রবিবার-৮ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি-২৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৫ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হিজরী বর্ষের প্রতি আমাদের উদাসীনতা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—যার প্রতিটি অনুশাসন সুনির্দিষ্ট, প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যমূলক। এমনকি সময় ও কালের হিসাবও ইসলামে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। অথচ আজকের মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে আমাদের নিজেদের মধ্যে, হিজরী বর্ষপঞ্জির প্রতি যে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও চিন্তার বিষয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, আল্লাহ যেদিন আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই বছরের গণনা বারোটি মাসে নির্ধারিত। এদের মধ্যে চারটি মাস পবিত্র, যার মধ্যে মুহাররম হলো হিজরী বছরের সূচনা। ইসলামের সমস্ত মৌলিক ইবাদত—রমযানের রোযা, হজ, ঈদ, লাইলাতুল কদর প্রভৃতি চান্দ্র মাসের হিসাবেই নির্ধারিত। কুরআনুল কারীমে চাঁদকে সময় নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

তবুও পরিতাপের বিষয় হলো, হিজরী সন এখন মুসলমানদের কাছেও গুরুত্ব হারিয়েছে। চাঁদ দেখা তো এখন শুধুই ঈদের আনুষ্ঠানিকতা। কেউ আকাশে তাকায় না; তাকায় ফেসবুকে, টিভির স্ক্রলে। অথচ সাহাবায়ে কেরাম ও আমাদের আকাবিরগণ চাঁদ দেখাকে ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করতেন। নতুন চাঁদ দেখলে দুআ পড়তেন, নববর্ষে বরকতের দুআ শিখতেন কুরআনের মতো গুরুত্ব দিয়ে।

হিজরী সনকে ভুলে যাওয়া মানে আমাদের ইসলামী পরিচয় ও সংস্কৃতিকে ভুলে যাওয়া। আমরা যদি চান্দ্র মাসের গণনা, চাঁদ দেখা, হিজরী সাল লেখা ও প্রচারে সচেতন না হই, তাহলে ধীরে ধীরে আমাদের ইবাদতের আত্মিক রূপও মুছে যাবে। তাই এখনই সময়, আমরা হিজরী বর্ষপঞ্জিকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করি, মুসলিম হিসেবে আমাদের ধর্মীয় ক্যালেন্ডারকে জীবন্ত করে তুলি।

 

আত্মশুদ্ধির শিক্ষা ও জীবনের মোড় ঘোরানোর সুযোগ

হজ একটি মহান ইবাদত। হজের প্রতিটি ধাপ আমাদের শেখায়—আনুগত্য, ত্যাগ, ধৈর্য, নম্রতা, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মসমর্পণের পাঠ। বাইতুল্লাহর জিয়ারত, আরাফার ময়দানে কান্না, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, কুরবানির মাধ্যমে নিজের পশুত্বকে বিসর্জন—সবই মুমিনকে দুনিয়ার মোহ থেকে সরিয়ে আল্লাহমুখী করার এক জীবন্ত প্রশিক্ষণ।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: হজ কবুল হলো কি না? সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনরা আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে যেমন ভয় করতেন, তেমনি আমলের পর জীবনের পরিবর্তনের দিকেও বিশেষ নজর দিতেন। আল্লাহর বিশেষ মেহমান হয়ে ফিরে এসে যদি জীবনে কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে সে হজ কতটা ফলদায়ক—তা ভেবে দেখা জরুরি।

আজ দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, অনেক হাজী হজ থেকে ফিরে পার্থিব আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন, কিন্তু হজের আত্মিক শিক্ষা জীবনে ধারণ করেন না। হজের প্রকৃত স্বার্থকতা হলো—হজ পরবর্তী জীবনকে হজমাফিক গড়ে তোলা। তাকওয়া, ইবাদত, সুন্দর আচরণ, গুনাহ থেকে দূরে থাকা, নামায-রোযার যত্ন, দীনের প্রতি আগ্রহ—এসবই হজ কবুল হওয়ার লক্ষণ।

আল্লাহর পথে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যই ইবরাহীমী মিল্লাতের মূল চেতনা। হজ সেই চেতনারই বাস্তব অনুশীলন। তাই হজকে শুধু একটি স্মৃতি নয়, বরং একটি স্থায়ী জীবনধারা বানানো জরুরি। হজ যেন আমাদের আত্মাকে শুদ্ধ করে, চরিত্রকে উন্নত করে, আল্লাহর প্রকৃত গোলাম বানিয়ে তোলে—এই হোক আমাদের কামনা।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ