জহির উদ্দিন বাবর
যাদের অস্তিত্ব যুগের দীনতা কিছুটা হলেও কম করে দেখায় তাদেরই একজন ছিলেন হযরত মাওলানা আলতাফ হোসাইন (রহ.)। তিনি ‘মক্কীনগরী হুযুর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো। আলেমকুল শিরোমনি, ইসলামি রাজনীতির রাহবার হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.)-এর সোহবতে তিনি ধন্য হয়েছিলেন। হাফেজ্জী হুযুরের অন্যতম আধ্যাত্মিক উত্তরসুরিও ছিলেন। নানা সময় জাতীয় প্রয়োজনে তিনিও সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘আলেমের মৃত্যু আলমের (জগতের) মৃত্যু’ কথাটির যথার্থতা তাঁর ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে প্রযোগ করা যায় অনায়াসে।
মাওলানা আলতাফ হোসাইনের বাবা আবদুল করীম, আর দাদা হযরত রওশন আলী (রহ.)। তারা ছিলেন নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী শেখ বংশের। তাঁর জন্ম ১৯৩৩ সাল মোতাবেক ১৩৫৫ হিজরীতে। মাওলানা আলতাফ হোসাইন বাবার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন স্কুলে। পরে দাদার নির্দেশে তাঁকে ভর্তি করা হয় নোয়াখালীর টুমচর আলিয়া মাদরাসায়। সেখান থেকে পাস করেন দাখিল। এরপর চলে যান পাকিস্তানের বিখ্যাত দীনী প্রতিষ্ঠান জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে। সেখানে লেখাপড়া করেন দুই বছর। পরে মুলতানে এক মাদরাসায় পড়াশোনা করে। সবশেষে জামিয়া আশরাফিয়ায় দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী, মাওলানা রসূল খান, মুফতি জামিল আহমদ থানভী, মাওলানা আবদুল্লাহ দরখাস্তীর মতো জগদ্বিখ্যাত উস্তাদদের কাছে দীনী শিক্ষা হাসিল করেন মাওলানা আলতাফ হোসাইন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী। সেরা উস্তাদদের সান্নিধ্য তার মেধাকে আরো শানিত করে। তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষার প্রতিটি ধাপ উত্তীর্ণ হন।
লেখাপড়ার সম্পন্ন করার পর মাওলানা আলতাফ হোসাইন শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। নোয়াখালীর ইসলামিয়া মাদরাসার মুহাদ্দিস হিসেবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। তিনি ঢাকার জামিয়া ইসলামিয়া বড়কাটারা, জামিয়া ইসলামিয়া তাঁতিবাজার, জামিয়া নূরিয়া কামরাঙ্গীচর, নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ মাদরাসায় ইলমে হাদীসসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করেছেন। দেওভোগ মাদরাসার মুহতামিম ও শাইখুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। জীবনের শেষ দিকে এসে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া আবু বকর আল ইসলামিয়া মক্কীনগর মাদরাসা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই মাদরাসার প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁকে কেন্দ্র করে এই প্রতিষ্ঠানটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে।
মাওলানা আলতাফ হোসাইন (রহ.)-এর মধ্যে সমন্বয় ঘটেছিল বহুমুখী ব্যক্তিত্বের। ইলম ও আমলে তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ। জ্ঞান-গরিমায় অন্য শত আলেমের মধ্যে তাঁকে ভিন্নভাবে চেনা যেতো। থানভী সিলসিলার প্রখ্যাত বুযুর্গ, বাংলার বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক রাহবার হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.)-এর কাছে তিনি বায়আত হন ১৯৭২ সালে। দীর্ঘ ১০ বছর পর্যন্ত আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভের পর ১৯৮২ সালের দিকে তাঁকে খেলাফত দেন হাফেজ্জী হুযুর (রহ.)। তিনি তাঁর শায়খের সোহবতে থাকার ফলে জাতীয় পর্যায়ে দীনের ঝাণ্ডা তুলে ধরার প্রেরণা লাভ করেন। হাফেজ্জী হুযুর (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক দীক্ষায় তিনি ছিলেন বলীয়ান। আশির দশক পুরোটা জুড়েই তিনি ছিলেন হাফেজ্জী হুযুর (রহ.)-এর আন্দোলন সংগ্রামের একনিষ্ঠ কর্মী।
আলতাফ হোসাইন (রহ.) শুধু আলেম হিসেবেই খ্যাতিমান ছিলেন না, তিনি একজন লেখকও ছিলেন। তাঁর লিখিত কয়েকটি বইও রয়েছে। তাঁর বেশির ভাগ লেখালেখি উর্দু ভাষায়। তিনি উর্দু ভাষার একজন পণ্ডিত ছিলেন। দেশ-বিদেশে তিনি দীনের আলো বিলিয়ে গেছেন। দীনের মিশন নিয়ে তিনি একাধিকবার যুক্তরাজ্য সফর করেছেন। মানুষের মঙ্গল ও হেদায়াতের জন্য তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন জীবনভর। দীনী শিক্ষার প্রচার ও প্রসারেও তাঁর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। মক্কীনগর মাদরাসা তাঁকে কেন্দ্র করেই খ্যাতি লাভ করে।
দীনের এই একনিষ্ঠ খাদেম বার্ধক্যের নানা সমস্যায় ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট রাত দুইটার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত মক্কীনগর মাদরাসায় জানাজা শেষে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনে তিনি দীনের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ খেদমত আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। সদকায়ে জারিয়ার নানা মাধ্যমও তিনি দুনিয়াতে রেখে গেছেন। ইনশাআল্লাহ, কবরে শুয়ে শুয়ে তিনি এসবের ফল ভোগ করবেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমীন।
লেখক: সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক