে। স্বাধীন আরাকান প্রতিষ্ঠাই রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের সর্বোত্তম পথ। কিস্তু আরাকানের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। আর মুসলমানদের আরেকটি স্বাধীন ভূমি পশ্চিমাদের অহেতুক মাথাব্যথার কারণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ অধিকারকে মুসলমানের অধিকার’ হিসেবে না দেখে মানুষের অধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করতে মুসলিম দেশগুলোকে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। যারা তা কেড়ে নেয় তারা জালেম। সব আইনেই জালেমদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বাধ্যতামূলক। কিন্তু সে সংগ্রাম এককভাবে বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, ইসরায়েল, চীনসহ দখলদার দেশগুলো একজোট। দখলকৃত মুসলিম দেশগুলোর নিরীহ মুসলমানরেদকে তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার মানবতা ও মানবাধিকারের এ বৃহৎ স্বার্থে মুসলিম দেশগুলো কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে অন্যান্য দেশের সমর্থন দিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে দখলদারদেরকে দখল ছাড়তে বাধ্য করতে পারে। তাতেও কাজ না হলে স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের পক্ষে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট করে জাতিসংঘের সহায়তায় এ অঞ্চলগুলোকে স্বাধীন করে দেওয়ার কোনো বিকল্প থাকবে না। এটিই হবে রেহিঙ্গা বা ইউঘুর সমস্যার টেকসই সমাধান।
লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট