তাবলীগ জামায়াত নিয়ে বিভ্রান্তি ও নিষেধাজ্ঞা
গত ৬ ডিসেম্বর ২০২১ ভারতের দেওবন্দ-ভিত্তিক সুন্নী মুসলিমদের শত বছরের পুরনো ইসলাম প্রচারের সংগঠন তাবলীগ জামায়াতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সতর্কতা জারি করেছে সৌদি আরব। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবায় এ সংগঠন সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করার জন্য ইমাম ও খতীবদের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রী ড. আবদুল লতিফ আলে শায়খ। মন্ত্রী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘তাবলীগ জামায়াত বিপথগামী সংগঠন, তাদের তৎপরতা দীনের মৌল কাঠামোর পরিপন্থী এবং এটি সন্ত্রাসবাদের অন্যতম দরজা।’ সৌদি মন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত এই অভিযোগ গুরুতর। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এই সিদ্ধান্তে আহত হয়েছেন। তাবলীগ জামায়াত বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তর ধর্মীয় সংগঠন, যার সাথে রাজনীতি ও উগ্রবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাওহীদের স্বীকৃতি, ঈমান ও নেক আমলের দাওয়াত, ব্যক্তি চরিত্র সংশোধন, মানুষের সাথে সদাচরণ, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালীন জবাবদিহি তাবলীগ জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য।
তাবলীগ জামায়াত ১৯২৬ সালে মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) কর্তৃক ভারতের মেওয়াতে দেওবন্দী আন্দোলনের একটি শাখা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের নির্দেশনা পালনের উৎসাহ দেওয়াই এ সংগঠনটির প্রধান ও মৌলিক কাজ বলে মনে করেন এই সংগঠনের নেতারা। তাই বিভিন্ন দেশের তাবলীগ জামায়াত-সমর্থকরা সৌদি সরকারের এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন। ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনা করে অনেক আগে থেকেই সৌদি আরবে প্রকাশ্যে তাবলীগের কোনো কার্যক্রম ছিল না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আরও কিছু দেশের সরকারও সৌদি আরবকে অনুসরণ করে তাবলীগকে নিষিদ্ধ করতে পারে।
এদিকে ভারতের প্রখ্যাত আলিম আল্লামা শায়খ সালমান হুসাইনি নদভি এ বিষয়ে সৌদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সৌদি সরকার যে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এজেন্ট হয়ে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে কাজ করছে, এমন নির্দেশনায় সেটি আরও স্পষ্ট হলো। বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলিম মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভি বলেন, সৌদি সরকার শতবর্ষী একটি দীনী আন্দোলনকে এভাবে একতরফা নিন্দা ও নিরুৎসাহিত করতে পারেন না। সৌদী আরবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাবলীগ জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রচারণা ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের কারণে দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মুফতী আবুল কাসেম নুমানী (দা. বা.) উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসীন শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.)-এর অন্যতম ছাত্র ছিলেন। তিনিই তাবলীগ জামায়াত প্রতিষ্ঠা করেন। যার অধীনে বড়দের নিষ্ঠাপরায়ণ চেষ্টা ও মেহনত দীনী ও আমলি ক্ষেত্রে উপকার বয়ে আনছে। শাখাগত মতভেদ সত্ত্বেও তাবলীগ জামায়াত নিজের মিশনে কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় গোটা বিশ্বেই তাদের কাজ ছড়িয়ে আছে। এর সাথে যুক্ত সদস্য ও জামায়াতের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর শিরক, বিদআত ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দারুল উলুম দেওবন্দ এর নিন্দা জানাচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি সরকারের কাছে আবেদন করছে, তারা যেন নিজেদের এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন এবং তাবলীগ জামায়াতের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচারণা থেকে বিরত থাকেন।
তাবলীগী কাজ সম্পর্কে উপমহাদেশীয় আলিমদের সাথে কথা বলে মন্তব্য করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হায়আতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি, মজলিসে দাওয়াতুল হক বাংলাদেশের আমীর ও যাত্রাবাড়ি মাদরাসার মুহতামিম মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমুদুল হাসান (হাফি.)। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইসলামের তাবলীগ তথা ঈমান আমলের দাওয়াতী কাজের নিন্দা করার আগে এর ভালোমন্দ সবদিক বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ ঈমান, ইসলাম ও ইহসানের দিকে ধাবিত হচ্ছে তাবলীগের মেহনতের ফলে। সৌদি আরবের আলিমদের উচিত তাবলীগী কাজ সম্পর্কে উপমহাদেশীয় আলিমদের সাথে কথা বলে মন্তব্য করা। আওলাদে রসুল (সা.) হজরত মাওলানা মুহাম্মদ রাবে হাসানী নদভী, মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী, মাওলানা মুফতী তকী উসমানীসহ বিশ্বের সেরা আলিমদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। এ মুহূর্তে আরববিশ্বে আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী ও মাওলানা মনযুর নুমানী প্রভাবিত আলিমদেরকে পরিস্থিতি অনুপাতে সোচ্চার হতে হবে। দেওবন্দ মাদরাসা ও এর অনুসারী প্রতিষ্ঠানের মুরব্বিদের আরবের শাসক ও আলিমদের সাথে মতবিনিময় করতে হবে।
তাবলীগী জামায়াতকে সন্ত্রাসী ও গোমরাহ সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এটার পরিণতি হবে দূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। এর জন্য সৌদি আরবকে বেছে নেওয়া হয় যাতে অন্যান্য আরব ও মুসলিম দেশ অনুসরণ করতে পারে। ইসলামের উৎসভূমিতে তাবলীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা অনেকের জন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য কুশিলবরা মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উপগোষ্ঠী তৈরি করে এবং নিজেদের মত ও পথের বাইরের মানুষদেরকে বিদআতী, গোমরাহ, ও কাফির ফতওয়া দিতে থাকে এবং Divide and Rule Policy বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। এত চক্রান্ত করেও ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশে থাকতে পারেনি। বিদায় নিতে হয়েছে। কিন্তু যে বিভ্রান্তি ও পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি করা হয়েছিল তার রেশ রয়ে যাবে কিয়ামত পর্যন্ত। যখনই কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ বা অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়, তখন মুসলমানদের একাধিক গ্রুপ ওই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় ও উল্লাস প্রকাশ করে। এটাই ট্র্যাজেডি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পবিত্র কুরআন ছেড়া ও পোড়ানো, ফ্রান্সে মহানবী (সা.)-এর ব্যঙ্গ কার্টুন অঙ্কন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কটূক্তি, ধর্ম অবমাননা, তাবলীগ জামায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আল ইখওয়ানুল মুসলিমুন ও ফিলিস্তিনের স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হামাসকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাসানুল বান্নাকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং মুফাসসিরে কুরআন সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। শায়খ মুহাম্মদ আস-সাবুনী, শায়খ আবুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ ও ড. ইউসুফ আল-কারজাভী নিজ দেশে থাকতে পারেননি।
আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামের উত্থান ও জাগরণকে বন্ধ করার জন্য নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রবক্তারা সুপরিকল্পিত নীলনকশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এর বাস্তবায়নে তারা দেশে দেশে মুসলিম শাসকদের কাজে লাগাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রলোভনে। সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া, ইরাক, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া ও আরব আমিরাত তার প্রমাণ। তাবলীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা ওই নীলনকশার অংশ। সম্পূর্ণ দাওয়াতি কাজে নিবেদিত মাওলানা কলিম সিদ্দিকির দীনী তৎপরতা ভারতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক একাউন্ট ও সহায় সম্পত্তি ফ্রিজ করা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে কোনো বাধা নেই কিন্তু ইসলাম প্রচার করতে গেলেই সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তোলা হয়। বিভিন্ন অমুসলিম দেশে মিডিয়ার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ইসলাম আতঙ্ক (Islamphobia) ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরব শাসকরা ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন করছেন এবং ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী জনগণকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন।
বর্তমানে উদ্ভুত অবস্থা ও পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এবং ঘটাতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও দাওয়াতি, ইসলাহি, সামাজিক, রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। কামাল আতাতুর্কের সৃষ্ট নাস্তিক্যবাদী তুরস্কে এখন ইসলামের ঝান্ডা উড়ছে। বিরূপ আবহাওয়া ও বিপদ সংকুল পথ কাফেলার অভিযাত্রা বন্ধ করতে পারবে না। দেড় হাজার বছর ধরে ইসলামকে বৈরি পরিস্থিতি ও প্রতিপক্ষের শক্তি ও দাপটের বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয়েছে। আগামী দিনেও যাবে। হতাশ হওয়া চলবে না। সাহস সঞ্চয় করতে হবে। নতুন সূর্যের উদয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। সময়ের ব্যবধানে সৌদি আরব হতে পারে তাবলীগ জামায়াতের মূল কেন্দ্র। ইতিহাস তো তাই বলে।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন