শনিবার-২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি-১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ.): এক আলোকিত মানুষের বিদায় (১৯২৫-২০২০)

ড. খালিদ হোসেন

 

বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রবীন আলিমে দীন, সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ, সাতকানিয়া আলিয়া মাহমুদুল উলুম মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ ও দেওদীঘি কাসিমুল উলুম কওমি মাদরাসার সাবেক মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ) গত ১০ মার্চ বিদায় হয়ে গেলেন। নিজেকে নিঃশেষিত করে সমাজকে আলোর পথে নিয়ে গেছেন। নবতিপর এ শিক্ষাবিদ ছিলেন শতাব্দী পরম্পরায় সংঘটিত ঘটনাসমূহের নীরব সাক্ষী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান ও আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অর্জন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ নির্বিশেষে সবাই তাঁকে সম্মান ও সমীহ করে চলতেন। যুদ্ধচলাকালীন বহু হিন্দু পরিবার নগদ অর্থ ও সোনাদানা তাঁর হাতে আমানত রেখে ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর তাঁরা দেশে ফিরে এসে আমানত বুঝে নেন।

উপমহাদেশের বহু রাজনীতিক ও খ্যাতনামা ব্যক্তিকে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন এবং অনেকের সান্নিধ্যও পেয়েছেন। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান, ফাতেমা জিন্নাহ, মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জেনারেল আইয়ুব খান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মুফতি মুহাম্মদ শফী, মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ফজলুল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই), মাওলানা আবু জাফর মুহাম্মদ সালেহ (শর্ষিনার পীর সাহেব), খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ, স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী মৌলভী ফরিদ আহমদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়া নওয়াজ শরীফ ও পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মিয়া শাহবাজ শরীফ অন্যতম।

মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ.) চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার এক সম্ভ্রান্ত দীনদার পরিবারে ১৯২৫ ইংরেজিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মৌলভী আবদুল ওয়াদুদ মিয়াজী, মায়ের নাম রহিমা বেগম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তিনি জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতেই সম্পন্ন করেন।

মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ.) কিশোর বয়সে একই দিনে মাতা পিতাকে হারালে বর্তমান সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সংসদ সদস্য ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নিজামুদ্দিন নদভীর বাবা প্রখ্যাত আলিমে দীন ও গ্রন্থকার চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসার নাজিমে আ’লা আল্লামা ফজলুল্লাহ (রহ.) তাঁর অভিভাকত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা হাবিবুল্লাহ সাহেবকে চুনতি মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। ওখান থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে আলিম ও ফাজিল কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর তিনি এক বছর বরিশালের শর্ষিনা মাদরাসায় ভর্তি হয়ে দেওবন্দের কৃতি ছাত্র, তিরমিযী শরীফের ভাষ্যকার আল্লামা নিয়ায মাখদুম খুত্তানী আত-তুরকিস্তানী, আল্লামা আবদুস সাত্তার বিহারীর কাছে হাদীস শরীফ অধ্যয়ন করেন। বরিশালের আবহাওয়া তাঁর স্বাস্থ্যের অনুপযোগী হওয়ায় পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম চন্দনপুরা দারুল উলুমে ভর্তি হন। ওখান থেকে প্রথম বিভাগে কামিল (হাদীস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আল্লামা যফর আহমদ ওসমানীর ছেলে মাওলানা ওমর আহমদ ওসমানী ও শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ আমিন ছিলেন তাঁর প্রিয় উস্তাদ।

মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ.) ছিলেন একজন পরহেযগার ও বুযুর্গ ব্যক্তি। রাতের প্রথম প্রহরে সামান্য ঘুমানোর পর সারারাত কুরআন তিলাওয়াত, অজিফা, জিকির-আজকারে মশগুল থাকতেন। সুন্নাতে রাসুর অনুসরণের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। মুফতিয়ে আযম আল্লামা ফয়জুল্লাহ (রহ.)-এর হাতে ইসলাহী বায়আত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর বাংলাদেশি বিশেষ খলীফা আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী (দা. বা.) তাঁকে খেলাফত প্রদান করেন। ছাত্রজীবন শেষ করে লোহাগাড়া থানার পদুয়া হেমায়েতুল ইসলাম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তিনি সাতকানিয়ার বাজালিয়া হেদায়েতুল ইসলাম মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম সাতকানিয়া মাহমুদুল উলুম আলিয়া মাদরাসায় দীর্ঘকাল প্রিন্সিপাল ছিলেন এবং গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া দেওদীঘি কাসিমুল উলুম কওমি মাদরাসার মুহতামিম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ খিদমত আঞ্জাম দেন। জিরি জামিয়া আরাবিয়া, রাজঘাটা হুসাইনিয়া, পদুয়া হেমায়েতুল ইসলাম, ডলুকুল নুরিয়াসহ বহু কওমি মাদরাসার তিনি মজলিশে শুরার প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। পঠন ও পাঠনে তাঁর আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। কঠিন ও জটিল কথাকে সহজভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা ছিল। মেধাবী ও কম মেধাবী শিক্ষার্থী নির্বিশেষে সবাই তাঁর ক্লাসে উপকৃত হতো।

মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ.) ছিলেন আদর্শ শিক্ষক এবং যুগসচেতন আলেমদীন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় তাঁর হাজার হাজার ছাত্র নানামুখী খিদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি ছিলেন উদার হৃদয়ের অধিকারী। কওমি ও আলিয়া উভয়ধারার ওলামায়ে কেরামের মধ্যে ঐক্যের সুদৃঢ় সেতুবন্ধন রচনা করতে তিনি উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

তিনি নিজ সন্তান এবং ছাত্রদের উন্নত নৈতিক চরিত্র ও জ্ঞান-প্রজ্ঞায় যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সারা জীবন মেহনত করে গেছেন। তাঁর ৬ সন্তান সবাই যোগ্য ও প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন চট্টগ্রাম ওমর গনি এমইএস কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। মেজো ছেলে হাফিয মাওলানা জাহিদ হোসেন লাহোরের শরীফ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি ভাষার অধ্যাপক। উল্লেখ্য যে, হাফিয মাওলানা জাহিদ হোসেন পাঞ্জাব প্রদেশের প্রখ্যাত কওমি মাদরাসা জামিয়া আশরাফিয়ার উস্তাদ ছিলেন এবং ওই মাদরাসা থেকে ছাত্রজীবনে বেফাকুল মাদারিসের অধীনে প্রথম বিভাগে দাওরায়ে হাদীস পাস করেন। তৃতীয় ছেলে হাফিজ নাজিম হোসেন, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা, চতুর্থ ছেলে মাওলানা ড. সাদিক হোসেন সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতের একান্ত সহকারী, পঞ্চম ছেলে মাওলানা ফারুক হোসেন, হোমিও চিকিৎসক এবং ষষ্ঠ ছেলে হাফিয আবদুল্লাহ, তিনিও হোমিও চিকিৎসক। মেয়েদেরকেও তিনি দীনী তালীমে প্রশিক্ষিত করে উচ্চ শিক্ষিত ও উপযুক্ত পাত্রে সোপর্দ করেন। জামাইদের মধ্যে কওমি মাদরাসার মুহতামিম, নায়েবে মুহতামিম, আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। শিক্ষার প্রতি অনুপম দরদ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী হওয়ার কারণে তাঁর নাতি নাতনিদের মধ্যে আলিম, হাফিয, এমবিবিএস ডাক্তার, বুয়েট ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, কলেজ শিক্ষক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ব্যাংকার তৈরি হয়েছেন।

কুরআনের শিক্ষা বিস্তার এবং দীনের খেদমতে সারা জীবন ত্যাগ ও কুরবানী দিয়েছেন। ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবন যাতে শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারমুক্ত হয় এবং সুন্নাতে রাসুল (সা.)-এর পরিপূর্ণ অনুসরণে জীবন যাতে ঋদ্ধ, শুদ্ধ ও সমৃদ্ধ হয় সে পথে একনিষ্ঠ প্রয়াস চালিয়েছেন। এতিম প্রতিপালন, এতিমকে শিক্ষা প্রদান ও এতিমকে বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মাত্রাতিরিক্ত উদার। তিনি সমাজসেবা, মানবকল্যাণ, ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। নিজের প্রয়োজনের চাইতে অন্যের চাহিদাকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন সবসময়। এটা তাঁর জীবনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে তিনি খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (রহ.)-এর সাথে নেজামে ইসলাম পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং পার্টির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন। ইসলামী আদর্শের আলোকে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর লালিত স্বপ্নসাধ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতির নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখতেন। ইসলামপন্থিগণ পারস্পরিক দলাদলি ভুলে এক প্লাটফরমে আসুক সেটা কামনা করতেন সর্বদা।

প্রথিতযশা আলিমে দীন হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি কওমি ও আলিয়া উভয় ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থেকে দরস-তাদরীস, সুনাগরিক গঠন, শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় সফলতার শ্রেষ্ঠ আসনটি অলংকৃত করেছিলেন। সামাজিক ন্যায়বোধ, সমঝদারি চিন্তা-চেতনা ও মানবকল্যাণ ছিল তাঁর নিয়মিত রুটিন ওয়ার্ক। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী যেমন ছিলেন, তেমনি তাঁর মধ্যে ছিল পরকে সহজে আপন করে নেয়ার পারঙ্গমতা। উগ্রতা ও শৈথিল্য পরিহার করে মধ্যমপন্থাকে তিনি অধিকতর পছন্দ করতেন।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের শাসনামলে ইসলামাবাদের ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ফজলুর রহমান লিখিত ‘ইসলাম’ নামক গ্রন্থে কতিপয় আপত্তিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ সাহেবের নেতৃত্বে গারাঙ্গিয়ার ছোট হুযুর হযরত মাওলানা আবদুর রশিদ, হাঙ্গরমুখ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আবদুল্লাহ ও দেওদীঘি জামে মসজিদের খতীব মাওলানা আবদুস সালামকে সাথে নিয়ে সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলেন। ড. ফজলুর রহমানকে অপসারণের দাবি জানিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কাছে কয়েক হাজার টেলিগ্রাম পাঠান। পরবর্তীতে গণআন্দোলনের মুখে তাঁকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী, বন্ধুবৎসল, উদার, পরোপকারী ও অতিথিপরায়ণ। কৃতজ্ঞতাবোধের প্রাবল্য তাঁর জীবনকে মহিমান্বিত করে। বাড়িতে যত মেহমান আসুক যত্ন আত্তি ও আতিথ্য প্রদর্শনে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। সংগ্রাম ও বৈরি পরিস্থিতির মুকাবেলা করে তিনি বড় হয়েছেন। বিনয়, সৌজন্যতাবোধ, ঋজুতা ও গাম্ভীর্য তাঁর চরিত্রের অন্যতম আলোকিত দিক। শিক্ষকতার পাশাপাশি মানবসেবায় ব্রতী হয়ে হোমিও চিকিৎসায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি ছিলেন সরকারি রেজিস্টার্ড হোমিও চিকিৎসক। রোগ নির্ণয় ও ওষুধ নির্বাচনে তাঁর পারঙ্গমতা ছিল রীতিমত বিস্ময়কর। ড. হ্যানিম্যানের ‘অর্গানন অব মেডিসিন’ ও ড. বোরিকের ‘মেটেরিয়া মেডিকা’ ছিল তাঁর প্রিয় চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ। প্রতিদিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত হাবিবিয়া হোমিও ফার্মেসিতে নানা পেশার ক্রণিক রোগীরা ভীড় জমাতেন। ফি ও ওষুধ খরছ নিয়ে তিনি কোনদিন চাপাচাপি করেননি। অনেকে বিনা পয়সায় ওষুধ নিয়ে যেতেন। চিকিৎসাকে সেবাব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন।

সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সাংসদ মাওলানা ড. আবু রেজা নদভী মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ (রহ.)-এর নামাযে জানাযাপূর্ব বক্তৃতায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার চাচা (হযরত মাওলানা হাবিবুল্লাহ রহ.) তাঁর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে আমাকে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। তৎকালীন প্রধান পরিচালক হযরত হাজী ইউনুস সাহেবকে তিনি সুপারিশ করেন। তাঁর নেক দুআ আমি সবসময় পেয়েছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মরহুমের সুকৃতিগুলো কবুল করুন, আমিন।’

তাফসীর অধ্যয়নের প্রতি তাঁর বিশেষ ঝোঁকপ্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, আল্লামা আশরাফ আলী থানভীর বায়ানুল কুরআন, আল্লামা শিব্বির আহমদ ওসমানীর তাফসীরে উসমানী, আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ শফীর মাআরিফুল কুরআন ও আল্লামা ইকবালের কুল্লিয়াত সবসময় তিনি অধ্যয়ন করতেন। বাংলা, উর্দু ও আরবি ভাষাদক্ষতা ছিল তাঁর সহজাত। ছাত্রজীবনে তাঁর শিক্ষার মাধ্যম উর্দু থাকায় উর্দুচর্চায় তিনি স্বাচ্ছন্দ অনুভব করতেন। আল্লামা ফজলুল্লাহ (রহ.) জীবন কর্ম স্মারকে উর্দু ভাষায় লিখিত তাঁর নিবন্ধ সমৃদ্ধ উর্দু সাহিত্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রয়োজনীয় ইংরেজিও তিনি জানতেন। হস্তলিপিও ছিল আকর্ষণীয়।

জিরি জামিয়া আরাবিয়ার প্রধান পরিচালক শাহ আল্লামা মুহাম্মদ তৈয়ব সাহেব, পটিয়া আল-জামিয়ার প্রধান পরিচালক আল্লামা মুফতি আবদুল হালিম বুখারী সাহেব, চট্টগ্রাম দারুল মাআরিফের সহকারী পরিচালক আল্লামা ফুরকানুল্লাহ খলিল সাহেব, কক্সবাজার মাশরাফিয়া মাদরাসার প্রধান পরিচালক, পদুয়া হেমায়েতুল ইসলাম মাদরাসার প্রধান পরিচালক মাওলানা সরওয়ার কামাল আজিজি সাহেবের নেতৃত্বে পৃথক পৃথক প্রতিনিধিদল জানাযায় শরিক হন। চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া, গারাঙ্গিয়া ইসলামিয়া আলিয়া, বাজালিয়া ফাজিল মাদরাসা ও সাতকানিয়া আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও শিক্ষকবৃন্দ নামাযে জানাযায় অংশ নেন।

লন্ডনে চিকিৎসাধীন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়া নওয়াজ শরিফ, পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পাক পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেতা শাহবাজ শরিফ, সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ, জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরের প্রধান পরিচালক মাওলানা ফজলুর রহিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম, নায়েবে আমির মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির, সাবেক এমপি মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহ, যুগ্মমহাসচিব শেখ লোকমান হোসেন, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী ও মাওলানা আবদুল খালেক নিজামী, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং মাগফিরাতের দুআ করেন।

নামাযে জানাযায় দূর-দূরান্ত থেকে রেকর্ডপরিমাণ মানুষের উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম নসীব করুন। মহাকবি ইকবালের ভাষায়,

আকাশ বর্ষণ করুক তোমার কবরে রহমতের বারিধারা,

আলোকময় সবুজ মাটি যেন এই ঘরকে দেয় পাহারা।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গনি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ