মাওলানা যুবাইর হানীফ কাসেমী
গতমাসে একদিনের ব্যবধানে তিন দিনে লাগাতার তিনজন মহান ব্যক্তিত্বকে হারালাম। দুইজন আমাদের জামিয়া পটিয়ার প্রবীণ মুরুব্বি আকাবির। অপরজন উপমহাদেশের বিখ্যাত মনীষী মাজাহিরুল উলূম সাহারানপুরের নাজেমে আলা ও শাইখুল হাদীস। তিনজনকে নিয়ে বান্দার সামান্য অনুভূতি প্রকাশ।
এক.
২৫/০৪/২০২৫ ঈসায়ী শুক্রবার জুমার পর হযরত মাওলানা আবদুল মান্নান দানিশ রহ. ইন্তিকাল করেন। হযরত জুমার নামায আদায় করেন। নামায পড়ে কিছুটা অসুস্থতা অনুভভ করলে মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। হযরত দানিশ সাহেব রহ. এর মৃত্যুর খবর মুহূর্তে দেশ-বিদেশে পৌঁছে যায়। শোকের ছায়া নেমে আসে। আমি হুজুরের নিকট সরাসরি না পড়লেও আমার অনেক উস্তাদ হযরতের নিকট পড়েছেন। আমার দাদা উস্তাদ তিনি। তাঁর জন্মস্থান ফটিকছড়ি হলেও জীবনের বিশাল একটা অংশ কাটিয়েছেন জামিয়া পটিয়ায়। তিনি জীবনের প্রায় ৪০টি বসন্ত কাটিয়েছেন এই ইলমী কাননে। নিজের সন্তানদের মানুষ করেছেন এখানে থেকেই।
হযরত আপাদমস্তক একজন সুন্নাহর অনুসারী ছিলেন। সুন্নাহর খুব পাবন্দ ছিলেন। সবসময় জামাতের সাথে মসজিদে নামায আদায় করতেন। ছাত্রদের প্রিয় উস্তাদ ছিলেন। দূরের ছাত্রদের আদর-যত্ন দিয়ে আগলে রাখতেন। নিজের সন্তানের মতো মহাব্বত করতেন। ইলমে নাহু ও কবিতা সাহিত্যে তাঁর বেশ দখল ছিল। নাহবে মীরের শরাহ ‘তাকরীবুল মাসির’ সকলের নিকট প্রসিদ্ধ মুফীদ কিতাব। উস্তাদ-ছাত্র সকলেই এই কিতাব থেকে সমানভাবে ইস্তিফাদা করতে পারেন। মাকবূল একটি কিতাব। কবিতা-সাহিত্যে তিনি অনন্য ছিলেন। ফিতরী কবি ছিলেন। যেকোনো বিষয়ে মুহূর্তেই তিনি কবিতা লিখতে পারতেন। তাঁর প্রতিটি কবিতায় গভীরতা ছিল অনেক ইশক ও মা’রিফাতে ভরা। তিনি ছিলেন আরবী উর্দু ও ফার্সী ভাষার কবি (শায়ের)। তিনি অত্র জামিয়ার মুশাআরা বিভাগের প্রধান এবং সহকারী প্রধান হিসেবেও মুশাআরা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪১ বছর জামিয়া পটিয়ায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জামিয়া পটিয়ার খাদেম হিসেবে তিনি আমারে মতো ছোটদেরকে খুব স্নেহ করতেন। সবসময় খোঁজখবর নিতেন। মুরুব্বি হওয়া সত্ত্বেও সবসময় আপনি করে সম্বোধন করতেন। একবার ফজরের নামায পড়ে জামিয়ার মসজিদ থেকে বের হলাম। পথে দেখা হওয়া মাত্র হযরত হাত ধরে রুমে নিয়ে গেলেন। বিভিন্ন খোঁজখবর নিলেন। অনেক পরামর্শ ও নসীহত করলেন। তাঁর লিখিত কবিতার কয়েকটি বই হাদিয়া দিলেন। বিশেষ করে ‘আফকারে দানিশ’ তার কবিতাগুচ্ছোর একটি অংশ। তাও হাদিয়া দিলেন।
হযররত সবসময় বড়দের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতেন। বড়দের অনুসরণ করাকে গুরুত্ব দিতেন। হক কথা বলতেন। যেকোনো অন্যায় কাজ দেখলে সাথে সাথে তা প্রতিরোধ করতেন। কোনো ছাত্র অন্যায় করলে খুব সহজে ধমকির স্বরে ধরে দিতেন। উস্তাদ হিসেবে তিনি একজন সফল উস্তাদ ছিলেন। হযরত জীবনের শেষ দুই বছর ঢাকা পল্লবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদে মুরুব্বি উস্তাদ হিসেবে খেদমত করেন। মৃত্যুর পরের দিন ঢাকা থেকে ফটিকছড়ি আনা হয়। বেলা ১১ টায় হেয়াকো ইসলামপুর রাবার বাগান ইউনুসিয়া মিসবাহুল উলুম মাদরাসার ময়দানে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন: তাঁর সুযোগ্য সাহেবজাদা শাইখ মাওলানা ত্বহা দানিশ মাক্কি হাফি.। ছোট বেতুয়া রহমানিয়া মাদরাসা সংলগ্ন পারিবারিক মাকবারায় হুজুরকে সমাহিত করা হয়।
দুই.
হযরত আবদুল মান্নান দানিশ সাহেব রহ.-এর জানাযা তখনও শেষ হয়নি; এদিকে হযরত আমিনুল হক সাহেব রহ.-এর মৃত্যুর খরব কানে আসল। মুহূর্তেই পুরো শরীর স্থীর হয়ে গেল। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। হযরত আমিনুল হক সাহেব রহ. দানিশ সাহেব রহ.-এর ইন্তিকালের খবর শুনে ছাত্রদের বলেছিলেন, তাঁর দাফনের পর আমার দাফনের প্রস্তুতি নিও।
যেই কথা সেই কাজ। তিনি ২৬/৪/২০২৫ঈ., শনিবার সকাল ১০:৪৫ দিকে ইন্তিকাল করেন। আমার ক্ষুদ্র জীবনে দেখা অনন্য গুণের অধিকারী একজন আকাবির। হযরত আমিনুল হক সাহেব ছাত্র ও শিক্ষকতার সময় মিলে প্রায় ৭০ বছর জামিয়া পটিয়াতে ছিলেন। তিনি হযরত হাফেজ আহমাদুল্লাহ সাহেব ছাড়া বর্তমান জামিয়া পটিয়ার সকল আসাতিযার সরাসরি উস্তাদ ছিলেন। ছিলেন সকলের মুরুব্বি। জামিয়ার সদরে মুহতামিম ছিলেন। খুবই বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
যেকোনো কাজ করতেন খুবই যত্নসহকারে। জামিয়া পটিয়ার দীর্ঘদিন কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ছিলেন অত্যন্ত আমানতদার। জামিয়া পটিয়ার বানী কুতুবে যামান হযরত আযীযুল হক রহ.-এর সরাসরি ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে হযরত বানী জামিয়া আযিযুল হক রহ.-এর নিকট সরাসরি পড়েছেন এমন আর একজন মাত্র ছাত্র অবশিষ্ট আছেন, হযরত আল্লামা সুলতান যাওক নদভী হাফিযাহুল্লাহ। আল্লাহ হযরতের হায়াত দীর্ঘায়ু করুন।
১৩৮২ হিজরীতে হযরত ইউসুফ বানুরী রহ. , আবদুর রশিদ নুমানী রহ., ওলি হাসান টুংকি রহ.-এর নিকট হাদীসের কিতাব পড়েছেন। অসাধারণ গুণের অধিকারী ছিলেন। খুবই কম কথা বলতেন। আস্তে আস্তে কথা বলতেন। জোরে কখনো কথা বলতে দেখিনি। দারসে উর্দূ ভাষায় তারকির করতেন। অসংখ্য গুনাবলী ও নম্রতার কারণে জীবনের শুরুর দিকেই ‘ফেরেস্তা হুজুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। মাদরাসা ও এলাকার সাধারণ মানুষ ফেরেস্তা হুজুর নামে চিনত।
সাদা জামা, সাদা রুমাল ও শুভ্র দাড়িতে হুজুরকে দেখতে ফেরেস্তার মতো ধবধবে সাদা মনে হতো।
হযরত আমিনুল হক সাহেব রহ. এর শেষ জীবনেও নিজে একা চলতেন। কারো সাহায্য নিতেন না। সব সময় আমলে থাকতেন। বেকার সময় কাটাতেন না। হযরত হারদুঈ রহ.-এর সোহবত পেয়েছেন। ফকিহুল মিল্লাত হযরত আবদুর রহমান রহ. এর মুজায ছিলেন। আমরা হুজুরের নিকট সুনানে নাসাঈ পড়েছি। দারসে হুজুরের পৃথক একটি শান ছিল। উর্দূ ভাষায় চমৎকার ভঙ্গিতে তাকরির করতেন। সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় দারস দিতেন। প্রত্যেক তালিবুল ইলমই বুঝতে অসুবিধা হত না। অসুস্থতা বা যেকোনো ব্যস্ততা থাকুক দারস মিস দিতেন না। যত কষ্ট হোক তিনি দারসের পাবন্দ ছিলেন। মৃত্যুর আগের দিনও দারস দিয়েছেন।
হযরত জীবনের শেষ এক বছর জামিয়াতুন নূর আল-আলামিয়ার সদরে মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস ছিলেন। তাই মৃত্যুর পর দাফন ও জানাযা কোথায় হবে তা নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। মনের ইচ্ছে ছিল জামিয়া পটিয়াতে হওয়ার। অবশেষে সেই আশা পূরণ হল। জামিয়া পটিয়ার মুরুব্বিদের ও পরিবারের সিদ্ধান্তে জানাযা ও দাফন জামিয়া পটিয়ায় হওয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মাগরিবের পূর্বে জামিয়ার মুরুব্বিরা গিয়ে হযরতের লাশ পটিয়ায় নিয়ে আসেন। মাগরিবের পর থেকে দেখানো আরম্ভ হয়।
কী নূরাণী চোহারা। মনে হচ্ছে, হাসছেন। মাওলার দিদারে ধন্য হতে যাচ্ছেন। দলে দলে মানুষ দেখতে লাগল। ইশার নামাযের পর রাত আনুমানিক ৯:২০ মিনিটের দিকে হযরত মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া হাফি.-এর ইমামতিতে জানাযার নামায সম্পন্ন হয়। নামায শেষে মাকবারায়ে আযিযীতে দাফন হয়।
জানাযার মাঠে উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে জামিয়া পটিয়ার শাইখুল হাদীস ও প্রধান মুফতী হযরত মাওলানা শামসুদ্দীন জিয়া হাফিযাহুল্লাহ কিছু কথা বলেন, তিনি প্রথমেই বলেন, “আজ আমরা একজন আল্লাহর ওলির জানাযা পড়ার জন্য একত্রিত হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। নিঃসন্দেহে তিনি একজন আল্লাহর ওলি। কেননা ওনার পুরো জিন্দেগী অতিবাহিত হয়েছে মসজিদ-মাদরাসায় দ্বীনি শিক্ষা অর্জন এবং বিতরণের মাধ্যমে।”
হযরত আরও বলেন, “উনি শুধু একজন শিক্ষক নয় বরং সবার অভিভাবক হিসেবে জামিয়াতে মুরুব্বি হিসেবে ছিলেন। ওস্তাদ-ছাত্র এমনকি মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদও কোনো সময় কোনো সমস্যায় পড়লে হযরতের শরণাপন্ন হতেন। হযরত এর পরামর্শ নিতেন। হযরতের পরামর্শ মোতাবেক নিজেদের সমস্যার সমাধান করতেন।”
হযরত বলেন, “আমি জীবনের প্রথম যখন জামিয়া পটিয়াতে আসি, তখন বোর্ডিংয়ের খোরাকি বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আমার খানা জারি হয় নি। তখন হযরত মাওলানা আমিনুল হক রহ. আমাকে ছাত্র হিসেবে একটা লজিং ঠিক করে দেন। আমার খানার ব্যবস্থা করেন। এভাবেই হযরতের জীবনটা কেটেছে দ্বীনের খেদমতে এবং মানুষের সেবায়।”
মানুষের সেবায় হুজুর খুব নিয়েজিত ছিলেন। নিজেকে মানুষের যেকোনো সেবায় বিরিয়ে দিতেন। এলাকার সাধারণ লোকজন পর্যন্ত হুজুর থেকে পরামর্শ নিত। মৃত্যুর সময় হুজুরের বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। হযরতের মুখে শুনেছি, হযরত ১৩৬০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। আমাদের শাইখুল হাদীস হযরত হাফেজ আহমাদুল্লাহ সাহেব আর তিনি সমবয়সী।
তিন
হযরত আমিনুল হক সাহেব রহ.-এর মৃত্যুর শোকতপ্ত কাটতে না কাটতে নতুন করে আরেক হৃদয় বিদারক খবর কানে আসল, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুরের শাইখুল হাদীস ও প্রধান মুরুব্বি, শাইখুল হাদীস হযরত যাকারিয়া রহ.-এর জামাতা ও শাগরিদে রশীদ হযরত মাওলানা আকেল সাহারানপুরী সাহেব রহ. ইন্তিকাল করেছেন। হযরত ২৮/৪/২০২৫ঈ., সোমবার সকাল ১১:০০ টার দিকে হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন।
হযরত আকেল সাহারানপুরী রহ. মাজারিরুল উলূম সাহারানপুরের নাজেমে আলা ও শাইখুল হাদীস ছিলেন। জীবনের বিশাল অংশ মাজাহিরে কাটিয়েছেন। ৬০ বছর শিক্ষকতার জীবন পার করেছের মাজাহিরুল উলুমে (১৩৮৬ হি. থেকে ১৪৪৬ হি.)। ১৩৯০ থেকে ১৪৪৪ হি. পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৬ বছর যাবৎ সদরুল মুদাররিসীন ছিলেন। বর্তমান দারুল উলূম দেওবন্দের রুকনে শূরা ছিলেন।
হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. এর খাছ ছাত্র ও জামাতা ও মুজায ছিলেন। শাইখুল হাদীস রহ.-এর সাথে অনেক তাসনিফাতে সহযোগী ছিলেন। বিশেষ করে লামিউদ দারারী, ফাজায়েলে দরুদ শরীফ-এর কাজে শরীক ছিলেন। মুহাদ্দিসুল আরস হযরত ইউনুস জৌনপুরী রহ.-এর সহপাঠি ও সহকর্মী ছিলেন। জৌনপুরী রহ. বোখারী আওয়াল পড়াতেন। আর আকেল সাহেব রহ. বোখারী সানী পড়াতেন। জৌনপুরী রহ.-এর ইন্তিকালের পর বোখারী আওয়াল হযরত পড়াতেন।
বর্তমান বিশ্বে কাবাবিরে দেওবন্দে প্রথম সারির একজন মুরুব্বি ছিলেন। ইলমী উচ্চতায় তাঁর মেসাল তিনি নিজেই ছিলেন। সুনানে আবু দাউদের শরাহ “আদ্দুররুল মানদুদ” ও সুনানে তিরমিজির শরাহ “কেফায়াতূল মুহতাদি” সারা দুনিয়াতে প্রসিদ্ধ। বলা হয়, হযরত শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. এর প্রতিচ্ছবি তিনি। আমাদের দেওবন্দ পড়ার সময় সাহারানপুরে হযরতের দারসে শরীক হওয়ার তাওফীক হয়। হযরত খুব দ্রুত পড়াতেন। সারা বছর এক নেজামে পড়াতেন। সুন্নাতের খুব পাবন্দ ছিলেন। মৃত্যুর সময় হযরতের বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। জন্ম: ১৩৫৫ হি.; ১৯৩৭ ঈ.।
দুআ করি, আল্লাহ তাআলা আমাদের আকাবিরদের জান্নাতের আলা মাকাম নসীব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সবরে জামীল নসীব করুন। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলার তাওফীক নসীব করুন। আমীন।
লেখক : শিক্ষক, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া।