উম্মাহর দরদি রাহবার
হযরত আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
উপমহাদেশের বরেণ্য আলিমে দীন, হেফাযতে ইসলামের আমীর চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলামের মহাপরিচালক শায়খুল ইসলাম হযরত আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে একটি শতাব্দীর যবনিকা ঘটল। ইসলামী সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ, বিদআত ও শিরকমুক্ত সমাজ গঠন, উত্তরাধিকার ঐতিহ্য লালন, আত্মশুদ্ধি ও কওমি শিক্ষার উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে। কওমি অঙ্গনের ৪০ লাখ ছাত্র-শিক্ষক বিনাবাক্য ব্যয়ে তাঁর নির্দেশ মেনে চলতেন। এক কথায় তিনি ছিলেন তাঁদের নিয়ামক শক্তি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলায় এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক তাঁর সরাসরি ছাত্র, শিষ্য, খলীফা, ভক্ত ও গুণগ্রাহী। তাকওয়া, ইখলাস ও নিষ্ঠার কারণে তিনি ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন।
তিনি আগাগোড়া ছিলেন জ্ঞানগবেষক, হাদীসের উস্তাদ ও আধ্যাত্মিক রাহবার। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফারিগ হওয়ার পর থেকে তিনি শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। এক দিনের জন্যও দারস ও তাদরিস থেকে দূরে থাকেননি। ৮০ বছর ইলমে দীনের খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, এর মধ্যে ৩৪ বছর তিনি হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, এমনকি অসুস্থ হয়ে একেবারে শয্যাশায়ী হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে বুখারী শরীফের পাঠদান করতেন। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে আছে তাঁর বিপুল খলীফা, শিষ্য, ছাত্র ও গুণগ্রাহী। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া, আনজুমনে ইত্তেহাদুল মাদারিস ও অন্যান্য কওমি মাদরাসা বোর্ডসমূহের সর্বোচ্চ পরিষদ হাইয়াতুল উলিয়ার চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে কওমি মাদরাসা বোর্ডসমূহের কর্তৃপক্ষের অবিরাম প্রচেষ্টায় দাওরায়ে হাদীসের সনদ রাষ্ট্রীয়ভাবে এমএ (আরবি ও ইসলামের ইতিহাস)-এর সমমান স্বীকৃতি লাভ করে। তাঁর আন্দোলনের ফলে স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আসে। অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে কওমি অঙ্গনে এত জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি আর হয়নি।
১০৪ বছরের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পঠন পাঠন, লেখালেখি, জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞান বিতরণ, ওয়ায ও নসীহতের বাইরে অন্যকোন ক্ষেত্রে তাঁর পদচারণা ছিল না বললেই চলে। রাজনীতি, কূটনীতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ও ম্যাকিয়াভেলিয়ান মারপ্যাঁচের ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন সাদাসিধে, আড়ম্বরবর্জিত, সহজ সরল এক দরবেশ। সৌজন্যবোধের প্রাবল্য ও শান্ত সমাহিত মন-মেজাজের কারণে তিনি মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতেন।
২০১০ সাল থেকে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হয়ে পড়েন। স্মর্তব্য যে, পাকিস্তান আমলে হাটহাজারী মাদরাসার তৎকালীন মহাপরিচালক, হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর খলীফা হযরত আল্লামা আবদুল ওয়াহাব (রহ.) যখন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে ঢাকা, করাচি ও লাহোরে তৎপর ছিলেন, তখনও হযরত আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-কে দলীয় রাজনীতি বা কোন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। এমনকি উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খুল ইসলাম হযরত সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর যেসব মর্যাদাবান খলীফা বাংলাদেশে ছিলেন কম বেশি সকলেই জমিয়তে ওলামার প্লাটফরমে সক্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁদের সাথেও যুক্ত হননি। মূলত তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী জ্ঞানগবেষক, নীরব সাধক ও প্রচারবিমূখ এক বুযুুর্গ। তিনি বড়-ছোট মিলিয়ে বাংলা ও উরদু ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি গ্রন্থ রচনা করেন। কিতাব অধ্যয়ন, যিকির-আযকার, অযিফা পাঠ, নফল নামায ও নফল রোযা পালন ছিল তাঁর দৈনন্দিনের আমল। তাহাজ্জদ নামায আদায়ের প্রতি তিনি সর্বদা যত্নবান থাকতেন। তাআল্লুক মাআল্লাহর বরকতে তাঁর কথায় আসর পয়দা হতো। তিনি গণমানুষের ভালবাসার পাত্র হয়ে উঠেন।
এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি কওমি অঙনের আলিম ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে আসীন হন। বায়তুল মুকাররমের খতীব হযরত আল্লামা ওবায়দুল হক (রহ.), শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.), মাওলানা সাইয়েদ মুহাম্মদ ফজলুল করীম (মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই) ও মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ.)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিবাদী আলিমদের ইন্তেকালের কারণে কওমি অঙ্গনের ওলামা-মাশায়েখের নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়। নাস্তিক্যবাদী শক্তির আস্ফালন, গণজাগরণ মঞ্চের আপত্তিকর বক্তব্য, ব্লগার ও সুশীল নামে পরিচিত একশ্রেণির সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের ইসলাম বিরোধী বক্তব্য ও মন্তব্য যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন জন্ম নেয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামক অরাজনৈতিক সংগঠনের। সে সময় হযরত আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর চেয়ে গ্রহণযোগ্য ও বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী অন্য কোন ব্যক্তি সামনে ছিল না। আন্দোলনকারীরা তাঁকেই আমীর হিসেবে বেছে নেন। তিনি হয়ে উঠেন নববিপ্লবের প্রতীক।
শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) ২০১২-১৩ সালে ১৩ দফা দাবি নিয়ে যখন ময়দানে আসেন তখন তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। তিনি প্রকাশ্য জনসভায় বলেন, ‘আমার আন্দোলন কোন ব্যক্তি বা দল বিশেষের বিরুদ্ধে নয়। ধর্মদ্রোহী ও নাস্তিক্যবাদীদের বিরুদ্ধে আমার আন্দোলন। কোন দলকে ক্ষমতা থেকে নামানো বা কোন দলকে ক্ষমতায় বসানো আমার অ্যাজেন্ডা নয়। রাস্তায় যেখানে বাধার সম্মুখীন হবেন সেখানে জায়নামায নিয়ে আপনারা বসে পড়বেন এবং তাসবিহ পাঠ করবেন।’
১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৩ সালের ৫ মে তাঁর ডাকে ঢাকা অবরোধ ও শাপলা চত্বরে যে অভূতপূর্ব সমাবেশ হয় তা ছিল ঐতিহাসিক। এর মাধ্যমে বিবিসি, সিএনএন, আল-জাযিরা, ডয়চে ভেলে, ভয়েস অব আমেরিকাসহ দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় তাঁর আলোচনা-পর্যালোচনা তুঙে উঠে। তখন থেকে তিনি খ্যাতির অনন্য উচ্চতায় আসীন হন। শাপলা চত্বর ট্র্র্যাজেডি, হেফাযতের আন্দোলনের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে পুঙ্কানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ রাজনীতি বিশ্লেষেকদের গবেষণার বিষয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সের ছাত্রথাকালীন থেকে আমি হযরতকে জানি ও চিনি। দেখলেই আমাকে টেনে কাছে বসাতেন। তাঁর মেহমানদারি, ভদ্রতা ও শালীনতাবোধ আমাকে বারেবারে মুগ্ধতায় ভরে দিয়েছে। তিনি আমাকে চিশতিয়া, কাদিরিয়া, নকশবন্দিয়া ও সোহরাওয়ারদিয়া তরীকায় সবক প্রদান করেন। বছর কয়েক আগে হাটহাজারী মাদরাসার দারুল হাদীসে আমি তাঁর সামনে বসে বোখারী ও নাসাঈ শরীফের শেষ হাদীসের সবক শুনি। হাটহাজারী মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে আমি ২০ বছর যাবৎ বয়ান করে আসছি। হযরত একসাথে আমাকে অগ্রিম দু’বছরের দাওয়াত দিতেন চিঠি দিয়ে। বহু সম্মেলন ও তাফসীর মাহফিলে তাঁর সাথে একই প্লাটফরমে বক্তব্য রাখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এক সময় চট্টগ্রাম লালদীঘি ময়দানে হেফাজত আয়োজিত শানে রেসালত সম্মেলনে বক্তৃতা শেষে মঞ্চের পেছনে অস্থায়ী কক্ষে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমি আপনার বক্তব্য পুরো শুনেছি। এগুলো লিখে রাখুন, হারিয়ে যাবে। কিতাবের রেফারেন্স দিয়ে ওয়ায করার মানুষ কমে গেছে।’ প্রিয় মুরব্বির পবিত্র যবান থেকে এ জাতীয় উৎসাহব্যঞ্জক উক্তি আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত ও প্রণোদিত করে। হযরতের একথা স্মৃতিপটে উজ্জ্বল থাকবে।
শায়খুল ইসলাম হযরত আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর জানাযায় সর্বস্তরের লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ তাঁর গগণচুম্বি জনপ্রিয়তার প্রমাণ বহন করে। দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসভার সদস্যগণ, সাংসদগণ, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ভারতের জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সাইয়েদ আরশাদ মাদানী, সাইয়েদ মাহমুদ মাদানী, পাকিস্তানের সাবেক বিচারপতি মুফতি তকী ওসমানী, জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা তারিক জামিল, মাওলানা ইলিয়াস গুম্মান, বর্তমান বিশ্বের খ্যাতনামা স্কলার ড. ইউসুফ আল-কারযাবী, ইতিহাসবিদ শায়খ আলী আস-সাল্লাবী, ভারতের নাদওয়াতুল ওলামার রেক্টর সাইয়েদ রাবে হাসান নদভী, মালয়েশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহীমসহ দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তি তাঁর ইন্তিকালে শোক প্রকাশ এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। সুন্নাতে রাসূল (সা.)-কে জিন্দা করার প্রয়াস, জনবান্ধব কর্ম, প্রতিবাদী আন্দোলন, ইলমের খিদমত ও সমাজ সংস্কারে তাঁর অনবদ্য অবদানের জন্য জাতি তাঁকে কৃতজ্ঞতার সাথে চিরদিন স্মরণ করবে। আল্লাহ তায়ালা আখিরাতে হযরতের দারাজাত বুলন্দ করে দিন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম নসীব করুন। তাঁর প্রতি রইল আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গনি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম