শনিবার-২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি-১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শায়খ সুফি হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (দা. বা.)-কে যেমন দেখেছি

শায়খ সুফি হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (দা. বা.)-কে যেমন দেখেছি

ড. খালিদ হোসেন

 

বিশ্ববরেণ্য সুফি ও দরবেশ হযরত শায়খ পীর মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দি মুজাদ্দিদি (দা. বা.)-কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। দুনিয়াজুড়ে রয়েছে তাঁর এক কোটি মুরিদ, শিষ্য ও শুভানুধ্যায়ী। লেখক হিসেবেও রয়েছে তাঁর যশ ও খ্যাতি। অধ্যাত্মসাধনা, আত্মার ব্যাধি ও প্রতিকার, কুদৃষ্টি, চরিত্র সংশোধন, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বিষয়ক তাঁর লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় দু’শতাধিক। বর্তমান বিশ্বের অধ্যাত্মিক জগতে তিনি গ্রহণযোগ্য এক সারস্বত ব্যক্তিত্ব। আলিম ও ওলামাদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা সালমান বিজনূরি (দা. বা.)সহ ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের বহু উস্তাদ তাঁর খলিফা। এ কারণে তিনি মাহবুবুল ওলামা ওয়াস সুলাহা অভিধায় পরিচিত হয়ে উঠেন।

২০১৭ সালে হযরত নকশবন্দি (দা. বা.) লিখিত সালামত রহে তুমহারি নিসবত গ্রন্থটি আমাকে হাদিয়া দেন তাঁরই খলিফা মালয়েশিয়া নিবাসী শায়খ মাওলানা মুহাম্মদ (দা. বা.)। আমি তখন কুয়ালালামপুরে। তিনি কষ্ট করে আমার হোটেলে আসেন এবং নকশন্দি-মুজাদ্দিদি তরিকা নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। তাঁর দেয়া এ গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে আমি অত্যন্ত প্রভাবিত হই। ইতোমধ্যে হযরতের লিখিত আরও কিছু গ্রন্থ অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করি।

ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে শায়খ নকশবন্দি (দা. বা.) লিখিত খাওয়াতিনে ইসলামকে কারনামে গ্রন্থটি অধ্যয়ন করি। এতে এমন দুর্লভ তথ্য-উপাত্ত পাই যা এ বিষয়ের অন্যান্য গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। তখন থেকেই শায়খ নকশবন্দি (দা. বা.)-কে দেখার ও সান্নিধ্যসৌরভ নেওয়ার তাগাদা অনুভব করি হৃদয় থেকে। অতঃপর ২০১৮-১৯ সালে শায়খ মাওলানা মুহাম্মদ (দা. বা.)-এর দাওয়াতে মালয়েশিয়ায় হুলুলাঙ্গাতে অনুষ্ঠিত ইসলামি ইজতিমায় শরিক হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করি। হযরত নকশবন্দি (দা. বা.)-এর শান্ত, সৌম্য ও জ্যোতির্ময় অবয়ব দেখে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হই। হযরত শায়খের হাতে হাত রেখে বায়আত গ্রহণ করি এবং তিনি

আমার বক্ষদেশে হৃদপিণ্ডের ওপর হাত রেখে ৩ বার আল্লাহু আল্লাহু বলে ডাক দেন। আমি এখনো জ্যোতির্ময় এই সাধক পুরুষের পবিত্র হাতের শীতল স্পর্শ অনুভব করি।

মালয়েশিয়ায় ইসলামি ইজতেমার ৩ দিনের কর্মসূচি ছিলো অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং সাজানো গোছানো। রুটিন মাফিক অযু-গোসল নামায-যিক্‌র, ওয়ায-নসীহত, নাশতা-খাবার পরিচালিত ও পরিবেশিত হয়। মাগরিবের পর হযরত শায়েখের বয়ান। প্রতিটি বাক্য হীরকখণ্ডের মতো মূল্যবান। প্রতিটি কথা কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসনির্ভর। মাঝে মধ্যে বিখ্যাত ফার্সি ও উর্দু কবিদের কবিতাপঙ্‌ক্তি আবৃত্তি করার কারণে মাহফিলের রওনক ও সৌন্দর্য আরো প্রকটিত হয়ে উঠে।

তাঁর ওয়ায-নসহীতের প্রকাশভঙ্গি বাগাড়ম্বরমুক্ত এবং সাদামাটা। উন্নত অথচ সহজ ও বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপনার কারণে যে কোন মানুষ বক্তব্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। কথার যাদুকরী প্রভাব শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো সম্মোহিত করে রাখে। তাঁর বক্তব্যে অন্তর বিগলিত হয় এবং অশ্রু ঝরে পড়ে বাধাহীনভাবে। নসীহত শেষে মুরাকাবা অনুষ্ঠান। আল্লাহর ধ্যানে তন্ময়তার এ দৃশ্য না দেখলে বোঝানো যাবে না। নকশবন্দি-মুজাদ্দিদি তরিকায় অন্যতম বৈশিষ্ট্য মুরাকাবা। শ্বেতশ্মশ্রু ও শুভ্র উষ্ণীষধারী এ বুযুর্গের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে ইবাদত ও যিক্‌র আযকারে। সেমিনার অথবা ওয়ায-নসীহত শুরু করার আগে তিনি হোমওয়ার্ক করেন এবং নোট দেখে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এতে করে কথার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় এবং পরবর্তীতে ওই নোট অবলম্বনে নির্ধারিত বিষয়ক গ্রন্থ রচনা সহজতর হয়।

সবুজ বীথিকা ও পাহাড়ঘেরা হুলুলাঙ্গাতের ইসলামি ইজতিমায় ২ বেলা খাবার ও ২ বেলা নাশতা তৈরি ও পরিবেশনায় স্বেচ্ছাসেবকদের ইখলাস ও আন্তরিকতার ছোঁয়া স্পষ্ট। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ভারতের বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে মেহমানদের আতিথ্য প্রদর্শন করেন। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, কোরিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার সালেকিন এই ইজতিমায় শরীক হন প্রতি বছর। ৩ দিনের এই ইজতেমা বলতে গেলে আত্মসংশোধনে ব্রতীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

শায়খের তিনজন বিশিষ্ট খলিফা যথাক্রমে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শামসুদ্দিন জিয়া (দা. বা.), হযরত মাওলানা মুফতি মিযান সাঈদ (দা. বা.) ও হযরত মাওলানা উবায়দুর রহমান নদভী (দা. বা.)-এর সাথে ইজতেমা চলাকালীন এক সাথে ইবাদত-বন্দেগি, খাবার নাশতা ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে শরিক থাকার সুযোগ ছিল আমার জন্য বাড়তি পাওনা।

হযরত মাওলানা পীর জুলফিকার নকশবন্দী (দা. বা.) ১৯৫৩ সালের পশ্চিম পাঞ্জাবের জং জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। পবিত্র কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন ১৯৬২ সালে। ১৯৬২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উস্তাদের কাছে ফার্সি, আরবি, নাহু, সারাফ, ফিক্‌হ, উসূলে ফিক্‌হ, তরজমা, তাফসির, উলূমুল কুরআন, হাদীস, উসূলে হাদীস, সিহাহ সিত্তা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব অধ্যয়ন করেন। হাফিজুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ জাফর সাহেবের কাছ থেকে তিনি হাদীসের ইজাযতপ্রাপ্ত হন। জাহানিয়ামণ্ডিস্থ জামিয়া রহমানিয়া ও মুলতানের জামিয়া কাছেমুল উলূম তাঁকে দাওরায়ে হাদীসের সনদ প্রদান করেন। আরব বিশ্বের অনেক মুহাদ্দিসের কাছ থেকে তিনি হাদীসের ইজাযতপ্রাপ্ত হন।

পাঞ্জাবের জং জেলায় অবস্থিত দারুল উলূম, জামিয়া আয়িশা (মহিলা মাদরাসা) ও মা’আহাদ আল ফকির আল ইসলামির মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ফয়সালাবাদ, লাহোর, রাওয়ালপিণ্ডি, ইসলামাবাদ, মালয়েশিয়া, লুসাকা ও জাম্বিয়ায় প্রতিষ্ঠিত দরসে নিজামি শিক্ষাধারার বহু মাদরাসা প্রধান উপদেষ্ঠা হিসেবে তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

হযরত মাওলানা পীর জুলফিকার নকশবন্দী (দা. বা.) ১৯৬৭ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক, ১৯৭৬ সালে প্রথম বিভাগে বিএসসি (ইলেকট্‌্িরক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রি লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি কম্প্যুটার ম্যানেজমেন্ট, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, লাইব্রেরি সায়েন্সে স্পেশাল কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৭৬ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন এবং ১৯৭৭ সলে পাকিস্তান সোসাইটি ফর সুগার টেকনোলজিতে মেম্বার নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে চিফ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হন।

১৯৭১ সালে নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া তরিকায় সবক ও বায়আত নেন। ১৯৮২ সালে প্রখ্যাত সাধক হযরত খাজা গোলাম হাবিব (রহ.) থেকে ইজাযত ও খিলাফত লাভ করেন। হযরত মাওলানা পীর জুলফিকার নকশবন্দি (দা. বা.) দাওয়াত ও তাবলিগের মহান দায়িত্ব পালনে পৃথিবীর ৭০টি দেশ সফর করেন। এর মধ্যে সৌদি আরব, আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, সিরিয়া, মিশর, তুরস্ক, নেপাল ভারত, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপূর, মিয়ানমার, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফগানিস্তান, উযবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, দাগিস্তান, ডেনমার্ক, হাঙ্গেরি, জার্মান, নরওয়ে, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, ফিনল্যান্ড, ফিজি, আফ্রিকা, জাম্বিয়া, রুশ ফেডারেশনের ৯টি স্টেট এবং মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ২২টি স্টেট অন্যতম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাঁর ৩শ’জন খলিফা নকশবন্দি-মুজাদ্দিদি তরিকায় ইসলাহি খিদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন।

ইংল্যান্ডে রয়েছেন শায়খ নকশবন্দি (দা. বা.)-এর নতুন প্রতিনিধি অনুজ প্রতিম ড. মাওলানা মাহমুদুল হাসান আজহারী। গত বছর মালয়েশিয়ার ইসলাহী ইজতেমায় মাহমুদ ভাইসহ রেস্ট হাউজের একই কক্ষে ছিলাম। শায়খ নকশবন্দি (দা.বা.) তাঁকে পাগড়ি (ইজাযত) প্রদান করেন।

তাঁর লিখিত দু’শতাধিক উর্দু গ্রন্থ ইংরেজি, পশতু, হিন্দি, তামিল, তেলেগু, নেপালি, সিনহালি, বার্মিজ, রাশিয়ান, তুর্কিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। বাংলায় ভাষান্তরিত হয়েছে তাঁর সর্বাধিক গ্রন্থ প্রায় ১০০টি। বাংলাদেশে শায়েখের রয়েছে ১০জন খলিফা। হযরত পীর জুলফিকার নকশবন্দী (দা. বা.)-কে বাংলাদেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শায়খের খলিফা বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শামসুদ্দিন জিয়া (দা. বা.), হযরত মাওলানা মুফতি মিযান সাঈদ (দা. বা.), হযরত মাওলানা মুফতি ইমাদুদ্দিন (দা. বা.) ও হযরত মাওলানা উবায়দুর রহমান নদভী (দা. বা.) সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন। ঢাকার কুড়িলস্থ শায়খ জাকারিয়া ইসলামিক সেন্টারে তাঁর খানাকাহ অবস্থিত। প্রতি দু’মাস অন্তর ওখানে ইসলাহি মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গনি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on pinterest
Pinterest
Share on telegram
Telegram
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

সর্বশেষ